প্রেমাতাল পর্ব – ৩৮ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধ বাথরুম থেকে বের হয়ে নতুন কেনা টাওয়াল টা নিয়ে সোজা বারান্দায় চলে গেল। ডিভানে বসে শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলল ফ্লোরে। টাওয়াল টা পড়ে প্যান্ট টা খুলে সেটাও ছুড়ে ফেলল। রাগে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়লো। তান্নাকে পেলে এখন খুন করতো ও। শুধুমাত্র তান্নার জন্য আজ নিজের তিতিরকে আদর করতেও হাত কাঁপে মুগ্ধর। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ছেলে হয়ে জন্মে যে পাপ করে ফেলেছে, আল্লাহ কাঁদার ক্ষমতাটা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি।
অনেকক্ষণ পার হয়ে গেল। তিতিরের গোসল এখনো হয়নি? ওকে ওই অবস্থায় ওভাবে ফেলে আসায় কি কষ্ট পেয়েছে? ওর ওই অবাক দৃষ্টি তো অন্তত তাই বলছিল। ও কি এখন কাঁদছে?
মুগ্ধ বাথরুমের দরজায় নক করলো,
-“তিতির? আর কতক্ষণ? আজ এত টাইম লাগছে যে? পরে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”
তিতির চোখ মুছে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
-“আসছি।”
মুগ্ধ তিতিরের গলা শুনেই বুঝলো ও কেঁদেছে। তখন ওর আরো বেশি অসহায় লাগতে শুরু করলো। কি করবে ও? ওর হাতে কি সত্যি কিছু আছে?
তিতির গোসল শেষ করে খেয়াল করলো জামাকাপড় ভেতরে আনেনি। রিসোর্টের টাওয়ালটা গায়ে পেঁচিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘরে উকি দিল। কিন্তু মুগ্ধকে দেখতে পেল না। মুগ্ধ আবার কোথায় গেল! তখনই বারান্দায় চোখ পড়তেই মুগ্ধকে দেখতে পেল। বলল,
-“এই, শোনোনা।”
মুগ্ধ বারান্দা থেকেই বলল,
-“কি?”
-“আমি তো কাপড় আনিনি।”
-“ওহ দাড়াও, দিচ্ছি।”
-“শোনো।”
-“কি?”
-“টাওয়াল আছে ভেতরে। শুধু কাপড় দিলেই হবে।”
-“আচ্ছা।”
মুগ্ধ নতুন কেনা পোলো শার্ট আর থ্রি-কোয়ার্টার নিয়ে দরজার সামনে এসে বলল,
-“নাও।”
তিতির হাত বাড়ালো। মুগ্ধ ওর হাতে ওগুলো দিল। কিছুক্ষণ পর তিতির বেড়িয়ে আসতেই মুগ্ধ ঢুকলো। কেউ কারো দিকে তাকালো না। তিতির চুল মুছে বিছানায় শুয়ে পড়লো। হঠাৎ তিতিরের নজরে পড়লো শপিং ব্যাগ গুলোর দিকে। তিতির যখন অন্তর্বাস কিনছিল, মুগ্ধকে তখন ভাগিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে। ততক্ষণে মুগ্ধও কিছু কিনেছিল যা দেখেনি তিতির। ও অবশ্য গাড়িতে উঠে দেখতে চেয়েছিল কিন্তু মুগ্ধ বলেছিল,
-“তুমি কি কিনেছো আমি দেখতে চেয়েছি? যেহেতু চাইনি তুমিও আমারগুলো দেখতে পারবে না। সবারই পারসোনাল জিনিস থাকতে পারে।”
তিতির উঠে গিয়ে শপিং ব্যাগ গুলো খুলতেই দেখলো অরেঞ্জ,রেড আর এশ কালারের কম্বিনেশনের একটা জর্জেট শাড়ি ব্ল্যাক পাড়! সাথে ব্ল্যাক কালারের রেডিমেড স্লিভলেস ব্লাউজ, ম্যাচিং পেটিকোট, বাহ! মুগ্ধর বরাবরই সবদিকে খেয়াল থাকে আর পছন্দটাও ফার্স্টক্লাস। সব ইউনিক জিনিস ওর চোখে পড়ে। ঝটপট শাড়িটা পড়ে ফেলল তিতির। শাড়িটা পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মনটা ভাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের খারাপ লাগাটা এখন আর ওর মধ্যে নেই। কারন, মুগ্ধ বেড়িয়ে যখন ওকে এভাবে দেখবে মুগ্ধরও ভাল লাগবে।
হলোও তাই। দরজা খুলে খালিগায়ে টাওয়াল পড়া মুগ্ধ চুল ঠিক করতে করতে বেড়িয়ে এল। তিতিরকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। তিতির হাসি হাসি মুখ করে বলল,
-“সারপ্রাইজ!”
-“দিলে তো আমার সারপ্রাইজ টা নষ্ট করে।”
-“নষ্ট হয়নি। আমি সারপ্রাইজ পেয়েছি। তাইতো ইচ্ছে হলো তোমাকেও দেই।”
মুগ্ধ তিতিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-“সত্যি সারপ্রাইজড হয়েছি।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ তিতিরের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
-“তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।”
তিতিরের মাথায় শয়তানি ঘুরঘুর করছিল। খুব ইচ্ছে করছিল মুগ্ধর পড়নের টাওয়ালটা একটা টান দিয়ে খুলে ফেলতে। বেশ হতো। কিন্তু একাজ ও করতে পারবে না। ভাবতেই লজ্জা লাগছে। মুগ্ধ সরে গিয়ে ব্যাগ থেকে কাপড় বের করলো। প্যান্ট পড়তে পড়তে বলল,
-“ভাল হয়েছে শাড়ি পড়েছো। চলো সিলেট সিটিটা আজ ঘুরে ফেলি।”
-“হুম চলো।”
-“আর রিসোর্টের ভেতরেও কিন্তু অনেক কিছু আছে। এটার অনেক বড় এরিয়া।”
-“অনেক কিছু বলতে?”
-“ইকো পার্ক, সুইমিংপুল আরো কি কি যেন।”
-“আর কালকের প্ল্যান কি?”
-“কাল সকাল সকাল আমরা একবারে বেড়িয়ে পড়বো। বিছনাকান্দি ঘুরে দুপুরেই রওনা দিব। রাতের মধ্যে ঢাকা। রাত হলেই তো তোমার বাসায় খোঁজ পড়বে, তাই না?”
-“হ্যা।”
মনটা সামান্য খারাপ হলো তিতিরের। সুন্দর সময় কেন এত তারাতারি চলে যায়? আনমনে ভাবছিল ও। এমন সময় মুগ্ধ আচমকা তিতিরের চুল মুছে দিতে শুরু করলো। বলল,
-“চুলগুলো আজও মুছতে শিখলে না।”
তিতিরের চোখে পানি এসে গেল। অনেক কষ্টে কান্নাটাকে হজম করে নিল। ইশ, আজীবনের জন্য তিতির মুগ্ধর এই টুকরো টুকরো ভালবাসা গুলো হারিয়ে ফেলবে একসময়। মুগ্ধ হয়ে যাবে অন্য কারো স্বামী, তিতির হয়ে যাবে অন্য কারো স্ত্রী! তার আগেই যদি জীবনটাকে থমকে দেয়া যেত? ইশ এমন করলে কেমন হয় আজ তিতির কোনো একটা বিষ কিনে নিয়ে আসবে লুকিয়ে লুকিয়ে, তারপর সেই বিষ গোপনে রাতের খাবারের সাথে মিশিয়ে মুগ্ধকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে পড়ে থাকবে এখানে। ওদের ভালবাসার হ্যাপি এন্ডিং হবে। আইডিয়াটা কিন্তু বেশ। কিন্তু বিষ কোথায় পাওয়া যায়? ওষুধের দোকানে কি পাওয়া যায়?
-“এই তিতির? কি হলো? কি ভাবছো?”
তিতির ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এল। বলল,
-“তেমন কিছুনা। আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথা ভাবছিলাম।”
-“ওহ। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি শাড়ি পড়া শিখতে গেলে কেন?”
-“তো? প্রত্যেকবার মায়ের কাছে যেতে ভাল লাগে নাকি?”
-“না মানে, তুমি যদি না শিখতে তাহলে আমি সেই ছোটবেলার মত আবার পড়িয়ে দিতে পারতাম।”
তিতির কোমরে হাত দিয়ে এক টানে কুচিগুলো খুলে ফ্লোরে ফেলে দিল। তারপর বলল,
-“ইচ্ছে করলে যেমন কোন কাজ শেখা যায়, ইচ্ছে করলে তেমন কোন কাজ ভোলাও যায়। আমি ভুলে গেছি কিভাবে শাড়ি পড়তে হয়।”
মুগ্ধ হেসে শাড়িটা তুলে নিল। পড়াতে পড়াতে বলল,
-“তুমি ইদানীং অনেক দুষ্টু হয়েছো।”
-“তোমাকে না পেয়ে না পেয়ে।”
মুগ্ধ আর কিছু বলল না। মনোযোগ দিয়ে শাড়ির কুচি দিতে লাগলো। কুচি দেয়া শেষ করে হাটু গেড়ে বসে কুচিগুলো কোমরে গুঁজে দিয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“পৃথিবী গোল, কিছু কিছু ঘটনার রিপিটেশন তো হতেই পারে, তাই না?”
তিতির অন্যদিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা লাজুক হাসি দিল। মুগ্ধ তিতিরের নাভির ডানপাশে চুমু খেল। তিতির হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল। মুগ্ধ বলল,
-“এত হাসির কি হলো?”
-“সুড়সুড়ি লেগেছে।”
-“বাহরে! এমনই বুঝি হয়? প্রথমবার তো হাসোনি, সুড়সুড়ি তখন কোথায় ছিল?”
-“আরে তখন তো বুঝেই উঠতে পারিনি কি হচ্ছে!”
মুগ্ধ উঠে দাঁড়ালো। তিতির কাছে এসে মুগ্ধর বুকের লোমের মধ্যে নাক ঘষলো, গাল ঘষলো আর তারপর ঠোঁটও ঘষলো। মুগ্ধ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে সবটা অনুভব করছিল। তারপর তিতির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতদুটো মুগ্ধর বুকের ঠিক মাঝখানটায় মেলে রাখলো। তারপর মাথা উঁচু করে মুগ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তোমার যখন অন্য কারো সাথে বিয়ে হবে তখন এরকম খালিগায়ে তাকে বুকে নেবে না। নিতে হলে কিছু একটা পড়ে তারপর নিবে।”
-“আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবো না। করলে এতদিনে করে ফেলতাম।”
-“তবুও, করতে হতেও পারে তাই বলছি সব করতে পারো কিন্তু তাকে খালি বুকে হাতও রাখতে দেবে না। চুমুও দিতে দেবে না বুকে। এটা শুধু আমার রাজত্ব করার যায়গা।”
মুগ্ধ হাসলো। তিতির বলল,
-“হেসোনা, হাস্যকর লাগতে পারে কিন্তু আমার এরকম কিছু কথা রাখতে হবে তোমাকে।”
-“ওকে রাখবো। বাকীগুলো কি?”
-“তাকে শাড়ি পড়িয়ে দিতে পারবে না।”
-“ওকে দিবনা, তারপর?”
-“হাঁস বার-বি-কিউ করে খাওয়াবে না।”
-“ওকে, স্পেসিফিকলি হাঁস বললে তাই জিজ্ঞেস করছি তাহলে কি মুরগী বার-বি-কিউ করে খাওয়ানো যাবে?”
-“যাবে।”
-“আচ্ছা আচ্ছা, ওকে। তারপর?”
-“তার ভেজাচুল মুছে দিতে পারবে না।”
-“ওকে দিবনা, নেক্সট?”
-“তার সাথে লিপকিস করার সময় আর যেখানে ইচ্ছা সেখানে হাত রাখতে পারো কিন্তু এক হাত কোমরে আরেক হাত কানের নিচে রাখবে না।”
মুগ্ধ মুখ টিপে টিপে হেসেই চলেছে। বলল,
-“আচ্ছা, তারমানে লিপকিস করা যাবে?”
-“হ্যা, যাবে। কিন্তু হাত সাবধান।”
-“আচ্ছা, তারপর?”
-“তাকে কক্ষনো কোলে নিতে পারবে না।”
-“ওকে নিবনা, আর?”
-“কখনো ওর কপালে কিস করবে না।”
এবার একটু বেশিই হাসলো মুগ্ধ। বলল,
-“আচ্ছা করবো না। তারপর?”
-“তোমরা দুজন কখনো একসাথে গোসল করবে না।”
-“এই এই, ওয়েট ওয়েট.. এতক্ষণ তুমি সেসবই নিষেধ করেছো যা যা আমি তোমার সাথে করেছি। কিন্তু এটা কি বললে? আমি তুমি তো কখনো একসাথে গোসল করিনি। তাহলে এটা না করলে কেন?”
-“আমার ইচ্ছে!”
মুগ্ধ হেসে তিতিরের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-“ওকে, তিতিরপাখি! বিয়েই তো করবোনা। তবু যদি কোনদিন করি তো তুমি যা যা নিষেধ করলে তার সব আমি মনে রাখবো।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
বিকেলটা রিসোর্টের মধ্যের ইকো পার্ক আর শহরের মধ্যেই একটা চা-বাগানের আশেপাশে ঘুরে কাটালো ওরা। ভেতরে ঢোকার পারমিশন পেল না। তারপর সন্ধ্যা হতেই ওরা মাজারে গেল। আর তারপর মাজার থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে উঠেই মুগ্ধ জিজ্ঞেস করলো,
-“বলোতো এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা?” পাশে বসে তিতির আনমনে চুলগুলোকে আঙুল দিয়ে আচড়াচ্ছিল। মুগ্ধর প্রশ্ন শুনে বলল,
-“কোথায়?”
-“সুরমা নদীতে একটা ভাসমান রেস্টুরেন্ট আছে। স্টাইল করে বলতে গেলে বলতে হবে ওটা একটা ছোট জাহাজ। কিন্তু আসলে একটা লঞ্চ।”
তিতির হাসলো। বলল,
-“রেস্টুরেন্টে গিয়ে কি হবে?”
-“খাব।”
-“ডিনার না রিসোর্টে করবে বললে?”
-“এটা প্রি-ডিনার। সন্ধ্যার নাস্তা।”
-“পারোও তুমি।”
-“অবশ্যই পারি। এক যায়গায় এসেছো সেখানকার স্পেশাল খাবার গুলো খাবে না?”
-“তুমি খাও।”
রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে মুগ্ধ বলল,
-“তোমার কপালে একটা মাঝারী সাইজের কালো টিপ থাকলে ভাল লাগতো।”
-“ও হ্যা, তুমি তো টিপ আর কাজল পছন্দ করো। কিন্তু সাজ পছন্দ করো না এই ব্যাপারটা আমার মাথায় সেট হয়ে গেছে। তাই সাথে কিছুই রাখা হয় না।”
-“থাক, এটা নিয়ে আবার আফসোস করতে বসোনা যেন।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল,
-“এইযে তুমি শুধু স্যুপ নিলে আমি অন্যকিছু খেতে জোড় করলাম না কেন বলোতো?”
-“কেন?”
-“কারন, এখান থেকে বেড়িয়ে আমরা আরেকটা রেস্টুরেন্টে যাব। এখানে কম খেলে সেখানে ভাল করে খেতে পারবে তাই।”
তিতির হেসে বলল,
-“মানে কি? কি ঢুকেছে তোমার পেটে আজ?”
-“আমি অনেক খেতে পারি, সেটা তুমি তো জানোই। আসলে আমি যেটা খেতে বেড়িয়েছি এখানে সেটা নেই তাই আরেকটাতে যেতে হবে।”
-“সেটা কি?”
-“সাতকড়া গরুমাংস।”
-“সাতকড়া কি?”
-“অস্থির জিনিস। অনেক স্বাদ, অনেক।”
-“কিন্তু সেটা কি বলবে তো?”
-“একটা ফল, দেখতে লেবুর মত। যেটা দিয়ে গরুমাংস রান্না করা হয়। কিযে স্মেল রে ভাই। এটা সিলেটের স্পেশাল জিনিস। সিলেট ছাড়া আর কোথাও পাবে না।”
-“ওহ। তোমার বলার ধরণ দেখে খেতে ইচ্ছে করছে।”
-“অবশ্যই খাবে।”
-“খেতে পারবো কিনা কে জানে!”
-“কেন?”
-“ঠোঁট জ্বলছে। কত জায়গায় কেটেছে কে জানে!”
-“ইশ, আসলেই? কেটে গেছে?”
-“কামড়ালে কাটবে না?”
-“শুধু জ্বলছে না ব্যাথাও করছে?”
-“ব্যাথাও করছে।”
-“আহারে, সরি।”
-“সরি বলোনা। শোধ করে দিব রাতেই।”
মুগ্ধ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
-“রিয়েলি? আমি চারপায়ে খাড়া।”
-“তোমার পা দুটো।”
-“হ্যা, তোমার দুটো সহ বলেছি।”
হাসলো তিতির। মুগ্ধও সে হাসিতে তাল মেলালো।
ওখান থেকে ওরা চলে গেল নবান্ন রেস্টুরেন্টে। সাতকড়া গরুমাংস আর পরোটা অর্ডার করলো। মুগ্ধকে অবাক করে পরপর তিন প্লেট গরুমাংস নিল তিতির। সাথে চারটা পরোটাও শেষ। মুগ্ধ হেসে বলল,
-“কি বলেছিলাম না?”
তিতির খেতে খেতে বলল,
-“একটু ঝাল বেশি কিন্তু পৃথিবীতে এত মজার কিছু থাকতে পারে আমার জানা ছিল না, জাস্ট ওয়াও। স্মেলটাই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তারপর সাতকড়ার টুকরাগুলোও খেতে খুব মজা”
-“পৃথিবীতে এর চেয়ে মজার জিনিস অবশ্যই আছে। আসলে এধরণের জিনিস আমরা সচরাচর খাই না তো। তাই হঠাৎ খেলে অনেক ভাল লাগে। আর এটা ঝাল কিছু না। রান্নাটাও ঝাল হয়নি, তোমার ঠোঁট কেটে গেছে তাই ঝাল লাগছে।”
-“হুম, আচ্ছা.. এগুলো কিনতে পাওয়া যায় কোথায়?”
-“বাজারে অভাব নেই। আর রাস্তার পাশেও ঝুড়ি ভরে নিয়ে বসে থাকে দেখোনি লেবুর মত?”
-“খেয়াল করিনি। যাই হোক, যাওয়ার দিন আমি নিয়ে যাব।”
-“আচ্ছা। রান্নার সিস্টেম জানোতো?”
-“না, আলদা কোনো সিস্টেম আছে নাকি? ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে মাংসের মধ্যে দিয়ে দেব।”
-“আজ্ঞে না। শুধু খোসাটাই রান্না করতে হয়। ভেতরের অংশটা খেতে হয়না ফেলে দিতে হয়, ওটা তিতা।”
-“ও।”
-“আর মাংসটা যেভাবে ইচ্ছা রান্না করে নামানোর ২০-৩০ মিনিট আগে দিয়ে রান্না শেষ করতে হবে। শুরুতেই দিলে তিতা হয়ে যাবে। খুবই সেন্সেটিভ জিনিস।”
ওর কথা শুনে কতক্ষণ হাসলো তিতির। বলল,
-“সত্যি, তোমার সাথে ছাড়া আমি কোথাও গেলে শুধু সেখানে যাওয়া হবে আর আসা হবে। সেখানকার কিছুই জানা হবে না, পাওয়া হবে না। সব কিছুই ঝাপসা থাকবে অথচ আমি বুঝবোও না।”
-“আমিও প্রথমে কিছুই জানতাম না তিতির। আস্তে আস্তে ঘুরতে ঘুরতে জেনেছি। যেখানে যাবে সেখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন, পরিবেশ সবকিছু খেয়াল করলে আপনাআপনি সব জেনে যাবে।”
যখন ওরা রিসোর্টে ফিরলো তখন ৯ টা বাজে। রুমে ঢুকে চেঞ্জ করার জন্য কাপড় নিল তিতির। মুগ্ধ বলল,
-“পড়ে থাকোনা শাড়িটা।”
তিতির হেসে বলল,
-“আচ্ছা। এই চলোনা বারান্দায় গিয়ে বসি। বারান্দাটা অনেক সুন্দর।”
-“তুমি যাও, আমি চেঞ্জ করে আসছি।”
বারান্দায় গিয়ে তিতিরের চোখে পড়লো ফ্লোরে মুগ্ধর জামাকাপড় পড়ে আছে। ওগুলো তুলে রুমে ঢুকতেই মুগ্ধ বলল,
-“হায় হায়, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ওগুলোর কথা। দাও আমাকে দাও, ধুয়ে দেই তারাতারি, না শুকালে ঝামেলায় পড়ে যাব।”
-“না, আমি ধুয়ে দিচ্ছি।”
-“আরে আমি ধুতে পারবো তো।”
-“জানি, আমিও ধুতে পারবো। আমি থাকতে তুমি ধোবেই বা কেন?”
-“আরে! মেয়ে বলে কি? তুমি কি আমার কাপড় ধোয়ার জন্য আছো নাকি?”
-“আমার ইচ্ছে, আমি ধোব। সরো তো।”
তিতির জোড় করে কাপড়গুলো ধুয়ে দিল। মুগ্ধ খালি গায়ে সাদা রঙের একটা হাফ প্যান্ট পড়ে বিছানায় শুয়ে টিভি দেখছিল। তিতির কাপড়গুলো বারান্দায় মেলে দিয়ে ঘরে এসে মুগ্ধর কোলের মধ্যে শুয়ে পড়লো। বলল,
-“টিভিটা বন্ধ করোনা।”
মুগ্ধ টিভি বন্ধ করে বলল,
-“তুমি পাশে ছিলে না তাই দেখছিলাম।”
-“ভাল করেছো, এখন তো আমি চলে এসেছি।”
মুগ্ধ তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“তাই তো দেখছি।”
-“তুমি আবার খালি গায়ে? কিছু একটা পড়ো।”
-“আমি তো বাসায় খালিগায়েই থাকি, অভ্যাস।”
-“এসব দেখে দেখে আমার নজর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
-“সিরিয়াসলি তিতির তোমার কথাবার্তা শুনলে মনে হয় কি ছেলেদের বুকের লোম যেন অতি বিশেষ কিছু। কিন্তু আসলে কিছুই না। অতি সামান্য জিনিসকে তুমি মহিমান্বিত করেছো।”
-“আমার কাছে অতিসামান্য না।”
-“আচ্ছা বুচ্ছি কিন্তু হঠাৎ শুয়ে পড়লে যে? এখনি শোধ করবে নাকি?”
তিতির লজ্জা পেয়ে বলল,
-“জানিনা।”
মুগ্ধ বলল,
-“প্লিজ শোধ করে দাওনা।”
-“আমি পারবো না।”
-“তখন তো খুব বড় মুখ করে বলেছিলে।”
তিতির লজ্জা পাচ্ছিল। মুগ্ধ বলল,
-“এখনো ব্যাথা করছে ঠোঁট?”
-“হুম।”
-“এসো, বিষ দিয়ে বিষক্ষয় করে দিই।”
তিতির সরে গিয়ে বলল,
-“ইশ না। অনেক ব্যাথা।”
-“আচ্ছা, আলতো করে।”
এবার আর তিতির সরলো না। তারপর মুগ্ধ তিতিরের ঠোঁটে আলতো করেই চুমু খেতে লাগলো।
তার মধ্যেই তিতিরের ফোনটা বেজে উঠলো। বাবা ফোন করেছে, উঠে বসে ফোনটা ধরলো তিতির,
-“হ্যা, বাবা বলো।”
-“কী অবস্থা মা তোর? কেমন আছিস?”
তিতির হেসে বলল,
-“সকালেই তো মাত্র এলাম বাবা, ভাল আছি।”
-“ও হ্যা তাই তো। তুই কোথাও গেলে ঘর অন্ধকার হয়ে থাকে। তা কি করছিস?”
-“প্রজেক্ট ওয়ার্কটা করছিলাম বাবা, এখন একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম। একটু পর আবার করবো। যেভাবেই হোক, দুদিনের মধ্যেই কম্পলিট করতে হবে।”
-“হুম, কাল কখন আসবি?”
-“বাবা, আমি কাল নাও আসতে পারি। প্রজেক্ট ওয়ার্ক টা কম্পলিট হলেই আসব। নাহলে আসব না। পরশু আসবো।”
-“সেকী!”
-“রুপাদের বাসাতেই তো আছি বাবা, টেনশান কিসের? নাকি বিশ্বাস হচ্ছে না? আন্টির সাথে কথা বলবে?”
-“না না ছি ছি, আন্টির সাথে কেন কথা বলবো? আর টেনশান না। আসলে তোকে না দেখলে ভাল লাগে না তো। তুই লাগলে থাক কালকেও সমস্যা নেই।”
-“ওকে বাবা। ডিনার করেছো?”
-“নাহ, এখন করবো।”
-“আমিও।”
-“ঠিকাছে মা। আমি তাহলে রাখছি। তান্না ফোন করলে ধরিস না। কাল আসবি না শুনলে আবার কি না কি বলবে তোকে। আমি ওর সাথে কথা বলে নেব।”
-“আচ্ছা বাবা। তুমি যা বলবে।”
ফোন রেখে মন খারাপ করে বসে রইল তিতির। মুগ্ধ বলল,
-“কি হলো?”
-“বাবাকে কতগুলো মিথ্যে বললাম!”
-“হুম, তাই দেখলাম আর অবাক হলাম।”
তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তোমার জন্য আমি সব পারি।”
-“শুধু ফ্যামিলির অমতে আমাকে বিয়েটা করতে পারো না।”
-“এটা করলে আমার বাবা মরে যাবে। বিশ্বাস করো শুধুমাত্র বাবার জন্যই আমি এটা পারি না।”
-“আচ্ছা বাদ দাও, এসব ভেবে মন খারাপ করার কোন মানে হয়না। কিন্তু এটা বলো বাবাকে কেন বললে কাল ফিরবে না।”
-“ও হ্যা, আরেকটা দিন থাকতে ইচ্ছে করছিল খুব, তাই আরেকটা দিনের পারমিশন নিলাম।”
-“আর বললে যে আন্টি মানে রুপার আম্মুর সাথে কথা বলিয়ে দেবে। এটা বললে কোন সাহসে?”
তিতির হেসে বলল,
-“জানি বাবা কথা বলবে না তাই বলেছি। জানি এটা অন্যায়। কিন্তু বাবা যদি ছেলের কথা না শুনে একটা বার সব যাচাই করে দেখতো। জেদ না ধরে থেকে তোমার আমার বিয়েতে রাজী হতো তাহলে তো আজ আমাকে এতবড় মিথ্যেবাদী হতে হতোনা। আর আমাকে নকল মিসেস তিতির মেহবুব হতে হতোনা। আসল মিসেস তিতির মেহবুবই হতাম। তখন আজ যা করছি তা অন্যায় বা খারাপ হতো না।”
মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে টেনে নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে বলল,
-“তুমিই একমাত্র আসল মিসেস তিতির মেহবুব। সেদিনই কনফার্ম হয়েছিলে যেদিন আমি লাভ ইউ বলার পর তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা, শোনো।”
-“বলো।”
-“তালগাছে উঠবে?”
তিতির অবাক হয়ে বলল,
-“কি? তালগাছে উঠতে যাব কেন? আর আমি গাছে উঠতে পারিও না।”
-“ছোটবেলায় কখনো বাবা তোমাকে পায়ের তলায় ঠেকিয়ে উপর উঠিয়ে দোলায়নি?”
হঠাৎ মনে পড়ে গেল তিতিরের। বলল,
-“হ্যা হ্যা। বাবা এরকম করতো, ভাইয়াও করতো। পায়ের তলাটা আমার পেটের সাথে ঠেকিয়ে আমাকে উঁচু করে ফেলতো। আমি উপুর হয়ে থাকতাম। বাবা বলতো এটা তালগাছ। উফ কি যে মজার ছিল ছোটবেলাটা।”
-“সেটার কথাই বলছি। উঠবে?”
-“তুমি ওঠাবে?”
-“হ্যা।”
-“কিন্তু আমি তো বড় হয়ে গিয়েছি। বাবা তো নিতো সেই ছোট থাকতে। যখন ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়ি।”
-“আমার কাছে তুমি এখনো ছোটই, এসো তো। তোমাকে তালগাছে উঠাই।”
মুগ্ধ তিতিরকে তালগাছে উঠিয়ে হাতে হাত ধরে রাখলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো তিতিরের। ও জানে মুগ্ধর সাথে সারাটা জীবন থাকলে পার্থিব সমস্ত সুখগুলো মুগ্ধ ওর পায়ের কাছে এনে রাখতো যা পৃথিবীর আর কেউ পারবে না। তিতির খিটখিট করে হাসছে। আর মনে মনে হাজার ফোটা চোখের জল জমিয়ে ফেলছে পরে ফেলার জন্য। এখন ফেলা যাবে না। মুগ্ধ কত সখ করে ওকে তালগাছে উঠিয়েছে। কাঁদলে কষ্ট পাবে না?

To be continued..
Tagged : / /

প্রেমাতাল পর্ব – ৩৭ || মৌরি মরিয়ম

তিতির চোখ মেলে দেখলো গাড়িতে ও একা। মুগ্ধ নেই, গাড়ি একটা শপিং মলের সামনে পার্ক করা। এটা কোথায় বুঝতেও পারছে না। তিতির মোবাইল বের করে মুগ্ধকে কল করলো,
-“হ্যালো, আমার ঘুমকুমারীর ঘুম ভেঙে গেল?”
-“হুম। আপনি আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেছেন?”
-“তুমি লক করা আছো তাই একা রেখে আসলেও প্রব্লেম নেই। আমি তোমককে ডেকেছিলাম কিন্তু তুমি ওঠোনি তখন। আমি মলে ঢুকেছি, কিছু কেনাকাটা আছে।”
-“কি আবার কিনবে?”
-“আরে হুট করে এসেছি না? সাথে জামাকাপড় তো নেই, পড়বো কি? দুজনের জামাকাপড় কিনতে ঢুকেছি।”
-“শুধু তোমারটা কেন তাহলে। আমার আজ ফ্রেন্ডের বাসায় থাকার কথা ছিল না? একটা এক্সট্রা সালোয়ার-কামিজ আছে সাথে।”
-“ওহ, সেটা ভাল কথা কিন্তু বিছনাকান্দিতে কি তুমি সালোয়ার-কামিজ পড়ে পানিতে নামবে? সামলাতে পারবে তো?”
তিতির উচ্ছাসিত হয়ে বলল,
-“আমরা বিছনাকান্দি যাব?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“তো সিলেট এসেছি কেন?”
-“ওয়াও, আমি খুশি ধরে রাখতে পারছি না। বাই দ্যা ওয়ে, সিলেট এসেছি মানে? আমরা কি সিলেট চলে এসেছি?”
-“হ্যা।”
-“বাপরে! এতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি?”
-“ব্যাপার না।”
-“তুমি কোনো ব্রেক নাওনি?”
-“নাহ।”
-“কষ্ট হয়েছে অনেক?”
-“আরে না।”
মুগ্ধ ততক্ষণে কথা বলতে বলতে বাইরে চলে এসেছে। গাড়ির দরজা খুলে বলল,
-“আসুন ম্যাম।”
তিতির হেসে বেড়িয়ে এল। শপিং মলে ঢুকে কেনাকাটা করছে এমন সময় তিতির লেডিস শার্ট দেখছিল। কয়েকটা কালারের মধ্যে বেবি পিংক টা বেছে নিল তিতির। মুগ্ধ বলল,
-“এটা নিও না। ব্ল্যাক কিংবা নেভি ব্লু টা নাও।”
-“কেন এটা খারাপ লাগছে? তুমি তো বলেছিলে আমাকে লাইট কালারে ভাল লাগে।”
মুগ্ধ বলল,
-“এটা পড়ে পানিতে নামবে? নাকি এমনি পড়তে নিচ্ছো?”
-“পানিতে নামার জন্যই তো নিচ্ছি।”
-“তোমার সেন্স অফ হিউমার ভাল, কিন্তু মাঝে মাঝে সেটা কাজে লাগাও না কেন?”
-“কি করলাম আবার? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
মুগ্ধ এবার কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,
-“হালকা কালারের ড্রেস পড়ে ভিজলে সব দেখা যায়।”
তিতির লজ্জা পেয়ে পিংক টা রেখে নেভি ব্লু টা নিল। পিংক টা এমনভাবে ছুড়ে রাখলো যেন ওটাতে কোন পোকা পড়েছে।
কেনাকাটা শেষ করে ওরা লাঞ্চ করে নিল। তারপর গাড়িতে উঠতেই তিতির বলল,
-“আমরা উঠছি কোথায়? হুট করে এলাম রুম পাব তো?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“বুকিং দেয়া হয়ে গেছে।”
-“সিরিয়াসলি? কোথায়?”
-“শুকতারা ন্যাচার রিট্রিট।”
তিতির চোখদুটো বড় বড় করে বলল,
-“রিসোর্ট?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“হ্যা।”
-“ওয়াও। খুব ভাল হয়েছে, আমার হোটেলে একদম ভাল লাগে না।”
-“সেজন্যই তো রিসোর্টে থাকবো।”
কিন্তু হঠাৎই চিন্তায় পড়ে গেল তিতির। বলল,
-“কিন্তু খরচটা তো অনেক বেশি হয়ে যাবে।”
-“তাতে কি? কতদিন তো কোথাও যাই না। হোকনা একটু খরচ, ডেইলি ডেইলি তো যাচ্ছি না।”
-“কেন যাওনা?”
-“তুমি ছাড়া এখন আর কোথাও যেতে ভাল লাগে না।”
তিতির চুপ হয়ে গেল। কে জানে এটাই হয়তো মুগ্ধর সাথে শেষ ট্যুর!
রিসোর্টের রিসিপশানে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বলল,
-“স্কিউজমি, আমাদের বুকিং ছিল।”
ম্যানেজার একটা ফর্ম দিল ফিলাপ করার জন্য। এতদিন যত যায়গায় গিয়েছে এসব ফর্মালিটিজ মুগ্ধই করেছে। আজ ফর্মটা তিতিরের দিকে এগিয়ে দিল। যা সবসময় মুগ্ধ লিখে এসেছে আজ তা লিখলো তিতির।
Mr. Mehbub Chowdhury Mugdho with Mrs. Titir Mehbub.
…………………………………………….
…………………………………………….
…………………………………………….
ফর্মালিটিজ শেষ করতেই একজন কেয়ারটেকার ওদের দোতলায় নিয়ে গিয়ে রুম খুলে দিয়ে বলল,
-“স্যার, লাঞ্চ করবেন?”
-“না না আমরা লাঞ্চ করে এসেছি। ডিনার করবো এখানে।”
-“ওকে স্যার, কিছু লাগলে ইন্টারকমে ১০১ এ কল করলেই হবে।”
-“ওকে, থ্যাংকইউ।”
-“মোস্ট ওয়েলকাম স্যার।”
ছেলেটি চলে যেতেই মুগ্ধ-তিতির ঘরে ঢুকলো। তিতিরের মনটাই ভরে গেল। বিশাল একটা ঘর। লাল ইটের সিরামিকের দেয়াল। বেতের বিছানা, বেতের আলমারি, বেতের ড্রেসিং টেবিল, সাথে কাঠের ফ্রেম করা আয়না। ঘরের পুরো একটা দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে থাই গ্লাস লাগানো। ওপাশে একটা বারান্দা, বারান্দায় যাওয়ার জন্য বড় একটা দরজাও আছে, দরজাটাও গ্লাসেরই। ভেতর থেকেই দেখলো বারন্দার ওপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় দেখা যায়। পুরো গ্লাসের দেয়ালটায় লাল রঙের পর্দা লাগানো। বেড কভার, বালিশের কভার সব সাদা। বিছানায় সামনে, টয়লেটের সামনে পর্দার সাথে মিলিয়ে লাল রঙের পাপোশ বিছানো। সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগলো। তিতির দরজা খুলে বারান্দায় গেল। সেখানে গিয়ে আরেকটা সারপ্রাইজ পেল। বারান্দার একপাশে বাগানের মত ঘাস লাগানো হয়েছে, পাশে সাদা গোল সিরামিকের টবে ফুলের গাছ। অন্যপাশে একটা ডিভান রাখা। পুরো বারান্দায় রেলিং বলে কিছু নেই। তবে বাউন্ডারি আছে, সেখানেও ঘাস ও ছোট ছোট বাগানবিলাশ লাগানো হয়েছে। আর বারান্দার ওপারে উন্মুক্ত পাহাড়, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। বান্দরবান আর সিলেটের দূরে থাকা সবুজ সৌন্দর্যের একটা পার্থক্য রয়েছে। বান্দরবানের দূরের সবুজগুলো গাঢ় সবুজ। আর সিলেটের দূরের সবুজগুলো হালকা সবুজ, কিন্তু উজ্জল। তবে দুটো সৌন্দর্যই চোখ জুড়ানো, মন ভোলানো। কারো সাথে কারো তুলনা করা চলে না।
হঠাৎ মুগ্ধ তিতিরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর চুলের গন্ধ নিল। তিতির মুগ্ধর বাহুডোরে থেকেই ফিরলো মুগ্ধর দিকে। তারপর মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মুগ্ধ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-“দেখো অবস্থা। এজন্য নিয়ে এলাম নাকি?”
তিতির চোখ তুলে মুগ্ধর দিকে তাকালো। মুগ্ধ ওর চোখ মুছে দিল। তিতির বলল,
-“তুমি ফর্মটা কেন আমাকে ফিলাপ করতে দিলে?”
-“কেন, কি হয়েছে তাতে?”
-“মিস্টার এন্ড মিসেস লেখার পর আমার কেমন যেন একটা ফিলিং হলো।”
মুগ্ধ হেসে জিজ্ঞেস করলো,
-“কেমন?”
-“জানিনা, কেমনই যেন! বোঝাতে পারব না।”
-“সবসময় তো আমিই ফিলাপ করি এবং তখন আমার এই ফিলিং টাই হয়। তোমাকে এটার সাথে পরিচয় করানোর জন্যই আজ তোমাকে ফিলাপ করতে দিয়েছি।”
তিতির আবার কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“সব ঠিকঠাক থাকলে তো আজ আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফই থাকতাম।”
-“আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফই তিতির। আমাদের আত্মার বিয়ে অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে। তোমার কি মনে হয়না আমাদের সম্পর্কটা শুধু একটা প্রেম না। তার থেকেও অনেক বেশি কিছু?”
-“হয় তো।”
-“হুম, এবার কান্নাটা থামাও না বাবা। আর গোসলে যাও। আমরা বিকেলে বের হব।”
-“কোথায় যাব?”
-“কোথাও একটা যাব। কোথায় তা এখনো জানিনা।”
মুগ্ধ তিতিরের চোখটা আবার মুছে দিল। তিতির বলল,
-“তুমি আমাকে কতদিন ধরে কোলে নাও না বলোতো?”
মুগ্ধ একথা শুনে এক সেকেন্ডও দেরী করলো না। কোলে তুলে নিল তিতিরকে। তারপর ঘরে নিয়ে গিয়ে নামাতে নিল আর তিতির বলে উঠলো,
-“নামিও না, নামিও না।”
মুগ্ধ অবাক হয়ে বলল,
-“কেন?”
-“গোসল করবো না? বাথারুমে দিয়ে আসো।”
-“ওহ, ওকে।”
মুগ্ধ তিতিরকে বাথারুমে রেখে ফেরার সময়ই তিতির শাওয়ার ছেড়ে ওকে ভিজিয়ে দিল। মুগ্ধ লাফিয়ে উঠে বলল,
-“এটা কি করলে বলোতো?”
তিতির হো হো করে হেসে দিল। মুগ্ধও ওকে টেনে শাওয়ারের নিচে এনে ভিজিয়ে দিল। কোথায় তিতির সরে যাওয়ার চেষ্টা করবে তা না করে মুগ্ধর টাই টা আলগা করে শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে দিল। তারপর ওর গলার পিছনে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো ওর চোখের দিকে। মুগ্ধ যখন বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারলো তখন তিতিরের ওড়নাটা টেনে ফেলে দিল। তারপর তিতিরের কোমর জড়িয়ে উঁচু করে শূন্যে তুলে নিজের সমান করে বলল,
-“উইল ইউ কিস মি?”
তিতির চোখ নামিয়ে হাসলো। শাওয়ারের পানি তিতিরের চুল বেয়ে বেয়ে এসে পড়ছে মুগ্ধর ঠোঁটে, চোখে, বুকে। মুগ্ধ বলল,
-“এমনভাবে করো তিতির যার ফিল টা আমার মধ্যে মৃত্যু পর্যন্ত থাকবে?”
তিতির মুগ্ধর দুই গালে হাত রেখে আরো একটু কাছে চলে গেল। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট বসালো। শাওয়ারটা ছাড়াই রইলো। বেশ অনেকক্ষণ পর মুগ্ধ আচমকা তিতিরকে নামিয়ে দেয়ালে ঠেকিয়ে পাগলের মত চুমু খেতে লাগলো। তিতিরের ঠোঁটের কত যায়গায় যে কামড়ে দাগ বসিয়ে দিল তার কোন হিসেব নেই। অবশ্য তিতির যে মুগ্ধর কত চুল টেনে ছিঁড়লো তারও কোনো ইয়ত্তা নেই। মুগ্ধও একসময় তিতিরের ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে এল। হাত চলে গেল কোমরে। পাগলামি চলতেই থাকলো। তিতিরের চোখ দুটো বন্ধ, ঘনঘন নিঃস্বাস ফেলছে। তখনই মুগ্ধ একটা হাত কোমর থেকে সরিয়ে তিতিরের পিঠের কাছে নিয়ে গেল। গলায় চুমু খেতে খেতেই তিতিরের পিঠ বরাবর কামিজের চেইনটা খুলে ফেললো। ভেজা পিঠে ভেজা হাত রাখতেই মুগ্ধর খেয়াল হলো তিতির আজ কিছুতেই না করছে না মুগ্ধকে কিন্তু ওর ফ্যামিলি তো সত্যিই কোনদিন মানবে না। একদিন হয়তো তিতিরের বিয়েও হবে অন্যকারো সাথে সেদিন যদি তিতিরের আফসোস হয় আজকের দিনটার জন্য? চেইনটা আবার লাগিয়ে দিল। তিতির অবাক হয়ে চোখ খুললো। মুগ্ধ বলল,
-“তারাতারি গোসল করে বেড়িয়ে এসো। এর বেশি ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
একথা বলে তিতিরের কপালে একটা চুমু দিয়ে ঘরে চলে গেল মুগ্ধ।
মুগ্ধ বেড়িয়ে যাওয়ার পর তিতির যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই বসে পড়লো। পাগলের মত কাঁদতে লাগলো। কান্নাটা কোনভাবেই থামাতে পারছে না। কিন্তু কেন কাঁদছে তা ও নিজেও ধরতে পারছে না। এত আদর পেয়ে সুখে কাঁদছে নাকি যা পেলনা তার জন্য কাঁদছে!
To be continued…
Tagged : / /

প্রেমাতাল পর্ব – ৩৬ || মৌরি মরিয়ম

সবসময় এরকমই হয় নিজ থেকে তিতির কখনোই এগিয়ে আসে না। কিন্তু মুগ্ধ যখন একবার শুরু করে দেয় তিতির আর ছাড়তেই চায়না। নেশা হয়ে যায় ওর। বুদ্ধদেব গুহ লিখেছেন, ‘মধুতে যে মরে তাকে বিষ দিয়ে মারতে নেই।’ কোন বইতে যেন লিখেছেন? ‘সবিনয় নিবেদন’ নাকি ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ তে? এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তা সে যে বইতেই লিখুক না কেন কথা সত্য। তাই মুগ্ধ ওকে মধু দিয়েই মারলো। অনেকদিন ধরে এরকম একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল মুগ্ধ! কিন্তু তিতির তো দেখাই করতে চাইতো না। যাই হোক, এবার কিছু তো একটা হবে। ফলাফল নিশ্চিত সুপ্রসন্ন!
তারপর তিতিরকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে এল মুগ্ধ। পুরো রাস্তায় কেউ কোন কথা বলেনি। তিতির আর একটি বারের জন্যও তাকালো না মুগ্ধর দিকে। গলির মাথায় যেতেই তিতির বলল,
-“আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও। বাসার সামনে তোমার সাথে যেতে চাচ্ছি না।”
-“হুম, ঠিকাছে তুমি বোসো। আমি তোমার জন্য একটা রিক্সা নিয়ে আসি।”
-“রিক্সা লাগবে না, এটুকু তো হেটেই চলে যেতে পারব।”
-“তোমার শরীরটা এখন উইক। পারবে না।”
-“বেশী বাড়াবাড়ি করো না। এটুকু কোন রিক্সা যায় নাকি? দুই কদমে চলে যেতে পারবো।”
একথা বলেই তিতির গাড়ি থেকে নামছিল। মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে থামালো। বলল,
-“সবকিছু নিয়ে আরেকটু ভেবো প্লিজ। আরেকটা বার ট্রাই করো বাবা-মাকে রাজী করাতে? তোমাকে ছাড়া থাকার অনেক চেষ্টা করেছি তিতির, পারছি না।”
তিতির একথার কোন উত্তর না দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
-“আমি আসছি।”
তিতির যতক্ষণ ধরে হেটে হেটে গেল ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো মুগ্ধ। তিতির একবারও পেছন ফিরে তাকালো না।
বাড়ির গেটের ভেতর ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়লো তিতির। কয়েক সেকেন্ড পর ভেতর থেকেই উঁকি মারলো। মুগ্ধ ততক্ষণে ঘুরে গেছে। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। তারপর চলে গেল। যতক্ষণ গাড়িটা দেখা যাচ্ছিল ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো তিতির। মুগ্ধ চোখের সীমানার বাইরে যেতেই উপরে চলে গেল। দু’বার বেল দেয়ার পরও কেউই দরজা খুলছে না। তিতিরের কষ্ট হচ্ছিল দূর্বল শরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে। এরপর তিতির কলিং বেলের সুইচটা অনেকক্ষণ চেপে ধরে রইলো। তখন চম্পা এসে দরজা খুলে দিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেল ড্রইং রুমে। তিতির দরজা আটকে ড্রইং রুমের দরজায় দাঁড়াতেই দেখতে পেল মা ডিভানে শুয়ে আছে, বাবা আর ভাবী সোফায় বসে। আর চম্পা ফ্লোরে বসে আছে। যে যেখানে যেভাবেই থাক না কেন সবার মনোযোগ টিভির দিকে। টিভিতে একটা ইন্ডিয়ান বাংলা সিরিয়াল চলছে। যেখানে এই মুহূর্তে একটা ছেলেকে কোন এক পার্টিতে তার শ্বশুর সবার সামনে অপমান করছে। একটা মেয়ে কাঁদছে, মেয়েটা সম্ভাবত ছেলেটার স্ত্রী। মা উত্তেজনায় শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
-“দেখসো দেখসো কি ভাল ছেলেটাকে কিভাবে অপমান করতেছে। অমানুষ একটা, আরে ব্যাটা খালি টাকাই দেখলি! নিজের মেয়েটার সুখের দিকে তাকাইলি না!”
তিতিরের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। হায়রে জীবন! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে গিয়ে দরজা লাগালো।
আয়না ধরে নিজের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে তিতির। মাত্র কিছুক্ষণ আগে মুগ্ধ ছিল এখানে। নিজেই নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো। মুগ্ধকেই অনুভব করতে পারছে। ইশ কি সুখ দিল মুগ্ধ। আচ্ছা, মুগ্ধর যখন অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়ে যাবে তখনও কি মুগ্ধ এভাবেই সুখ দেবে ওর বউকে? হয়তো দেবে না, কিন্তু সত্যি যদি দেয়! তাহলে সেটা কিভাবে সহ্য করবে তিতির? ধুর, তিতির তো জানবেই না তো সহ্য করার ব্যাপারটা আসছে কোত্থেকে? কিন্তু এসব তো শুধু ওর অধিকার, অন্য কাউকে পেতে দেবে না ও। মুগ্ধর শেষ কথাটা কানে বাজছিল। ‘আরেকবার চেষ্টা করো’। কিন্তু কিভাবে চেষ্টা করবে ও? কম চেষ্টা তো করেনি।
রাতে খাওয়ার টেবিলে বাবা বলল,
-“তিতির মা..”
তিতির বাবার উল্টোদিকে ঠিক মুখোমুখি বসা ছিল। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“জ্বী বাবা, বলো?”
-“তোর চাচ্চু তোর জন্য যে প্রপোজাল টা এনেছিল সেটা কিন্তু এসলেই ভাল। ছেলেটা তোর ছবি দেখে তোকে খুবই পছন্দ করেছে। এখনো বিয়ে করেনি। একবার কথা বলে দেখ, ভাল লাগতেও তো পারে। ছেলেটা কিন্তু অসাধারণ, লাখে একটা যাকে বলে।”
তিতির মুখের ভাতটুকু শেষ করে স্পষ্ট স্বরে বলল,
-“বাবা, আমি বিয়ে করলে মুগ্ধকেই করবো এবং তোমাদের সম্মতিতেই। অন্য কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাকে কেটে ফেললেও আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।”
মা টেবিলের উল্টোদিকে বসে ছিল। উঠে এসে তিতিরের গালে একটা চড় মারলো। এত জোরে মারলো যে তিতির টাল সামলাতে না পেরে পাশে বসে থাকা ভাবির গায়ের উপর গিয়ে পড়লো। মা বলল,
-“কোন বিয়েসাদির দরকার নেই তোর। এমনি থাকবি আজীবন। মাস্টার্স কম্পলিট হলেই চাকরী খুঁজবি। বিয়ে দেব না তোকে।”
মা একথা শেষ করেই আবার নিজের চেয়ারে বসে খাওয়া শুরু করলো। তিতির উঠে সোজা হয়ে বসতেই তান্না বলল,
-“বাবা, আজীবন লক্ষী মেয়ে লক্ষী মেয়ে বলেছ না? দেখো এখন তোমার লক্ষী মেয়ের অধঃপতনের নমুনা।”
তিতির উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। দরজা লাগিয়ে ফ্লোরে বসে কাঁদতে লাগলো। কেউ পেছন থেকে ডাকলো না আজ। অথচ আগে ও একবেলা না খেয়ে ঘুমাতে পারতো না। ঘুমিয়ে পড়লেও মা নাহয় ভাইয়া প্লেটে করে ভাত এনে ওর মুখে তুলে খাইয়ে দিত। ও ঘুমের ঘোরেই খেত। ওর ফ্যামিলির কেউ কখনো ওর কোন কিছুতে বাধা দেয়নি, কখনো খোঁচা দিয়ে কথা বলেনি গায়ে হাত তোলা তো বহুদূরের কথা। মাত্র কিছুদিনের ব্যাবধানে সবকিছু কেমন বদলে গেল।
তারপর আরো কয়েক মাস পার হয়ে গেল। এর মধ্যে মুগ্ধ অনেকদিনই ফোন করেছে, তিতির কখনো ধরেছে, কখনো ধরেনি। ধরে কি বলবে সেই তো এক কথা নিয়ে তর্কাতর্কি হবে। কি লাভ এসব করে! কিন্তু একদিন রাতে ইন্টারনেট অন করতেই হোয়াটস এ্যাপে মেসেজ এল। মুগ্ধর নাম দেখেই বুকটা কেঁপে উঠলো তিতিরের। মুগ্ধ একটা অডিও পাঠিয়েছে। তিতিরের মন বলে, ‘তারাতারি প্লে কর তিতির’। আর ওর ব্রেইন বলে, ‘খবরদার তিতির, ভুলেও প্লে করিস না। মরবি মরবি।’ শেষপর্যন্ত মনেরই জয় হলো। তিতির অডিওটা প্লে করতেই মুগ্ধর গিটারের টুংটাং শুরু হয়ে গেল। তারপর গান….
“যে কটা দিন তুমি ছিলে পাশে,
কেটেছিল নৌকার পালে চোখ রেখে।
আমার চোখে ঠোঁটে গালে
তুমি লেগে আছো..
যেটুকু রোদ ছিল লুকোনো মেঘ
দিয়ে বুনি তোমার শালে ভালবাসা,
আমার আঙুলে হাতে কাধে
তুমি লেগে আছো..
তোমার নখের ডগায় তীব্র প্রেমের মানে,
আমিও গল্প সাজাই তোমার কানে কানে,
তাকিয়ে থাকি হাজার পরদা ওড়া বিকেল,
শহর দুমড়ে মুচড়ে থাকুক অন্য দিকে।
ট্রাফিকের এই ক্র্যাকার ফোনই..
আমাদের স্বপ্ন চুষে খায়।
যেভাবে জলদি হাত মেখেছে ভাত
নতুন আলুর খোসার এই ভালবাসা,
আমার দেয়ালঘড়ি কাঁটায়
তুমি লেগে আছো..
যেমন জড়িয়ে ছিলে ঘুম ঘুম বরফ পাশে,
আমিও খুঁজি তোমায় আমার আশেপাশে,
আবার সন্ধ্যেবেলা ফিরে যাওয়া জাহাজ পাশে,
বুকে পাথর রাখা আর মুখে রাখা হাসি,
যে যার নিজের দেশে
আমরা স্রোত কুড়োতে যাই।
যেভাবে জলদি হাত মেখেছে ভাত
নতুন আলুর খোসার এই ভালবাসা
আমার দেয়ালঘড়ি কাঁটায় তুমি লেগে আছো।
যে কটা দিন তুমি ছিলে পাশে
কেটেছিল নৌকার পালে চোখ রেখে
আমার চোখে ঠোঁটে গালে
তুমি লেগে আছো।”
গানটা শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না তিতির। কান্নায় ভেঙে পড়লো তিতির। গানটার প্রত্যেকটা শব্দ যেন ওদের জন্যই লেখা হয়েছে। ও আগেও বহুবার শুনেছে এই গানটা, তখন ওর এরকম ফিলিং হয়নি। মুগ্ধও যেন একটু বেশিই আবেগ দিয়ে গেয়েছে। কেন মুগ্ধ এমন করছে! মুগ্ধ এমন করলে ও বাঁচবে কি করে? মুগ্ধ কি একটুও বোঝে না? মুগ্ধকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কিভাবে দেখবে! একটা ছবিও তো নেই। মুগ্ধর ছবিওয়ালা ফোন, মেমরি কার্ড সবই তো কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেছিল ভাইয়া। মুগ্ধ তো ইদানীং ফেসবুকও ইউজ করে না। শুধু হোয়াটস এ্যাপের এই ছবিটা দেখে তো মন ভরছে না তিতিরের। কোনভাবে রাতটা পার করলো। তারপর সকাল সকাল উঠেই ৮ টার মধ্যে রেডি হয়ে বের হয়ে গেল তিতির। সিএনজি নিয়ে ৯:১৫ এর মধ্যেই তিতির পৌঁছে গেল মুগ্ধর অফিসের সামনে। না মুগ্ধর সামনে যাবে না, শুধু দূর থেকে একবার দেখেই চলে যাবে। মুগ্ধর অফিস ১০ টায়। কখন আসবে কে জানে। মাত্র সকাল হলো এখনি রোদ খা খা করছে। ওড়নাটা মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়ে নিল। মুগ্ধর অফিসের ঠিক অপজিটে একটা বিউটি স্যালুন। তার সামনে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ালো তিতির। মুগ্ধ যেদিক দিয়েই আসুক না কেন তিতির ওকে দেখতে পাবে। প্রায় আধাঘন্টা অপেক্ষা করার পর পৌনে ১০ টার দিকে দেখলো মুগ্ধর গাড়িটা এসে অফিসের সামনে থামলো। গাছের আড়াল থেকেই লুকিয়ে দেখছিল তিতির। রাস্তার এপাশ-ওপাশ হলেও দুরত্ব অনেক। তবু তিতিরের দেখতে প্রব্লেম হচ্ছিল না। মুগ্ধ গাড়ি নিয়ে বেজমেন্টে চলে গেল। হায় খোদা! যদি বেজমেন্ট থেকেই লিফটে উঠে যায় তাহলে তো ও দেখতেই পাবে না। না মুগ্ধ বেজমেন্ট থেকে ফিরে এল। সিকিউরিটির সাথে কথা বলছে। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, টাই, সানগ্লাস সব মিলিয়ে কি যে দারুন লাগছে মুগ্ধকে! শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করছে। মুগ্ধ সিকিউরিটির সাথে কথা বলা শেষ করে হাসছিল। ইশ কি মারাত্মক সে হাসি! কতদিন পর দেখছে তিতির। অবশেষে মুগ্ধ ভেতরে চলে গেল। এক পা ভেতরে দিয়েই আবার ফিরে এলো। আশেপাশে তাকালো, কি খুঁজছে ও? পকেট থেকে ফোন বের করলো। তারপর পরই তিতিরের ফোনে কল এলো। মুগ্ধ ফোন করেছে! ভাগ্যিস ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। কিন্তু মুগ্ধ কি কিছু বুঝতে পারলো নাকি এমনিতেই ফোন করেছে? কি করবে ফোন কি ধরবে নাকি ধরবে না? ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেল। মুগ্ধ বিরক্ত হয়ে আবার কল দিল। তিতির কি করবে কি করবে করেও কলটা রিসিভ করেই ফেলল।
-“হ্যালো।”
-“হ্যা, হ্যালো তিতির.. তুমি কোথায়?”
-“এইতো ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। এত সকালে তুমি?”
-“আসলেই ক্যাম্পাসে যাচ্ছো?”
-“হ্যা, ক্লাস আছে।”
এমন সময় মুগ্ধর সামনে দিয়ে একটা গাড়ি গেল। যার ভেতর গান বাজছে,
“Nothing gonna change my love for u…”
গানটা মুগ্ধ একই সাথে ফোনের মধ্যেও শুনতে পেল। ব্যাস মুগ্ধ এখন সিওর তিতির আশেপাশেই আছে। মুগ্ধ আশেপাশে হাটছে আর খুঁজছে। বলল,
-“তিতির, সিরিয়াসলি বলো.. তুমি কোথায়? তুমি কি বনানী? যদি এসে থাকো তো মিট মি প্লিজ। আমি তোমাকে দেখতে চাই।”
-“না, আমি বনানী কেন আসতে যাব? আমি ধানমন্ডিতে।”
এমন সময় মুগ্ধ দেখে ফেলল তিতিরকে। এক দৌড় দিল রাস্তা ক্রস করার জন্য। অর্ধেকটা আসতেই একটা গাড়ি এসে পড়লো, তিতির আঁৎকে উঠলো। মুগ্ধ থেমে গেল। গাড়িটা চলে যেতেই মুগ্ধ আবার দৌড় দিল। এক দৌড়ে তিতিরের সামনে। তিতির কোথায় যাবে বুঝে উঠতে পারলো না। এমনভাবে ধরা খাবে ভাবেনি। মুগ্ধ বলল,
-“পাবলিক প্লেস না হলে এমন একটা চড় মারতাম এখন তোমাকে যে জীবনে ভুলতে পারতে না। ফাজিল মেয়ে, যেমন ভাই তেমনি তার বোন।”
তিতিরের কান্না পেল, কিন্তু কাঁদলো না। একটুও রাগ করলো না। তিতির জানে এটা মুগ্ধর ভালবাসা প্রকাশেরই একটা ধরণ।
মুগ্ধ আর অফিসে গেল না। ফোন করে ছুটি নিয়ে নিল। তিতিরকে নিয়ে হাইওয়েতে চলে গেল। একসময় মুগ্ধ বলল,
-“এমন আর কখনোই করোনা তিতির। জানো তোমাকে একটা বার দেখার জন্য আমার মনটা কেমন করে? আর তুমি কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখে চলে যাও। এমন করে কি লাভ বলো?”
তিতির একথার উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলো,
-“একটা কথা রাখবে?”
-“কি?”
-“আগে এটা জিজ্ঞেস করলে বলতে ‘বলো’ আর এখন বলছ ‘কি?’ এখন আর আগের মত ভরসা নেই তোমার।”
-“আরে না না পাগলী! আমি তো অন্য কথা বলছিলাম হঠাৎ তুমি অন্য কথা বলায় জিজ্ঞেস করে ফেলেছি। বলো কি কথা রাখতে হবে।”
-“আমি প্রায় ১ বছর ধরে বাসায় বন্দী। কেউ বেধে রাখছে না, কিন্তু নিজেই বের হইনা। প্রায় প্রতিদিনই কথা শুনতে হচ্ছে বাসায়। আর পারছি না। আমাকে একটু কোথাও নিতে যাবে?”
-“হ্যা বলো কোথায় যেতে চাও।”
-“ঢাকার বাইরে, একদিনের জন্য জাস্ট। একটু রিফ্রেশড হতে চাই।”
মুগ্ধ অবাক হয়ে বলল,
-“মানে? ঢাকার বাইরে যাবে? তোমার ফ্যামিলি জানলে…”
আর বলতে দিল না তিতির। মুখ চেপে ধরলো। তারপর বলল,
-“একটা দিনের জন্য আমি সবকিছু থেকে দূরে চলে যেতে চাই। যেখানে ফ্যামিলি থাকবে না, প্রব্লেম থাকবে না, দুশ্চিন্তা থাকবে না, ভয় থাকবে না, শুধু তুমি আর আমি থাকবো। নিয়ে যাবে না?”
-“হুম নিয়ে যাব। কবে যাবে বলো?”
-“এক্ষুনি।”
-“মানে? এখন যাবে? বাসায় বলে এসেছো?”
-“নাহ, আজ আমার গ্রুপ স্টাডির জন্য ফ্রেন্ডের বাসায় থাকার কথা ছিল। সেই হিসেবেই আমি বলে বেড়িয়েছিলাম। গত পরশু ও আমার বাসায় ছিল। প্রব্লেম নেই। আর আমার আসলে এই মুহূর্তেই মনে হলো কোথাও গেলে ভাল লাগবে। সুযোগও আছে কিন্তু তুমি ছুটি কি পাবে?”
-“আজ তো ছুটি নিয়েই নিয়েছি।”
-“কিন্তু আজ তো থাকবো। কাল আসবো। কালকের ছুটি নিতে হবে না?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“মাথাটা গ্যাছে না? কাল শুক্রবার।”
-“ওহ, আমার খেয়ালই ছিল না।”
-“ওকে, কোথায় যাবে বলো।”
-“তুমি যেখানে নিয়ে যাবে।”
-“কক্সবাজার?”
-“ধুর, ওটাতো আরেক ঢাকা। খালি বিল্ডিং আর বিল্ডিং।”
-“তাহলে?”
-“এনি আদার অপশন?”
-“পাহাড়ে তো কতই গিয়েছি দুজনে। চলো এবার সিলেটে যাই। ওখানে আমাদের একসাথে যাওয়া হয়নি। পাহাড়, নদী, ঝড়না সবই আছে।”
-“আচ্ছা।”
-“কিন্তু আমি তো উলটো এসে পড়েছি। এমন সৌভাগ্য হবে জানতামও তো না।”
-“এখন ঘুরে যাও।”
মুগ্ধ গাড়ি ঘোরালো। তিতির বলল,
-“আমি যদি ঘুমাই তুমি কি রাগ করবে?”
-“রাগ কেন করবো?”
-“এত লম্বা জার্নি, আমি ঘুমাবো আর তুমি এতটা রাস্তা একা একা বোর হয়ে ড্রাইভ করবে।”
-“আরে নাহ পাগল, তুমি পাশে থাকলে কিছুতেই আমি বোর হইনা।”
-“তবু, আচ্ছা চলো বাসে যাই। তাহলে তোমাকে কষ্ট করে ড্রাইভ করতে হবে না।”
-“না বাসে গেলে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে, গাড়িতে গেলে দুপুরের মধ্যে পৌঁছতে পারবো। আর তুমি তো জানো ড্রাইভ করতে আমার অনেক ভাল লাগে।”
-“আচ্ছা। বাসায় জানাবে না?”
-“পরে। যখন ব্রেক নেব তখন জানিয়ে দেব।”
-“আচ্ছা।”
এরপর তিতির মুগ্ধর দিকে ফিরে সিটে হেলান দিয়ে মুগ্ধর একটা হাত টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“এক হাতে চালাতে পারবে?”
-“হুম। তো কয়হাত লাগবে?”
-“তাহলে এই হাতটা আমার কাছেই থাকুক? আমি একটু ঘুমাই। জানো অনেক রাত ধরে ঘুমাতে পারি না আমি। এখন তোমার স্মেল নিয়ে নিয়ে ঘুমাবো, ঘুমাই?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“ঘুমাও।”
তিতির শুনতে পেল না মুগ্ধর শেষ কথাটা। কারন ও ততক্ষণে ঘুমে তলিয়ে গেছে। মুগ্ধর হাত-পা কাঁপছে। আজ কতদিন পর তিতির স্বাভাবিক ব্যাবহার করছে ওর সাথে। ঘুরতে যেতে চেয়েছে! তাও আবার ঢাকার বাইরে! ইভেন যাচ্ছেও! কি যে ভাল লাগছে মুগ্ধর। মুগ্ধ জানে এ ভাললাগা ক্ষণিকের তবু যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুতেই সুখ।
To be continued…
Tagged : / /

প্রেমাতাল পর্ব – ৩৫ || মৌরি মরিয়ম

প্রত্যেকটা
মানুষই সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট স্টক নিয়ে পৃথিবীতে আসে। সেই স্টক শেষ হয়ে গেলে
যেমন আর পাওয়া যাবে না তেমনি শেষ না হলেও মৃত্যুর আগে যেভাবেই হোক শেষ হতে হবে।
তিতিরের সুখের স্টক শেষ বোধহয়। আর কষ্টের স্টকে তো হাতই পড়েনি এতদিন। ছোটবেলা থেকে
কেঁদেছে অনেকবারই তবে সেটা শুধুই সুখে
,আবেগে। আজ থেকে যে
কষ্টের কান্না শুরু
, বুঝতে
অসুবিধা হলো না তিতিরের। এটাও বুঝতে পারছে মুগ্ধকে ও কখনোই পাবে না। তবু মৃত্যুর
আগ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে।

মাঝরাতে
আবার ফোন করলো মুগ্ধ। তিতির বলল
,
-“
ঘুমাওনি
কেন
? সকালে
অফিস নেই
?”
-“
কাল
শনিবার।”

-“

হ্যা। খেয়াল ছিল না।”

-“
তোমাকে
বাসা থেকে এখনো কিছুই বলেনি
?”
-“
বলেছে।”
-“
কি
বলেছে
?”
কে
কি বলেছে সবটা মুগ্ধকে খুলে বলল তিতির। সব শুনে মুগ্ধ বলল
,
-“
সো
নাও ইউ হ্যাভ জাস্ট
2 অপশনস
টু পিক ওয়ান।”

তিতির
চুপ করে রইল। মুগ্ধ বলল
,
-“
তো
কি ডিসিশান নিলে
?”
তিতির
চুপ
, মুগ্ধও
কিছু বলল না.. সময় দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিতির বলল
,
-“
তোমাকে
বিয়ে করলে আমার ফ্যামিলি ছাড়তে হবে। সেটা তো পারব না আমি।”

-“
জানতাম
আমি।”

-“
আমি
তোমাকেও অনেক ভালবাসি কিন্তু বাবা-মা ছোটবেলা থেকে কত কষ্ট করেছে আমার জন্য তাদের
আমি কষ্ট দিতে পারব না।”

-“
হুম।
কিন্তু তিতির তুমি যদি চলে আসো
, আমরা বিয়ে করে ফেলি
তারপর এক সময় তোমার ফ্যামিলি ঠিকই মেনে নেবে। এখন কষ্ট পেলেও তখন তো সব ঠিক হয়ে
যাবে তাইনা
?”
-“
যারা
পালিয়ে বিয়ে করে তাদের সবারই ফ্যামিলি এক সময় না এক সময় মেনে নেয়। তাই আমরা ভাবি
সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আসলে কি ঠিক হয়
? কতটুকু ঠিক হয় বলো তো? বাবা-মায়ের মনে যে
ক্ষতর সৃষ্টি হয় সেটা কি কখনো মিলিয়ে যায়
? যায়না, হয়তো সন্তানের মুখ চেয়ে
মেনে নেয় একসময়। কিন্তু ক্ষতটা ভেতরে রয়েই যায়।”

মুগ্ধ
ভাবলো
, বাহ
তিতির বড় হয়ে গেছে! এই চিন্তাটা মুগ্ধর মাথায় আসা উচিৎ ছিল
, কিন্তু আসেনি। আসলো
তিতিরের মাথায়। তিতির ওকে চুপ থাকতে দেখে বলল
,
-“
কিছু
বলো
?”
-“
আমার
আর কিছু বলার নেই। যা ভাল মনে হয় করো।”

এভাবেই
চলতে থাকলো
, তখন
প্রতিদিন ওদের কথা হত। কেমন আছো কি করোর পর ওদের কথা ফুরিয়ে যেত। তারপর শুধু শুধু
কতক্ষণ ফোন কানের কাছে ধরে রেখে তারপর রেখে দিত। মুগ্ধ কোনো ফাজালামো করতে পারতো
না। তিতিরও তেমন কথা খুঁজে পেত না। ওরা একসাথে থাকলেও ওদের জীবনে কোন সুখ ছিল না।
এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর কথায় কথায় হুট করে একদিন মুগ্ধ রেগে গিয়ে বলল
,
-“
যেইনা
ফ্যামিলি তার জন্য আবার জান দিয়ে দিচ্ছে। আমার জীবনে আমি এত ফালতু ফ্যামিলি
দেখিনি।”

তিতির
অবাক হয়ে বলল
,
-“
কি
বললে তুমি
?”
-“
যা
বলেছি একদম ঠিক বলেছি। তোমার ফ্যামিলির কাছে নিজেদের ইগোর মূল্য সবচেয়ে বেশি।
তোমার সুখ কিচ্ছু না।”

তিতির
কিছু না বলে ফোন কেটে দিল। হঠাৎই পায়ের তলা থেকে একদল কীট যেন ঢুকে গেল পায়ের
ভেতর। পা থেকে সমস্ত শিরা
,উপশিরা
বেয়ে বেয়ে রকেটের গতিতে বুকের মধ্যে উঠে এসে একটা মোচড় দিয়ে আবার বেয়ে বেয়ে উঠে
গেল মাথায়। তারপর আবার একটা মোচড় দিয়ে পানির রূপ ধরে বেড়িয়ে এল চোখ দিয়ে! মুগ্ধ
এভাবে কথা বলল ওর সাথে
? তিতির
জানে ওকে ছাড়া থাকতে মুগ্ধর কষ্ট হয়। ওর কি কষ্ট হয়না
? এতবড় পৃথিবীতে একমাত্র
মুগ্ধই তো ছিল ওকে বোঝার মানুষ। এখন সেও বুঝতে পারছে না!

মুগ্ধ
সাথে সাথেই আবার কল দিল। কয়েকবার ধরলো না তিতির। কিন্তু মুগ্ধ একের পর এক কল করেই
যাচ্ছে। অবশেষে না ধরে থাকতে পারলো না। তিতির ভেবেছিল মুগ্ধ সরি বলার জন্য ফোন
করছে। কান্নাটা কোনভাবে থামিয়ে
, চোখ মুছে ফোনটা ধরলো।
মুগ্ধকে কিছুতেই বুঝতে দেয়া যাবে না যে ও কাঁদছিল। কিন্তু ফোন ধরতেই মুগ্ধ ঝাড়ি
দিয়ে বলল
,
-“
কথা
বলছি তার মধ্যে না বলে ফোন কাটলে কেন
?”
-“
এমনি।”
-“
এমনি
মানেটা কি
? ফ্যামিলি
তোমার একলারই আছে
? আর
কারো নেই
?”
-“
সবারই
ফ্যামিলি আছে আর সবার ফ্যামিলির প্রতিই তাদের দূর্বলতা আছে। তাই আমার ফ্যামিলি
নিয়ে আর আজেবাজে কথা বলোনা।”

-“
কেন
বলবো না
? তোমার
তোমার ভাই ইচ্ছেমত বাবা-মার ব্রেইন ওয়াশ করবে আর তারা কিছু যাচাই না করেই ওয়াশড
হবে। তোমার ভাই তাদের ছেলে আর তুমি কি কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে যে তোমার দিকটা দেখবে না
?”
-“
তোমার
সাথে কথা বলার আর কোন ইচ্ছে আমার নেই।”

-“
তোমার
সাথে কথা বলার জন্য লাগে আমি বসে আছি
? ফোন রাখো!”
শেষের
ফোন
রাখো
টা
মুগ্ধ প্রচন্ডভাবে ধমকে বলল। তিতির বলল
,
-“
তুমি
রাখো।”

-“
আর
একটা কথা বললে তোমার ভাইরে আমি খুন করবো। এক্ষুনি ফোন রাখো।”

-“
আমি
ফোন দিয়েছি মনে হয়
? তুমি
ফোন দিয়েছো
, তুমিই
ফোন রাখবে।”

-“
ধুর
বা*।”

একথা
বলেই ফোন রেখে দিল মুগ্ধ। আবার কান্নায় ভেসে গেল তিতির। আচ্ছা ঠিকাছে এই ব্যাবহার
করলো তো মুগ্ধ
? মনে
থাকবে।

আশ্চর্যজনকভাবে
তিন চারদিন চলে গেল অথচ মুগ্ধ একবারও ফোন করলো না। থাকতে না পেরে তিতিরই কল করলো।
ওই নাহয় প্রথমে সরি বলবে। কিন্তু কল ঢুকছে না। তিতির অবাক হলো। অনেকবার ট্রাই
করলো। কিন্তু কল ঢুকছেই না! ভাবীর রুমে গিয়ে ভাবীর ফোন থেকে কল করতেই কল ঢুকলো।
এবং মুগ্ধ সেই কল রিসিভও করলো। কথা না বলে কেটে দিল তিতির। ভাবীকে বলল
,
-“
যদি
কল ব্যাক করে তো বলবে নাম্বার টাইপ করতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছিলে। পরে অপরিচিত গলা
শুনে কেটে দিয়েছো।”

-“
কে
মুগ্ধ ভাইয়া
?”
তিতির
দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল
,
-“
হ্যা।”
-“
রাগারাগি
হয়েছে
?”
তিতির
ম্লান হেসে বলল
,
-“
সব
তো শেষই
, এখন
রাগারাগি হলেই কি আর না হলেই কি!”

ভাবী
অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তিতির নিজের ঘরে চলে এল। তার মানে মুগ্ধ ওকে ব্লক
করে রেখেছে। ফেসবুকে ঢুকলো ম্যাসেজ করার জন্য। কিন্তু মেসেজ গেল না। মুগ্ধ ওকে
ফেসবুকেও ব্লক করে দিয়েছে! কতক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। ও পারে পিউ বা মা কে কল
করতে। কিন্তু করবে না। কেন করবে
? মুগ্ধ তো ইচ্ছে করেই
সবকিছু থেকে ব্লল কিরেছে যাতে ওর সাথে আর কথা বলতে না হয়। ঠিকাছে মুগ্ধ পারলে ও
অবশ্যই পারবে। তিতির সিদ্ধান্ত নিল কোনভাবেই আর মুগ্ধর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা
করবে না। যেদিন মুগ্ধ নিজ থেকে যোগাযোগ করবে সেদিন মুখ ঘুরিয়ে থাকবে
, খুব কথা শুনিয়ে দেবে
সেদিন।

সারাটা
দিন মাস্টার্সের ক্লাস আর ফ্রেন্ডস নিয়ে ব্যস্ত থাকতো তিতির। কিন্তু রাতটা কাটতেই
চাইতো না। একটা রাতও শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি তিতির। ঘুম তো আসতোই না
, কোনভাবে ঘুমিয়ে পড়লেও
দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেত। আগে এত স্বপ্ন দেখতো না। ইদানিং বেড়েছে। মানুষের মন
যত বেশি অশান্তিতে থাকে তত বেশি স্বপ্ন দেখে একথা বুঝি আসলেই সত্যি।


মাস পর যেদিন মুগ্ধ ফোন করলো তিতিরকে কোনো কথাই শোনাতে পারেনি সেদিন ও। পারেনি
কোনো অভিমান করতে
, পারেনি
আহ্লাদ করতে
, এমনকি
পারেনি ওর সামনে কাঁদতেও। যেন অনেক দূরের মানুষ। কঠিন হয়ে থাকতে পেরেছিল শুধু।
সেদিন মুগ্ধ বলেছিল
,
-“
সরি
তিতির
, লাস্ট
যেদিন আমাদের কথা হয়েছিল সেদিন আমি তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যাবহার করেছি।”

তিতির
বলেছিল
,
-“

মাস পর সরি ফিল করলে
?”
-“
নাহ, ২/৩ দিন পরেই সরি ফিল
করেছিলাম কিন্তু ইচ্ছে করেই ফোন করিনি। তোমাকেও ব্লক করে রেখেছিলাম কারন যেহেতু
দূরেই থাকতে হবে তাই অভ্যাস করছিলাম।”

-“
বাহ
ভালই তো। তা অভ্যাস ভেঙে ফোন করতে গেলে কেন
?”
-“
আসলে
আমার মোবাইলে তোমার যে ছবিগুলো ছিল ওগুলো পিসিতে রেখে ডিলিট করে দিয়েছিলাম। যাতে
সবসময় সামনে না পরে। সামনে পড়লেই তো দেখতে থাকি আর মায়া বাড়ে। নিজেকে কন্ট্রোলে রাখার
জন্যই এসব করেছিলাম। আজ হঠাৎই তোমার একটা ছবি সামনে পড়লো। তারপর লোভ হলো অন্য
ছবিগুলো দেখার
, দেখলাম।
তারপর লোভ আরো বাড়লো তোমার ভয়েস রেকর্ডিং গুলোও শুনলাম। তারপর তোমাকে লাইভ শোনার
লোভ হলো। আর থাকতে না পেরে কল করলাম। এখন তোমাকে লাইভ দেখার লোভ হচ্ছে।”

-“
এতদিন
যখন কন্ট্রোলে রাখতে পেরেছো তো এখনো পারবে
, বাকী জীবনটাও
পারবে।”

-“
হুম, কন্ট্রোল করার চেষ্টা
করেছি
, করতে
তো আর পারলাম না। অনেক কষ্ট হয়েছে এই ৫ টা মাস। জানি তোমারও কষ্ট হয়েছে। অনেক কষ্ট
দিয়েছি
, ক্ষমা
করো।”

-“
না
না একদম ঠিকই করেছো তুমি। ৫ মাস যে পারে সে সারাজীবনও পারবে।”

-“
ওকে
বাট
, এটলিস্ট
স্কাইপে তে আসো
?”
তিতিরের
বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল তখন কিন্তু কান্নাটা চেপে রাখলো। বড্ড অভিমান হলো। ইশ ৫
টা মাস একটা কথা না বলে থেকেছে আর এখন এসেছে চেহারা দেখতে! চিন্তা করলো বেঁচে
থাকতে এ চেহারা আর দেখাবে না মুগ্ধকে। বলল
,
-“
না
স্কাইপে তে আসতে পারবো না। ইন্টারনেট নেই।”

তারপর
থেকে গত দুই মাসে মুগ্ধ অনেকবারই ফোন করেছে। প্রথম কয়েকবার ফোন ধরেনা তিতির
, তারপর ঠিকই ধরে, না ধরে পারেনা। কিন্তু
দুজনের কথাবার্তা যতক্ষণ হয় এধরণের কথাই হয়। তিতিরের অভিমানটা একসময় চলে যায়
কিন্তু তবু শক্ত থাকে কারন ও জানে ওর ফ্যামিলি মানবে না। তাই আর জড়াতে চায় না। যত
জড়াবে কষ্ট তত বাড়বে। মুগ্ধ জানে তিতির কেন এত স্ট্রং হয়ে থাকে
, ও জানে তিতির যত কাটা
কাটা কথাই বলুক না কেন ওর বুকের মধ্যে মুগ্ধর জন্য যে ভালবাসা ছিল তা আজও আছে।
সেখানে অনেক বরফ জমিয়ে ফেলেছে মুগ্ধ
, এখন গলাতেও হবে ওরই।
তাই হাল ছাড়েনি।

সন্ধ্যা
প্রায় হয়ে এসেছে। তিতির এখনো ওঠেনি। এরপর না গেলে ওর বাপ-ভাই খোঁজাখুঁজি শুরু করে
দেবে। তখন আরেক অসান্তি হবে। মুগ্ধ তিতিরের মাথার কাছে বসে চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে
ডাকলো
,
-“
তিতির? এই তিতির?”
তিতির
উঁ করে নড়ে উঠলো। মুগ্ধ বলল
,
-“
উঠবে
না
?”
-“
না।”
তিতিরের সেই
ঘুমন্ত কন্ঠস্বর যা শুনলে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায় মুগ্ধর। ও তিতিরের মাথাটা বালিশ
থেকে উঠিয়ে নিজের কোলে নিল। তারপর আবার ডাকলো
,
-“
ওঠো
না বাবা
, বাসায়
যেতে হবে তো।”

-“
না
আজকে যাব না
, তুমি
টিকেট ক্যান্সেল করে দাও। আজও আমি তোমার আদর খাব।”

মুগ্ধর
মুখে হাসি ফুটে উঠলো। শরীরে কাঁপন ধরলো। অনেকদিন পর সেই পুরোনো অনুভূতি। যেন আবার
ওরা কোথাও বেড়াতে গিয়েছে। তিতির ঘুমের মধ্যে আহ্লাদ করছে। মুগ্ধ তিতিরকে উঠিয়ে
বুকে জড়িয়ে ধরলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
,
-“
পাগলী, এত ভালবাসা লুকিয়ে কেন
রাখো
?”
কিন্তু
তিতির তখনো ঘুমে। মুগ্ধ আরো কয়েকবার ডাকার পর চোখ মেলে তাকালো ওর দিকে। কয়েক
সেকেন্ড পর লাফিয়ে উঠে সরে গেল তিতির। মুগ্ধ কিছু বলল না। তিতির ভাবতে লাগলো ও তো
ছিল রাস্তায়! মুগ্ধর বাড়িতে এল কি করে
? আর ওর বুকের উপরই বা
পড়ে ছিল কেন
? ইশ
বুকটা ধকধক করছে। কতদিন পর মুগ্ধ ওর সামনে! মুগ্ধ বুঝতে পারলো বোধহয় তাই বলল
,
-“
তুমি
রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়ে গিয়েছিলে। একটা ছেলে তোমার ফোনের ইমারজেন্সি কললিস্টে
আমার নাম্বার পেয়ে আমাকে ফোন করে। তারপর আমি সেখান থেকে তোমাকে নিয়ে ডক্টরের কাছে
যাই
, সেখানে
তোমাকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দেয়া হয়। তারপর আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি ঘুমানোর জন্য।
ওই অবস্থায় তোমার বাসায় দিতে গেলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে হতো। তখন তো আরেক গ্যাঞ্জাম
লাগতো। তাই এখানে এনেছি।”

তিতিরের
মনে পড়ে গেল। বলল
,
-“
কোন
রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলাম
?”
-“
চেয়ারম্যান
বাড়ি।”

-“
চেয়ারম্যান
বাড়ি কি করে আসলাম
? আমি
তো ছিলাম ধানমন্ডি। লেকের ধার ধরে হাটছিলাম।”

-“
মানে
কি
? তুমি
হাটতে হাটতে ধানমন্ডি থেকে বনানী এসেছো
?”
তিতিরের
মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তিতির দুহাতে মাথা চেপে ধরলো। মুগ্ধ ওর হাত ধরে বলল
,
-“
কি
হয়েছে
? খারাপ
লাগছে
?”
তিতির
বলল
,
-“
না
ঠিকাছে।”

-“
আগে
কখনো এমন হয়েছে
?”
-“
নাহ।
আর আমি বাসায় যাব
, অনেক
দেরী হয়ে গেছে।”

-“
আচ্ছা, চলো। তার আগে একটু
হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। ভাল লাগবে।”

হাতমুখ
ধুয়ে বের হতেই তিতির দেখলো মুগ্ধর মা বসে আছে একটা ট্রে নিয়ে। ট্রে ভর্তি দুনিয়ার
খাবার-দাবার। তিতিরকে দেখেই উনি উঠে এলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন
,
-“
ইশ, মা কি চেহারা করেছো? খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো
করোনা না
?”
তিতির
একটু হাসার চেষ্টা করল
,
-“
না
না আন্টি খাই তো। আসলে বয়স বাড়ছে তো
, আগের মত অত ছোট তো
নেই।”

-“
এহ
আমার কাছে বয়সের কথা বলছো
? বলোনা।
এই অবস্থা কেন হয়েছে জানিনা ভাবছো
? এত ভেঙে পড়োনা মা।
তোমার ফ্যামিলি যখন মুগ্ধকে মেনে নেবেই না আর তুমিও যখন পারবে না ফ্যামিলি ছেড়ে
আসতে তাহলে সেটাই বাস্তবতা ভেবে মেনে নাও। সুখী হবে।”

তিতির
কিছু বলল না
, মাথা
নিচু করে রইলো। মা বলল
,
-“
এসো
মা একটু ভাত খেয়ে নাও।”

-“
নাহ, আন্টি আমি এখন খাব
না।”

-“
একটা
মাইর দিব ধরে। আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোমাকে। খাব না বললে তো হবে না।”

মুগ্ধর
মা তারপর জোর করে খাইয়ে দিল তিতিরকে। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। মা বলল
,
-“
মুগ্ধ, তুইও তো খাসনি। একটু
প্লেটে নিয়ে খেয়ে নে না বাবা।”

মুগ্ধ
একটা প্লেটে অল্প একটু ভাত নিয়ে খেল। তারপর তিতিরকে নিয়ে বের হলো।

তিতির
পাশে বসে আছে। মুগ্ধ ড্রাইভ করছে। মুগ্ধর নিজের গাড়ি। সকালে অফিসে যাওয়ার সময়
নিজেই ড্রাইভ করে যায়। তারপর ড্রাইভার গিয়ে গাড়ি নিয়ে আসে। মা
,পিউ,স্নিগ্ধ ব্যবহার করে।
সন্ধ্যায় ড্রাইভার আবার গাড়ি মুগ্ধর অফিসে দিয়ে আসে। মুগ্ধ ডাইভ করে ফেরে।
প্রথমবার যখন মুগ্ধর প্রমোশন হয় তার পরপরই বাবা মারা যায়। লোন নিতে সাহস পায়নি
তখন। পুরো ফ্যানিলির দায়িত্ব যে এখন ওর উপর! তারপরের বছর আবার প্রোমোশন হয় তখন
মুগ্ধ কারলোন নিয়ে গাড়িটা কেনে। গাড়িতে বসতেই তিতিরের মনে পড়ে গেল এই গাড়িটা নিয়েও
ভাইয়া কত কিছুই না বুঝিয়েছে বাবাকে। এত তারাতারি গাড়ি কিনলো কি করে
? কি এমন চাকরী করে? নির্ঘাত অসৎ পথে আয়
করেছে। বাপ পুলিশ ছিল না
? ম্যাক্সিমাম
পুলিশরাই তো দুই নাম্বার হয়। দুই নাম্বারের ছেলেও হয়েছে দুই নাম্বার। আঙ্কেলের মত
অমন মানুষ সম্পর্কে ওসব কথা শুনে তিতির কান্না করে দিয়েছিল। নিজের ভাইকে বলতে
ইচ্ছে করছিল
, ‘সবাই তোর মত দুমুখো সাপ না। তোর
যোগ্যতা নেই বলে তুই চাকরীতে উন্নতি করতে পারিসনি। বাপের টাকায় ফুটানি মারছিস।
মুগ্ধর যোগ্যতা আছে তাই মুগ্ধ উন্নতি করতে পেরেছে।
কিন্তু বলতে পারেনি
তিতির। ছোটবেলা থেকেই ও কখনো বাসায় কারো মুখের উপর কথা বলেনি। এখনো বলেনা তবু ওকে
পদে পদে শুনতে হয় ও বেয়াদব। কারন ও ফ্যামিলির সবার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে বলতে
পারে
, ‘আমি মুগ্ধকে ভালবাসি।
জ্যামে
পড়লো ওরা। গাড়িতে ওঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত দুজনের একজনও কোন কথা বলেনি। মুগ্ধ
একটা গান প্লে করলো
,
আমার
আকাশ জুড়ে

বিশাল
পাখির ডানা

তোমার
ভেতর দিয়ে আমার আনাগোনা

তোমার
ধমনীতে আতুর হয়ে যখন

চাঁদের
আলোয় ভিজে সামিলে মন যখন

মাঝে
মাঝে একা লাগে..

ভীষন
সুখেও একা লাগে..


অসময়ে একা লাগে..


বালির পথ একা লাগে..

রাত
পেড়িয়ে দিন আসে

দিন
পেরিয়ে রাত

প্রত্যেকদিন
বাড়ছে শুধুই এই অজুহাত।

তোমার
ধমনীতে আতুর হয়ে যখন

চাঁদের
আলোয় ভিজে সামিলে মন যখন

মাঝে
মাঝে একা লাগে..

ভীষন
সুখেও একা লাগে..


অসময়ে একা লাগে..


বালির পথ একা লাগে..

সব
বুঝতে সময় লাগে

ভুল
বুঝতে নয়।

কার
সাধ্য ঘোচাবে

আমাদের
সংশয়
?
তোমার
ধমনীতে আতুর হয়ে যখন

চাঁদের
আলোয় ভিজে সামিলে মন যখন

মাঝে
মাঝে একা লাগে..

ভীষন
সুখেও একা লাগে..


অসময় একা লাগে..


বালির পথ একা লাগে।”

হঠাৎ
তিতির গানটা বন্ধ করে দিল। মুগ্ধ বলল
,
-“
কি
হলো গানটা বন্ধ কেন করলে
?”
-“
গানটা
খুব বাজে ছিল।”

মুগ্ধ
মৃদু হেসে চোখ ফিরিয়ে নিল। বাকী রাস্তাও তিতির আর একটা কথাও বলল না। বিজয় স্মরনী
থেকে ধানমন্ডির দিকে না গিয়ে তেজগাঁর দিকে যেতেই তিতির জিজ্ঞেস করলো
,
-“
ওদিকে
কোথায় যাচ্ছো
?”
-“
এখন
কথা কেন বলছো
? এতক্ষন
যেমন কথা বলার প্রয়োজন মনে করোনি তেমন এখন ও করার দরকার নেই।”

তিতির
বলল
,
-“
বাসায়
যেতে দেরী হলে প্রব্লেম হবে।”

-“
কোন
প্রব্লেম হবে না। সারাদিন তো বাসার বাইরে
, কেউ তো একবার ফোন করে
খবরও নিল না! আর যদি প্রব্লেম হয়ও তাতে আমার কি
?”
তিতির
আর কোন কথা বলল না। আসলেই রাত ১০ বাজলে হয়তো কেউ ফোন করবে তার আগে ইদানিং কারোর
সময়ই হয়না ওকে নিয়ে চিন্তা করার। হাতিরঝিল গিয়ে লেকের ধারে গাড়ি থামালো মুগ্ধ।
তারপর জিজ্ঞেস করলো
,
-“
সমস্যা
কিরে বাবা তোমার
? প্ল্যান
করে দেখা তো করিনি। হঠাৎই দেখা হয়ে গেছে। এখন একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও তোমার
সমস্যা
?”
-“
হ্যা, অনেক সমস্যা।”
একথা
শুনে রাগ ধরে রাখতে পারলো না মুগ্ধ। আচমকা তিতিরের কোমড় জড়িয়ে ধরে তিতিরের ঠোঁটে
চুমু খেল। প্রথমে তিতির ওকে সরিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরেও
এক ইঞ্চি সরাতে পারলো না মুগ্ধকে। তারপর কি যেন হলো তিতিরের
, তখন ও নিজেও মুগ্ধর
গলাটা জড়িয়ে ধরে সাড়া দিল।
To be continued…

Tagged : / /