ধোকা পর্ব – ০৫ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

প্রীতম আর ইশার কর্মকান্ডে আমি একদম হতবাক হয়ে গেলাম… প্রীতমকে তো আমি আমার সবথেকে ভালো বন্ধু মনে করতাম..
তারপর ও ভাই হয়েও আমার বউয়ের সাথে………………..
ছিহঃ
ভাবতেই গায়ের টগবগ রক্ত সব গরম হয়ে যাচ্ছে..
ইশাকে এতো ভালোবাসি, তবুও কি কম পড়লো ওর যে প্রীতমের সাথে………… ছিহ্!
এসবে আমি একদম মুর্তির মতো নিস্তেজ হয়ে গেলাম.. আমার মধ্যে তখন কষ্ট, রাগ, ঘৃণা সবই একসাথে কাজ করতে লাগলো.. সেজন্য একদম প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি..
-ইশা! পারলে তুমি এভাবে আমাকে ধোকা দিতে! আমার ভালোবাসার কি কোনো মূল্য ছিলো না তোমার কাছে… আরে এটা না হয় বাদ ই দিলাম, প্রীতমের সাথে যে সম্পর্ক তোমার সেটা আগে বললেই পারতে… আমাকে ভালোবাসায় জড়িয়ে এতো কষ্ট দেওয়ার কি মানে ছিলো! ছিহ্ আমার ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে যে তোমার মতো মেয়েকে এতো ভালোবেসেছি আমি!
প্রীতম অস্থিরভাবে আমার কাছে এসে আমার কাধে হাত রাখলো,
-হৃদু দেখ্! মাথা গরম পরে করিস.. সব কথা শোন আগে, তারপর তোর যা মনে চায় করিস.. শান্ত হয়ে ডিসকাস করি চল্
-আরে চুপ থাক্ হারামজাদা! এতো বড় বিশ্বাসঘাতকতা আমার সাথে! এতো ভালোবাসার এমন ফল! শেষ হয়ে যাবে আজ সব কিছু!
বলতে বলতে পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম.. কলে কিছুক্ষণ একজনের সাথে কথা বলে ইশার উদ্দেশ্যে বললাম,
-নাও কথা নিলাম উকিলের সাথে! হয়ে যাবে ডিভোর্স.. আর এভাবে ভালোবেসে ঝুলে থাকার ইচ্ছে নেই.. আর কয়েকটা মাস শুধু.. তারপর নিজের ভালোবাসাকে থেকো নিজের মতো..
-হৃদু! হঠাৎ করে………..
-শালা চুপ কর্ তুই! বের হ আমার রুম থেকে!
আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে জোর করে প্রীতমকে ঘাড়ে ধরে বের করে দিলাম.. ভাগ্যিস আজ এমন সময় এসেছিলাম বাসায়, নাহলে তো এতো কিছু জানতেই পারতাম না… ইশার এতো পরিবর্তনের কারণ যেন আজকে বুঝতে পারলাম ভালো করে..
মেজাজটা প্রচুর গরম হয়ে আছে.. কষ্টে সবকিছুই যেন আটকে আসছে! রুমে এসে দরজা বন্ধ করে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম.. একা থাকা দরকার আমার…
.
পরের কয়েকদিন একদম চুপচাপ থাকলো আমাদের ঘর… ইশা বা আমি, কারোরই কোনো টু-শব্দ শোনা যেতো না…
ইশা ইশার মতো আর আমি আমার মতো করে চুপচাপ কাজ করতাম…
ইশাকে আমি খুব ভালোবাসতাম, খুব… কিন্তু ঐদিনের পর থেকে আমার মধ্যে যেন এক অস্থিরতা ঢুকে পড়ে… প্রতিনিয়ত এখন ইশাকে আমার চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছা করেনা.. ওকে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায় আমার…
সহ্য হয় না আর.. পুরনো কথা মনে পড়ে সব.. ভালোবাসার কথা ভেবে আরো কষ্ট হয়..
না ইশা আমার কাছে ভালো আছে, না ওর জন্য আমি ভালো আছি!
মা আর তিতু কষ্ট পাবে ভেবে, ওদের না জানিয়েই ডিভোর্সের জন্য খুব চেষ্টা করতে লাগলাম..
যে সম্পর্কে জোর করে টিকিয়ে রেখেও কোনো অস্তিত্ব থাকে না, সে সম্পর্কটা একেবারে শেষ করে দেওয়াই ভালো…
হয়তো এতে করে দুজনেই ভালো থাকবো.. না থাকলেও শিখে যাবো..
স্বামী স্ত্রী হয়েও আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই আর.. এক ছাদের নিচে থেকেও কারোর সাথে কারোর কোনো কথা নেই..
ইশা ওর মতো আর আমি আমার মতো করে থাকতে লাগলাম.. প্রীতমের সাথেও আমি নিজের সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে দিলাম..
এভাবেই চলছিলো আমাদের… এখন শুধু ডিভোর্সের অপেক্ষায়…
.
ইশা এতোটা কেয়ারফুল না হলেও পলক ঠিকই দিনে একবার হলেও আমাদের বাসায় আসতো.. মা আর তিতুর খোজ খবর নিতো.. তারপর অনেকক্ষণ ওদের সাথে গল্প টল্প করতো.. মাঝেমধ্যে টুকটাক রান্নাও করে দিয়ে যেতো..
এতোদিনে এতোকিছু না বুঝতে পারলেও ইদানীং এটা বুঝতে পারছি যে, ইশা পলককে সহ্য করতে পারে না.. পলক বাসায় আসলে ও কেমন যেন এড়িয়ে যেতে চায়.. মুখ শুকিয়ে ফেলে নিজের.. এক ভাব দেখা যায় ইশার চেহারায়..
এমনটা ইশা আগেও করতো, কিন্তু তখন এতো খেয়াল করিনি.. সেদিন পলককে নিয়ে বলা ইশার কথাগুলো থেকে আজ সব খেয়াল করতে পারছি..
যদিও ইশা বা আমি ডিভোর্সের কথা নিয়ে বাসার কারোর সাথে আলোচনা করিনি, তবুও যেন পলক বুঝতে পেরেছিলো আমার আর ইশার মধ্যে কোনো প্রবলেম হয়েছে..
ও ইশার সাথে অতো ক্লোজ ছিলো না.. জাস্ট স্বাভাবিকভাবে কথা বলতো ওর সাথে.. তাই এটা নিয়ে ওকে কিছু না বলে আমাকেই জিজ্ঞেস করেছিলো, যদিও আমার সাথে ও তেমন ক্লোজ না..
যাই হোক, আমি ওকে আমার আর ইশার মধ্যকার কোনো কথাই বললাম না.. শুধু এড়িয়ে গেলাম ব্যাপারটা..
.
কয়েকদিন পর আবারো কোনো এক ছোট বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেলো..
ঝগড়ার কোনো এক পর্যায়ে না চাইতেও ইশার গালে সজোরে এক থাপ্পড় মারলাম,
-আরে মুক্তি দাও না আমায়… সব ছেড়ে চলে যাও মা-বাবার কাছে.. আর সহ্য করতে পারছি না আমি প্লিজ..
আমার চিৎকারে মা আর তিতুও রুম থেকে চলে এলো..
ইশা অশ্রুসজল চোখে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে.. তিতু গিয়ে ইশার দুই কাধে ধরে এক পাশে দাড়ালো,
-বউদি কী হয়েছে? এ ভাই কী হলো তোদের!
আমি আর ইশা কেউ ই কোনো কথা বলছি না… লাল চোখে ইশার থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরলাম আমি..
মা আমার এক কাধে ধাক্কা দিয়ে বললেন,
-এই কী হয়েছে তোর! এতো কিসের মেজাজ! বউমার গায়ে হাত তুললি কেন!
-তোমার বউমাকে জিজ্ঞেস করো না! আর কিসের এতো বউমা! ও বউমা ছিলো তোমার, দুদিন আর থাকবে না..!
-মানে!
-মানে তোমার বউমা আমার সাথে থাকতে চায় না, তো আমিও ওকে ডিভোর্স দেবো…!
-ডিভোর্স! এই দাদা পাগল হলি তোরা! কি বলছিস! (তিতাস)
-হ্যা ঠিকই বলছি.. আমাদের মাঝে তোরা আসিস না প্লিজ! আমাদের প্রবলেমটা আমাদের একেবারের জন্য সলভ করতে দে, তারপর দেখিস সবাই হ্যাপি থাকবে…
-বাহ্ তোরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলি.. ছোট খাটো বিষয় নিয়ে তোরা বিয়ে নামক বন্ধনটাই ভেঙে দিবি!
-আরে মা! বিয়ে ছিলো না ওটা! আবেগের ঠেলায় জবরদস্তি সুখী থাকার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিলো..
-যাই হোক, ডিভোর্স টিভোর্সের চিন্তা বাদ দিয়ে ঝামেলাটা মিটিয়ে নে.. আর কখনো এরকম করিস না প্লিজ.. (তিতাস)
-হাহ্! ডিভোর্স ছাড়া তো ঝামেলা মিটবে না আর.. তোরা তো জানিস না কিছুই, তাই বলছিস এভাবে! ইশা তো… ছিহ্! বলতেও খারাপ লাগছে আমার! তোরা জানলে তোদেরও বলার মতো আর কোনো ভাষা থাকবে না…
-আরে কী হয়েছে স্পষ্ট করে বলবি তো! (মা)
-হাহ্ মা! তোমাদের বউমা তো আর আমার জন্য না… অন্য কারোর জন্য… বিয়ের আগেও ও অন্য কারোরই ছিলো, আর এখনো বিয়ের পর তার সাথেই পরকীয়ায় লিপ্ত!
-Whattt!!
-ইয়াহ্! বিয়ের পরও শ্বশুরবাড়ির থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে পরপুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখে! ওদের মেন্টালিটি আর কেমন হতে পারে! দিনের পর দিন, দিনের পর দিন, এভাবেই আমাদের সবাইকে ধোকা দিয়ে যাচ্ছিলো ওর.. আর ওর সেই গুণধর ব্যক্তিটি কে জানো মা! প্রীতম….! প্রীতম! হ্যা আমাদের প্রীতম!
কথাটা শুনেই যেন এক নিরবতা ছড়িয়ে গেলো ঘরে… মা আর তিতু একদম অবাক হয়ে গেলো..
মা হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে.. তিতু ইশার দিকে তাকিয়ে অবাক কন্ঠে বললো,
-বউদি সত্যি এসব!?
-আরে কিসের বউদি টউদি বলে আহ্লাদ দেখাচ্ছিস! ওর মতো মেয়েকে আমার লাইফে দরকার নেই! চলে যেতে বল্ ওকে আমার সামনে থেকে.. থু!
কথাটা শুনেই ইশা হুড়মুড় করে মেজাজ দেখিয়ে রুমে ওর ব্যাগপত্র গুছানো শুরু করলো.. তিতু কি করবে বুঝতে না পেরে ওকে আটকানোর চেষ্টা করছিলো, আর আমাকেও ইশাকে আটকানোর জন্য বলছিলো.. পরে আমি নিজেই তিতুর এক হাত ধরে আটকে রাখলাম,
-আরে যে সম্পর্কেরই সম্মান দিতে পারে না, সে আর ঐ পরিবারে থেকে কী করবে! যেতে দে ওকে ওর মতো করে! ওর মা-বাবার কাছে গিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করুক, ঈশ্বরের কাছে শুধু এইটাই প্রার্থনা করি!
ইশা রাগে আর কান্নায় ওর সব কিছু প্যাক করতে লাগলো.. তিতু আর মায়ের সাথে কথাবার্তা তো দূর, যাওয়ার সময় ওদের দিকে ফিরেও তাকালো না..
আর মা কিছু না বলে স্ট্যাচুর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো.. ইশা ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতেই মা মাথা ঘুরে পড়ে গেলো..
আমি আর তিতু তাড়াতাড়ি করে মাকে ধরলাম.. তিতু এখন আর নিজেকে সামলাতে পেরে একদম কেদেই দিলো.. ছোট মানুষ.. ওর কান্না দেখে আমারও বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো..
মাকে রুমে নিয়ে তাড়াতাড়ি ডক্টরকে কল করলাম.. মায়ের এমন অবস্থার খবর শুনেই পলক হন্তদন্ত হয়ে দ্রুত ছুটে এলো..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /

আহারে জীবন || একে আজাদ

আহারে জীবন

Person
Ak Azad

আহারে জীবন!
অতৃপ্ত মন
অন্তহীন যাতনা
স্বাপ্নিক বাসনা।
পেরেশান চলন
আহারে জীবন!
মানব! জীবন!
নয় মণিকাঞ্চন
সুখি বলে
মিথ্যা আস্ফালন।
আহারে জীবন!
কর্ম ধর্ম
অভাব সর্বত্র
দুনিয়ার নিয়ম
চলছে অবিরাম।
আহারে জীবন!

Tagged : / /