ধোকা পর্ব – ১১ || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

কোল থেকে আলতো করে পলককে বেডে শোয়ালাম.. পলকের চোখে মুখে ধীরে ধীরে যেন লজ্জা ফুটে উঠতে শুরু করলো..
পলকের মিষ্টি চেহারায় এমন লজ্জা আগে কখনো দেখিনি.. ওর চোখ, মুখ, গাল, ঠোট সবই আমাকে নেশায় ডুবিয়ে দিচ্ছিলো.. এরকম অনুভূতি আজকে প্রথম হচ্ছে আমার…
ওর উপর হালকা ঝুকে ওর দুদিকে হাত রেখে নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে নিলাম… এক হাতের উপর ভর রেখে অন্য হাতের অাঙুলগুলো ওর গালে ছড়িয়ে আলতো করে ওর ঠোটে স্পর্শ করলাম…
ওভাবে ধরেই ওর কানের নিচে আমার ঠোটটা নিয়ে একটা ছোট্ট আদর দিলাম.. পলক আমার চুলগুলো খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেললো..
ওর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে আমার হৃৎস্পন্দনের বেগও যেন বেড়ে যেতে লাগলো… এক মুহুর্তে পলক আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না কন্ঠে বললো,
-আই লাভ ইউ হৃদয়…
আমি ওর গলায় একটা চুমু খেয়ে খেয়াল করলাম ওর চোখে জল.. কিছুটা অবাক হয়ে একটা হাসি দিয়ে ওর কপালে কপাল ঠেকালাম.. ওর চোখের জল আলতো করে মুছে দিয়ে নাকে নাক লাগিয়ে ধরলাম,
-পাগলিটা… লাভ ইউ টু…
পলক ঠোট ভেঙে একটা খুশির হাসি দিলো.. আমার গালে হাত রেখে ঠোটের কোণায় একটা চুমু একেঁ দিলো ও.. এক অদ্ভুত রকমের ফিলিংস দৌড়াদৌড়ি করলো আমার মধ্যে..
শিহরণে চোখ বন্ধ করে ওকে আদরে বুকে জড়িয়ে নিলাম.. পলকও আমার বুকে মুখ গুজে এক ভালোবাসার স্পর্শ দিলো..
আদরে আদরে কাছে টেনে নিলাম পরস্পরকে.. হারিয়ে গেলাম ভালোবাসার এক পবিত্র মুহুর্তে…
.
সকালে চোখে মুখ জলের হালকা ছিটা পড়ে ঘুম ভেঙে গেলো.. এক বিরক্তিভাব নিয়ে ঘুমের চোখটা মেলে ডানে বামে তাকালাম..
দেখলাম পলক স্নান করে এসে আনমনে টাওয়েল দিয়ে চুল মুছছে… এভাবে চুলের পানিতে ঘুম কেটে যাবে ভেবে নাকে মুখে কম্বল দিয়ে দিলাম…
ধুউর এমনিতেই একবার ঘুম ভেঙে গেলে সেকেন্ড টাইম আর ঘুম পায় না.. তার উপর এমন ডিস্টার্ব.. এই শীতের সকালে এমনিতেই ঘুম থেকে উঠতে মন চায়না.. কম্বলে মুখ কান ঢেকে জোর করে ঘুম আনার চেষ্টা করতে লাগলাম..
কিন্তু পলকের চুল মুছতে গিয়ে ওর শাখা পলা ওর চুড়িগুলো যে ঝনঝনানি করছিলো, তার শব্দে যেন ঘুমিয়ে পড়তে পারছিলাম না..
পলকের কথা মনে করতে গিয়ে গতরাতটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো… কম্বলটা নাক মুখ থেকে সরিয়ে পলকের দিকে তাকালাম,
-স্নান করেছো ভালো কথা… জলগুলো আমাকে ডিস্টার্ব করছে কেন!
আমি যে জেগে গেছি, সেটা পলক খেয়াল করে নি.. এখন আমার কন্ঠ ওর কানে যেতেই ও ফিরে আমার দিকে তাকালো..
ও ফিরতেই আমার চোখ যেন আটকে গেলো.. ওর সৌন্দর্য দেখে আমি একদম নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম..
আগে কখনো ওর সৌন্দর্যের নেশায় পড়েছিলাম কিনা জানি না, কিন্তু এখন ওকে দেখে বুঝলাম, সত্যিই প্রেমে পড়েছি আমি..
পলক ওর হাতটা আমার গালে রেখে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো,
-ঐ! কি হলো..
-এ! কিছুনা তো.. (হুশে ফিরে)
-হুহ্.. ডিস্টার্বড ফিল করলে নাকে মুখে কম্বল টেনে ঘুমাও..
-চেষ্টা তো করলাম.. কিন্তু ঘুমটা তো আর আসার নয়..
-কেন..
আমি পলকের দিকে পাশ ফিরে কনুইয়ের উপর ভর রেখে বললাম,
-যাদের ঘরে এতো সুন্দর একটা বউ থাকে, তাদের ঘুম তো সেই কবেই ফুরুৎ হয়ে যায়!
-ইইহহ সকাল সকাল ঢং করা হচ্ছে!
-না গো সিরিয়াসলি! এইতো দেখো না, প্রতিদিন ই তো স্নান করো তুমি… কিন্তু আজ যেন একটু বেশি ই স্পেশাল স্নান করেছো বলে মন হচ্ছে.. সৌন্দর্যটাও ভালোভাবে ফিল করতে পারছি..
একটু দুষ্টামি করার জন্য ইচ্ছে করেই কথাটা বলেছিলাম.. পলক দেখলাম সত্যি সত্যিই লজ্জা পেয়ে গেছে.. ও আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় একটা ওয়ার্নিং দিলো,
-উফফ হৃদয়…..! (লজ্জায়)
-হিহি! টিশার্টটা কোথায় আমার?
-আমি কি জানি! দেখো কাল রাতে কোথায় রেখেছো…
-আমি রেখেছি, না তুমি রেখেছো! উম?
-ইশশ হৃদু.. তুমি মারাত্মক দুষ্টু!
-আহালে! তুমি আজ জানলে!
-জানি না.. নিজে খুজে নাও টি-শার্ট..
পলক আবারো লজ্জা পেয়ে গেলো.. ও আড়চোখে তাকিয়ে আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলার ইশারা দিলো.. আমি হাসতে থাকলাম..
পলক মুখ ফিরিয়ে আবার ওর কাজ মন দিলো.. ও তখন আয়নায় তাকিয়ে সিদুর পড়ছিলো.. ঐ দৃশ্যটা যেন আরো মন কাড়ছিলো আমার..
কতো সুন্দর ও ওর কপাল আর সিথিতে আলতো করে সিদুর পড়লো.. ইশ! আমার বউ… আমার নামে সিদুর পড়ে..
অন্তরে একটা হাসির স্রোত উঠলো আমার.. হা করে ওর দিকে তাকিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম..
হঠাৎ ই চোখটা আমার ঘড়ির দিকে গেলো.. OmG! কত্তো বেলা হলো..
বউয়ের সাথে দুষ্টামি করতে করতে অফিসে যে দেরি হয়ে যাচ্ছে, সে খেয়াল ই নেই..
-ইশ! পলক, তোমার জন্য কতো দেরি হয়ে গেলো আমার…
-এহ! নিজের দোষ এখন আমার ঘাড়ে চাপায়!
-তোমার জন্যই তো..
-যাও যাও উঠো..
আমি তাড়াতাড়ি এক লাফে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত ফ্রেশ হলাম… তারপর রেডি হয়ে সকালের নাস্তা টাস্তা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলাম..
.
বিকেলে অফিস থেকে এসে পলককে নিয়ে ইশাকে ওর বাসায় দেখতে গিয়েছিলাম… গিয়ে শুনলাম সারাদিন ই নাকি ইশা মনমরা হয়ে বসে থাকে.. নিজের খেয়াল টেয়াল রাখে না ভালোভাবে..
এটা শুনে আমি আর পলক ইশার রুমে গিয়ে নিজের কেয়ার নেওয়ার জন্য বোঝাতে লাগলাম… স্পেশালি পলক খুব ভালোভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো ওকে.. কিন্তু ইশা আবারো কান্না শুরু করে দিলো..
পলক কোনোমতে ইশাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কান্না থামালো.. ইশার পাশে বসে ওর হাতটা ধরলো,
-নিজের খেয়াল রাখো না কেন হুম! এখন তোমার মধ্যেও যে কেউ একজন বেড়ে উঠছে, সেটা ভুলে যাও?
ইশা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে পেটে হাত রাখলো.. তারপর ফ্যাকাশে মুখে বললো,
-হাহ্! যার জন্য এলো ও, সে ই তো নেই আর.. চলে গেছে আমাদের থেকে.. তাহলে কার জন্য কার টেক কেয়ার করবো..
আমি ওদের পাশেই পকেটে হাত দিয়ে দাড়িয়েছিলাম.. ইশার কথাটা শুনে একটু মেজাজ দেখিয়ে বলে উঠলাম,
-স্ট্রেঞ্জ! কার জন্য মানে! তোমার নিজের জন্য.. তোমার বেবির জন্য.. আর যা হবার তো হয়েই গেছে.. বেবিটার তো কোনো দোষ নেই.. তাহলে নিজের সাথে সাথে বেবিটাকেও কেন শাস্তি পেতে হবে!
-হৃদয়…… Cool… দেখো ইশা, অতীতের খারাপ স্মৃতিগুলো ভুলে আবার নতুন করে ভাবো… (পলক)
-ইচ্ছে করে না আর… (ইশা)
-ইশা প্লিজ! ইচ্ছে করে না মানে কি.. না করলেও হতে হবে.. এট লিস্ট, তোমার বেবিটার জন্য!
ইশা কিছুক্ষণ শুকনো চেহারায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো.. পরে মাথা নিচু করে পলকের হাতটা আকড়ে ধরে বললো,
-উম… আই উইল ট্রাই..
ইশা একটা প্লাস্টিক হাসি দিলো.. পলকও প্রত্যুত্তরে একটা হাসি দিলো.. তারপর ওকে জিজ্ঞেস করলো,
-খেয়েছিলে দুপুরে?
-খাওয়া হয়নি… (ইতস্তত করে)
-কীহ্!! খাওনি এখনো!! চলো এখনি খাবে…
পলক ইশাকে টেনে খাবার টেবিলে নিয়ে গেলো.. ইশা খেতে চাইছিলো না.. কিন্তু পলক ওকে জোর করে খাইয়ে দিলো..
খাওয়ার পর ইশা বেশ অনেকক্ষণ গল্প করলো আমাদের সাথে… খুব স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই কথা বলছিলো.. তবে মুখে এক শুকনো ভাব..
প্রীতমকে হয়তো সত্যিই খুব ভালোবেসেছিলো, যেমনটা আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম… কিন্তু প্রীতম যা করলো… সত্যিই ক্ষমা করার মতো নয়..
অবশ্য ইশাও তো আমার সাথে এমনই করেছিলো.. ভালোবাসাটাকে এড়িয়ে অন্যের হয়ে গেছিলো..
অনায়াসে পেয়ে যাওয়া সত্যিকারের ভালোবাসাটাকে তো অনেকেই মুল্যায়ন করতে পারে না..
মানুষের তো স্বভাবই এমন.. যে ভালোবাসে খুব, তাকে অবহেলা করে… আর যে পাত্তাও দেয়না, তার জন্য সব করতে রাজী হয়ে যায়..
যাই হোক, সবাই ভালো থাকুক, শুধু এটাই প্রে করি..
পলক আর ইশা ওদের মতো করে কথা বলছিলো.. আমি পাশেই ফোনটা নিয়ে বসেছিলাম..
পলক আর আমি ইশার সাথে বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছিলাম..
ইশা তো এমনিতে নাকি অলটাইম মন খারাপ করে থাকে.. কিন্তু তখন ওর মুডটা কিছুটা ভালোই লাগছিলো..
হয়তো ও আমাদের কথাগুলো ভালোভাবে মনে নিয়েছিলো.. এখন নিজের আর বেবিটার সুন্দরভাবে খেয়াল রাখলেই হয়..
আসার সময় ইশাকে আবারো নিজের আর নিজের ফিউচারটা নিয়ে ভাবার জন্য বলে এলাম..
.
রাতে দেখলাম পলক আবার বেলকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে.. তবে আজ তো মন খারাপ বলে মনে হচ্ছেনা.. এমনিতেই হয়তো…
আমিও গিয়ে পলকের কাছে গিয়ে দাড়ালাম.. পেছন থেকে বাম হাতটা রেলিংয়ে ধরে অন্যহাতটা দিয়ে পলকের কোমরে জড়িয়ে ধরলাম..
.
.
(চলবে)

Tagged : / /