ধোকা পর্ব – ০১ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে রুমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু রাতের প্রকৃতি দেখছিলাম.. একটু পরই ইশা রুমে এলো.. আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওর শাড়ি ঠিক করছিলো.. ওকে দেখে রুমের ভেতরে এলাম আমি.. আয়নার সামনে ওর পেছনে গিয়ে দাড়ালাম আমি..
পেছন থেকে আমার দুহাত ইশার শাড়ি গলিয়ে ওর পেটে জড়িয়ে ধরলাম.. আমার মুখটা নিচু হয়ে ওর কাধের উপর রেখে আয়নায় তাকালাম,
-আমার বউটাকে কতো মিষ্টি লাগে, দেখো!…
-ইইহ! হয়েছে আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না.. ঘুমাও গিয়ে..
-উহু.. এতো মিষ্টি একটা বউ থাকলে কি রাতে ঘুম হয়, বলো!
-ঘুমাবে না তো কী করবা?
-সারারাত দেখবো তোমাকে…….
কথাটা শুনেই ইশা একটা হালকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো আমায়,
-অলে লে… আর আহ্লাদ দেখাতে হবে না, যাও তো লাইটটা অফ করে এসে ঘুমাও…
আমি একটা হাসি দিয়ে লাইট অফ করতে গেলাম.. ইশা বেডে গিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে কম্বল টেনে শুয়ে পড়লো..
আমিও বাতি নিভিয়ে ডিম লাইটটা অন করে বেডে এসে শুয়ে পড়লাম..
কম্বলটা গায়ে টেনে ইশার দিকে ফিরে তাকালাম আমি,
-ও ম্যাম… একটু দিয়া দাও না আদর..
-ইশ ইশ রে.. সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে, আর রাত হলেই ভালোবাসা বেড়ে যায় উনার!
-কই বাইরে বাইরে! অফিসে থাকি তো… কাজেই তো বেলা কেটে যায়..
-জ্বি সেটাই সেটাই.. এখন আর কোনো কথা না বলে ঘুমান তো..
-আরে কী হলো তোমার?
-কিছু না তো, ঘুমাও…
বলেই ইশা মুখ ফিরিয়ে ওপাশে শুয়ে পড়লো.. আদরে ব্যর্থ হয়ে আমিও চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর টিকিট কাটছিলাম..
.
পরদিন সকালে ঘুম ঘুম চোখ মেলে দেখলাম ইশা পাশে নেই.. ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম বেশ বেলা হয়ে গেছে.. উঠা দরকার, নাহলে অফিসের দেরি হয়ে যাবে..
এই ইশাটাও না! ডাক দেবে না আমায়! পরে যে অফিস যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করতে হয় বুঝে না নাকি! যাই হোক, রান্না ঘরে আছে মনে হয়.. কাজের চাপে ডাক দেবার সুযোগ পায়নি হয়তো..
নিজে নিজেই ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম.. অফিসের জন্য রেডি হয়ে নাস্তার জন্য নিচে গেলাম.. তার আগে একবার মায়ের রুমে গেলাম,
-কী করছো মা? উঠেছো ঘুম থেকে?
-হ্যা বাবা অনেকক্ষণ হলো.. হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে আছি এখন..
-ওহ্ আচ্ছা, খাবে না? এসো একসাথে খেয়ে নেবো..
-তোর তো অফিস আছে, যা খেয়ে নে তুই.. আমি একটু পর খেয়ে নেবো..
-আচ্ছা ঠিক আছে..
আমি রুম থেকে বেরিয়ে যাবো, তখনি মায়ের ওষুধের বক্সটায় নজর গেলো,
-ওহ্ হ্যা! ভালো কথা, সকালের খাওয়ার আগের ওষুধ খেয়েছো মা?
-না তো.. আমার তো কখন কোন ওষুধ খেতে হয় খেয়াল থাকে না, তুই নাহয় বউমা ই তো দিস…
-আচ্ছা দিচ্ছি দাঁড়াও..
আমি বক্সটা নিয়ে মায়ের পাশে বসলাম.. তারপর সকালের ওষুধটা খুজতে খুজতে অন্য একটার প্যাকে চোখ গেলো,
-মা? কালকে রাতের ওষুধটাও খাও নি?
-ওহ্ না রে.. তোরা তো দিস নি.. আর আমারও খেয়াল নেই..
-ইশাও দেয় নি? সকালে আসে নি তোমার রুমে?
-হ্যা এসেছিলো, ঘর টর ঝাড়ু দিয়ে, মুছে আবার চলে গেলো.. আমার মনে নেই ওষুধের কথা, আর বউমারও হয়তো খেয়াল নেই..
-ওহ্ আচ্ছা.. নাও এখন খেয়ে নাও ওষুধটা..
আমি জলের গ্লাস আর ওষুধটা এগিয়ে দিলাম মায়ের দিকে.. মাকে ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে ইশার কথা ভাবতে লাগলাম.. মেজাজটা কিছুটা খারাপ হয়ে গেলো..
কী হলো ইশার! রাতেও মাকে ওষুধ দিতে ভুলে গেলো, আর এখনোও! মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে ইশাকে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘরে গেলাম..
-ইশা… এই ইশা!
-কি হলো! সাত সকালে চেচামেচি করছো কেন!
-What! চেচামেচি করছি আমি! Ok Fine! আমি সাত সকালে চেচামেচি করছি এটা বুঝতে পারছো, অথচ সাত সকালে যে আমাকে অফিসে যেতে হয়, মাকে ওষুধ খেতে হয়, এটা ভুলে গেছো! আমাকেও ডেকে তুলো নি আজ, মাকেও ওষুধ দাও নি রাত থেকে.. কি হয়েছে তোমার ! এতোটা কেয়ারলেস কীভাবে!..
