ধোকা পর্ব – ০৭ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

পলক আর আমার প্রথম রাত আজ.. কিন্তু এই ফুলশয্যার রাতেও ড্রিংকস করে এলাম আমি… রুমে যে কেউ একজন ওয়েট করছে, সে খেয়ালটাই যেন নেই…
টালমাটাল অবস্থায় রুমের দরজাটায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকলাম.. আমাকে দেখেই পলক বেড থেকে নেমে দাড়ালো..
আমি মাতাল হয়ে টলতে টলতে কোনোমতে পলকের সামনে গিয়ে দাড়ালাম,
-কেউ ভালোবাসে না রে আমায়… কেউ ভালোবাসে না..
মাতাল কন্ঠে পলককে কথাগুলো বললাম আমি.. চোখগুলো একদম লাল হয়ে গেছে আমার..
পলক আমাকে টলতে দেখে কোনোভাবে ধরলো আমাকে,
-হৃদয় নেশা করেছো তুমি!…
-হু হালকা লাগে… খুব হালকা লাগে… ইশা আর প্রীতমের মতো…………
কথাটা বলতে বলতে আটকে যাচ্ছিলাম আমি… পলক আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-ইশা আর প্রীতম আবার কী করলো??
-সেদিন কতো কি বললো ওরা… দেখা হয়েছিলো.. কষ্ট দিয়েছে ওরা আমায়…
পলক আমাকে আস্তে আস্তে বেডে নিয়ে বসালো,
-হৃদয় বসো ঠিকমতো.. এখন একদম ক্লিয়ার করে বলো প্লিজ কী হয়েছে…
আমি কোনোমতে পলককে সেদিনের কথা বলতে লাগলাম….
ঃ-
এক ছুটির দিনে এমনিতেই সুজিত দার ছেলে অন্তুটাকে কোলে নিয়ে হাটতে হাটতে পার্কে ঘুরতে গেসিলাম.. সেখানে গিয়ে হঠাৎ ই প্রীতম আর ইশার সাথে দেখা…
ওরাও হয়তো একসাথে এখানে সময় কাটাতে এসেছিলো.. ওদের দেখা মাত্রই মেজাজটা বিগড়ে গেলো আমার.. অন্তুকে নিয়ে ফিরে আসছিলাম..
কিন্তু প্রীতম দেখে ফেললো.. ইশা আর ও দ্রুত আমার কাছে এসে কথা বলার জন্য থামালো আমাকে..
প্রীতম আমার উদ্দেশ্যে বললো,
-এই হৃদু..! জাস্ট কিছুক্ষণের জন্য একটু দাড়া প্লিজ… ৫মিনিট?
আমি বিরক্তিভাব নিয়ে প্রীতম আর ইশার দিকে ফিরে তাকালাম,
-কী হয়েছে…!
-হৃদু! একটু সময় মন দিয়ে আমার কথাটা শোন প্লিজ!
দেখ্ মানছি আমার আর ইশার সম্পর্ক রয়েছে… তবুও ব্যাপারটা ভালোভাবে ক্লিয়ার করা দরকার… (প্রীতম)
-আর কি ক্লিয়ার করার দরকার আছে! কিছুই শোনার নেই আমার.. ভালো থাক্..
-হৃদয়, একটু তো ঠান্ডা হয়ে শোনো.. সব যখন জেনেই গেছো, তাহলে ভালো করেই জানো সব… (ইশা)
-কী জানবো!
-তুই হয়তো ভেবেছিস তোদের বিয়ের পর থেকে আমার আর ইশার সম্পর্ক হয়েছে, কিন্তু এমন না… আমার সাথে ইশার এর আগেও সম্পর্ক ছিলো… তবে সেটা খন্ডকালীন.. (প্রীতম)
-মানে?
-মানে শোন্…. বছর খানেক আগের কথা.. প্রীতম আর আমি একজন আরেকজনকে খুব ভালোবাসতাম.. আড়াই বছরের সম্পর্ক ছিলো আমাদের.. ভালোই চলছিলো সব.. কিন্তু হঠাৎ ই দরকারে আমার বিদেশ যাওয়ার কথা ঠিক হলো.. এখন কোনদিন দেশে ফিরবো বা আদৌ ফিরবো কিনা জানতাম না.. প্রবলেম ছিলো, তাই ইশার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে বিদেশ চলে গেলাম…
-কষ্ট হলেও তখন থেকে প্রীতমকে আমি আস্তে আস্তে ভুলে যেতে লাগলাম.. তারপর তোমার সাথে বিয়ে হলো.. গেলো কয়েকমাস.. প্রথম প্রথম তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছিলাম খুব.. কিন্তু তেমনভাবে পারিনি.. কয়েকমাস পর যখন হঠাৎ প্রীতমকে দেখলাম তোমাদের বাসায়, তখন একদম শকড হয়ে গেলাম.. আমি জানতাম না তোমরা যে কাজিন.. প্রায় ভুলেই গেছিলাম প্রীতমকে.. কিন্তু ঐদিন একে অপরকে দেখার পর কেন জানি আবার সেই পুরনো ভালোবাসাটা উকি দিয়ে উঠলো.. তোমাদের থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে যোগাযোগ হতো আমাদের.. তারপর এভাবেই আস্তে আস্তে কীভাবে যে আবার সম্পর্কে জড়িয়ে গেলাম জানি না..
-বাহ্ ভালোই! তো এসব শুনে আমার কী লাভ হলো?
-লাভ ক্ষতি কিছু না হৃদু.. তুই যখন জেনেছিস ই, তাহলে একদম শুরু থেকে শেষ জানালাম.. আমাদের জন্য তুই খুউব কষ্ট পেয়েছিস জানি, অনেক অপরাধবোধ জাগছিলো, তাই এসব বলে হালকা করে নিলাম.. ক্ষমা করে দিস আমাদের প্লিজ!
-হাহ্! কতো সহজ না দুনিয়াটা? ভুল করলাম.. অনুতপ্তও ফিল করলাম.. অতঃপর ক্ষমাও চেয়ে নিলাম.. এতেই কি সব শেষ হয়ে যায়? আরে ভুল ক্ষমার মাঝখানে যে কষ্টটা থাকে, সেটার পরিণতি কেউ কীভাবে ঠিক করবে!
-হৃদয়, প্লিজ সরি… অনেক গিল্টি ফিল করছি.. তোমার সাথে অনেক খারাপ বিহেইভ করেছি, মাফ করে দাও..
-ইশা? আমার তোমাকে তো কিছু বলার ই নেই আর.. এতোটা ভালোবেসেছিলাম তোমায়, আর তুমি এভাবে আমাকে ধোকা দিলে? আমাকে একটাবার সবকিছু বলে দেখতে পারতে.. আমি নিজে থেকে তোমাকে ভালোয় ভালোয় মুক্তি দিতাম.. এতো কষ্ট দেওয়ার তো দরকার ছিলো না.. আমার লাইফে তোমাদের মতো এমনটা আর কেউ করেনি..
-ভাই সত্যি তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মুখেরও অবস্থা নেই আমাদের.. তোর যা ইচ্ছা শাস্তি দে আমাদের..
-হাহ্ জানিস, সত্যিটা জানার পর চাইলেই আমি অনেক কিছু করতে পারতাম… তাতে তোর আর ইশা কারোরই সমাজে মুখ দেখানোর মতোও অবস্থা থাকতো না.. এটা কিন্তু তোদের কৃতকর্মের জন্যই.. তোদের পরিবারেও ঝামেলা হতো খুব.. কিন্তু এমন কোনোকিছুই করিনি আমি.. উপরে ঈশ্বর থাকতে আমি তোদের শাস্তি দেওয়ার কে!
আচ্ছা যাই হোক, বাদ দে, ভালো থাক্ সবসময়.. এটাই প্রে করি..
বলেই আমি অন্তুকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম, তখনি ইশা আমাকে ডাকলো পেছন থেকে,
-কয়েকমাস পর বিয়ে আমাদের… পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসো.. (ইশা)
-হুম…
আমি মাথা নাড়িয়ে ওদের নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে অন্তুকে নিয়ে চলে এলাম…
আমার কথাগুলো শেষ করে ঢুলুঢুলু চোখে তাকালাম পলকের দিকে.. দেখলাম ও ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে.. হঠাৎ ই ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে শুরু করলো,
-খুব কষ্ট হয়েছে তোমার হৃদয়? আর হবে না রে.. ইশা তোমার মতো করে ভালোবাসে নি তোমায়.. আমি বাসবো হৃদয়.. আমি বাসবো..
আমি নেশা লাগা কন্ঠে পলককে আলতো করে ছাড়িয়ে আমার সামনে দাড় করিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলাম.. ও কিছু না বলে আমার দুইগালে হাত রাখলো,
-পাগল কেন বিয়ে করতে রাজী হয়েছি তোমায় বুঝোনা রে? ভালোবাসি তো… তুমি ছাড়া অন্য কেউ এই প্রস্তাবটা দিলে আগেই পরিবারকে না করে দিতাম.. কিন্তু তুমি ছিলে তাই কেউ আপত্তি দেয়নি… জানো হৃদু, আরো আগে থেকেই ভালোবাসি রে তোমায়.. কিন্তু আমি তা প্রকাশ করার আগেই তুমি অন্য কারোর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছিলে.. তাই এড়িয়ে চলতাম তোমায়..
-উমমম….
ঘুমের মতো অবস্থায় ছিলাম আমি.. পলকের কথাগুলোতে শুধু মাথা নেড়ে হা হু করে যাচ্ছিলাম.. ভালো করে চোখ মেলতে পারছিলাম না..
পলক আমাকে বেডে শোয়ালো আস্তে আস্তে,
-নেশা করো কেন রে… আর করো না প্লিজ.. নিজের ভালো বুঝোনা তুমি? তোমার সাথে সাথে মা, তিতুর কষ্ট হয় বুঝোনা? এখন তো আমারও সহ্য হয়না প্লিজ.. আর কখনো পুরনো কথা নিয়ে কষ্ট পেও না প্লিজ.. নেশায় নেশায় শরীরটাই খারাপ করে ফেলছো…
আমার নেশা করা নিয়ে পলক খুব কান্না করলো.. আমাকে নিয়ে কেন এতো কান্না করে পলক! কীভাবে কী করবো বুঝতে পারছিলাম না.. হুশে ছিলাম না..
নেশায় ছিলাম.. পলকের কথাগুলোর জবাব দেওয়ার মতো এনার্জী ছিলো না.. এমনি এমনি ই হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লাম..
.
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি এলোমেলোভাবে বিছানায় শুয়ে আছি… পলক কতো আগেই উঠে গেছে ঘুম থেকে..
রুমে নেই.. হয়তো রান্নাঘরে বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত.. গায়ের কম্বল টম্বল সরিয়ে বেড থেকে নামতেই গতরাতের কথা মনে পড়ে গেলো..
নেশার জন্য বকুনি তো খেতাম ই.. কিন্তু কালকে রাতে পলক কান্নাও করলো! আমার জন্য?
মা আর তিতুর কথাও মনে পড়ে গেলো.. মানুষগুলো কতো চিন্তা করে আমার.. আর আমি নিজেকে সামান্য হালকা করার জন্য এতোজনকে কষ্ট দিচ্ছি..
অনুতপ্ত হতে লাগলো খুব.. সিদ্ধান্ত নিলাম এটার জন্য একেবারে শেষবারের মতো ক্ষমা চেয়ে নেবো.. আর তারপর নেশাটাও ছেড়ে দেবো..
ফ্রেশ টেশ হয়ে তাই পলকের খোজে নিচে গেলাম.. ও কিচেনে রান্না করছিলো.. আমি ওর পাশে গিয়ে চুপচাপ দাড়ালাম..
পলক ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলো আমাকে.. কিন্তু কোনো কথা না বলে আবার ওর মতো করে রান্না করতে লাগলো..
কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটু পর একটু হালকা খুশখুশ করে কাশি দিয়ে পলকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম,
-পলক রাগলে তোমাকে দারুণ লাগে.. কিন্তু নেশাগ্রস্ত চোখে তোমার সেই মুহুর্তটা ভালোভাবে উপভোগ করতে পারি না.. তাই ভাবলাম ছেড়ে দেবো নেশা টেশা..
পলক কাজ করতে করতে আড়চোখে তাকালো আমার দিকে,
-ঢং! প্রতিবার তো একই কথা বলো যে, আর করবা না নেশা…
-এইবারেরটা একদম পাক্কা.. কসম…
-হুহ্ এতো দিব্যি টিব্যি কাটতে হবে না.. শুধু মনে থাকলেই হলো..
-আরে প্রমিস করলাম তো.. সত্যি…
-আচ্ছা আচ্ছা এখন গিয়ে খেতে বসো..
-হুম..
আমি গিয়ে তিতুকে ডেকে এনে একসাথে খেতে বসলাম.. মায়ের শরীরটা একটু খারাপ.. তো মায়েরটা পলক রুমেই দিয়ে এলো..
যাই হোক, এতোদিনে বেশ শান্তি বিরাজ করছে বাসাটায়.. মায়ের সব খেয়াল পলক ই রাখে.. আর তিতুর সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবেও তো পলক আছে..
সারাদিন বাইরে বাইরে থাকলেও ওদের নিয়ে আর বাড়তি কোনো চিন্তা করতে হয় না আমার.. পলক নিজেই খুব ভালোভাবে সামলে নেয়..
.
একদিন মন খারাপ করে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি… পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু কল্পনা করছিলাম..
আকাশটা আজ সকাল থেকেই মেঘলা.. শীতের দিনে এমন আবহাওয়া সচরাচর দেখা না গেলেও এখন যেন এটা গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে..
আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা দেখছি, হঠাৎ ই টিপটিপ করে করে এক ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো..
টিপটিপ বৃষ্টি দেখতে দেখতে অর্ধেক ভিজেই গেলাম.. তাই ঝুম বৃষ্টিতে আর রুমে যাওয়ার দরকার মনে করলাম না..
কেন জানি এই বৃষ্টিতে খুব ভিজতে ইচ্ছে করছিলো.. তাই আরো নিজে থেকেই ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগলাম..
হঠাৎ ই কারোর নরম স্পর্শে চমকে উঠলাম আমি.. তাকিয়ে দেখলাম পলক রাগী চেহারা নিয়ে আমাকে খুজতে এসেছে..
ও এক হাতে মাথাটা ঢেকে বৃষ্টি থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করে আমার উদ্দেশ্যে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বললো,
-ঐ! এমন অঝর বৃষ্টির মধ্যে এভাবে ভিজছো কেন! শয়তান তাড়াতাড়ি ভেতরে চলো..
আমি নিশ্চুপ চাহনিতে পলকের দিকে তাকিয়ে আছি.. এতো মিষ্টি শাসন.. ঠোটের কোণে একটা ঢেউ খেললো আমার..
ওদিকে বৃষ্টি বেড়েই চলেছে.. পলক আমাকে খুজতে এসে নিজেও ভিজে যাচ্ছিলো.. ও বকতে বকতে আমাকে ভেতরে যাওয়ার জন্য কনভিন্স করছিলো.. কিন্তু আমি নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছি ওর দিকে..
হঠাৎ ই ভয়ংকর এক বাজ পড়তেই পলক ভয়ে সজোরে একটা চিৎকার দিয়ে অন্য হাতে আমাকে টানতে টানতে ছাদের এক পাশের স্টোর রুমটায় ঢুকে পড়লো..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /

শশুরবাড়ি পর্ব – ০১ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

ফুলশয্যা… জীবনের এক বহু প্রতীক্ষিত ভালোবাসার অনন্য মুহুর্ত.. ব্যাচেলর লাইফ থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষে আমিও এই নিশিযাপনের সুযোগ পেয়েছি..
বউ আমার খুব সুন্দর করেই বেনারসী পরে সেজেগুজে বাসর ঘরে ওয়েট করছে.. আমি এতোক্ষণ বন্ধুদের সাথে বাগানে আড্ডা দিচ্ছিলাম..
ওদের থেকে ছাড়া পেয়ে এখন নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম.. বুকটা ধুকপুক করছে.. গলা শুকিয়ে কাঠের মতো অবস্থায়.. কোনোমতে গিয়ে দরজাটা খুলে বাসর ঘরে ঢুকলাম..
বাহ্! ফুলে ফুলে বেশ ভালো করেই সাজানো হয়েছে রুমটা.. এতোসব ফুলের সমাহারে সবথেকে মনোরম ফুলটা যেন আমার বউ ই.. কতো লজ্জামুখে লম্বা ঘোমটা টেনে চুপটি করে বসে আছে.. ওকে দেখে আমার অন্তর দিয়ে কেমন যেন এক বাতাস বয়ে যাচ্ছে…
আমি রুমের দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ফুলেসজ্জিত বেডের দিকে এগিয়ে গেলাম.. ধীরে ধীরে বসলাম বউয়ের পাশে.. ওভাবে কতোক্ষণ নিরবে স্থির হয়ে থাকলাম.. কি থেকে কি বলে শুরু করবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না..
অবশেষে মনে হলো আগে ঘোমটাটা সরানো দরকার.. এতে করে চোখে চোখ পড়লে কথা বলার একটু তাগিদ পাওয়া যাবে.. অবশ্য বউয়ের চেহারাটা দেখার জন্যও মনটা আকুপাকু করছে আমার.. তো আর কিছু না ভেবে সরিয়েই ফেলি ঘোমটা..
চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ঘোমটা সরানোর হাত উঠালাম.. কোনোরকম কাঁপা কাঁপা হাতে ঘোমটাটা সরাতে উদ্যত হচ্ছিলাম.. ঘোমটা উঠিয়ে ফেলবো ঠিক এমন মুহুর্তেই চুলে কেউ সজোরে এক টান দিলো..
চুলে টান খেয়ে দ্রুত এক লাফে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম আমি.. উঠে বসে জোরে জোরে প্রশ্বাসের সাথে সাথে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলাম..
‘বউ, বউ’ বলে ঘুম কাটিয়ে আশেপাশে তাকাতেই দেখলাম তিতু ওর কোমরে হাত দিয়ে বিরক্তির চেহারায় তাকিয়ে আছে,
-বউ কোত্থেকে পেলি তুই!
তিতুকে দেখে ঘুমের চোখেই একদম চমকে উঠলাম আমি.. উফফ গড! স্বপ্ন ছিলো তাহলে! খুব বিরক্ত বোধ করলাম আমি.. ঘুমকন্ঠেই তিতুকে বকতে লাগলাম আমি,
-ধুউর! বউয়ের চেহারাটাও দেখতে পেলাম না! ফুলশয্যাটাও ভেস্তে দিলি ব্যাঙ…
-এহহ!! স্বপ্নের ছিরি দেখো! বিয়ে হচ্ছে দাদাভাইয়ের… আর ফুলশয্যা করছেন উনি!
-আরে এক কথাই তো! ঘুরে ফিরে তুই তো বউদি ই ডাকবি…
-মাথা! এই নিয়ে তোকে ছয়বার ডাকা হলো ঘুম থেকে উঠার জন্য.. কিন্তু তোর সেই কুম্ভকর্ণের ঘুম শেষই হয় না! বাইরে কতো কাজ.. বাবা জেঠাইরা খুজছে তোকে..
-কতো ঘুম পায় রে… (আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে)
-দেখি ওঠ্ ওঠ্! নাহলে তোকে রেখেই বরযাত্রী চলে যাবো..
-ইহ্! আমাকে ছাড়া কোনো শুভ কাজ হতে পারে নাকি..
-ঢং! ওঠ্ তাড়াতাড়ি…
-উম..
তিতু মুখ ভেংচিয়ে রুম থেকে চলে গেলো.. ধুউর! আমার কতো ভালো স্বপ্নটায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিলো.. আমার সাধের ফুলশয্যা..
আহ্ ব্যাচেলর লাইফেও কতো স্বপ্ন!
অবশ্য এতে আমার মতো নিষ্পাপ ছেলের কোনো দোষই নেই.. এমন স্বপ্ন আসতেই পারে… ৬/৭দিন ধরে যে বিয়ে বিয়ে চিন্তা মাথায় ঘুরছে.. যদিও আমার বিয়ে না..
সারা বাসায় এক হৈচৈ আর কোলাহল.. হওয়াটাই স্বাভাবিক.. দাদাভাইয়ের বিয়ে.. আজ দুপুরের দিকে বরযাত্রী যাবো সবাই…
কনের বাড়ি কিছুটা গ্রাম আর শহরের মধ্যবর্তী স্থানে.. তবে ওরা এমনিতে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই বিলং করে.. আমাদের থেকে কোনো দাবি দাওয়া নেই.. ওরা নিজে থেকেই মেয়েকে যা পারে, দিয়ে দেবে..
আমাদের স্থায়ী ঠিকানা শহরে হলেও এবার দাদাভাইয়ের বিয়েটা উনি ঠিক করলেন গ্রামের বাড়ি থেকে করাবেন.. অবশেষে পরিবারের সবার সম্মতিতে গ্রামের বাড়ি থেকেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু করা হয়েছিলো..
গ্রামের বাড়িতে আসার পর থেকেই বিয়ে নিয়ে এতো ধকল চলছে… এতো কাজ.. বাবা-কাকা, ভাই-বন্ধুদের সাথে মিলে সব সামলানো.. বিয়েতে মজা ফুর্তি নাচানাচি.. সব কিছু মিলিয়ে খুবই ক্লান্ত লাগতেছে.. ঘুম ছাড়ছেই না..
অথচ বাইরে আবারো বরযাত্রী যাওয়া নিয়ে কতো কাজ টাজ.. এসব রেখেই আমি মরার মতো ঘুমাচ্ছি.. এখন উঠে যাওয়া দরকার বাবা! নাহলে জুতোপেটা খেতে হবে…
কোনোমতে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বিয়ের কাজে সাহায্য করতে গেলাম.. গিয়ে বরযাত্রী যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে.. সবাই সেজেগুজে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে রেডি..
আমাদের গ্রামের বাড়ির দু’মিনিট দূরত্বের গাঙে দুইটা ইঞ্জিনচালিত ঘরওয়ালা নৌকা অপেক্ষা করছে..
বরযাত্রীরা সবাই গিয়ে নৌকায় উঠছে.. কেউ ভেতরে.. কেউ ছাদের উপরে.. আমি গিয়ে নৌকার উপরেই এক মাঝি ভাইয়ের কাছে বসলাম..
সবাই খুব উৎফুল্ল মুডে.. পরিবারের বড় ছেলের বিয়ে বলে কথা! দাদাভাই কি সুন্দর বর টর সেজে নৌকার ভেতরে ফ্রেন্ডদের সাথে বসলো..
দুই স্টেপে যেতে হবে.. প্রথমে এই নৌকা গিয়ে এক অন্য গ্রামের গঞ্জে থামবে.. তারপর সেখান থেকে আবার এক নরমাল ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে যেতে হবে..
কনেপক্ষের গ্রামে পৌছতে পৌছতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো.. ওখানে নেমে মূল গন্তব্যের জন্য আবার ১৫/২০ মিনিটের মতো হাটতে হবে..
আমাদের নৌকাটা এবার আগেই পৌছেছিলো.. তবে দাদাভাই এবার অন্য নৌকাতে ছিলো.. আমরা সবাই তাই পাড়ে দাঁড়িয়ে বরের নৌকার ওয়েট করছিলাম..
দাদাভাইয়েরা নামতেই আমরা সবাই মিলে হাটা শুরু করলাম.. গ্রামের সন্ধ্যারাতের পরিবেশ.. রাস্তা কতো এলোপাথারি আর অন্ধকারাচ্ছন্ন..
বরযাত্রীরা সব হেই সেই কথা বলতে বলতে বিয়েবাড়িতে যাচ্ছিলাম.. কিন্তু তখন থেকে হাটতে হাটতে আমার পায়ে পুরো ব্যথা ধরে যাচ্ছে.. এমনিতেই শরীরটা কেমন মেজমেজ করছে!
হঠাৎই কানের মধ্যে জোরে জোরে সাউন্ড বক্সের গান আসতে লাগলো.. উফ! তাহলে কাছাকাছিই চলে এসেছি.. একটু যেন আরাম পেলাম প্রাণে..
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়েবাড়ির গেইট নজরে পড়লো.. কিছুটা গ্রামীণ এলাকায় হলেও ওদের দালান বাসা.. খুব সুন্দরভাবে বাসার চারপাশে সাজানো হয়েছে..
দাদাভাইকে নিয়ে কাকা আর ওর ফ্রেন্ডরা আগে আগে চলছে.. দাদাভাই ওর ডান হাত দিয়ে ওর ধূতির কুচিটা ধরে আছে.. আর অন্য হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে আমাদের চার বছরের ভাতিজা অন্তু ধরে আছে.. ক্যামেরাম্যান তো সেই তখন থেকেই এদিক সেদিক থেকে ভিডিও করতে করতে যাচ্ছিলো..
ওরা গিয়ে গেইটের সামনে দাড়ালো.. এটার ব্যবস্থা খুব সুন্দরভাবে করা হয়েছে.. ওখানে দাদাভাইকে একটা সজ্জিত চেয়ারে বসতে দিলো.. সামনের টি-টেবিলে কতোরকমের খাবার.. নানারকম মিষ্টি, সুন্দরভাবে সার্ভ করা ফল-মূল.. দুধ, জুস.. হেই সেই.. ইশ! দেখেই খিদে পেয়ে যাচ্ছে..
টেবিলের একদিকে বরযাত্রী.. অন্যদিকে কনেপক্ষ.. একদল মেয়েরা দাঁড়িয়ে.. হয়তো দাদাভাইয়ের শালিরা.. দুপক্ষের ক্যামেরাম্যান একত্রিত হয়ে ভিডিও করতে লাগলো.. বরযাত্রীর আপ্যায়ন শেষ.. এবার ভেতরে ঢোকার পালা..
কনেপক্ষ আর বরযাত্রী মিলে বিয়েবাড়িতে কতো ভিড়! বর সবার আগে আগে.. তারপরের সবাই ঠেলাঠেলি করে কোনোমতে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতে লাগলো.. এতো ভিড়ের মধ্যে ঢুকে আমি একটু সাইড দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেতে চাইছিলাম..
হঠাৎ কোনো এক কোমলমতির শরীরে ধাক্কা খেয়ে বেকুব হয়ে গেলাম.. চোখের সানগ্লাসটা খুলে পড়ে গেলো আমার.. কিছুটা বিরক্ত হয়ে ওটা নিচ থেকে তুলে সামনে তাকালাম..
তাকাতেই দেখলাম নীল শাড়ি পরিহিতা কোনো এক কন্যা মুখ ফিরিয়ে আমার বিপরীত দিকে তাড়াহুড়া করে দৌড়ে যাচ্ছিলো.. চেহারা দেখতে পারিনি, তবে পেছন থেকে যতোটুক দেখলাম, তাতেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি.. একে তো নীল শাড়ি.. তার উপর ঘন কালো চুলে এক আকর্ষণীয় খোপা করা.. তাতে ফুলের বেষ্টনি..
মেয়েটা যে দৌড়ে যাচ্ছিলো, তাতে ওর আচলটা খুব সুন্দর মাটিতে ডিস্ট্যান্স রেখে ঢেউ খেলাতে খেলাতে দুলছিলো.. আমি মুগ্ধ চাহনিতে নির্বাক দাড়িয়ে ওর যাওয়াটাই উপভোগ করছিলাম..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /