প্রত্যাবর্তন পর্ব – ০২ (শেষ) || জিসান আহম্মেদ রাজ

Person
Jisan Ahmed Raj

মা দেখে যাও, বাড়িতে পতিতাকে নিয়ে এসেছে বিয়ে করে। আমাদের মুখ দেখানোে কোনে জায়গা রাখলো না। ( জান্নাত)
কই গো দেখে যাও, তোমার ছেলে ধর্ষিতাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। মা টা যেমন নষ্টা ছিল, তাঁর ছেলেটাও ঠিক তেমনি রয়েছে।
” সৎ মা এর কাছে, এসব শুনে রাগে শরীর গিজগিজ করে। শুধুমাএ বাবা নামক লোকটাকে শ্রদ্ধা করি বলি এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি।
কাবে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিস? একটা ধর্ষিতাকে বিয়ে করে নিয়ে আসার সময় একবারো ভাবলি না তুই কার সন্তান? আমার মান – সম্মানকে এ ভাবে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে একটাবারো ভাবলি না?
তোমার ছেলে আর তাঁর বন্ধুরা মিলে যখন ,কথাকে ধর্ষণ করেছে, তখন কোথায় ছিল তোমার সম্মান! জানি কিছু বলতে পারববে না।
দেখছো, দেখছো বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সে আদব টাও শিখেনি। তুমি শুনো নাও কোন ধর্ষিতাকে এ বাড়িতে জায়গা দিলে, আমি এ বাড়িতে থাকবে না। আমি আজকেই জান্নাত আর রাফিকে নিয়ে চলে যাবো। তুমি আর তোমার আদরের ছেলে থাক! ( সৎ মা)
রাজ এখনি ওই মেয়েকে তালাক দিবি। ( বাবা)
বাবা এটা কোন ভাবেই সম্ভব না। আমি কথাকে ভালবাসি।
তুই যদি ধর্ষিতাকে তালাক না দেস, তাহলে, আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবি। আর যদি কোনদিন আমার বাড়িতে আসিস তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি।
না বাবা এমন কসম দিয়ো না, তোমার মরামুখ দেখতে পারবো না। ছোটবেলা মাকে হারিয়ে, বুঝেছি মাকে ছাড়া বেঁচে থাকা কেমন কষ্ট! প্লিজ বাবা শুধু বলবো দোয়া কইরো আমাদের জন্য। কখনো মন চাইলে একটা বার ডাক দিয়ো কাছে চলে আসবো।
হইছে আর অভিনয় করতে হবে না। ধর্ষিতা মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছে। দরদ উল্টাইয়ে পড়ছে মনে হচ্ছে। ( সৎ মা)
বাবার পায়ে কথা সালাম করতে গেলে বাবা পা সরিয়ে ফেলে। আমি কথার হাতটা শক্ত করে দরে, বাড়িটার দিকে শেষ বারের মতো একনজর তাকিয়ে কথাকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম! কথার দিকে চেয়ে দেখি কাঁদছে।
চোখের পানি মুছে দিয়ে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম! কথা কাঁদছে, এ কান্নার কষ্টের কোন কান্না নয়! এ কান্না পরম পাওয়ার কান্না।
ঢাকায় গিয়ে বাসা ভাড়া নিলাম। আজ আমাদের বিয়ের তিনদিন। তিনদিন পর আজ আমাদের বাসর ঘর। রাত ১২ টা বাজে এখনো বেলকুণিতে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশটা কেমন ঘুর অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। রাত ১ টায় দিকে বাসর ঘরে যেতেই কথা পা ছুঁয়ে সালাম করলো। কথাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।
তোমাকে একটা কথা বলবো? ( কথা)
হুম বলো!
জানো পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ আমি। দোয়া করি, সব মেয়ে যেন তোমার মতো একটা স্বামী পায়। কখনো আমায় ছেড়ে যেয়ো না। তোমার বুকেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি যেন আল্লাহ্ তায়ালার কাছে প্রার্থনা। ( কথা)
এই তুমি কাঁদছো কেন? ফুলশর্যার রাতে কি কেউ কাদে? বুকে আসো। কথাকে বুকে নিয়ে কথার ঠোঁটের সাথে ঠোঁট দুটি মিলিয়ে দিলাম। কথার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পর অজানা এক ভালবাসার রাজ্যে হারিয়ে গেলাম।
কয়েকদিন পর হঠাৎ খবর আসলো, বাবা মারা গেছে। বাবার মৃত্যুর কথার শুনে মনে হচ্ছে, আমার কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছে। কথাকে নিয়ে গ্রামে গিয়ে বাবাকে মাটি দিতে পারি নি। সৎ মা আর রাফি, গ্রামের মানুষদের বলেছে, ধর্ষিতা আর ধর্ষিতার স্বামীকে মাটি দিতে দেওয়া হবে না। কত অনুরোধ করেও বাবার কবরে এক মুঠো মাটি তো দূরের কথা মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারিনি। কথাকে নিয়ে অশ্রুভেজা চোখ নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। মাঝরাতে ঘুম ভেযে যায় কান্নার আওয়াজে, আমার পাশে তাকিয়ে দেখি কথা নেই!
কান্নার আওয়াজ শুনে পাশের রুমে গিয়ে দেখি কথা নামায শেষ করে মোনাজাতে কাঁদছে আর বলছে” হে আল্লাহ্ তায়ালা আমার তো বাবা – মা তুমি ছোট থাকতেই উঠিয়ে নিয়েছো। জীবনে বাবা’কে বাবা বলে ডাকতে পারিনি। বাবার আদর কি বুঝিনি! শুনেছি, মা গর্ভে থাকাকালীন তুমি আমার বাবাকে তোমার কাছে নিয়ে নিয়েছো। হসপিটালের বেডে জন্ম দিয়ে মা’টাকেও চলে গেছে বাবারি মতো! কখনো মা- বাবার স্নেহ ভালবাসা কি বুঝিনি। তবুও তোমার কাছে কাছে কোন নালিশ করিনি! তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। তুমি আমার রাজের মতো একটা স্বামী আমাকে দিয়োছো। হে আল্লাহ তোমার কাছে প্রার্থনা আমার স্বামীর বুকেই যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।
আল্লাহ্ আমার শ্বশুর কে তুমি জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করো। তাঁর প্রতি আমার কোন অভিযোগ। আল্লাহ্ তিনি তো আমার বাবার মতোই ছিল! আল্লাহ্ তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও। আমার স্বামী যেন চিরজীবি হয়। আল্লাহ্ হে পরম করুণাময়, তোমার কাছে শেষ মিনতী আমি আর আমার স্বামী যেন তোমার জান্নাতেও একসাথে থাকতে পারি।
কথা মোনাজাত শেষ করে পিছন দিকে তাকাতেই দেখে, আমি কাঁদছি।
কাঁদছো কেন?
সত্যি তোমার মতো স্ত্রী পাওয়ার মতো ভাগ্য।
প্লিজ ওভাবে বলো না। তোমার মতো স্বামী কয়জনের ভাগ্যে হয়। আল্লাহ্ যেন তোমাকে আর আমাকে তাঁর জান্নাতে জায়গা করে দেয়।
কথাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, কপালে ভালবাসার স্পর্শ এঁকে দিলাম।
দিনগুলি ভালোই কাটছিল। কিছুদিন
পর আমাদের ঘর আলোকিত করে একটা রাজকন্যা এলো। মনে হচ্ছিল দুনিয়াটা জান্নাতের একটা টুকরা। কথা, ইচ্ছাকৃত ভাবে এক ওয়াক্ত নামায কাযা করে না। এদিকে আমি যদি নামায না পড়ি, তাহলে খেতে দেয় না। তাঁর কথা হলো দুজন একসাথে যেন, আল্লাহর জান্নাতে থাকতে পারি।
হঠাৎ একদিন, টিভির পর্দায় একটা সংবাদ শুনে থমকে গেলাম। মায়ের হাতে ধর্ষক ছেলে এবং তাঁর বন্ধুরা খুন।
কথাকে ডাক দিতে গিয়ে গলাটা কেমন ধরে এলো। পাশেই তাকিয়ে দেখছি কথা কাঁদছে।
টিভিতে যে ৭ টা লাশ দেখাচ্ছে তাঁদের সবাই ছিল কথার ধর্ষক। তাঁদের মাঝে লাশ হয়ে শুয়ে আছে আমার সৎ ভাই রাফি।
আর সব থেকে অবাক হলাম তখন যখন দেখলাম, তাঁদের সবার খুনি হচ্ছেন আমার সৎ মা। যে মা তাঁর ছেলেকে ধর্ষক হতে প্রশয় দিছে।
হঠাৎ হাতে থাকা গ্লাসটা পড়ে গেল যখন শুনলাম” রাফির বন্ধুরা, জান্নাত কে ধর্ষণ করে, আর জান্নাত ধর্ষিতার মুখ দেখাতে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়।
কথা আর আমাদের রাইসাকে নিয়ে পরের দিন গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। গ্রামে গিয়ে সবকিছু শুনে চোখ দিয়ে অঝরো পানি ঝরতে থাকে।
যে সৎ বোনটাকে ছোটবেলা নিজের হাতে খাইয়েছি সে বোনটা আজ কবরে। এই ধর্ষক সমাজ তাকে বাঁচতে দিলো না।
থানায় গিয়ে সৎ মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বললো ” কথা বউমা আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। আমি তোমার প্রতি অনেক অবিচার করেছি। তোমার প্রতি অবিচার করার ফল, আজ আমি নিজে হাতে পেয়েছি। আমার মেয়েটাকে আমারি, কুলাঙার ছেলের বন্ধুরা নিশংস ভাবে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটা সে মুখ দেখাতে পারেনি। মরে যাওয়ার আগে একটা চিঠি লেখেছে। আমি মায়ের কথায় পুলিশেন কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম”
প্রিয় ‘
রাজ ভাইয়া শুরুটা কিভাবে করবো বুঝতে পারছি না।
আমি আজ বুঝলাম একটা মেয়ের শ্রেষ্ট সম্পর্দ তাঁর সতিত্ব। আজ তা হারিয়ে বুঝতে পারছি। জানিনা কথা ভাবী আমায় ক্ষমা করবে কিনা। তোমাদের প্রতি অনেক অবিচার করেছি। তোমাকে কখনো ভাই বলে স্বীকার করিনি। আজ নিজের ভাইয়ের বন্ধুরা মিলে আমাকে ধর্ষণ করলো। তাঁদেন যৌন চাহিদা মেটালো। কত কাকুতি- মিনতি করেছি, বলেছিলাম আমি তো রাফির বোন তোমাদের বন্ধুর বোন। তাঁরা কি বলেছিল জানো” তোর ভাই কি কোন মেয়েকে ধর্ষণের সময় ভাবে সে কারো বোন?
ভাইয়ারে ক্ষমা করে দিস তোর ধর্ষিত বোনকে।প্রত্যার্বতন যে এভাবে জীবনে আসবে তা বুঝতে পারিনি।
মা’কে বলতে চাই” জানো মা, পৃথিবীতে ভাগ্যবান যদি হয় তাহলে আমাদের সৎ মা। রাজ ভাইয়ার মা। কারণ রাজ ভাইয়া সে মায়ের সন্তান যে একটা ধর্ষিতা নারীকে, স্ত্রীর সম্মান দেয়। আর তুমি সেই মা যে মা নিজের ছেলেকে ধর্ষক হতে অনুপ্রেরণা দিয়েছো। যার জন্য আজ আমি ধর্ষিত। জানো মা, ধর্ষিকদের কোন পরিচয় নেই। তুমি যদি পারো তোমার মেয়ে হত্যার বিচার করো, তোমার নিজের ছেলের রক্ত দিয়ো। নইতো আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করবে না!
ইতি ‘
ধর্ষিতা ( পতিতাও বলতে পারো মা, তুমিই তো কথা ভাবীকে পতিতা বলেছো)
কথাগুলো,পড়ে কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে অঝরে বৃষ্টি পড়ছে।
পাশ থেকে মা কথাকে বলল” কথা মা তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস! তোকে আর জান্নাতকে যারা ধর্ষণ করেছে তাঁদের আমি নিজ হাতে খুন করেছি। আমার কুলাঙ্গার ছেলেটার রক্তে যখন রুমটা ভেসে যাচ্ছিল তখন আমার চোখে আমার মেয়ে জান্নাতের ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো লাশটা বার বার ভেসে উঠছে। প্রত্যার্বতন এভাবে আসবে কখনো ভাবতে পারিনি। আজ আমি গর্বিত আমার নিজের মেয়ের ধর্ষকের বিচার নিজ হাতে করেছি। ভালো থাকিস, রাজ একবার মা বলে ডাকবি” বুকের ভেতর যে ঝড়টা উঠেছে তোর মতো, সন্তানের ডাকে তা শান্ত করি।

নিজের অজান্তেই মা ডাকটা দিয়ে ফেললাম! চোখ দিয়ে তৃপ্তির মানে ঝরছে। আমাদের ছোট রাজকন্যাটাও কাঁদছেম কথার চোখে, চকচকে জল ঝরতে দেখলাম! এটা কোন কষ্টের জল নয়, এটা আনন্দের।
সমাপ্ত

Tagged : / /