শশুরবাড়ি পর্ব – ০৫ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

হিয়ার আকুতি মিনতিতে আমি একটা লুকানো হাসি দিয়ে ওর হাতে ভালো করে আঁকড়ে আমার দিকে টেনে নিলাম..
হিয়া হাতের টান খেয়ে আমার বুকের উপর পড়ে দুহাত দিয়ে একদম জড়িয়ে ধরলো.. আমার বুকের ভেতরটা জাম্প করে উঠলো.. কিছুক্ষণের জন্য স্ট্যাচু হয়ে গেলাম..
হিয়া কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকার পর হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো.. আমিও ধাক্কা খেয়ে কিছু বলতে পারলাম না..
হিয়া আমার বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে.. ঐ মুহুর্তে আমিও বলার মতো কিছু খুজে পাচ্ছিলাম না..
একটু পর মনে খানিক সংশয় নিয়েই নিরবতা ভেঙে হিয়াকে বললাম,
-রাগ করলে?
হিয়া আমার প্রশ্ন শুনে আড়চোখে তাকালো আমার দিকে.. মুখে কোনো রিয়েকশন নেই ওর.. বুকটা কেপে উঠলো আমার.. রাগ টাগ করেনি তো!
এটা ভেবে একটা ঢোক গিললাম আমি.. হিয়া আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ই ওর হাত দুটো গলা টিপার ভঙ্গি করে আমার দিকে এগিয়ে এলো,
-কিডনির বাচ্চা!
হিয়া বাকা চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে সিড়ি বেয়ে নৌকার উপরে চলে গেলো.. আমিও হাসিমুখে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম..
যাক! হিয়া তাহলে রাগ টাগ করে নি.. যেমন সুন্দরী, তেমনই দুষ্টু.. ভালো লাগে.. নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো মুখে..
দুইস্টেপে জার্নি করে বর বউকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলাম.. সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো.. নৌকা গাঙের
পাড়ে লাগতেই সবাই নতুন বউকে নিয়ে যেতে আসলো.. বাড়িতে নতুন বউকে নিয়ে আবার সেই হৈচৈ.. বরণ-টরণ, সাত পাক আরো কতো কি রিচ্যুয়ালস্!
বিয়ের বাজনা সানাই বাজছে.. ক্যামেরাম্যান ভিডিও করে চলেছে.. বর বউকে নিয়ে ব্যস্ত সবাই.. আশেপাশের সব্বাই এসেছে.. খুব ফুর্তি সবার মুখে..
সবার মুখে বিয়ে নিয়ে খুশি.. আর আমি খুশির হিয়ার খুশিটা দেখে.. দুদিনেই কাউকে এতোটা ভালো কীভাবে লাগতে পারে! হিয়ার কথাবার্তা দুষ্টামি সবই চোখে ভাসছে আমার.. কনে বিদায়ের সময় হিয়া যখন কান্না করছিলো, তখন ওর কান্নাটা যেন আমার বুকে এসে লাগছিলো..
হিয়াকে দেখার পর থেকেই ওর রিয়েকশন গুলোর প্রভাব যেন আমার উপর পড়ছিলো.. ওর সবকিছুতেই আমার অন্তরে ধাক্কা লাগছিলো.. আমি কি প্রেমে পড়লাম ওর! কথাটা ভেবে এক দ্বিধায় পড়ে গেলাম..
হঠাৎ ই হিয়ার ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়লো আমার.. ও পিক তোলার জন্য খুব উৎসাহের সহিত ডাকছে সবাইকে.. আমাকেও টানতে টানতে নিয়ে গেলো.. ইশ কত্তো মিশুক মেয়েটা! যেকেউ মায়ায় পড়ে যাবে..
এসব সেরে আমরা ভাইবোন ফ্রেন্ডরা মিলে দাদা বউদির বাসর সাজাতে গেলাম.. হিয়াও ছিলো আমাদের সাথে.. একমাত্র দাদাভাই আর বউদিভাই আমাদের.. ওদের ফুলশয্যার ঘর সাজানোর দায়িত্ব তো আমাদের ই.. খুব হাসি ঠাট্টা করতে করতে সবাই ঘর সাজাচ্ছিলাম..
