ধোকা পর্ব – ১০ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

পলক বেবির কথা জিজ্ঞেস করে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মাথাটা রাখলো… আমি ওকে বলার মতো কোনো শব্দ খুজে পাচ্ছিলাম না…
ও আমার জবাবের অপেক্ষা না করে ওর মুখটা তুলে আমার দিকে শুকনো চেহারায় বললো,
-ভালোবাসি…
মুখ উচু করায় ওর গরম নিঃশ্বাসটা আমার গলায় পড়লো.. ও ওর চোখটা নামিয়ে আমার গলায় মুখটা গুজে নাকটা একটু ঘষে দিলো..
আমি চমকে গিয়ে আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেললাম…
পলক আমার গালে হাত রেখে গলায় একটা গভীর চুমু খেলো…
সারা শরীরে এক একেকটা লোম আমার কেপে কেপে উঠলো…
আমি আমার গাল থেকে পলকের হাতটা সরিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম…
ওকে অন্য হাত দিয়ে এক পাশে জড়িয়ে ধরে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম..
ওভাবে পলককে চোখ বন্ধ করেই বললাম,
-আর না প্লিজ.. ঘুমাও এখন…
আমার কথাটায় পলকের খুব লাগলো হয়তো.. ও আমার থেকে সরে যেতে চাইছিলো..
আমি ওকে ছাড়লাম না.. ওকে আরো ভালোভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বললাম,
-দূরত্ব রেখে ঘুমাতে হবে না.. বুকেই ঘুমাও এভাবে..
পলকের মুখে আর কোনো কথা ফুটলো না.. চুপচাপ ই থাকলো..
ওকে দূরেও ঠেলে দিতে পারছিনা.. আবার কিছু একটা ভেবে ওকে একদম কাছেও নিতে পারছিলাম না..
মনটা খারাপ হয়ে গেলো ওর.. কিছু একটা বলতে চেয়েও বললো না.. অতঃপর ও আমাকে ওভাবেই জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো..
.
আমি আর পলকও প্রীতমকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিলাম.. কিন্তু প্রীতম কিছুইতেই কিছু বুঝতে চাইছিলো না.. ওটা নাকি ওর বেবি না…
এমনকি DNA টেস্টের রিপোর্টটাও প্রীতম অস্বীকার করছিলো.. ঐদিন রাগের চোটে প্রীতমকে চড়ও মেরেছিলাম…
রাত কাটাবে… মজা লুটবে… আর পরবর্তীতে কৃতকর্মের ফলটা এড়িয়ে যাবে.. এটা তো হয় না!
এমনই যদি হয় তাহলে অযথা ফরমালিটি মার্কা ভালোবাসার কি দরকার ছিলো.. ওরা কি ওদের এতোদিনের সম্পর্কে সর্বোত্তম বিশ্বাসটাই স্থাপন করতে পারেনি!
যে ভালোবাসায় পবিত্রতা আর বিশ্বাসের কমতি থাকে, সে সম্পর্কটা তো একদিন না একদিন ঠিকই ফুরিয়ে যাবে.. ইশা আর প্রীতমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিলো..
প্রীতম ইশার সাথে প্রায় সব যোগাযোগই বন্ধ করে দিয়ে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো.. প্রীতমের বিহেইভিয়ার গুলো আসলেই অদ্ভুত ছিলো..
কয়েকদিন পর আমরা সকলেই বেশ বড়সড় একটা শক খেলাম, যখন শুনলাম প্রীতম ড্রাগস চালানের সাথে জড়িত.. পুলিশ ওকে খুজতে খুজতে হাতেনাতে বাসা থেকে এরেস্ট করে নিয়ে গেলো..
আমরা সবাই তো থ মেরে গেলাম.. হৈচৈ পড়ে যায় বাসায়.. প্রীতম ড্রাগস সাপ্লাই করতে গিয়ে নাকি প্রমাণসহ ধরা পড়েছে.. কারাদন্ড হলো ওর…
জানা যায়, ও যে আগেরবার বিদেশে গিয়েছিলো, সেই থেকেই ও এই কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে.. পরে ওখানে এবং দেশে লুকিয়ে অনেক ড্রাগস সাপ্লাই করেছে.. একটা গ্যাং এর সংস্পর্শে এসেই প্রীতমের এই অবস্থা..
ও আগে এতোটা নেশা করতো না, কিন্তু পরবর্তীতে এই ড্রাগসের পাল্লাতে পড়েই ও তাতে চরম আসক্ত হয়ে যায়.. পরে চোরাচালানের কাজেও জড়িয়ে পড়ে..
এসব শুনে ইশা একদম ভেঙে পড়ে.. প্রীতম যে নেশা করতো সেটা ইশা ঠিক ই জানতো, কিন্তু ও যে এমন ড্রাগসের মধ্যেও এতো জড়িত ছিলো, সেটা ইশা জানতো না..
কান্নায় ফেটে পড়লো ও… একে তো বেবিটাকে নিয়ে ওদের সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন হতে যাচ্ছিলো.. তার উপর এখন ড্রাগস চালানের জন্য প্রীতমের জেলে যাওয়া.. সব ই যেন ওকে কষ্টে ডুবিয়ে ফেলছিলো..
ওর কান্না দেখে খুব খারাপ লাগছিলো.. ঐদিন ইশা আর প্রীতমের কর্মকান্ডে আমার কেমন ফিল হয়েছিলো, সেটা হয়তো আজ ইশাও খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে..
ড্রাগসের পুরো ব্যাপারটাই প্রীতম ইশার থেকে চেপে গিয়েছিলো.. ইশা আজ গিয়ে প্রীতমের কর্কশ ব্যবহারের কারণ সব বুঝতে পারলো..
ইশা এখন ওর মতো ছেলের সাথে সম্পর্ক করার জন্য আফসোস করছিলো.. ওর কান্নায় খুব স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছিলো যে ও প্রীতমকে খুব ভালোবাসে.. কিন্তু প্রীতম যে ওকে এভাবে ধোকা দেবে, ভাবতে পারেনি..
আমি আর পলক সবাই মিলে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম.. এমনিতেই অনেক কিছু ঘটে গেলো.. তো এই মুহুর্তে এটা ছাড়া আর কিছু করারও নেই আমাদের..
যা হওয়ার তো হয়েই গেছে.. এখন সেটা নিয়ে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ না হয়ে, বাস্তবটাতা মেনে নেওয়াই ভালো হবে.. ইশাকে কোনোমতে পরিস্থিতিটা সামলে নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে ফিরে এলাম..
.
রাতে বাসায় এসে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলাম যে পলকের মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে… কিন্তু কেন যে ও এমন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, সেটা জানিনা..
রাতে ডিনারটাও পলক ভালোভাবে করেনি.. কোনোমতে দুমুঠো খেয়ে বেলকনিতে একা দাঁড়িয়েছিলো শুধু… কেমন যেন উদাসীন উদাসীন লাগছিলো..
ওর এরূপ অবস্থায় আমারও যেন ভালো লাগছিলো না… অশান্তি কাজ করছিলো মনের মধ্যে.. শুধু ভাবছিলাম কীভাবে ওর মনটা ভালো করা যায়…
একটু পর আমিও বেলকনিতে গিয়ে পলকের পেছনে দাড়ালাম.. পলক হয়তো আমাকে খেয়াল করেনি..
একটু পর হঠাৎ ও আমাকে দেখে যেন কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো.. আমি আলতো একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-মন খারাপ?
পলক কোনো উত্তর দিলো না.. আমার দিকে এক নজর তাকিয়ে আবার সুদূর আকাশ পানে তাকিয়ে থাকলো..
আমি ওর কাছে গিয়ে কাধে ধরে আমার দিকে ফিরালাম… ওর ডান হাতটা আমার হাতের মুঠোয় নিয়ে বললাম,
-নিজের স্বামীর কাছে কিছু লুকোতে নেই ম্যাম… কী হয়েছে বলো..
পলক এবারও কিছু বললো না.. প্রতিক্রিয়াহীন চেহারায় ও মাথাটা নিচু করে নিলো.. আমি ওর থুতনিতে ধরে ওর মুখটা উচু করে বললাম,
-পলক.. মুখটা যে ঝুলিয়ে বসে আছো, আমার কি ভালো লাগতেছে? কী হয়েছে শেয়ার করো.. দেখবে নিজেরও হালকা লাগছে আর আমারও ভালো লাগবে..
পলক আমার দিকে এক মায়াভরা চাহনিতে তাকালো.. তারপর কপাল কুচকে মন খারাপ করে বললো,
-বেবি হবে ইশার.. কতো কিউট ব্যাপার… আর আমার দেখো, বেবির চিন্তা তো দূর.. স্বামীর কাছে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আদরের আবদারটাও করতে পারিনা…
কথাটা বলে পলক এক মন খারাপের হাসি দিয়ে আবার মাথা অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলো..
পলকের কথায় আমার বুকে যেন খুব লাগলো.. কিছুক্ষণের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি.. এক ভাবনার সমুদ্রে ডুবে গেলাম..
ঠিকই তো! আজ প্রায় এক বছর হতে চললো আমাদের বিয়ের.. কিন্তু এখনো পর্যন্ত পলককে যথার্থভাবে ওর প্রাপ্য অধিকারগুলো দিতে পারিনি..
একটা মেয়ের জন্য এটা যে কতো কষ্টের, এটা হয়তো একটা মেয়েই ভালো অনুভব করতে পারে.. হয়তো নিজের সবকিছু ঠিক রাখতে পলকের উপর কোনো অন্যায় করে ফেলছি!
জানি না আমি পলককে ভালোবেসে ফেলেছি কি না, কিন্তু এখন পলকের মাঝেই নিজেকে ফিল করতে পারি..
ভেবেছিলাম ইশা আর ইশার ধোকাদারির কষ্টগুলো ভুলে অন্য কারোর মায়া জড়াতে পারবো না.. কিন্তু পলকের কেয়ার আর ভালোবাসায় ইশার পুরনো সব স্মৃতি ভুলে গেলাম আমি..
এতোদিন কখনো এসব ভেবে দেখিনি, কিন্তু আজ পলকের কথাটায় খুব অনুতপ্ত ফিল করলাম.. পলককে খুব কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে হলো কেন জানি..
কোনো কিছু ইশারা না দিয়েই তৎক্ষনাৎ পলককে কোলে তুলে নিলাম.. পলক আঁতকে উঠে আমার দিকে হা হয়ে তাকালো..
ও চোখ বড় বড় করে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে.. কি হচ্ছে ও যেন ঠাওর করতে পারছে না..
চোখের পলক পড়ছে না ওর.. আমি ওর চোখে ফু দিয়ে ওর ধ্যান ভাঙালাম,
-সেকেন্ড টাইম আজকে… তাই না?
পলক হুশে ফিরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-কী?
-কোলে নিলাম যে…
পলক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে.. ওর যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এসব.. ওর চোখে মুখে এক বিস্ময়ের ছাপ…
-এই যে ম্যাম.. এসব কিন্তু স্বপ্ন দেখছো না তুমি.. সিরিয়াসলি হচ্ছে.. আজকে থেকে তুমি তোমার আদর থেকে ধরে সব ধরনের আবদার করবে আমার কাছে.. এসবে তোমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে..
-সিরিয়াস? (অবাক কন্ঠে)
-জ্বি ইয়েস..
-যতো ইচ্ছা কোলে উঠার বায়না করতে পারবো? যত মন চায়, আদর চাইতে পারবো? ভালোবাসবা তুমি আমায়?
পলক খুব উৎফুল্ল কন্ঠে একদমে কথা গুলো জিজ্ঞেস করলো আমাকে.. ওর মুখে অফুরান খুশির ঝিলিকটা দেখতে দেখতে হ্যা সূচক মাথা নাড়লাম আমি..
পলক খুব খুশিতে আমার গলা জড়িয়ে গাল টেনে একটা চুমু খেলো.. আমি ওর পিচ্চিদের মতো খুশি দেখে হেসে দিলাম..
পলকের কপালে আমার কপালটা ঠেকিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বেডরুমে এলাম..
কোল থেকে আলতো করে পলককে বেডে শোয়ালাম.. পলকের চোখে মুখে ধীরে ধীরে যেন লজ্জা ফুটে উঠতে শুরু করলো..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /

শশুরবাড়ি পর্ব – ০৪ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

হিয়া এয়ারিং খুজতে খুজতে হঠাৎ পিছনে ফিরতেই আমার বুকের সাথে ধাক্কা খেলো.. আমি আচমকা শক খেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম..
হিয়াও ধাক্কা খেয়ে প্রথমে চোখ বন্ধ করে কপালে হাত বোলাতে বোলাতে আমার দিকে চোখ মেলে তাকালো.. ভ্রু কুচকে ও আমার উদ্দেশ্যে বললো,
-ইশশ! কিডনির বাচ্চা.. আর কয়বার সংঘর্ষ ঘটাবেন! দেখে চলতে পারেন না?
আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো.. হিয়াকে হেচকা একটা টান দিয়ে আমার বুকের সাথে মিশিয়ে ওর হাতটা পেছনে চেপে ধরলাম,
-স্টুপিড! আ’ম হৃদয়! নট কিডনির বাচ্চা ওকে! তোমার নিজেরই চোখ নেই, আবার অন্যকে কথা শোনাও..
হিয়া হকচকিয়ে তাকালো আমার দিকে.. কয়েক সেকেন্ড হা করে থেকে একটু বাদেই একটা চিন্তা আর বিরক্তির চেহারায় আমার বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো,
-ধ্যৎ! এমনিতেই ভালো লাগছে না, আমার ফেভারিট দুলটা হারিয়ে গেছে.. আর উনি!
আমি কিছুটা ছিটকে পড়ে যেতে যেতে বাচঁলাম.. আমার হাতের গাঁদা ফুলের পাপড়িগুলো পড়ে গেলো..
হিয়া আমাকে পাত্তা না দিয়ে একমনে মুখ ভেংচিয়ে এয়ারিং খুজতে লাগলো..
কিন্তু বিয়েবাড়ির এই ভিড়ের মধ্যে একটা কানের দুল খুজে পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য.. হেল্প করার জন্য আমিও ওর সাথে সাথে খুজতে লাগলাম..
কানের দুলটা সম্ভাব্য সব জায়গায় খুজার পরেও যখন পাওয়া গেলো না, তখন হিয়া হতাশ হয়ে দুই কোমরে হাত গুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো,
-ধুউর…
হিয়া চেহারায় একটা মলিনতার ছাপ নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিলো.. তখনই আমার নজরটা ওর শাড়ির আচলের দিকে গেলো.. আমি পেছন থেকে ওর আচল ধরে আটকে ফেললাম ওকে..
হিয়া বাধা পেয়ে আৎকে উঠে পেছন তাকালো.. আমার হাতে ওর শাড়ির আচল দেখতেই ও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো,
-অইইই! কিডনির বাচ্চা! আপনার সাহস কী করে হয় এভাবে আমার আচল ধরার! তখনও আচলে পা রাখলেন, আর এখনও হাত! জানেন এখন যদি আমি একটা চিৎকার দেই, তাহলে কি কি হতে পারে!
হিয়ার চোখ রাগে একদম লাল হয়ে গেলো.. আমি একদম বেকুব হয়ে গেলাম.. বাজে কোনো মাইন্ডে তো আমি ওর আচল ধরি নি.. এটা বোঝানোর জন্য ওর আচলটা হাতে রেখেই কড়া গলায় বললাম,
-আরে! রূপে তো অনন্যা.. তাহলে ব্যবহারে করলার রস কেন…!
-আজব! আপনি আমার আচল ধরবেন, আর আমি কিছু বললেই করলার রস!
-এই দেখো! এমন কিছুনা… না বুঝেশুনে চেচাবে না.. ওকে!
হিয়া আবারো একটা রেগে একটা চিৎকার দিতে চাইলো.. কিন্তু আমি সেটার সুযোগ না দিয়ে ওর একটু নিকটে গিয়ে মুখটা চেপে ধরলাম,
-স্টুপিড! একদম রাগ দেখাবে না.. তোমার এয়ারিং টার জন্যই ধরেছি এভাবে..
হিয়া কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে.. আমি একটু বিরক্তি নিয়ে ওর মুখটা ছেড়ে চুপ থাকার ইশারা দিলাম.. তারপর ওর শাড়ির আচলটা ওর সামনে তুলে ধরে হারিয়ে যাওয়া এয়ারিংটা দেখালাম..
ও এয়ারিংটা দেখে চমকে উঠলো.. সাথে একটা খুশির হাসিও দিলো,
-আরে! এয়ারিংটা খুলে শাড়ির আঁচলেই আটকে ছিলো.. আর আমি খেয়াল ই করি নি এতোক্ষণ..
-সেটা খেয়াল করানোর জন্যই তো আঁচলটায় ধরেছিলাম.. নাথিং এলস্!
-ওহহ্ সরি সরি.. ভুল বুঝলাম.. থ্যাংক ইউ সো মাচ…
কথাটা বলে হিয়া খুশিতে আমার নাকে একটা টান দিলো.. ওর চোখের রাগ সব হারিয়ে গেছে.. আমিও একটা হাসি দিয়ে এয়ারিংটা হাতে নিয়ে হিয়াকে দিলাম..
হিয়া এয়ারিংটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো ডান কানে.. কিন্তু ওর যেন পড়তে একটু প্রবলেম হচ্ছিলো.. আমি ওর এয়ারিং পড়াটাই খেয়াল করছিলাম.. এখন ও পারছে না দেখে আমি এগিয়ে গেলাম ওর দিকে,
-আমি হেল্প করি?
হিয়া ডান কানে দুহাতে এয়ারিংটা ধরে আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালো.. তারপর কিছু একটা ভেবে হালকা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো..
হিয়া একটা ঢোক গিলে আড়চোখে তাকিয়ে আমার হাতে এয়ারিংটা দিলো.. আমি এয়ারিংটা হাতে নিয়ে হিয়ার ডান দিকে গিয়ে দাড়ালাম.. অতঃপর হিয়ার ডান কানের লতিতে ধরে ধীরে ধীরে দুলটা পড়িয়ে দিচ্ছিলাম.. আমি দুল হাতে হিয়ার কানে প্রথম স্পর্শটা রাখতেই ও কিছুটা কেপে চোখ অর্ধেক বন্ধ করে নিলো..
আমি ওর সেই রিয়েকশনের চেহারাটা আর কানের দিকে তাকাতে তাকাতে দুল পরানোটা সেরে নিলাম..
হিয়া আমার দিকে হালকা লজ্জার দৃষ্টিতে তাকিয়ে নজর নিচু করে আবারো ধন্যবাদ জানালো.. আমি চেয়েও কিছু বলতে পারলাম না.. শুধু হৃদয়ে একটা অজানা দোলা অনুভব করলাম..
হিয়া আমার দিকে একপলক তাকিয়ে মৃদু হাসি এনে আবার কুঞ্জের দিকে বিয়ে দেখায় জয়েন করলো.. আমিও একটা হাসি দিয়ে ওখানে এটেন্ড করলাম..
খুব সুষ্ঠুভাবে আনন্দ ফুর্তিতে দাদাভাই আর দিবা বউদির বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেলো.. রাতে বর কনে বিয়াই বিয়াইন দু পক্ষের সবাই মিলে অনেক আড্ডা আর মজা করলাম.. ওভাবেই কাটলো রাতটা.. শেষ রাতের দিকে সবাই ই আড্ডায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো..
পরদিন সকাল থেকেই কনের বাড়িতে হৈচৈ.. মেয়ে এবার বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রস্থান করবে.. কতো কোলাহল কান্নাকাটির মাঝে মেয়েকে বিদায় দেওয়া হলো..
বউদিকে নিয়ে নৌকায় উঠলাম আমরা.. সাথে বউদির কয়েকজন রিলেটিভস- ভাই, মামা, হিয়া, ফ্রেন্ড এমনই কয়েকজনও ছিলো..
বর বউকে নৌকার ভেতরে বসানো হলো.. সাথে ওদের ফ্রেন্ডরা আর কয়েকজন রিলেটিভস.. আর নৌকার ছাদের উপর আমরা ভাই বোন আর ফ্রেন্ডরা ছিলাম.. হিয়াও ছিলো সাথে..
আমি উপরে গিয়ে একদম মাঝি ভাইয়ের কাছে বসলাম.. আর বাদ বাকিরা সব আড্ডা দিচ্ছিলো নৌকায়.. একটু পর আমি মিনি সিড়ি দিয়ে উপর থেকে নেমে নৌকার পেছনের প্রান্তে নামলাম..
ওখানে একাকী দাঁড়িয়ে হাওড়ের মনোরম শীতল বাতাসটা উপভোগ করছিলাম..
দুহাত বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে একটা জোরে নিঃশ্বাস নিলাম.. হাওড়ের বিশাল জলরাশির স্মেলটার সাথে সাথে অনেক শীতল হাওয়া যেন আমাকে ছুয়ে ছুয়ে যাচ্ছিলো..
নৌকার এ প্রান্তে একাকী খুব নিরব হয়ে একমনে ফিল করছিলাম এগুলো.. হঠাৎ ই সিড়িতে কারোর পায়ের শব্দ শুনে পেছন ফিরলাম..
তাকাতেই দেখলাম হিয়া ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে নামছে.. আমি একটা হালকা হাসি দিয়ে ওর দিকে ঠিক হয়ে দাড়ালাম..
ও নামতে নামতে ওর ভ্রু নাচিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
-তো মিস্টার কিডনি.. এখানে কী করছেন শুনি..
-ঐ! তুমি আমাকে কিডনি বলো কেন হ্যা.. আমার নাম হৃদয় ওকে!
-হ্যা তো কিডনি ই তো বললাম….
-ইইইই!!! কিডনি না… হৃদয়য়য়….
আমি একটা ধমকের সুরে ডিস্টার্বড লুকে তাকালাম হিয়ার দিকে.. হিয়া দুষ্টু মার্কা হাসি দিতে লাগলো.. আমার সহ্য হচ্ছিলো না.. আমার নাম নিয়ে মজা কেন করবে! ও আবারো হাসতে হাসতে বললো,
-ওকে ওকে কিডনি ই তো বলবো…
বলেই ও হাসতে শুরু করলো আবার.. আমি রাগে আচমকা ওকে ডান হাতে হেচকা একটা টান দিয়ে ধরে নৌকার বাইরের দিকে ঠেলে দিলাম.. ওর পা দুইটা নৌকাতে থাকলেও, সারা শরীর নৌকার বাইরে.. আমি হাতটা ছাড়লেই ধপাস করে হাওড়ে হাতড়াতে থাকবে…
হিয়া টান দেওয়ার সাথে সাথে চিৎকার শুরু করে দিয়েছিলো.. হাওড়ের বাতাসে যদিও সেটা অন্যদের কাছে অতো স্পষ্ট লাগছিলো না.. হিয়ার কান্নাপ্রায় অবস্থা হয়ে গেলো.. ও চোখ বন্ধ করে কান্না কান্না গলায় বলতে লাগলো,
-ঐ ঐ! আমি সাতার জানিনা প্লিজ… ভয় করছে আমার হৃদয়ের বাচ্চা প্লিজ তুলো…
-উহু… ছেড়ে দেবো হাতটা…
বলে ধীরে ধীরে হাতটা ঢিলা করতে লাগলাম.. যতই হাত একটু একটু করে আলগা করছিলাম, ততোই হিয়ার চোখে মুখে ভয় আতঙ্ক কান্নার মতো অনেক ছাপ ফুটে উঠছিলো.. ও চোখ বন্ধ রেখেই আমাকে চেচিয়ে হাত না ছেড়ে তুলে নিতে বলছিলো..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /