শশুরবাড়ি পর্ব – ০৬ (শেষ) || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

হিয়া দোলনায় আমার বুকের উপর পড়তেই দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম.. কিছু একটার স্রোত বয়ে গেলো যেন শরীরে.. তাকিয়ে ছিলাম একে অপরের দিকে..
হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো.. তারপর উড়নাটা ঠিক করে নিজেও উঠে গিয়ে অন্যদিকে ফিরে “Sorry” বললো… আমি কিছু বলার আগেই ও ভেতরে চলে গেলো..
কি হলো কিছুই বুঝলাম না.. তবে ওর লজ্জা আর বিব্রতকর দৃষ্টিটা বেশ লাগছিলো আমার..
ওর কথা ভেবে বাগানে দাঁড়িয়ে একা একাই হাসলাম মনে মনে..
হিয়ার জন্য এতো ফিলিংস আমার কবে তৈরি কিছুই জানিনা.. তবে ও যখন কাছাকাছি থাকে, তখন একদম অন্যরকম অন্যরকম লাগে..
ও যখন ঘুরতে আসে আমাদের বাসায়, তখনকার দিনগুলো তো একদম স্বপ্নের মতো কাটে.. আর যখন আবার নিজের বাড়ি ফিরে যায়, তখন মাঝেমধ্যে চ্যাট আর মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই স্বপ্নটা কাটাতে হয়…
একদম ভালো লাগে না.. যখন একা লাগে, তখন ই মনে হয়ে হিয়াকে একদম তুলে নিয়ে আসি এবং এই বাড়িকেই ওর শ্বশুরবাড়ির অধিকার দেই…
ইশ!
.
হিয়া আর আমার পরিচয়ের প্রায় ৬ মাস পূর্ণ হয়েছিলো মাত্র… তবে এতোদিনে অনেক ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিলো.. হিয়াকে আমি সত্যিই ভালোবেসেছিলাম.. ওর পাগলামি, দুষ্টামি, মিষ্টি-মিষ্টি কথা, সফট বিহেইভিয়ার সবকিছুতেই উইক হয়ে পড়েছিলাম আমি…
এ ফিলিংসগুলো ফার্স্টে কার সাথে শেয়ার করবো বুঝতে পারছিলাম না.. কেউ একজন তো সাপোর্টার থাকতে হবে.. উদয় তিতুর সাথে শেয়ার করলাম, যদিও ওরা আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো সব..
দাদাভাই আর বউদিভাইও তো খুব ক্লোজ আমাদের.. তাই পরে সাহস করে সরাসরি বউদিকেও বলে দিলাম.. ভেবেছিলাম খুব রিয়েক্ট করবে হয়তো, কিন্তু পরে দেখলাম বউদি আমার দলেই আছে..
কিন্তু কীভাবে হিয়াকে বলবো, আর ও ই বা কথাটা কীভাবে নেবে, সেটা ভেবেই কিছু বলতে পারতাম না.. আবার প্রপোজাল দিতে দেরিও করতে চাই না.. যদি মাঝখান দিয়ে অন্য কেউ এসে পড়ে! যাই হোক, হিয়া যদি আমার ই হয়, তাহলে ও আমার ই থাকবে.. বাদ বাকি সব ঈশ্বর ভরসা..
গতদিন রাতে হিয়া আর ওর মা-বাবা এসেছিলো বউদিভাইকে দেখে যেতে.. থাকবে হয়তো কয়েকদিন.. সকাল সকাল উঠেই ঐদিন হিয়ার মুখটা দেখেছিলাম.. মনটাই ফ্রেশ হয়ে গেলো..
বিকেলবেলা ভাবলাম হিয়াকে নিয়ে যদি একটু ঘুরতে যেতে পারতাম.. কিন্তু কোন উছিলায় যাবো, সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না.. বউদির কাছ থেকে এই ব্যাপারে একটু পরামর্শ নিচ্ছিলাম..
হঠাৎ ই মনে হলো তিতুর তো বার্থডে সামনে.. ওর গিফট কেনার বাহানায় যদি হিয়াকে সাথে নেওয়া যায়.. তাহলে তো লুকানোও থাকবে কথাটা.. বউদিকে কথাটা বলতেই বউদি একটা হাসি দিয়ে আমার মাথার চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিলো,
-বাব্বাহ! আমার দেবর তো দেখছি তো আমার বোনের জন্য দেবদাস হয়ে যাচ্ছে…
বউদির হাসিতে আমিও দাত বের করে হাসলাম একটু.. তারপর বউদিকে চোখ মেরে একটু ভাব নিয়ে বললাম,
-আরে দেবদাস না বউদিভাই.. লাইফ পার্টনার হয়ে একদম সারাজীবনের দায়িত্ব নেবো..
-উম.. ভালো ভালো.. তাড়াতাড়ি তাহলে আমার বোনকে বউ করে নিয়ে আসো.. দুইবোন একই বাড়িতে জা হয়ে থাকবো.. কত্তো ভালো ব্যাপার..
-হ্যা বউদি.. কিন্তু একটাই ডাউট আমার..
-কী?
-তোমার বোন আমার প্রপোজাল এক্সেপ্ট করবে তো.. ওর কি আমার প্রতি ওরকম ফিলিংস আছে!
-আরে আছে হয়তো.. হিয়ারও মেবি পছন্দ তোমাকে.. নাহলে তোমার সাথে এতো দুষ্টামি করে! বুঝি তো আমি..
বউদির কথাও একটু লজ্জা লাগলো.. অবশ্য হিয়ার কথাটা শুনে বেশ প্রাউডও ফিল হলো.. একটু কলারটা টেনে বউদিকে কুর্নিশ করে বললাম,
-অলটাইম আমাদের নিয়ে প্রে করিয়েন মহারাণী.. যাতে তোমার বোনের শ্বশুরবাড়ির গন্তব্যটাও আমাদের বাড়িতেই করতে পারি..
-অলে দেবর বাবু লে.. কাজে সফল হউন…
-ইশ রে সুইটহার্ট আমার… সব বউদিই তোমার মতো এতো ফ্রেন্ডলি হউক..
-দেবররাও তোমার মতোই হউক…
-হাহাহা.. আচ্ছা আসছি বউদিভাই এখন.. তোমার বোনকে নিয়ে বের হবো..
বউদি আমার পাগলামিতে হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো..
হিয়াকে গিয়ে তিতুর বার্থডের কথা বলতেই ও যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে গেলো.. কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে হিয়া আর আমি বেরিয়ে পড়লাম..
রাস্তায় হাটতে হাটতে হিয়াকে বললাম,
-গরীব মানুষ.. বাবার হোটেলে খাই.. বাইক টাইক নাই ম্যাম.. রিকশা দিয়ে যেতে হবে..
হিয়া আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিলো,
-জানি স্যার.. রিকশাই ডাকুন, প্রবলেম নেই..
আমি মাথা নেড়ে মৃদু হেসে একটা রিকশা ডাক দিলাম.. হুডটা ফেলে হিয়াকে রিকশায় উঠতে বললাম..
হিয়া উঠার পর আমিও উঠে বসলাম.. হিয়ার পাশে এতোটা কাছে বসে কিছুটা অন্যরকম ফিল করছিলাম.. বাট হিয়াকে দেখে মনে হলো না ও অতোটা আনইজি ফিল করছে..
বরং হিয়া বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই আমার কাছে বসে চারিদিক দেখতে দেখতে গল্প করছিলো.. আর আমি শুধু ওর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ওকেই ফিল করে যাচ্ছি..
একটু পর রিকশা থামিয়ে একটা গিফট শপে ঢুকলাম.. অনেকক্ষণ ধরে তিতুর জন্য আমি আর গিফট চয়েস করতে লাগলাম.. শেষ পর্যন্ত তিতুর জন্য একটা হ্যান্ডওয়াচ, পাওয়ার ব্যাংক আর হিয়ার পছন্দ করা এক জোড়া এয়ারিং প্যাক করে নিলাম..
গিফট কেনা শেষে রাস্তার সাইড দিয়ে হেটে হেটে বাসায় ফিরছিলাম.. হঠাৎ ই হিয়া আমার ডান হাতে জড়িয়ে ধরে আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরলো..
ও রাস্তায় এভাবে আচমকা আমাকে আঁকড়ে ধরায় আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম.. আমি কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই ও আমার ডান হাতে ধরে টেনে টেনে আইসক্রিম কিনতে নিয়ে গেলো..
অগত্যা ওর আর আমার জন্য আইসক্রিম কিনে পুনরায় রাস্তা ধরলাম.. বেশ খুশি খুশি লাগছে হিয়াকে..
ও ওর ডান হাত দিয়ে আমার বাম হাতের ভাজে ঢুকিয়ে রাস্তা চলছিলো.. এতোটা ফ্রি কবে হয়েছি জানিনা.. বাট মনে বেশ একটা উদ্দীপনা অনুভব করছিলাম..
ওভাবে হাটতে হাটতে হঠাৎ ই সাহস করে হিয়াকে বলে উঠলাম,
-আচ্ছা আমি কি তোমার বাড়িটা আমার শ্বশুরবাড়ি করতে পারি? বদলে তুমিও আমার মা বাবাসহ পুরো পরিবারকে একদম নিজের করে নিতে পারো…
চোখ বন্ধ করে কথাটা একদমে বলেই আস্তে আস্তে একটা একটা করে চোখ মেলে তাকালাম হিয়ার দিকে.. হিয়া এক অদ্ভুত হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে…
প্রথম কিছু সময় দুজনেই অপ্রস্তুত একটা হাসি দিয়ে চুপচাপ হাসি দিয়ে হাটছিলাম.. হিয়া মনে হলো খুব বেশিই অবাক হয়েছে.. ও কি রিপ্লাই দেবে বুঝতে পারছিলো না..
চোখটাকে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক নাচিয়ে আমার দিকে ফিরে বললো,
-আর ইউ সিরিয়াস?
আমি একটা ঢোক গিলে কোনো মতে কম্পিতভাবে মাথাটা নাড়িয়ে হ্যাসূচক জবাব দিলাম..
হিয়া মন খুলে একটা হাসি দিয়ে আমার বাম হাতটা আরো ভালো করে জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা রাখলো.. অবাক হলাম আমি.. ওর দিকে তাকাতেই ও বললো,
-পাগল তুমি……
ওর এমন উত্তর আর ‘তুমি’ সম্বোধনটা শুনে চমকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম,
-রাজী তুমি?
হিয়া লজ্জায় চোখটা তুলে হালকা উপর নিচ মাথা নাড়লো.. বউদি ঠিকই বলেছিলো তাহলে হিয়ার আমার জন্য সত্যিই ফিলিংস আছে… আমি খুশিতে ওকে ছেড়ে এক লাফ দিয়ে ওর সামনে মুখ করে দাড়ালাম,
-সত্যিই ভালোবাসো?
-অফুরন্ত…
-OMG!
হিয়ার উত্তরে অতিরিক্ত খুশি হয়ে রাস্তার মধ্যেই হিয়াকে কোলে তুলে নিলাম.. হিয়া একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো,
-ঐ কি করছো! রাস্তা এটা… দেখছে সবাই!
-দেখুক.. তাতে আমার কি! নিজের বউকেই তো নিলাম কোলে…
হিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে একটা একটা মাঠের কিনারে বসতে বসতে কথাটা বললাম.. হিয়া মুখ ভেংচিয়ে তাকালো আমার দিকে,
-এহ! এখনো তো হইনি বউ..
-তাতে কী! হয়ে যাবে তো.. দাদাভাই আর বউদিভাই তো আছেই.. সময়মতো পরিবারকে বুঝিয়ে ঠিক বিয়েটা ঠিক করে ফেলবে.. তারপর তুমিও চলে আসবে শ্বশুরবাড়ি.. আর আমিও বউ পেয়ে যাবো..
হিয়া হাসতে হাসতে আমার মাথায় আদর করে চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো.. আমিও প্রত্যুত্তরে আমার মাথাটা ওর কোলে রেখে একটা প্রশান্তির হাসি দিলাম…
.
.
(সমাপ্ত)

Tagged : / /