ঘর সাজানোর এক পর্যায়ে হিয়া আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-আরে কিডনির বাচ্চা.. আপনার নাক ঘামে! বাব্বাহ আপনার বউ আপনাকে খুব ভালোবাসবে দেইখেন…
বলেই ও একটা হাসি দিলো.. প্রথমে ওর কথাটায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম.. অবাক হয়ে একটু হাসিও দিয়েছিলাম.. তারপর বিড়বিড় করে বললাম,
-হ্যা সেটা তো তোমার উপর নির্ভর করে..
-কী?
-না কিছু না..
হিয়া কিছু বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে একটা ভেংচি কাটলো.. তারপর উদয় তিতুদের সাথে আবার ফুল নিয়ে হৈচৈ করতে লাগলো..
.
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলো জলের ছিটা খেয়ে.. আচমকা পানি পড়তেই লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম.. উঠতেই দেখি হিয়া হাতে গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে.. আর ওটার সব জল আমার মাথায়..
এমতাবস্থায় ঘুম ঘুম চোখেই আৎকে উঠলাম আমি.. আমি চোখ মুখের জল মুছতে মুছতে দেখলাম হিয়া নিজের মতো করে হেসেই চলেছে,
-ওওও নবাব কিডনি! উঠবেন? বেলা কতো হয়েছে জানেন…! রান্নাবান্না শেষ.. সবাই খেতেও বসে যাবে এখন… উঠুন তাড়াতাড়ি! আপনাকে খুজছে সবাই..
আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ও আবার মুখ ঘুরিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো.. আমি একদম হাদারামের মতো বিছানায় বসে রইলাম…
এভাবে ঘুম ভাঙানোর কোনো কারণ বুঝতে পারলাম না.. ধুর সকালের ঘুমটাই মাটি করে দিলো.. মেজাজও খারাপ হলো.. আবার অবাকও হলাম..
হিয়াকে ডেকেছিলাম পেছন পেছন.. কিন্তু ও ইচ্ছা করে জবাব না দিয়েই চলে গেলো.. আমি ঘুমটা উড়িয়ে ফ্রেশ হয়ে গেলাম..
সকালে বউদির হাতের স্পেশাল সুস্বাদু ডিশগুলো দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বাইরে ঘুরতে চলে গেলাম…
.
বিকালে বাসায় এসেই এক ঢিলে দুই পাখি মারার জন্য সর্বপ্রথম দাদাভাইয়ের রুমে গেলাম.. একে তো বউদির সাথে একটু হাসি-ঠাট্টা করা যাবে.. আর সেকেন্ড, হিয়াকেও হয়তো ওখানেই পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি..
দাদাভাইয়ের রুমে যেতেই দেখলাম বউদি, হিয়া, তিতু আর উদয় মিলে আড্ডা দিচ্ছে…
আমি যেতেই হিয়া আমাকে দেখে বলে উঠলো,
-এসে গেছে কিডনি… এখন দেখবে শয়তানি করে সব মাথায় তুলে ফেলছে..
বউদি হিয়ার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বললো,
-হুর! আমার দেবর বাবুকে একদম বলবি না এসব.. কত্তো ভালো ছেলে একটা..
বউদির এ কথায় আমার সবাই হেসে দিলাম.. আমি কলারটা টেনে একটা পলক ফেলে বউদির কাছে গিয়ে বসলাম,
-ইয়াহ্ মাই সুইটহার্ট বউদিভাই… নাও ক্যান্ডি খাও..
আমি হাতের মুঠো খুলে একটা ক্যান্ডি এগিয়ে দিলাম বউদির দিকে.. ক্যান্ডিটা দেখে বউদির চেহারায় একটা ঝিলিক ফুটে উঠলো,
-আরে এই ক্যান্ডিগুলো! এগুলো ছোটবেলায় ১ টাকায় ৪টা কিনে খেতাম..
বউদিকে ক্যান্ডিটা দিতেই হিয়া চিৎকার দিয়ে উঠলো,
-ঐ… আমাকে দিবেন না?
-হ্যা তোমার জন্যই তো আনলাম স্পেশালি..
-অলেলে.. সত্যি? থ্যাংক ইউ সো মাচ..
-ঐ আমাদের জন্যও এনেছিস তো? নাকি শুধু তোর সুইটহার্টদের জন্যই আনলি! (তিতু)
হিয়া ‘সুইটহার্টদের’ কথাটার আসল অর্থ না বুঝে একটু অবাকের হাসি এনে তিতুর দিকে তাকালো.. তিতু একটা ভেংচি কেটে পরিস্থিতি সামলে নিলো..
আমি হেসে তিতুর কথায় হ্যাসূচক মাথা নাড়িয়ে উদয়, তিতু আর হিয়াকেও একটা করে ক্যান্ডি সাপ্লাই করলাম..
সবাই ই ভালোভাবে ক্যান্ডি খেলাম.. আমি তখনো ক্যান্ডির মোড়ক খুলিনি.. আড়চোখে একটা দুষ্টামির হাসি লুকিয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি..
সবাই ই ভালোভাবে ক্যান্ডি খাচ্ছে.. কিন্তু হিয়া তখনো ক্যান্ডিটা মুখে দেয়নি.. একটু পর ও ক্যান্ডিটা কামড় দিয়েই চোখ বন্ধ করে ‘ইয়াক’ করে উঠলো..
সবাই অবাক হয়ে হিয়ার দিকে তাকালো.. আর আমি হেসে দিলাম ওর অবস্থা দেখে.. ও এমন ভাবে ক্যান্ডিতে কামড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, যেন মনে হচ্ছে ওকে মুখে কেউ তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়েছে..
হিয়ার অবস্থা দেখে সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো,
-কি রে কি হলো! তোর মুখে সাদা কি ওসব.. (বউদিভাই)
হিয়া মুখ ফিরিয়ে বউদির দিকে তাকিয়ে মুখ বেকিয়ে বললো,
-দিদিভাই! মোম………
-মোম?? ক্যান্ডিতে মোম আসবে কীভাবে.. মিষ্টি ই তো আছে..
কথাটা শুনেই হিয়া এক এংরি লুকে আমার দিকে তাকালো,
-কিডনির বাচ্চা! আপনি ইচ্ছা করেই আমার ক্যান্ডির মোড়কে মোম রেখে দিয়েছেন, তাই না!!
হিয়া রাগের ভঙ্গিতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো.. আমি ওর অবস্থায় হাসতে লাগলাম,
-হিহিহি ঠিক করেছি.. বিয়েতে আমাদের সাথে কী করেছিলে মনে আছে! শোধ তুললাম সেটার হুম…..
বলেই আবার দাত চেপে হাসতে লাগলাম.. এতোক্ষণে সব ব্যাপার বুঝতে পেরে বউদি, তিতু আর উদয়ও হেসে দিলো..
হিয়া জব্দ হয়ে আমাকে মারার ইশারায় হাত উঠিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো.. আমি হিয়ার থেকে বাচতে গিয়ে রুমের মধ্যে দৌড় আরম্ভ করলাম..
হিয়াও আমাকে মারার জন্য পেছন পেছন ধাওয়া করতে লাগলো.. ওর মোম খাওয়া মুখটা দেখে বার বার টিটকারি মারছিলাম আমি..
আর ও ততোবারই রেগে-মেগে আমাকে মারার জন্য ইশারা করে আসছিলো.. সারা বাড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে বাগানে চলে গেলাম আমরা..
দৌড়তে দৌড়তে টায়ার্ড হয়ে বাগানের দোলনায় দৌড়ে গিয়েই আচমকা বসে পড়লাম আমি.. হিয়া কিছু বুঝতে না পেরে ও নিজেও পা ফসকে এক্সিডেন্টলি আমার উপর দোলনায় পড়ে গেলো..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /