ধোকা পর্ব – ১২ (শেষ) || হৃদয় চৌধুরী


Hridoy Chawdhury

আমি পেছন থেকে পলকের পেটে জড়িয়ে ধরে একদম কাছে টেনে নিলাম..
পলক কিছুটা হকচকিয়ে উঠলো.. আমার একটা বাম হাতটা রেলিংয়ে.. আর ডান হাতটা পলকের কোমর থেকে পেটে স্পর্শ করে গেলো..
আমার বুকে পলকের পিঠটা ঠেকে আছে.. ও পিছনে হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে আমায় দেখে বললো,
-ওহ্ তুমি!
-উম..
-এভাবে না বলে কেউ হঠাৎ এমন জড়িয়ে ধরে?
-হ্যা ধরে তো.. সারপ্রাইজড করার জন্য..
আমি পেছন থেকে পলকের পেটে হাত বুলিয়ে ওর গালে আমার গালটা লাগালাম.. আমার মুখটা পলকের গাল আর গলায় খানিক স্পর্শ করতেই ও কিছুটা শিউরে উঠে হেসে দিলো..
ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে হাসতে হাসতে ও আমার অন্যগালে হাত রাখলো,
-অলে লে.. এতো সারপ্রাইজড করার দরকার নেই.. যাও ঘুমাও গিয়ে… সকালে অফিস আছে না?
-উম আছে তো.. বাট ঘুমাবো না এখন.. পরে..
-পরে কেন? এখন কী করবা?
-এইতো যেভাবে জড়িয়ে আছি তোমাকে, সেভাবেই সময় কাটাবো এখানে..
পলক আমার কথায় হাসলো কতোক্ষণ.. ও ওর পেটে আমার হাতটার উপর নিজের ডান হাতটাও রাখলো..
আমার হাতের আঙুলগুলোর ভেতর ওর আঙুলগুলো গলিয়ে আমার কাধে ওর মাথা ঠেকিয়ে বললো,
-হৃদয়… অনেক আগে একবার মনে আছে তোমার? তুমি যে ইশাকে মনে করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে?
আমি পুরনো স্মৃতির এলবামটা কিছুটা নাড়া দিলাম.. আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু কিছু চিন্তা করে পলককে বললাম,
-উমম.. রান্নাঘরে যে??
-হুমম.. ঐদিন তোমার স্পর্শে সিরিয়াসলি বিশ্বাস করো, কেমন যেন এক অস্থিরতা বয়ে গিয়েছিলো.. ধুকপুকুনি বেড়ে গিয়েছিলো.. একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম.. ওভাবে যে তোমার স্পর্শ পাবো, ভাবিনি..
আমি পলকের কথায় ঐদিনের কথা মনে করে হাসলাম কিছুক্ষণ,
-হাহাহা.. মনে আছে তোমার?
-উম থাকবে না আবার! কোনো ছেলের আচমকা প্রথম স্পর্শ ওটা..
-ভালো লেগেছিলো??
-জানিনা… বাট ভালোবাসতাম তো.. ভালোও লেগেছিলো.. খারাপও লেগেছিলো.. সাথে লজ্জাও…
-কেন?
-ভালো লেগেছিলো তোমার স্পর্শ পেয়ে.. আর খারাপ লেগেছিলো এটা ভেবে যে, তোমার স্পর্শ পাওয়ার অধিকার অন্যজনের.. আমি তো শুধু এক্সিডেন্টলি পেয়ে গিয়েছিলাম..
-আহারে.. তো লজ্জাটা কেন?
-Strange! লজ্জা লাগবে না!? ওভাবে ঐজায়গায় Touch করলে যেকেউ লজ্জায় লাল হয়ে যাবে.. আর তুমি যখন ওটা নিয়ে Sorry বলতে, তখন আরো বেশি লজ্জা লাগতো..
-হাহাহা.. অবশ্য আমারো লজ্জা লেগেছিলো সেদিন.. ইশার জায়গায় তোমাকে দেখে একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম.. ভয়ও পেয়েছিলাম, যদি তুমি ওটা রেগে গিয়ে বকাবকি করো! কিন্তু পরে তো তেমন কিছুই করলে না..
-উমমমম…. ভালোবাসি তো….
-হুমমমমম… আমিও অন্নেএএএক্ক ভালোবাসি….
পলক আমার দুইহাতটা জড়িয়ে ধরে একসাথে ওর পেটে রাখলো.. আমিও প্রত্যুত্তরে ওকে জড়িয়ে নিয়ে ওর গলায় আমার নাকটা আলতো করে ঘষে দিলাম..
পলক শিহরণে চোখ বন্ধ করে ঠোট খেলিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিলো.. আমার পিঠে হেলান দিয়ে আমার হাত দুটো ওর মুঠোয় নিলো..
দুজন মিলে সারারাত আকাশ দেখে ভোরের দিকে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম..
.
পরদিন বেশ সকাল সকাল ঘুম ভাঙলো.. উঠে দেখলাম পলক আমার বুকে গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে আছে..
আমি ওর মিষ্টি চেহারাটা দেখে একটা হাসি দিলাম.. ও ওর মতো করে অঘোর ঘুমে আছে.. আর আমি অপলক চোখে ওর দিকে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে আছি..
অনেক পর পলকের ঘুম ভাঙলো.. ও আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুমের চোখে তাকাতেই দেখলো আমি জেগে আছি..
ও অবাক হয়ে একটা হাই তুলে আমার উদ্দেশ্যে বললো,
-কি রে! এতো তাড়াতাড়ি জাগলে যে…….
আমি একটা মৃদু হাসি দিয়ে বললাম,
-তোমার সকালের সৌন্দর্যটা দেখার জন্য উঠলাম এতো তাড়াতাড়ি..
-এএহহ! ঘুম ভেঙে গেছে মনে হয়.. আর এখন এটা নিয়ে একটা ঢং দেখানো হচ্ছে…
আমি দাত বের করে একটা হাসি দিলাম,
-না গো.. সত্যি..
-হয়েছে হয়েছে আর ভাব ধরতে হবে না…
-ভাব না সুইটহার্ট… ইট’স ভালোবাসা..
পলক আমার গাল টেনে চোখ ছোট করে একটা হাসি দিয়ে বললো,
-অলে লে.. খুব লাকি আমি তোমাকে পেয়ে..
-আমিও…
চোখ বন্ধ করে পলককে আরো ভালোভাবে বুকে টেনে নিয়ে শুয়ে রইলাম.. হঠাৎ ই পলক বলে উঠলো,
-হৃদু আমাদেরও বাবু হবে… তাই না?
-হুম হবে তো…
-ছেলে বাবু না মেয়ে বাবু?
-উমম.. একটা হলেই হলো.. ঈশ্বরের গিফট তো.. দুইটাই ভালো..
-নাম কী রাখবা বাবুদের?
আমি পলকের প্রশ্নে উপরের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে অনেক কিছু চিন্তা করলাম,
-উম.. মেয়ে বাবু হলে নাম রাখবো ‘পুতুল’.. আর…
-আর ছেলে হলে নাম হবে ‘হৃদম’.. ঠিক আছে?
-উম.. আচ্ছা.. (হালকা হেসে)
-উমম…
এসব ভেবে পলকের গালে একটা চুমু খেয়ে আবারো বুকে জড়িয়ে নিলাম..
.
ভালোই চলছিলো আমাদের সুখের সংসার.. ইশাও ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিতে শিখে গেলো..
নিয়তির সবকিছুই বুঝতে পেরেছিলো সে, তবে একটু দেরিতে.. ওর বেবির যখন ৮ মাস, তখন ওরই এক ফ্রেন্ড ‘উজ্জ্বল’ ওকে ভালোবেসে নতুন করে ওর জীবনে আসার জন্য জিজ্ঞেস করেছিলো..
উজ্জ্বল ওর অতীত মেনে নিয়ে আবার বর্তমান আর ভবিষ্যত সাজানোর দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলো.. সার্বিক পরিস্থিতি ভেবে ইশাও রাজী হয়ে গেছিলো.. বিয়ে হলো ওদের..
ধোকাবাজির অনেক শাস্তি পেয়েছে ইশা.. প্রীতমকেও পরোক্ষভাবে শাস্তি দিয়েছে ঈশ্বর.. এখন হয়তো ইশার শাস্তির ঘড়া পূর্ণ হয়েছে.. তাই নতুন করে আবার বাস্তব স্বপ্ন ফিরে এলো ওর জীবনে..
প্রীতম এখনো ড্রাগস পাচারের দায়ে জেল খাটছে.. তবে ওর মেয়ে বাবুটাকে নিয়ে ইশা আর উজ্জ্বল সংসার করছে..
উজ্জ্বল বিয়ের কয়েকদিন পরেই ইশাকে নিয়ে কাতার চলে যায়.. গিয়ে ওখানেই সেটেল্ড হয়ে যায়.. এখন আর তেমন যোগাযোগ ই হয় না ওদের সাথে..
যাই হোক, আমিও পলককে নিয়ে খুব ভালোই আছি.. তিতু, মা, আমি আর পলক- চারজনের পুরো পরিবার ই খুউব ভালোয় ভালোয় দিন কাটাই…
.
কেটে গেলো অনেক মাস….
.
আজ আমার পলকও মা হতে চলেছে.. জীবনের সব থেকে খুশির মুহুর্তটা তখনি ছিলো, যখন শুনেছিলাম আমি বাবা হতে চলেছি.. পলক আর আগত বাবুটার খেয়াল নিতে নিতে কেটে গেলো দশ মাস..
কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে এখন আমি, তিতু, পলকের বাবা আর ভাই ওয়েট করছি.. আর ঈশ্বরকে ডাকছি.. একটু পর প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো আমাদের..
পলকের মাতৃ আর্তনাদ থামলো.. বাচ্চার কান্না কানে যেতেই আমাদের প্রাণে খুশির ঢেউ উঠলো.. ডক্টর বাইরে এসে ইনফর্ম করলো পুত্র সন্তানের আগমন ঘটেছে পরিবারে..
আমরা খুশিত উদ্বেল হয়ে ভেতরে মা আর বাচ্চাকে দেখতে ঢুকলাম.. ওরা সবাই বাবুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো.. আমি পলকের দিকে তাকাতেই ও খুশি আর লজ্জায় একটা মিষ্টি হাসি দিলো..
আমিও মৃদু হাসি দিয়ে আমার ছেলেকে কোলে নিলাম.. অনেকক্ষণ ওকে কোলে নিয়ে আদরের পর পলকও ওকে কোলে নিতে চাইলো..
আমি পলকের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসলাম.. একটা বালিশে হেলান দিয়ে বসে ও আস্তে আস্তে বেবিকে কোলে নিলো.. একটা মৃদু হাসি দিয়ে ও আমার দিকে তাকালো,
-আমাদের ছেলে, ‘হৃদম’….
আমি হ্যাসূচক মাথা নাড়িয়ে একটা প্রসন্ন হাসি দিলাম.. সারা শরীরে আমার খুশির স্রোত বইছে.. নতুন এক সদস্যের আগমন.. পরিবারের সবাইও কত্তো খুশি..
আমি হৃদমকে একহাতে ধরে অন্য হাতে পলককে হালকা বুকে জড়িয়ে নিলাম.. ওর কপালে চুমু খেয়ে একটা শান্তির প্রশ্বাস নিলাম আমি.. লাইফের সবথেকে সুখকর এক মুহুর্ত এটা.. আই উইশ, এমন সুখের মুহুর্তগুলো আজীবন টিকে থাকুক…
.
.
(সমাপ্ত)

Tagged : / /