ধোকা পর্ব – ০৬ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

পলকের নিজের মা নেই.. তাই আমার মাকেই একদম নিজের মায়ের মতো ভালোবাসতো.. তাই আজকে মায়ের এই অবস্থায় ও একদম অস্থির হয়ে উঠতো..
মায়ের যখন জ্ঞান আসছিলো না, পলক কান্না করতে করতে হঠাৎ ই আমাকে জড়িয়ে ধরলো.. ওর চোখের জলে আমার টি-শার্টের বুকপকেটটা একদম ভিজে যাচ্ছিলো.. বুকটা কেমন যেন কেপে উঠলো..
ইশাও তো অনেকবার আমাকে জড়িয়ে ধরেছে, কিন্তু কখনো তো আজকের মতো এমন অনুভূতি হয়নি আমার..
আর হঠাৎ করে এভাবে জড়িয়ে ধরায় আমি বেশ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম..
আমিও রেসপন্সে ওকে জড়িয়ে ধরবো নাকি সরিয়ে দেবো.. নাকি বলবো ওকে কিছু.. কিছুই বুঝতে পারছিলাম না..
বুঝতে পারছিলাম যে পলক এটা আবেগের কারণে করেছে, তবুও আমি এখন কেমনভাবে রিয়েক্ট করবো, বুঝে উঠতে পারছিলাম না..
অবশেষে একরকম সাহস সঞ্চয় করে পলককে একপাশে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় হাত রাখলাম..
হাতটা কাপছে আমার.. কোনোমতে মুখ থেকে আওয়াজ বের করে পলকের উদ্দেশ্যে বললাম,
-এই পলক, কেদো না এভাবে.. মা ঠিক হয়ে যাবে তো.. কান্না থামাও.. নাহলে তোমারও শরীর খারাপ হয়ে যাবে.. প্লিজ..
পলক আমার টি-শার্ট খামচে ধরে আরো কান্না করতে লাগলো.. কীভাবে সামলাবো ওকে বুঝতে পারছিলাম না..
পলকের জায়গায় ইশা হলে কখনোই এভাবে কান্না করতো না সিউর আমি! ইশা এমন কেন! আর পলক ই বা ওমন কেন! কাউকেই বুঝতে পারিনা আমি…
একটু পর, পলককে আলতো করে সরিয়ে ওর দুগালে হাত রেখে কাদতে নিষেধ করলাম.. তারপর আমার রুমালটা বের করে পলকের চোখদুটো মুছে দিলাম…
পলক কোনোমতে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলো.. একটু পর মায়ের জ্ঞান ফিরতেই যেন পলকের জানে পানি এলো.. এবার একটু শান্ত হলো সে..
ডক্টর মাকে ওষুধ আর ঘুমের ইনজেকশন আমাদের কিছু কথা বলে চলে গেলেন..
তিতু কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে গেলো.. মাও ঘুমাচ্ছিলো.. পলকের কান্নাও একটু আগেই থামলো.. ওদের কান্নায় আমি একদম নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলাম.. বুকটা কেমন যেন খা খা করছিলো..
একা থাকার জন্য একটু বেলকনিতে গিয়ে দাড়ালাম.. একটু পর কাধে কেউ একজনের স্পর্শ টের পেয়ে পেছন ফিরে তাকালাম..
দেখলাম এক গ্লাস জল হাতে পলক এসে দাড়িয়েছে.. আমি তাকাতেই ও আমার দিকে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পুরো জলটা খেতে বললো..
আমি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আরেকবার ওর দিকে তাকালাম.. কিছুক্ষণ ওর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে গ্লাসটা হাতে নিয়ে জলটা খেয়ে নিলাম..
পলক গ্লাসটা রেখে এবার আমাকে আজকে হঠাৎ এমন অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করলো..
কষ্ট হালকা করার জন্য আমি পলককে একে একে সব খুলে বললাম.. পলক এসব শুনে একদম শকড হয়ে গেলো..
ও একদম অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে,
-ইশার সাথে প্রীতমের অ্যাফেয়ার চলছিলো, আর সেটা থেকে ডিভোর্স টিভোর্স এতো কাহিনী ঘটে গেলো, অথচ আমাকে কিছু একটা বলার প্রয়োজন মনে করলে না?
-দেখো পলক.. আমি অনেক কিছু ভেবেই কিছু বলতে চাইনি.. আমি তো আমার বাসায় ই এটা নিয়ে কাউকে কিছু বলিনি.. আজকে সকালেই সব বললাম, আর তারপর তো……. জানো ই..
-হুমমম….
পলক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো.. পলক আমার এক গালে হাত রেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তখনি ওর বাসা থেকে ওর ভাইয়ের ডাক পড়লো..
ও কথাটা বাকি রেখেই চলে গিয়েছিলো তখন..
.
কয়েকদিন কেটে গেলো…
.
মা ধীরে ধীরে সুস্থ হলো.. মায়ের পাশে এখন সর্বদাই পলক হাজির থাকে, তাই মাকে নিয়ে এখন আর এতো চিন্তাভাবনা করতে হয়না আমাকে..
তিতুও ইশার সাথে অতো ক্লোজ না থাকলেও, পলকের সাথে বেশ ফ্রেন্ডলি.. এদিক থেকেও শান্তি আমার…
তবে অন্যদিক দিয়ে খুব অশান্তি ছিলো আমার মনের মধ্যে.. কিন্তু সেটা কোনোভাবেই কাউকে প্রকাশ করতে পারছিলাম.. ইন ফ্যাক্ট, আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারতাম না ভালোভাবে..
ঐদিনের পর থেকে ইশার সাথে এরপর আর একটা কথাও বলিনি… ভুলতে চাইছিলাম ওকে.. তাই ওর সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম..
এর কয়েক মাসের মধ্যেই ডিভোর্স হয়ে যায় আমাদের.. ঐদিন ইশা আমার সাথে শেষবারের মতো কিছু কথা বলে আমার শুভ কামনা করে চলে গিয়েছিলো..
তবুও যেন ওর ছায়াটা পিছু ছাড়ছিলো না আমার.. ওর মায়াটা ছাড়ানোর জন্য অনেক পথ অবলম্বন করেছিলাম আমি..
সেদিনের পর থেকে কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে গেছিলাম আমি.. রাত করে বাড়ি ফিরতাম.. নেশাটা তো নতুন ধরেছিলাম.. ড্রিংকস্ করেও ফিরতাম অনেক সময়..
টালমাটাল শরীরে আবোল-তাবোল কতোকিছু বকতাম.. মা আর তিতু প্রতিরাতেই আমাকে সামলানোর চেষ্টা করতো..
হুশে থাকা অবস্থায় মা আমাকে বোঝানোর খুব চেষ্টা করতো.. কান্নাও করতো.. খুব কষ্ট লাগতো তখন.. বুঝতাম আমি এমন করাটা ঠিক হচ্ছে না আমার… তবুও নিজের লুকোনো চাপা কষ্টটা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না আমি..
পলকও অনেক বকতো আমায়.. তবুও প্রতিবার না চেয়েও এমন সব নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছিলাম আমি.. রাতে যেন ঘুম হতো না.. নিজেই নিজেকে হ্যান্ডেল করতে পারতাম না..
.
একদিন সন্ধ্যায় বাইরে যাওয়ার আগে হঠাৎ মা আমাকে ডেকে পাঠালেন,
-কোথায় যাচ্ছিস এখন?
-এইতো একটু বাইরে যাবো…
-হ্যা তারপর রাতে নেশা করে ফিরবি.. আর বাড়িঘর মাথায় তুলবি.. শরীরের কি হাল করছিস খেয়াল আছে? নিজেরটা না হয় ভাবিস না, বাসায় যে একটা স্কুল পড়ুয়া ছোট বোন আছে, সে খেয়াল আছে তোর? ও কী শিখবে এসব থেকে!
আমি মায়ের প্রশ্নে কী জবাব দেবো বুঝতে পারছিলাম না.. পকেটে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম.. মা আবার বলতে শুরু করলেন,
-দেখ্ যা হয়ে গেছে তা ভুলে যা না! যে মেয়েটা তোর কথা একটুও ভাবেনি, তার জন্য তুই কেন এতো কষ্ট পাবি!
-মা! ভালোবেসেছিলাম ইশাকে.. খুব ভালোবেসেছি.. নিজের থেকেও বেশি.. কিন্তু ও আমাকে ধোকা দেবে, তা ভাবতে পারিনি.. আর কাছের মানুষরাই যে এতো বেইমানী করতে পারে, সে সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা হলো…
-সবাই একরকম না হৃদু.. যারা বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে পারেনা, তারা এমনি করে.. তুই অন্য কাউকে নিয়ে আবার নতুন করে সংসার কর্.. তোর জীবনের আরো অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে.. একটু তো নিজের চিন্তাও কর্ বাবা!
-এখন আর কাকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখবো মা.. সেকেন্ড টাইম আর কাউকে নিয়ে সংসার সাজানোর ইচ্ছা নেই..
-পলক… খুব ভালো মেয়ে..
মায়ের মুখে হঠাৎ এই কথাটা শুনে একদম চমকে তাকালাম.. মা আমার কাধে হাত রেখে খুব আত্মবিশ্বাসের সহিত পলককে নিয়ে কিছু কথা বললো,
-পলককে তো চিনিস ই তুই.. আর যাই হোক, ইশার মতো তো একদম ই না.. নতুন করে তেমন কিছুই বলার নেই.. সারাদিন তুই বাসায় থাকিস না, পলক ই তো থাকে আমার পাশে.. এখন দেখ্ এভাবে যদি সারাদিন পড়ে থাকে, তাহলে অনেকেই অনেক কথা বলবে.. সমাজের মুখ তো জানিস ই.. এর থেকে বরং তুই পলককে বাড়ির বউ করে নিয়ে আয়.. দেখ্ সব দিক থেকেই ভালো হবে বাবা.. তোরও খেয়াল রাখবে.. সবকিছুই সামলে নিতে পারে মেয়েটা.. নাহলে তুই নিজেই চিন্তা করে দেখ্..
মায়ের কথা শুনে কিছুক্ষণ ভাবলাম আমি.. একদম দোটানায় পড়ে গিয়েছিলাম.. কিছু একটা চিন্তা করতে করতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-এটা কি ঠিক হবে মা?
-কেন হবে না! হতেই পারে….
-না মানে দেখো.. একবার তো আমার আর ইশার সংসার ভেঙেছে.. তো..??
-তাতে কী! আমার ছেলের তো কোনো দোষ নেই..
-পলক কি রাজী হবে?
-সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না.. তুই শুধু বল্ রাজী কি না!
আমি কি উত্তর দেবো বুঝতে পারছিলাম না.. কিছুক্ষণ ধরে ইতস্তত করতে করতে মাকে বললাম,
-ঠিক আছে, কিন্তু ওর পরিবার? সবাই মানবে তো?
-দেখি কথা বলে..
-আচ্ছা যাই এখন..
-হুম..
.
অবশেষে সবদিক খেয়াল করে মায়ের কথায় আবার সব শুরু করার জন্য রাজী হয়েছিলাম আমি..
.
গেলো কয়েকদিন…
.
কয়েক সপ্তাহ পর, আমার আর পলকের বিয়ে সম্পন্ন হলো.. পলক যে কীভাবে কী কারণে রাজী হয়েছিলো এ বিয়েতে জানা নেই আমার..
প্রথমে ভেবেছিলাম ও আপত্তি করবে.. কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি..
আর তাছাড়া আমাদের কারোর পরিবারও বিয়ের প্রস্তাবটা নিয়ে কোনো রকম ঝামেলা করেনি.. মা কথা বলার কয়েকদিনের মধ্যেই পলকের পরিবার থেকে বিয়ের আয়োজন শুরু করে দিলো..
অবাক হয়েছিলাম প্রথমে, কিন্তু পরে আর এটা নিয়ে কোনো মাথা ঘামাই নি…
কোনো একরকম বিয়ের সব কাজ বেশ ভালো ভাবেই সব সম্পন্ন হয়ে গেলো..
আজ ফুলশয্যা..
যদিও এটা আমার জীবনের দ্বিতীয় ফুলশয্যা.. তবুও পলক আর আমার তো প্রথম রাত…
.
.
(চলবে)

Tagged : / /

চাঁদ মামা || একে আজাদ

চাঁদ মামা

Person
Ak Azad

একটি পূর্ণ চাঁদ
আলোকিত রাত,
জোছনা পরছে ছুয়ে
ধান ক্ষেতের গায়ে।
জোঁনাকিরা পাচ্ছে লজ্জা দেখে চাঁদের সজ্জা,
শেয়াল মামা ভূরি ভূরি
খেলছে লুকোচুরি।
নেই বাদ কুকুর ও
তেড়ে যাচ্ছে করছে ঘেও ঘেও,
তাল মেলাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকা মাটির গর্তে একা একা।
দেখে এদের কাজ
চাঁদ মামা দ্বিগুন হাসছে আজ।

Tagged : / /