ইশা ওর রান্নার কাজ কর্ম রেখে আমার সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাড়ালো.. ও বিরক্তি ভাব নিয়ে বলতে শুরু করলো,
-বাহ্ বাহ্! আমারটাও শোনো তাহলে… সকাল সকাল উঠে উঠে যে বাড়ির এতো কাজ আমাকেই সামলাতে হয়, সে সময় কিছু না তাই না! তুমি তো নবাবের ছেলে! সারাদিন অফিসে থেকে বাসার কোনো কাজ তো করতে হয় না.. মা অসুস্থ.. আর তোমার ছোট বোনও তো সারাদিন স্কুল প্রাইভেট পড়া নিয়েই থাকে.. সব তো আমাকেই দেখতে হয়.. তখন কি কোনো অভিযোগ করি তোমায়!
-দেখো ইশা! মা তো অসুস্থই… আর তিতুও তো ছোট মানুষ.. তো বাড়ির বউ হিসেবে তো সবকিছুর খেয়াল তোমাকেই রাখতে হবে, তাই না!
-হ্যা হ্যা সব খেয়াল রাখার পরও তো তোমার অভিযোগ আর শেষ হয় না! একা মানুষ সব দিক কীভাবে সামলাবো..!
-বাহ্ ইশা! আগে তো কখনো এমনভাবে কিছু বলো নি.. তাহলে আজকে হঠাৎ কি হলো তোমার.. আরে তোমার যদি সাহায্যের দরকার ই হয়, তাহলে আমাকে বলবা, তিতু বাসায় থাকলে ওকে বলবা, এভাবে খেয়ালে বেখেয়ালে কাজ গুলোর ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে?
-হৃদয়! ভুল তো মানুষমাত্রই হয়.. এজন্য তো তোমার আমার উপর এভাবে রাগারাগি করার কোনো মানে হয় না!
-হ্যা ভুল হলো মানলাম.. কিন্তু একই ভুল বারবার! রাতেও মায়ের ওষুধ মিস, আজকে সকালেও হলো এমন…!
-ওহ্ তো তুমি বলতে চাইছো আমি ইচ্ছে করে এমন করেছি…!
-কী রে কী হয়েছে তোদের..? (মা)
-এমন কিছু……..
আমি পুরো কথাটা বলার আগেই পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মা অসুস্থ শরীর নিয়ে হাজির.. আমি মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে ধরলাম,
-একি মা! তুমি অসুস্থ শরীর নিয়ে রুম থেকে এসেছো কেন..?
-তোদের চেচামেচি শুনেই তো এলাম.. ঝগড়া করছিস কেন তোরা?
-কই মা কিছু না তো.. এমনিতেই জাস্ট… যাও তো যাও রুমে গিয়ে শুয়ে থাকো..
-মিলেমিশে থাকিস বাবা.. মাথা গরম করিস না..
আমি চুপচাপ মাথা নেড়ে মাকে রুমের দিকে নিয়ে এলাম.. ইশা আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো..
মায়ের অসুস্থতা আর অফিসে যেতে দেরি হবে ভেবে ইশার সাথে আর রাগারাগি করলাম না.. মাকে রুমে দিয়ে চুপচাপ গম্ভীরমুখে নাস্তা সেরে অফিসে চলে গেলাম..
.
তখনের পর থেকে অফিসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ইশার মুখে আর একটাও কথা ছিলো না.. আসার সময়ও কোনো কথা বললো না ও.. অফিস যাওয়ার সময় শুধু ইশার কথাই ভাবছিলাম..
ইদানীং অনেক দিন ধরেই ওর মধ্যে কেমন জানি এক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে.. আগের ইশাটা যেন নেই আর.. মাত্র ছয় মাস হলো আমাদের বিয়ের.. এর আগে তো কখনো এমন হয়নি.. কাজেকর্মেও কেমন যেন এক গাফিলতি দেখা যায় ইশার.. আর ওকে এসব নিয়ে কিছু একটা বললেই ও ও আমার সাথে মেজাজ দেখানো শুরু করে..
এসব ভাবতে ভাবতে অফিসে গেলাম.. সকালে ইশার সাথে এমন করার জন্য খারাপ লাগছিলো.. তাই Lunch Time এ অনুতপ্ত হয়ে কল দিলাম ইশাকে.. কিন্তু তখনও ইশা ভালোভাবে কথা বললো.. রাগের কারণে হয়তো.. আমি ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে ফোন রেখে দিলাম.. রাতে যেভাবেই হোক, অভিমানটা ভাঙাতে হবে..
অফিস শেষে রাস্তার দোকান থেকে এক তোড়া ফুল কিনলাম… এখন বাসায় যেতে যেতে শুধু প্রস্তুতি নিচ্ছি কীভাবে মহারাণির রাগ ভাঙানো যায়..
কলিংবেলটা বাজাতেই তিতু দরজা খুলে দিলো.. আস্তে আস্তে ঢুকলাম বাসায়.. তিতু আমাকে ডাক দিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু আমি ওকে মুখে আঙুলের ইশারা দিয়ে চুপ থাকতে বললাম.. এক হাতে ফুলের তোড়াটা পিছনে নিয়ে রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম.. কিন্তু রুমে গিয়ে ইশা ম্যামের দেখা পেলাম না, বুঝলাম রান্না ঘরেই আছে হয়তো..
তোড়াটা পেছনে লুকিয়ে রান্নাঘরে গেলাম.. উম.. রান্নাঘরেই আছে ও.. কতো সুন্দর কোমরে শাড়ির আচল গুজে রান্না করছে..
আমি পেছন থেকে ওর কোমরে এক পাশে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে তোড়াটা পেছন থেকেই ওর সামনে ধরলাম..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /