প্রেমাতাল পর্ব – ৩৪ || মৌরি মরিয়ম

কাঁদতে কাঁদতে তিতিরের নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছিল। বার বার মনে একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, মুগ্ধকে আর ও পাবেনা। আর ঠিক তখনই ওর চোখে ভেসে উঠছিল মুগ্ধর সাথে কাটানো দিনগুলো, ওদের সব স্পেশাল মুহূর্তগুলো! কত স্বপ্ন, কত প্ল্যানিং, কত কথা দেয়া নেয়া সব এভাবে শেষ হয়ে যাবে? এসব ভাবনার অবসান ঘটালো একটি ফোনকল। রিংটোন শুনে তাকাতেই তিতির দেখলো স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে, Mugdho is calling..
লাফিয়ে উঠে ফোন ধরলো তিতির। মুগ্ধর গলায় হ্যালো শুনতেই কান্নাটা আরো বেড়ে গেল। মুগ্ধ বলল,
-“আরে পাগলী এত কাঁদছ কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে।”
তিতির কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
-“আই লাভ ইউ।”
-“আই লাভ ইউ টু মাই তিতিরপাখি।”
-“তোমার সাথে থাকতে না পারলে আমি মরে যাব। প্লিজ কিছু একটা করো। প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”
-“হ্যা, অবশ্যই করবো। তুমি আর কান্না করোনা প্লিজ। দেখো সব ঠিক করে দেব।”
-“জানো কতবার তোমাকে ফোন করেছি! কিন্তু তোমার ফোন বন্ধ ছিল।”
-“হ্য ফোন আছাড় মেরেছিলাম, ভেঙে গেছে, পিউ কুড়িয়ে দিয়েছে অবশ্য কিন্তু অন হচ্ছিল না। অথচ তোমার খোঁজটাও নিতে পারিনি তাই আগের ফোনটা আলমারির চিপা থেকে খুঁজে বের করেছি। যাই হোক তোমার বাসার পরিস্থিতি কি? তান্না তোমাকে স্পিচ দিয়ে দিয়েছে না একটা আমার বিরুদ্ধে?”
-“না, আমি তখনই ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়েছি। কিন্তু তুমি ফোন কেন ভেঙেছো?”
-“আরে ইকরা**টা ফোন করে পিঞ্চ করছিল তোমাদের বাসা থেকে আমাকে রিজেক্ট করেছে সেটা নিয়ে। আমি তো ওর ফোন ধরিনা। তাই আননোন নাম্বার থেকে ফোন করেছে, বোঝো কি পরিমাণ বেয়াদব একটা।”
-“ছিঃ প্লিজ তুমি স্ল্যাং ইউজ করোনা তো।”
-“আমি তো এমনই, খারাপ।”
-“উফ, আজাইরা কথা বলোনা। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পারছি না ইকরা আপু এত তাড়াতাড়ি জানলো কি করে?”
-“কিভাবে আবার মা বলেছে। মাঝে মাঝে মা যা করে।”
এতক্ষণে তিতিরের কান্না থেমে এসেছে। বলল,
-“মায়ের উপর কখনো রাগ করোনা। মা তো একটু সহজ সরলই। দুনিয়ার কোন প্যাঁচই বোঝেনা।”
-“না, মায়ের উপর রাগ করিনি।”
-“আচ্ছা, এবার আমাকে বলোতো তোমার আর ভাইয়ার মধ্যে কি হয়েছিল?”
মুগ্ধ কোনো ভনিতা না করে সব বলল। যা ঘটেছিল তার এক বর্ণও চেঞ্জ বা লুকায়নি। উলটো তান্না কি কি বলেছিল আর ও কিভাবে মেরেছিল কি কি গালি দিয়েছিল তার সবটা বলল। মুগ্ধ যতক্ষণ বলছিল তিতির ততক্ষণ একটা কথাও বলেনি। মুগ্ধর বলা শেষ তখনো তিতির চুপ করে রইলো। তারপর মুগ্ধ বলল,
-“তিতির? চুপ করে আছো কেন? কিছু তো বলো।”
তিতির এখন আর মোটেও কাঁদছে না। রাগ হচ্ছে। মুগ্ধর উপরও যেমন রাগ হচ্ছে, ওর ভাইয়ের উপরও রাগ হচ্ছে। বলল,
-“আমাকে ভুলে যাও।”
-“মানে? তিতির আমি জানি আমি যা করেছিলাম ঠিক করিনি কিন্তু তোমার ভাই যেটা করেছিল সেটাও কিন্তু ঠিক করেনি। তুমি এরকম কথা বলোনা তিতির। এতবড় শাস্তি আমাকে দিওনা।”
-“আমি কিছুই করছি না। এতকিছু যখন ঘটে গেছে আমার ফ্যামিলি কখনোই রাজী হবেনা তাই বললাম আমাকে ভুলে যাও।”
-“সব ফ্যামিলি এরকম বলে। আমরা বোঝাব তিতির। দেখো বোঝালে ঠিকই বুঝবে।”
-“কি বুঝবে বলো? তুমি আমার ভাইকে কিসব গালি দিয়েছো চিন্তা করে দেখো একবার।”
-“তিতির রাগ উঠলে যখন মানুষ গালি দেয় তখন এতকিছু মিন করে দেয়না, মুখে যা আসে তাই বলে গালি দেয়।”
-“তুমি আমার ভাইয়ের জন্ম পরিচয় নিয়ে কথা বলেছো। আমার মা কে নিয়ে বাজে কথা বলেছো তোমার মনে হয় এরপরেও আমার বাবা, আমার ভাই তোমার সাথে আমার বিয়ে দেবে?”
-“আমি কি জানতাম তান্না তোমার ভাই? সবসময় তো ভাইয়া ভাইয়া বলেছো। একদিনও নামটা বলেছো?”
-“মারামারি আর গালাগালি তোমার স্বভাব। রাগ কন্ট্রোলের আর যেন কোনো উপায় নেই তোমার। আমি তো আগেও কতবার দেখেছি।”
-“তোমাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে আমার সহ্য হয়না।”
-“বাহ! ভাল তো। কি বীরপুরুষ আমার।”
-“তিতির, তোমার ভাই যে তোমার রেট জিজ্ঞেস করেছে তাতে কি ওর কোনো দোষ নেই? তুমি তো ওর নিজের বোন।”
-“ও যদি এটা বলেও থাকে তো জানতো না যে ও ওর বোনের সম্পর্কে বলছে।”
-“ভাইয়ের বেলায় এখন ‘যদি’ বলছ? তার মানে আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না? আর হবেই বা কিভাবে! তোমার ভাইয়ের যা এক্টিং দেখলাম আজ। বলে কিনা বাচ্চাকাচ্চা আর মুরুব্বিদের সামনে বলতে পারবে না কি হয়েছে! আরে ও তো দুমুখো সাপ ওর মুখ কি সোনা দিয়ে বান্ধানো নাকি! যে ওর মুখ দিয়ে ভাল কথা ছড়াবে! -“মুখটাকে একটু সামলাও।”
-“তোমার ভাই বুচ্ছো বাসার মধ্যে ভেজাবিড়াল হয়ে থাকে। সেটা নিশ্চই ফ্যামিলিতে গুডবয় হয়ে থাকার জন্য?”
-“দেখা তিতির, আমি সত্যি জানতাম না যে ও তোমার ভাই। কিন্তু বিশ্বাস করো ও শুরু না করলে আমিও ওকে কিছুই বলতাম না।”
-“নাইবা জানলে, তুমি না সবসময় সবাইকে বলো একটা মেয়েকে বাজে কথা বলার আগে ভাবা উচিৎ সেও তোমার বোনেরই মত কারো বোন। তাহলে কারো মাকে নিয়ে বলার আগে এটা ভাবলে না সেও কারো মা।”
-“দেখো আমি তো চাইলে তান্নাকে গালাগাল করার ব্যাপারটা তোমার কাছে গোপন করতে পারতাম। আমিতো করিনি তিতির। পুরোটাই বলেছি তোমাকে। আর প্লিজ আল্লাহর দোহাই লাগে তিতির, একটু বোঝো.. কাউকে কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দেয়ার মানে এটা না যে তার মা কুত্তা। মানে হলো গিয়ে সে একটা বাবু কুত্তা। তেমনি অন্য গালিগুলোও অমনই।”
এভাবেই অনেক তর্কাতর্কি হয়েছিল সেদিন। অনেক রাতে ভাইয়া দরজায় নক করলো। অনেকবার নক করার পর তিতির দরজা খুলল। বাবা-মা, ভাইয়া দরজায় দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢুকেই তিতিরের মা বলল,
-“তিতির, ওই ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হওয়া কখনো সম্ভব না। তোমার কি কিছু বলার আছে?”
তিতির দেখলো বাবা ওর দিকে তাকাচ্ছে না। রুমে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তান্নাও কোনো কথা বলছে না।
-“মা, তোমরা ওকে যেমন ভাবছ ও তেমন নয়। ওই ঘটনাটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল। আমি ওকে চার বছর ধরে চিনি। ও আসলে খারাপ না। আমার সম্পর্কে কেউ কোন আজেবাজে কথা বললেই শুধু রেগে যায় ও। তখন রাগারাগি, গালাগালিটা ওর চলে আসে। সবার তো আর ১০০% ভাল দিক থাকে না।”
মা অবাক হয়ে বলল,
-“এতকিছুর পরেও একথা বলছিস? মা, ভাইয়ের সম্মানের কোন দাম নেই তোর কাছে?”
তান্না বলল,
-“তোর মতামত জানতে চেয়েছিলাম।”
তিতির বলল,
-“আমি মুগ্ধকেই বিয়ে করবো। ও ভাল খারাপ যেমনই হোক না কেন ওর সাথে আমি হ্যাপি থাকবো।”
এতক্ষণে বাবা বলল,
-“তিতির তুমি যদি মনে করো তুমি এডাল্ট, তোমার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নিতে পারবে তাহলে জেনে রাখো আমরা তোমার বাবা-মা, তোমাকে জন্ম দিয়েছি, লালনপালন করেছি, যত্ন করেছি, ভালবাসা দিয়েছি তাই তোমার উপর আমাদের অধিকার আছে। আমরা কোনোভাবেই তোমাকে আগুনে ফেলে দিতে পারব না। যাই হোক, আমরা কখনো এই ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দেব না। তারপরেও যদি করতে চাও তাহলে এ বাড়ি ছেড়ে চিরতরে চলে যাও। কখনো আর ফিরে আসবে না। তুমি ভুলে যেও তোমার বাবা মা আছে। আমরাও ভুলে যাব আমাদের একটা মেয়ে ছিল। সব সম্পর্ক সেদিনই শেষ হয়ে যাবে যেদিন তুমি ওর সাথে নতুন সম্পর্কে বাধা পড়বে।”
একথা বলে বাবা ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। তান্নাও বলল,
-“রক্তের সম্পর্কের প্রতিদান, ছোটবোনকে ঘুম পাড়ানোর জন্য রাতের পর রাত জেগে কাধে নিয়ে হাটার প্রতিদান, অসুস্থ বোনের বিছানার পাশে বসে কাঁদার প্রতিদান, বোনের আবদার পূরণ করার জন্য দিনরাত এক করে বাবা-মাকে রাজী করানোর প্রতিদান, বোনের পরীক্ষার সময় অযথা জেগে থেকে বোনকে সঙ্গ দেয়ার প্রতিদান! সব প্রতিদানগুলো এতসুন্দর করে পাব ভাবিওনি কোনদিন। থ্যাংকস।”
একথা বলে ভাইয়া বের হয়ে গেল। ভাইয়ার চোখে পানি দেখে মা বলল,
-“আগে যদি জানতাম, তুই জন্মানোর পরই তোর মুখে বালিশচাপা দিয়ে মেরে ফেলতাম।”
তারপর মাও ঘর থেকে বের হয়ে গেল। তিতির ফ্লোরে বসে পড়ে অঝর ধারায় কাঁদতে লাগলো।
To be continued…

Tagged : / /

প্রেমাতাল পর্ব – ৩৩ || মৌরি মরিয়ম

হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠতেই মুগ্ধর ভাবনায় লাগাম পড়লো উঠে গিয়ে দরজা খুলল, মা এসেছে ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলো,
-“
তিতির কোথায়?”
-“
আমার ঘরে।

মা সোজা মুগ্ধর ঘরে চলে গেল। মুগ্ধ দরজা লাগিয়ে ঘরে ঢুকতেই মা বলল,
-“
একি অবস্থা হয়েছে মেয়েটার!”
মা বিছানায় তিতিরের পাশে বসেছে। মুগ্ধ চেয়ার টেনে বসে বলল,
-“
তুমি জানলে কিভাবে যে এসেছে?”
-“
পিউ ফোন করেছিল।
-“
ও।

মা আবার বলল,
-“
মেয়েটার চোখদুটো গর্তে ঢুকে গেছে। চেহারার মাধুর্যটাই চলে গেছে। ডাকাত ফ্যামিলি একটা।
-“
বাদ দাও না মা।
-“
কেন বাদ দিব? ওর ওই ডাকাত ফ্যামিলির জন্যই আজ আমার সংসারে কোন শান্তি নেই, সুখ নেই, আনন্দ নেই। যতটুকু ছিল তাও শেষ করে দিয়েছে। এতদিনে তোর বউ এসে নাতি নাতনীতে ঘর ভরে যাওয়ার কথা ছিল। ওর জন্য বিয়ে করলি না। বছর অপেক্ষা করলি ওর স্টাডির জন্য। লাভ কি হলো? উলটো অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হলো। এখনও বিয়ে করছিস না। বয়স চলে যাচ্ছে। তুই শুধু শুধুই ওর জন্য অপেক্ষা করছিস। দুনিয়া উলটে গেলেও ওর ফ্যামিলি কোনদিনও মানবে না। আর পারবেও না ওর ফ্যামিলি ছেড়ে আসতে।

-“
মা এখন কি এসব কথা বলার সময়?”
-“
অবশ্যই। ইভেন এখনই পারফেক্ট সময়। দেখ ওর অবস্থা, এসব দেখেও যে ফ্যামিলি ইগো নিয়ে বসে থাকতে পারে তারা বিবেকহীন। তাই ওর আশা এবার চিরদিনের জন্য ছেড়ে দে। তুই বুদ্ধিমান ছেলে, জানি এর বেশি কিছু আর তোকে বলতে হবেনা।
মুগ্ধ চুপ, মা এবার প্রসঙ্গ পালটালো,
-“
ওকে নাকি ঘুমের ওষুধ দিয়েছে?”
-“
ঘুমের ইঞ্জেকশান।
-“
তাহলে? বাসায় যাবে কি করে? দেখ তুই ওকে বাসায় এনেছিস এটা নিয়ে না ওর ভাই আবার ঝামেলা করে।
-“
না মা। ডাক্তার বলে দিয়েছে জাস্ট / ঘন্টা ঘুমাবে। তারপরও না উঠলে ডেকে উঠিয়ে দিয়ে আসব।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“
এর চেয়ে অনেক ভাল হত ইকরা কে যদি বিয়ে করতি। এসব আমার আর ভাল লাগেনা।
-“
মা ইকরাকে আমি পছন্দ করিনা।
-“
যাকে পছন্দ করো তার কাছে তো তোমার ভালবাসার দাম নেই। তাই যে তোমাকে পছন্দ করে তাকেই তোমার বিয়ে করা উচিৎ। ইকরার মত লক্ষী মেয়ে কতটা চায় তোকে! তোর বউ হলে সারাজীবন তোর পায়ের কাছে পড়ে থাকতো।
-“
বউ কি পায়ের কাছে পড়ে থাকার মত জিনিস মা?”
মা মেজাজ খারাপ করে তাকিয়ে রইল। মুগ্ধ বলল,
-“
তিতিরের কাছে আমার ভালবাসার দাম নেই এটাও তুমি ভুল বলেছ মা।
-“
হ্যা দাম আছে কিন্তু ওর কাছে ওর ওই ডাকাত ফ্যামিলির ভালবাসার দাম তার চেয়েও বেশি।
-“
সেটাই কি স্বাভাবিক না?”
-“
না স্বাভাবিক না, আমি যে ফ্যামিলি ছেড়ে তোর বাপের সাথে চলে এসেছিলাম, তার মানে কি এই যে আমি আমার ফ্যামিলিকে ভালবাসতাম না?”
-“
তা বলিনি মা, সবার তো আর সেই সাহস টা থাকে না।
-“
শোন মুগ্ধ, বিয়ে করে ফেললে সব ফ্যামিলিই একসময় মেনে নেয়। আমাদের ফ্যামিলি কি মানেনি? তুই হওয়ার পর মেনেছে কিন্তু মেনেছিল ঠিকই। তিতির যদি চলে আসতো তোকে বিয়ে করতো ওর ফ্যামিলিও এক সময় মেনে নিতো।
-“
মা তোমাদের সময়ে পালিয়ে বিয়ে করার একটা ট্রেন্ড ছিল। যা এখন নেই।
কতক্ষণ রক্তচক্ষু নিয়ে মা তাকিয়ে থেকে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল,
-“
যা ইচ্ছে কর, এত মানুষ মরে আমি মরি না কেন কে জানে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতিরের দিকে তাকালো মুগ্ধ। মায়ের উপর রাগ হচ্ছে না মুগ্ধর। হচ্ছে না তিতিরের উপরেও। দুজনই হয়তো তাদের যার যার যায়গা থেকে ঠিক। শুধু মুগ্ধই ভাঙা সেতুর রেলিং ধরে ঝুলে আছে।
সেদিন তান্না খুব স্বাভাবিকভাবে মুগ্ধর সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল হ্যান্ডশেক করার জন্য। তিতিরের বাবা বলেছিল,
-“
এই আমার ছেলে।
মুগ্ধ হ্যান্ডশেক করলো। তান্না বলল,
-“
বাবা পরিচয় করাতে হবে না, উনি আমাকে ভালভাবেই চেনেন।
তিতির বলে উঠলো,
-“
তোমরা একে অপরকে চেনো?”
তান্না বলল,
-“
হ্যা, চিনি। খুব ভালভাবেই চিনি। তো ভাইয়া, আপনি আমার বোন কে বিয়ে করতে চান? সত্যি আমি অবাক! কেন আপনার সেই গার্লফ্রেন্ডের খবর কি?”
সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ওদের দুজনকে। মুগ্ধ এতটা ভয় আগে কোনদিন, কোনো সিচুয়েশনে, কাউকে পায়নি যতটা ভয় পাচ্ছে আজ তান্না কে। খুব অসহায় লাগছে। কোনরকমে বলল,
-“
তখনও তিতিরই আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল।
তান্না বলল,
-“
রিয়েলি? গল্পটা বেশ।
তিতিরের বাবা এতক্ষণে কথা বলল,
-“
ব্যাপারটা কি কিছুই তো বুঝতে পারছি না। তান্না তুই ওকে কিভাবে চিনিস?”
-“
বাবা উনিই মেহবুব। মিথুনদের বাসার দোতলায় থাকতো। বুঝতে পেরেছো কার কথা বলছি?”
বাবা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলো মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধর সত্যিই সেই মুহূর্তে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। বাবা মুগ্ধর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“
তিতির আংটিটা ফেরত দিয়ে দাও।
তিতির অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে! মুগ্ধর মা বলল,
-“
কেন ভাই? কি হয়েছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ওদের পরিচিত হওয়ার সাথে তিতিরের আংটি খুলে ফেলার কি সম্পর্ক রয়েছে?”
তিতিরের বাবা বলল,
-“
বিয়ে সম্ভব নয়। আমি কোনো গুন্ডা ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেবনা।
তিতির কিচ্ছু বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে! কিন্তু এটা বুঝতে পারছে সমস্যা বিরাট কিছু কারন মুগ্ধ প্রচন্ড নার্ভাস। মুগ্ধকে খুব কঠিন সময়েও নার্ভাস হতে দেখেনি তিতির। তাই ভয়ে তিতির আর কোনো কথা বলতে পারছিল না। কিন্তু যা দেখছে তাতে বুক ফেটে কান্না বেড়িয়ে আসতে লাগলো। চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি পড়ছে, মুখে আঁচল চেপে ধরে আছে তিতির। মুগ্ধর মা বলল,
-“
গুন্ডা মানে? আমার ছেলেকে গুন্ডা কেন বলছেন? কি করেছে?”
-“
আন্টি সেসব কথা বাচ্চাকাচ্চা আর মুরুব্বিদের সামনে আমি মুখে আনতে পারবো না। তাই ভাল হয় আপনি মেহবুব ভাইয়ার কাছ থেকেই এসব জেনে নিয়েন। উনি সত্যি ঘটনাটাই বলুক আর রঙচঙ মিশিয়েই বলুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
তিতিরের বাবা হাতজোড় করে বলল,
-“
মাফ করবেন, বিয়ে সম্ভব না। আপনারা এখন আসতে পারেন।
একথা শুনে মুগ্ধর কি যে হলো সাথে সাথে তিতিরের বাবার সামনে দুই হাটু মুড়ে বসে পা ধরে বলল,
-“
অাঙ্কেল, একথা বলবেন না প্লিজ। আমি যা করেছিলাম ভুল করেছিলাম। আজ আপনার পা ধরে ক্ষমা চাচ্ছি আমাকে প্লিজ ক্ষমা করুন।
তিতিরের বাবা আর একটি কথাও না বলে চলে গেল নিজের ঘরে। পেছন পেছন তিতিরের মাও গেল। বাবার পাশেই তান্না দাঁড়িয়ে ছিল। মুগ্ধ তান্নার পা ধরে বলল,
-“
তান্না তুমি আমার ছোটই হবে তবু যে হাতে তোমাকে মেরেছিলাম সে হাতেই আজ তোমার পা ধরে ক্ষমা চাইছি। প্লিজ ক্ষমা করো, তিতিরকে আমার থেকে আলাদা করোনা।
এই দৃশ্য দেখে পিউয়ের চোখে পানি এসে গেল। স্নিগ্ধ্বও তাকিয়ে ছিল অবাক হয়ে। এটা কি ওদেরই বড়ভাই? যে কোনদিন কারো সামনে মাথা নিচু করেনি সে আজ একজনের পর একজনের পা ধরে মাফ চেয়ে যাচ্ছে!
তান্না সরে গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিয়ে বলল,
-“
নিচে দারোয়ানকে বললে গেট খুলে দেবে।
তখনও মুগ্ধ ফ্লোরে বসা। ওর মা ওকে তুলে বলল,
-“
চল।

মুগ্ধ নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। মুগ্ধ,পিউ,স্নিগ
্ধকে নিয়ে ওদের মা তিতিরদের বাসা থেকে বেড়িয়ে এল। বের হওয়ার আগে একবার মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকালো। তিতির ওর ভাবীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আর কোনদিন মুগ্ধ তিতিরের চোখের জল মুছে দিতে পারবে না। ওর আজকের এই যত্ন করে পড়া লাল শাড়ি, চোখের কাজল সব মিথ্যে হয়ে গেল।
মুগ্ধ খুব ভেঙে পড়েছিল। পিউ, স্নিগ্ধ, মা সবার মনেই কৌতূহল ছিল আসলে কি এমন হয়েছিল তান্না আর মুগ্ধর মধ্যে? মা জিজ্ঞেস করতেই মুগ্ধ পুরো ঘটনাটা বলল। মা বলল,
-“
ওদের আশা তাহলে ছেড়ে দে। তিতিরকে বল একদম খালি হাতে চলে আসতে।
ওদিকে ওরা চলে যাওয়ার পর তান্না গিয়ে বাবার ঘরে ঢুকলো। তিতির ভাবীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। তান্নাকে বাবার ঘরে যেতে দেখে তিতিরও গেল। আসল ঘটনাটা কি সেটা ওর জানতেই হবে। ঘরের দরজায় পা রাখার আগেই তিতির শুনতে পেল তান্না বাবামাকে বলছে,

-“
তিতির হয়তো কান্নাকাটি করবে তোমরা আবার গলে যেওনা।
-“
তান্না এসব কিছুই আমাকে বলতে হবে না। আমার খুব ভালভাবেই মনে আছে তুই এক সপ্তাহ হসপিটালে ছিলি। কয়েক মাস লেগেছিল সুস্থ্য হতে।

-“
ওই ছেলে যদি ভাল হতো আমাকে মারার জন্য ওদের বিয়ে আটকে থাকতো না বাবা। একটা ক্যারেক্টারলেস। ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে মেয়ে নিয়ে আসতো ভাড়া করে। চিন্তা করো একবার। আর আমাকে মারার সময় কি বাজে বাজে গালি যে দিচ্ছিল বাবা তার একটাও যদি তিতির শোনে ঘৃনায় মরে যাবে। আমার নাকি কোন জন্মের পরিচয় নেই, মাকে নিয়ে কতটা বাজে কথা বলেছিল বাবা আমি কিছুই ভুলিনি! তার সাথে আমি আমার বোনের বিয়ে তো কিছুতেই মানব না বাবা।
তিতির বিস্ময়ে আঁচলে মুখ চেপে ধরে ছিল তান্নার কথা শুনে। মুগ্ধ ভাড়া করে মেয়ে নিয়ে আসতো! অসম্ভব.. তিতির চেনে মুগ্ধকে। মুগ্ধ কখনোই ওরকম না। কিন্তু মার আর গালাগাল! সেটা তো তিতির নিজেই চোখেই দেখেছে কতবার! তবু সবটা জানতে হবে। বাবাভাইকে পরে ফেস করবে। আগে পুরোটা মুগ্ধর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। তিতির নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর ফোন করলো মুগ্ধকে। ওপাশ থেকে ভেসে এল,
আপনার ডায়ালকৃত নামারটি এখন বন্ধ আছে। দয়া করে আবার চেষ্টা করুন।
তিতির অবাক হলো, মুগ্ধর মোবাইল তো কখনো বন্ধ থাকেনা। আজ তবে বন্ধ কেন? চোখে পানি যেন আজ আটছেই না। উপচে উপচে পড়ছে
To be continued…

Tagged : / /