ধোকা পর্ব – ০৯ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

ও আমার কাছে এসে আমার কলার দুটো ওর হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আমার চোখে চোখ রাখলো.. তারপর এক অজানা আশংকায় আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
-হৃদু, তোমার বেবি?
আমি অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম…
একটু পর কপাল ভাজ করে কম্পিত কন্ঠে জবাব দিলাম,
-হয়তো…
পলক আমার সব কথা শুনে এক ঝটকায় আমার কলারটা ছেড়ে দিলো.. আমি কিছুটা ছিটকে সরে গেলাম…
পলক অপরদিকে মুখ ফিরিয়ে কান্না শুরু করে দিলো.. আমি ওর কাছে গিয়ে ওকে আমার দিকে ফিরালাম.. ওর দুইকাধে হাত রেখে নিচু হয়ে ওর দিকে তাকালাম.. ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম,
-এই পলক, কাদছো কেন এভাবে?
পলক আমার গলায় পিঠে জড়িয়ে ধরে আরো কাদতে লাগলো.. ও কোনোমতে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,
-হৃদয়, ওটা যদি তোমার বেবি হয়, তাহলে তো তুমি ওদের কাছে চলে যাবে, তাই না রে!
-আরে! কে বললো!
-আমি বললাম……..
-বললেই হলো নাকি! কিছু হবে না এমন…
-এমনই হবে হৃদু! নাহলে ইশা যে প্রেগন্যান্ট, ওটা তোমাকে বলার কী দরকার ছিলো! ও তো এখন অন্য কারোর, তাই না!
-জানি না রে….
-ও তো জানে, তুমি এখন শুধু আমার.. তাহলে ও তোমায় ওর প্রেগন্যান্সির খবর জানিয়ে দেখা করতে বললো কেন এভাবে? দেখবা ও সিউর তোমার কাছে ওর বেবির বাবার অধিকার চাইবে…
-আমাদের তো ডিভোর্স হয়ে গেছে.. তাহলে অধিকার চেয়ে কি আর কিছু হবে…
-জানিনা………
বলেই পলক আরো শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে কান্না করতে লাগলো.. আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না…
ইশা কি সত্যিই আমার কাছে ওর বাচ্চার বাবার অধিকার চাইবে! ঐ সময় তাহলে আমি কি করবো!
বাচ্চাটা আমার হলে তো রক্তের টানও থাকবে… কীভাবে নিজের রক্তকে অস্বীকার করবো তখন..
এসব ভাবছিলাম তো একটু পরই পলক কান্না চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-হৃদু, বিকালে তুমি যখন ইশার সাথে দেখা করতে যাবে, তখন আমিও যাবো তোমার সাথে…..
-তুমিও??
-হ্যা… নিয়ে যাবে প্লিজ??
পলকের অশ্রুসজল কান্নামাখা মুখটা দেখে আমি ওকে মানা করতে পারলাম না.. ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে ওকে সম্মতি জানালাম..
বিকালে আমি আর পলক ইশার সাথে দেখা করার জন্য বের হলাম.. পলকের মুখটা একদম শুকনো হয়ে আছে.. দুপুরে ভালো করে খায়ও নি.. ওর ঐ অবস্থায় আমি নিজেও কিছু খেতে পারিনি…
ইশার সাথে এক কফি শপে দেখা করার কথা.. বাইকে উঠে পলক সারাটা রাস্তা আমাকে একপাশে জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা রেখে এলো..
পুরোটা সময়ই ও একদম চুপচাপ ছিলো.. শুধু কফিশপে ঢোকার পূর্বে ও আমার হাতটা শক্তে আকড়ে ধরে করুন ভাবে তাকিয়ে একটা বললো,
-যতো কিছুই হোক রে, তুমি কখনো আমায় ছেড়ে যেও না প্লিজ… I Don’t Wanna Lose You Hridu….
আমি কিছু না বলে ওর হাতটা শক্ত করে আকড়ে কফিশপের ভেতর পা বাড়ালাম..
.
কফিশপে ইশা আগে থেকেই ওয়েট করছিলো.. আমাকে আর পলককে দেখে ও একটু নড়েচড়ে বসলো,
-পলকও এসেছো? (ইশা)
-হুমম…
-আচ্ছা ভালোই হলো.. বসো..
ইশার মুখটা কিছুটা শুকনো লাগছিলো.. সেটা দেখে পলক ইশাকে জিজ্ঞেস করলো,
-কিছু হয়েছে ইশা?
-হ্যা রে.. অনেক কিছু.. প্রেগন্যান্ট আমি..
-তো বেবিটা কি আমার ইশা??
ইশা এবার জবাব দিতে গিয়ে একটু ইতস্তত বোধ করছিলো.. আমি আর পলক ওর দিকেই তাকিয়ে আছি.. একটু পর ইশা মাথাটা ডানে বামে মাথাটা হালকা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলো,
-না প্রীতমের…
বলেই ইশা মাথাটা নিচে ঝুকিয়ে ফেললো.. এই জবাবটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না..
বেবিটা প্রীতমের শুনে অন্যদিকে ফিরে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলাম আমি.. তারপর ইশার দিকে তাকিয়ে বললাম,
-বাহ্! কত্তো ভালো রে… বিয়ের আগেই বেবি! ওয়াও! এই না হলে ডিজিটাল জেনারেশন!
-হৃদয়.. আর লজ্জা দিও না রে.. পুরোটা শোনো প্লিজ.. তারপর কিছু একটা সাজেস্ট করো.. তুমিও পারলে হেল্প করিও পলক.. আমার প্র্যাগনেন্সি নিয়ে একটা প্রবলেম হয়েছে রে..
-বেবিটা যখন প্রীতমদার ই, তাহলে প্রবলেম এর কী ? কয়েকদিন পর তো তোমার আর প্রীতমদার বিয়েই হবে…
-প্রীতম বেবিটাকে স্বীকার করছে না রে পলক!
-হোয়াট!
-হ্যা পলক.. আর কয়েকদিন পর আমার আর প্রীতমের বিয়ে.. কিন্তু আমার প্র্যাগনেন্সির কথা শুনে প্রীতম আপত্তি জানালো.. ও বেবিটার সাথে সাথে এখন বিয়েতেও অস্বীকার করছে..
-কীহ্!
-হুম.. ও বলছে ওটা নাকি হৃদয়ের বেবি.. কিন্তু DNA টেস্টে বেশ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়েছে যে এটা প্রীতমের ই বেবি.. কিন্তু প্রীতম স্বীকার করে না! ও আমাকে ভোগ করে এখন এতো বদলে গেলো! আজব আজব বিহেইভ করে যোগাযোগও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এখন..
-ছিহ্!!! মানুষ এত্তো নীচ হতে পারে!!
-প্রীতম আমার সাথে এমন করবে কখনোই ভাবিনি.. অনেক ভালোবেসেছিলাম ওকে.. হৃদয়ের ভালোবাসাটাকে দূরে ঠেলে দিয়ে ওকে নিজের আপন করে নিয়েছিলাম.. কিন্তু ও ই আমাকে এমন প্রতিদান দিলো! কান্না করি খুব.. ফ্যামিলিকে বলেছিলাম, তবুও যেন মনের কথাগুলো ভালোভাবে কারোর সাথে শেয়ার করতে পারিনা.. কি করবো বুঝে উঠতে পারিনা.. আর সেটার জন্যই রে ডেকেছিলাম হৃদয়কে.. কিছু একটা হেল্প বা সাজেশন যদি দিতে পারতো..
-Abortion করে নাও না ইশা…
-এখন আর Abortion করানো সম্ভব না.. খুব দেরি হয়ে গেছে.. অসহ্য লাগে.. প্রীতম এমন কেন করলো বুঝতে পারছি না আমি!
-হাহ্! আমাকেও মানুষ এভাবে ধোকা দিয়েছিলো রে… মানুষগুলা বিশ্বাসঘাতকতা, বেইমানী সবকিছুই করলো আমার সাথে… তাতে আমার কতোটা কষ্ট লেগেছিলো, বুঝতে পারছো তো এখন?
-সরি রে হৃদয়! এখন বুঝতে পারছি তোমার কষ্টটা… আমি কি করবো এখন, কিছুই বুঝতে পারছি না…
-আহ্ হৃদু, এভাবে খোচা দিও না.. জানি ইশারও দোষ আছে এতে, বাট এমন একটা অবস্থায় একটা মেয়ের কেমন ফিল হতে পারে, সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি..
বলেই পলক ইশার দিকে ফিরে ওর হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে বললো,
-ইশা.. হেল্প করার ট্রাই করবো আমরা.. প্রীতমদাকে বুঝিয়ে তোমাদের সম্পর্কটা আরো মজবুত করবো..
ইশা পলকের কথাটা শুনে প্লাস্টিক একটা হাসি দিয়ে ধন্যবাদ জানালো.. আমি ওদেরকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
-আচ্ছা এখন আমাদের যাওয়া দরকার.. বাসা খালি আছে.. মা আর তিতু মামার বাড়ি.. যেতে হবে..
-আচ্ছা হৃদয়, সময় দেওয়ার জন্য থ্যাংক ইউ…
-হুমমম..
ঐদিনের মতো ইশার সাথে দেখা করে পলক আর আমি বাসায় ফিরে এলাম…
.
রাতে বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছিলো পলককে.. কতো হাসিখুশি রান্না করছিলো.. যাই হোক, ওর খুশির কারণটা বুঝতে পারছিলাম..
আমি একটা পেয়াজ লুপতে লুপতে ওর পাশে গিয়ে দাড়ালাম,
-কী রান্না করছেন ম্যাম..??
-আপনার ফেভারিট ডিশ স্যার… দুপুরে তো ভালো করে খান নাই, তো এখন একদম তৃপ্তি সহকারে খাবেন.. ঠিক আছে?
কথা বলতে বলতে পলক রান্না শেষ করে খাবারগুলো টেবিলে নিয়ে গেলো..
পলকের রান্নাগুলো দেখে জিভে জল চলে এলো আমার… দেখেই লোভ লেগে যাচ্ছে.. আমি পলকের সাথে সাথে খাবার টেবিলে যেতে যেতে বললাম,
-ইশশ লে পলক… মা আর তিতু তো দারুণ ভাবে তোমার খাবার গুলো মিস করবে.. মামার বাড়িতে যাওয়ার জন্য তিতু কেন যে এতো পাগল হয়.. না গেলে আজ সবাই একসাথে মিলে খুব ভালোভাবে ডিনারটা করা যেতো…
-হুমমমম… খুব মিস করছি ওদের…
-আচ্ছা তাড়াতাড়ি খেতে দাও…
পলক টেবিলে আমার সামনে প্লেটে খাবার বেড়ে দিতেই আমি খেতে শুরু করে দিচ্ছিলাম… বাট ভাত খুব গরম ছিলো.. আমি দ্রুত হাত সরিয়ে ফু দিতে লাগলাম…
-আউচঃ গরম…
পলক আমার অবস্থা দেখে হাসতে লাগলো.. অতঃপর ও নিজেই আমাকে ওর হাতে খাইয়ে দিতে লাগলো…
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে খাচ্ছিলাম.. আর কতোকিছু ভাবছিলাম আমি.. ইশা কখনো এতো আদর করে খাইয়ে দেয় নি আমায়.. কিন্তু পলক কতো সুন্দর করে খাইয়ে দিচ্ছে… ঐদিন বাকিদিনের তুলনায় বেশ অন্যরকম এক তৃপ্তি নিয়ে ডিনারটা সারলাম…
.
রাতে কম্বল গায়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ট্রাই করছিলাম.. হঠাৎ ই গায়ে পলকের স্পর্শ পেলাম..
তাকিয়ে দেখলাম পলক কাছে এসে আমার বুকে শুয়ে নিলো.. আমি হালকা নড়তেই ও আমার দিকে তাকিয়ে ওর একটা হাত আমার গালে রাখলো,
-হৃদয়, আমাদের বেবি হতে পারে না রে?
.
.
(চলবে)

Tagged : / /

শশুরবাড়ি পর্ব – ০৩ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

হিয়া ওর কাধ দিয়ে আমার কাধে একটা হালকা ধাক্কা দিয়ে মুখ ভেংচিয়ে চলে গেলো.. আমি বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম এতে..
আবারো বেকুব হয়ে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম.. আন্টি কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তাই হয়তো দেখতে পাননি এসব..
আমি হা হয়ে ওদিক থেকে ফিরে তাকাতেই আচমকা সামনে উদয়ের চোখে চোখ পড়লো.. আমি আবারো কিছুটা চমকে উঠলাম.. উদয় আমার হাতে মোবাইলটা দিয়ে অন্য হাতে আমার কাধে জড়িয়ে ধরলো,
-কি রে ছোটদাভাই! ওদিকে এভাবে থ হয়ে কী দেখছিস..
-হিয়া….
আমি ধীরে ধীরে নিচুস্বরে হিয়ার নামটা নিলাম.. উদয় প্রথমে না বুঝতে পেরে একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো.. পরে নামটা বুঝে নিয়ে একটা হাসির ঝলক দিয়ে বললো,
-ওহ্ হিয়া দিদি!
আমি না চাইতেও কিসের ঘোরে থেকে যেন হিয়ার নামটা বের হয়ে গেলো মুখ থেকে.. উদয় পুনরায় হিয়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করলাম.. উদয় সেটাকে পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগলো,
-ইশ হিয়া দিদি যে ঝাক্কাস! কথাবার্তাও কতো কিউট… কিন্তু আফসোস! সিনিয়র আমার.. নাহলে দুসেকেন্ডেই প্রপোজ সেরে ফেলতাম…
উদয় যে কথাগুলো দুষ্টামি করে বলছে সেটা ওর ভঙ্গি দেখেই বুঝে গেলাম.. আমি ওর মাথায় একটা গাট্টা মেরে হাতের ব্লেজারটা ওর কাছে দিলাম,
-হয়েছে! আর বলতে হবে না.. এখন ব্লেজারটা তিতুকে দিয়ে ব্যাগে রাখতে বলে দিস..
উদয় ব্লেজারটা তিতুকে দিয়ে আবার খুজে খুজে আমার কাছে এলো,
-ছোটদাভাই, বিয়ে মনে হয় শুরু হয়ে যাওয়ার পালা.. চল্ কুঞ্জের দিকে যাই..
কথাটা বলে উদয় আমার কাধে টেনে টেনে কুঞ্জের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো.. চারিদিকে কতো হৈচৈ, মিউজিক, ফুর্তি, কোলাহল…
বেশ ফুরফুরে লাগছিলো মনটা.. ক্লান্তি যেন সব চলে গেছে.. হঠাৎই ভিড়ের মাঝে চলতে চলতে আরেকটা ধাক্কা খেয়ে গেলাম,
-What the!
সামনে তাকিয়ে দেখলাম একদল মেয়ে.. আর যার সাথে ধাক্কা খেলাম সেটা হিয়া.. ও কিছুটা রাগীদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-অয়ে মিস্টার! আপনি কি সত্যিই চোখে দেখতে পান না! (হিয়া)
-এই যে ম্যাম! আমি ঠিকই দেখতে পাই.. হয়তো তোমার ঢাকা দেওয়ার ব্যামো আছে, তাই সংঘর্ষ ঘটে..
আমি কিছুটা বিরক্তিভাব নিয়ে হিয়াকে কথাটা বললাম.. সাথে সাথেই ও সহ ওর সাথিরা আমার উদয়ের সাথে তর্ক লেগে গেলো.. ওদের ভিড়ে আমি আর উদয় পুরো বোকা হয়ে গেলাম.. এতোগুলা মেয়ের সাথে আমরা দু’জন ঝগড়ায় পেরে উঠছিলাম না..
এক পর্যায়ে হঠাৎ উদয় একটু ভাব নিয়ে ওদের সামনে দাড়ালো,
-আচ্ছা আচ্ছা শেষ এখন.. তোমরাই যে ঝগড়ায় নোবেল পাওয়ার যোগ্য সেটা বুঝে গেছে সবাই.. এখন দোহাই মায়েরা থামো একটু…
উদয় হাতজোড় করে কথাটা বলার সাথে সাথেই মেয়েরা সব হুংকার দিয়ে উঠলো,
-ঐ! ঝগড়াটে আমরা???
-তা নয়তো কি! যেভাবে কোমর বেধে সবাই শুরু করেছো! বরের ভাইদেরকে একটু ভালোভাবে খাতির-যত্ন করবে… তা না! ঝগড়া শুরু করে দিয়েছো..
-অহো হো… খাতির যত্ন দরকার আপনাদের? আচ্ছা আচ্ছা তো জাহাপনা, আপনাদের কীভাবে সেবা করতে পারি আমরা?? (হিয়া)
-যাও যাও কিছু খাওয়ার জন্য নিয়ে এসো.. পানীয় হলে বেশি ভালো হয়..
উদয় ওর কলার ঠিক করতে করতে একটু ভাব নিয়ে কথাটা বললো.. মেয়েগুলা সব কেমন নজরে যেন তাকালো আমাদের দিকে.. তারপর ওরা আমাদের উদ্দেশ্যে কুর্নিশ করে বললো,
-জো হুকুম ছাগলরা! থুক্কু জাহাপনারা….
বলেই সবগুলা মেয়ে আমাদের কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো.. উদয় আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে বললো,
-কি রে ওরা কি সত্যিই খাওয়ার আনতে চলে গেলো?
-আরে ধুউর! যে ফাজিল ওরা.. মজা করেছে আর কি.. যা যা চল্ আমরা গিয়ে দেখি.. বিয়ে শুরু হয়ে গেছে মনে হয়..
-উম হতেই পারে.. আচ্ছা আয়…
উদয় আর আমি বিয়েতে যাচ্ছিলাম.. পথিমধ্যে ফ্রেন্ডদের সাথেও দেখা হয়ে গেলো.. সবাই মিলে এখন কুঞ্জের দিকেই যাচ্ছিলাম..
হঠাৎ ই আমাদের পথ আটকে কনেপক্ষের দুষ্টু সুন্দরীরা দাড়ালো.. একজনের হাতে জুসের জগ.. অন্যজনের হাতে গ্লাসভর্তি একটা ট্রে…
অরেঞ্জ জুসটা দেখেই আমাদের জিভে জল চলে এলো.. আসলেই খুব তেষ্টা পেয়েছে.. আমরা ফ্রেন্ডরা সব ওটার দিকে হা হয়ে তাকালাম..
একটু পর হিয়া একটা একটা করে গ্লাসে জুস পূর্ণ করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলো.. আর মুখে একটা পরিপূর্ণ হাসি নিয়ে বলতে থাকলো,
-নিন নিন.. বিয়াইসাহেবরা.. খেয়ে তৃষ্ণা মেটান..
বাহ্ বাহ্! এ যে মেঘ না চাইতেই জল.. আমরা সব খুশিই হলাম জুসটা পেয়ে.. আমরা সবাই একে একে গ্লাসগুলো নিলাম.. ওদের মধ্যে থেকে একটা মেয়ে বললো,
-খুব ভালোভাবে খাতির করছি.. নেক্সট টাইম আর কনেপক্ষকে নিয়ে কিছু বলবেন না.. হুম!
আমরা ছেলেরা হাসলাম একটু.. তারপর তৃষ্ণার একটা ঢোক গিলে গ্লাসটা থেকে জুস খেতে লাগলাম.. জুসটা মুখে দিতেই জিভ শিরশিরিয়ে উঠলো… ইয়াক থুউউ! কি এটা..! সব লাফিয়ে উঠে মুখ থেকে ফেলে দিলাম সব জুস..
-ছিইহ্! কি ছিলো এটা…
আমরা সবগুলার মুখে যেন একদম গিরগিটির মতো রঙ পরিবর্তন ঘটতে লাগলো.. অরেঞ্জ জুস তো না.. অন্য কিছু খেলাম.. নাকে মুখে কেমন এক ঝাঁঝ লাগলো.. নাক চোখে হালকা জলও চলে এলো. উদয় নাক মুখটা বিকৃত করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-ছোটদাভাই.. হলুদের গন্ধ….
উদয়ের কথায় আমিও ভ্যাবলাকান্তের মতো মুখ করে তাকালাম.. হ্যা সেরকমই তো.. দাদাভাইয়ের শালিগুলা এভাবে আমাদের ছাগল বানালো!
ইয়াক থুউউ!! আমরা গ্লাসের সবটা ফেলে দিয়ে রাগী দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকালাম… খুউব ডিস্টার্বড ফিল করলাম ওদের জন্য.. আজেবাজে কি জানি খাওয়ালো এটা ব্যাঙ!
আমাদের এমন অবস্থা দেখে মেয়েরা সব হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে যেন.. কয়েকটা মেয়ে হাসতে হাসতে বলতে লাগলো,
-হনুমান দেখেছেন কখনো? না দেখলে আপনাদের এই মুহুর্তের চেহারাটা আয়নায় প্রতিফলিত করুন.. খুব ভালোভাবে দেখতে পাবেন..
-এহেহে মশলা মেশানো পানীয়… ইস! খুব টেস্টি ছিলো তাই না?
কথাগুলোর পর আবারো সবগুলা হাসিতে ফেটে পড়লো.. হিয়ার হাসি দেখে পাগল হবো, না মেজাজ দেখাবো বুঝতে পারছিলাম না.. ও আমাদের দিকে উদ্দেশ্যে করে বললো,
-এরপর থেকে আর নিজে থেকে খাতির যত্ন চাইবেন না, ঠিক আছে বিয়াই সাহেবরা?
আমাদের মেজাজটাই বিগড়ে গেলো.. এতো ফাজিল ওরা!
আমরা তৃষ্ণার্ত মানুষ, ওদের বিশ্বাস করে সরল মনে জুস ভেবে ওটা খেয়ে নিতে যাচ্ছিলাম..
ঝগড়া করতে যাচ্ছিলাম.. কিন্তু বিয়েবাড়িতে এটা নিয়ে যদি কোনো জটলা বা ঝামেলা দেখা দেয়, তাহলে ভালো লাগবে না ব্যাপারটা.. তার চেয়ে বরং পরে কোনো একসময় এটার শোধ নিয়ে নেবো.. এটা ভেবে আমরা ওদের পাত্তা না দিয়ে মুখ গোমড়া করে ওখান থেকে কুঞ্জের দিকে চলে গেলাম..
বিয়ে শুরু হয়ে গেছে… মালা পড়ানো টড়ানো হচ্ছে.. আমরা বাইরে থেকে হাসিমুখে ওদের দিকে গাঁদা ফুলের পাপড়ি মুঠো করে ছুড়ে দিচ্ছি.. আমাদের পাশেই কনেপক্ষের সেই দুষ্টু মেয়েরা.. ওরাও ফুল ছুড়ছিলো..
খুব ভালোই লাগছিলো.. মজা করে আমরা একে অপরের দিকেও ফুল ছুড়ে দিচ্ছিলাম.. হিয়া ফুল ছুড়তে ছুড়তে কতো সুন্দর হাসছে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে.. ওর হাসিতে আমারও ভালো লাগছে..
হঠাৎ খেয়াল করলাম ওর ডান কানে একটা কানের দুল নেই.. কিছুটা ভ্রু কুচকে তাকালাম আমি.. আসলেই ওর এই কানটা খালি.. কি ব্যাপার!
আমি হালকা সরে গিয়ে ওর পেছনে ঘেষে দাড়ালাম.. ওর দিকে মুখটা নিয়ে ওকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
-এয়ারিংটা সুন্দর তো খুব… কিন্তু এটা কেমন স্টাইল.. ডান কানটা খালি যে…
আমার কন্ঠটা আচমকা শুনে হিয়া আমার দিকে ফিরে তাকালো.. তারপর ডান কানে হাত দিয়ে ওর কপালটাও ভাজ হয়ে গেলো..
ও কিছুটা চিন্তিত চেহারায় পেছনে ভিড়ের ভেতরে ঢুকে গেলো.. আমিও ফুল হাতে রেখে ওর পিছুপিছু গেলাম.. ও দেখলাম তন্নতন্ন করে খুজছে কানের দুলটা.. আমি ওর কাছে গিয়ে দাড়ালাম..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /