Home Blog Page 2

প্রেমাতাল পর্ব – ৩০ || মৌরি মরিয়ম

তিতির ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছে মুগ্ধর দিকে। ও বংশীর কথা তো শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু মুগ্ধ চুপ করে থেকে একসময় বলল,
-“আচ্ছা আচ্ছা নো প্রব্লেম। হুট করে এলে এমনটা হতেই পারে। আচ্ছা বংশী দা। রাখছি তাহলে।”
ফোন রাখতেই তিতির বলল,
-“ব্যবস্থা হয়নি না?”
মুগ্ধ তিতিরের গাল টিপে দিয়ে বলল,
-“মন খারাপ করোনা। আমি সামনের মাসেই আগে থেকে বুকিং দিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব।”
তিতির বলল,
-“আমি পারমিশন পাব না।”
-“পাবা পাবা।”
-“না পাবনা।”
-“আচ্ছা বাদ দাওনা এখন, যেভাবেই হোক আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। এখন একটু খাও।”
তিতির প্লেট এগিয়ে নিল। খাওয়া শুরু করে বলল,
-“হ্যা, এতক্ষণ তো টেনশনে ছিলাম তাই খেতে পারছিলাম না। এখন তো আর কোনো টেনশন নেই, সব শেষ।”
-“বোকার মত কথা বলোনা তিতির। কিসের সব শেষ?”
তিতির কিছু বলল না, মন খারাপ করে খেতে থাকলো। হঠাৎ তিতিরের চোখ পড়লো টেবিলের উপর রাখা লাচ্ছির দিকে। ৪ গ্লাস লাচ্ছি আর সাথে হাফ লিটারের বোতলের এক বোতল লাচ্ছি। তিতির বলল,
-“এত লাচ্ছি দিয়ে কি হবে?”
-“খাব। গ্লাসের গুলো এখন খাব। বোতলের টা রাস্তায় যেতে যেতে খাব। নষ্ট হয়ে যাবে নাহলে আরো নিতাম। এটা আমার প্রিয় লাচ্ছি। সব ইনগ্রিডিয়েন্স গুলো এত পারফেক্ট পরিমাণে দেয় যে একদম পারফেক্ট একটা লাচ্ছি হয়। তিতির এতক্ষণে হাসলো। বলল,
-“তুমি পাগল একটা।”
-“না, খাদক।”
রাস্তার অপজিটে আর্মিদের একটা সুপার শপ ছিল। খাওয়া শেষ হতেই মুগ্ধ ওই শপটা দেখিয়ে বলল,
-“চলো ওই শপটাতে একটু যাব।”
-“কি কিনবে আবার?”
-“চকলেট কিনবো।”
-“তুমি যাও। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। এখানেই বরং ভাল লাগছে। তুমি যাও। কেনাকাটা শেষ করে এসো। আমি এখানেই বসে থাকি।
মুগ্ধ আর জোর করলো না, চলে গেল। মুগ্ধ যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ করে বৃষ্টি নামলো। তিতির ভিজে যাচ্ছে, ধুর! সবগুলো টেবিলের উপর ছাতা আছে, শুধু ওদেরটাতেই নেই। ভেতরে চলে যেতে পারে কিন্তু তাহলে তো মুগ্ধ ওকে খুঁজে পাবে না। ফোনটাও তো ব্যাগে আর ব্যাগ মুগ্ধর কাছে। যখন বৃষ্টির জোর বাড়লো তখন তিতিরের ভালই লাগলো ভিজতে। এর মধ্যেই মুগ্ধ দৌড়াতে দৌড়াতে এল। এসেই ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তিতির বলল,
-“কোথায় যাচ্ছি?”
-“সিএনজি ঠিক করেছি।”
-“ওহ।”
মুগ্ধ বলল,
-“ভিজছিলে কেন তুমি?”
-“তো কি? যদি হারিয়ে যাই, আমার ফোন তো তোমার কাছে।”
মুগ্ধ তাকিয়ে দেখলো তিতিরের ঠোঁট বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে আর সেই ফোঁটা ফোঁটা পানিগুলো তিতির ওর ঠোঁট দিয়ে পিষে ফেলছে কথা বলার সময়। মুগ্ধর সেই ফোটাগুলোকে এখন হিংসা হচ্ছে। তিতির বলল,
-“কি হলো দাঁড়িয়ে পড়লে যে?”
-“এমনি, চলো চলো।”
সিএনজিতে উঠেই মুগ্ধ আবার তাকালো তিতিরের দিকে। ওর ঠোঁটদুটো ভিজে সপসপে হয়ে আছে। এই মুহূর্তে মুগ্ধর প্রচন্ড ইচ্ছে করছে ওই ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়া পেতে। এই অন্ধকারে সিএনজিতে সেটা পাওয়াও সম্ভব। কেন যেন মনে হচ্ছে তিতির আজ বাধা দেবে না। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল মুগ্ধ। ওদের প্রথম চুমুটা কিনা এভাবে হবে? নাহ! সুন্দর, পারফেক্ট একটা সময়ের জন্য মুগ্ধ অপেক্ষা করবে। যখন কোনো তাড়া থাকবে না, কেউ দেখে ফেলার আতঙ্ক থাকবে না আর যখন তিতিরের কোনো সংকোচ থাকবে না।
সিএনজি বাস স্ট্যান্ড পার হওয়ার পর তিতির বলল,
-“এই আমরা বাস স্ট্যান্ড পার হয়ে এলাম তো।”
মুগ্ধর ঠোঁটে মুচকি হাসি দেখেই তিতির বুঝে ফেলল। বলল,
-“আমরা আজ থাকছি?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“হ্যা, বংশী ফোন দিয়ে কনফার্ম করেছিল তখন, আমি তোমার সাথে একটু মজা করছিলাম। আর তাঁবুতে থাকতে হবে না। আমরা কটেজ পেয়েছি।”
তিতির একমুখ হাসি নিয়ে এক লাফ দিয়ে মুগ্ধর গলাটা জড়িয়ে ধরলো। মুগ্ধ হাসতে হাসতে বলল,
-“তুমি এত পাগলী কেন?”
তিতির ওর পিঠে খামচি মেরে বলল,
-“তুমি এত খারাপ কেন? কি মন খারাপ হয়েছিল আমার।”
মুগ্ধ হঠাৎই তিতিরের কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে কোলের মধ্যে উঠিয়ে নিল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
-“আই লাভ ইউ পাগলী!”
তিতিরের ইচ্ছে করছিল রিপ্লাই দিতে কিন্তু দিলনা। যখন দিবে বলে ঠিক করে রেখেছে তখনই দিবে। ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ কি শুধু লাভ ইউ টু বললেই হয়? আরো কত উপায় আছে! তিতির তারই একটা বেছে নিল। মুগ্ধর শার্টের ডান পাশের কলারটা সরিয়ে মুখ ডুবিয়ে দিল ওর গলার ডান পাশে। তারপর ইচ্ছেমত চুমু দিল। মুগ্ধর পায়ের রক্ত এক লাফে মাথায় উঠে গেল। হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। নিজ উদ্যোগে করা তিতিরের প্রথম আদর। মুগ্ধ ওকে জাপ্টে ধরে রাখলো নিজের বুকের মধ্যে।
কিছুক্ষণের মধ্যে যখন ওরা “রিসোর্ট হলিডে ইন” এ পৌঁছল, গাড়ির শব্দ পেয়ে বংশী দৌড়ে এল,
-“আইয়ে বিবিজি আইয়ে। আল্লাহ মেহেরবান কি হাম আপকো লিয়ে কুছ কার পায়া।”
তিতির হাসলো কিছু বলল না। ওদের ব্যাগ দুটো জোর করে নিয়ে নিচ্ছিল। মুগ্ধ দিলনা। জিজ্ঞেস করলো,
-“বংশী বিবিজিকে কেমন দেখলে? পছন্দ হয়েছে?”
বংশী মাথা নিচু করে বলল,
-“সাহাব ইয়ে আপনে কেয়া পুছা? মুজহে তো লাগা কি বেহেশত সে কোয়ি হুর আগেয়া।”
মুগ্ধ বলল,
-“হ্যা তা ঠিক, কিন্তু বেশি বাচ্চা না?”
-“লেড়কি কাভি বাচ্চা নেহি হোতি সাহাব। উহারা পালাট কে সাত সাত জোয়ান বান যাতা।”
কথা বলতে বলতে ওরা রিসিপশনে চলে এল। তিতির বসলো। মুগ্ধ ফর্মালিটিজ সেরে তিতিরকে নিয়ে কটেজের সামনে যেতেই তিতির বলল,
-“আমরা এখানে থাকব?”
-“হ্যা।”
-“আর ইউ সিওর?”
-“হ্যা।”
-এই পুরো কটেজটা আজকের জন্য আমাদের?”
মুগ্ধ এবার হেসে দিল। তারপর বলল,
-“হ্যা।”
তিতির আরেকবার তাকিয়ে দেখে নিল কটেজটাকে। ছোট্ট একটা একতলা ঘর। কিন্তু দোতলা সমান উঁচু। নিচতলা সমান যায়গা ফাকা। টোঙ ঘরের মত করে বানানো। সামনেই চওড়া সিঁড়ি। সিঁড়ির উপরে দোচালা ডিজাইনের চাল। সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই বারান্দা। বারান্দা দিয়েই ভেতরে ঢোকার দরজা দেখা যাচ্ছে। তিতির পা বাড়াতেই মুগ্ধ থামালো,
-“এই দাঁড়াও।”
-“কেন?”
-“বংশী একটা ছেলেকে পাঠালো না আমাদের ব্যাগ নিয়ে?”
-“হ্যা।”
-“ও বের হোক, তারপর আমরা যাব।”
-“আচ্ছা।”
ছেলেটা বের হয়ে চলে যেতেই মুগ্ধ তিতিরকে কোলে তুলে নিল। তিতির মুগ্ধর গলার পিছনে দু’হাত বাধলো, মুখে হাসি। মুগ্ধ ওকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠে গেল। ভেতরে নিয়ে নামালো। তিতির ভেতরটা দেখে বিস্ময়ে মুখ চেপে ধরলো। পুরো রুমটাই কাঠের, ইভেন দেয়াল, ফ্লোর সব কাঠের। রুমে ঢুকেই হাতের ডান পাশে বিছানা সাদা বেড কভার বিছানো। বিছানার পাশেই বিশাল আয়নার বিলাশবহুল ড্রেসিং টেবিল। একটু সরে একটা আলমারি। সব ফার্নিচার ম্যাচিং ডিজাইনের। বাম পাশের দেয়ালের কর্নারে একটা দরজা, হয়তো টয়লেট। বাকী দেয়ালটুকু পুরোটাই সাদা পর্দা দিয়ে ঢাকা, নিচে কি? জানালা নাকি? কে জানে। সামনের দেয়ালে থাই গ্লাস লাগানো সিলিং থেকে ফ্লোর পর্যন্ত পুরোটা। এখানেও সাদা পর্দা। মুগ্ধ পর্দাটা টেনে দিয়ে তিতিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর বলল,
-“কি ম্যাম? পছন্দ তো?”
-“পছন্দ হবে না মানে? আমি তো বিশ্বাস করতে পারছি না কি দেখছি আমি!”
-“আচ্ছা শোনো, অনেকক্ষণ ভেজা কাপড়ে আছো। চেঞ্জ করো। নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে। সারারাত যখন এখানেই আছো তখন সব দেখতে পারবে আস্তে আস্তে।”
-“আচ্ছা। আমি বাথরুমে যাচ্ছি চেঞ্জ করতে। তুমি রুমেই চেঞ্জ করে নাও।”
-“হুম।”
তিতির যখন ব্যাগ থেকে কাপড় বের করতে যাচ্ছিল মুগ্ধ বাধা দিল। তারপর নিজের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে তিতিরের হাতে দিয়ে বলল,
-“এই নাও। এটা পড়ো।”
-“এটা কি?”
-“শাড়ি। তোমার জন্য কিনলাম একটু আগে।”
-“মানে আর্মি শপটাতে তুমি এজন্যই গিয়েছিলে?”
-“হ্যা। কাল তো একটু দেখেছি শাড়ি পড়া বউ তিতিরপাখিকে। আজ যখন সুযোগ পেয়েছি মিস করতে ইচ্ছে হলোনা।”
-“কিন্তু শাড়ি পড়তে তো আরো অনেক কিছু লাগে। পেটিকোট, ব্লাউজ। ওগুলো কোথায় পাব স্যার? কাল তো পিউয়ের টা পড়েছিলাম।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“তোমার কি আমাকে বলদ মনে হয়? আমি আর যাই হইনা কেন বলদ নই। আর মেয়েদের ব্যাপারে সবই জানি সো শাড়ি পড়তে কি লাগে না লাগে তা আনবো না ভাবলে কি করে?”
তিতির হেসে বলল,
-“জানি আমি। কিন্তু আমি তো শাড়ি পড়তে পারিনা। কালই প্রথম পড়লাম। তাও মা পড়িয়ে দিয়েছিল।”
-“তো তুমি দেখোনি মা কিভাবে পড়িয়েছিল?”
-“হুম দেখেছি, শিখেছি কিন্তু অনেক প্যাঁচ। সব ভুলে গেছি।”
-“হায় খোদা! এখন শাড়ি পড়ানোটাও আমার শিখিয়ে দিতে হবে?”
-“তুমি পারো?”
-“পারব না কেন? মুগ্ধ সব পারে।”
-“কিভাবে পারো?”
সন্দেহের দৃষ্টি তিতরের চোখে। মুগ্ধ বলল,
-“ইউটিউবে আজকাল কি না শেখা যায় বলো? আমার খুব সাধ জেগেছিল শাড়ি পড়া দেখবার। কিন্তু জিএফ বউ কিছুই তো ছিলনা। তাই ইউটিউব থেকেই দেখেছি। আর শিখেও ফেলেছি।”
-“তুমি ওই মেয়েটার পেটের দিকে তাকিয়েছিলে?”
মুগ্ধ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
-“কোন মেয়ে?”
-“ইউটিউব ভিডিওতে যে মেয়েটা শাড়ি পড়া শেখাচ্ছিল?”
মুগ্ধর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এল। বলল,
-“হ্যা। মানে একটা সুন্দরী মেয়ে চোখের সামনে সুন্দর, মসৃন পেট বের করে শাড়ি পড়ছে। আর আমি কি চোখ বন্ধ করে থাকবো বলো? আমি কি পুরুষ মানুষ নই?”
-“তুমি সত্যি দেখেছো?”
-“হ্যা দেখেছি। বাট আই প্রমিস আমি আর কোনো শাড়ি পড়া মেয়ের পেটের দিকে তাকাব না। তখন তো তুমি ছিলে না তাইনা?”
তিতির উত্তর নাদিয়ে রাগ করে বাথরুমে ঢুকে গেল। ঢুকে তো ভিমরি খাওয়ার জোগাড়। বাথটাব, হাই কমোড সব আছে। কিসের সাথে কিসের কম্বিনেশন! যাই হোক, ওর মুডটা অফ! মুগ্ধ কি বলল এটা! সত্যি কি দেখেছে নাকি ওকে ক্ষ্যাপানোর জন্য বলেছে কে জানে!
প্যাকেট টা খুলতেই তিতির দেখলো সিলভার পাড়ের লাল তাতের শাড়ি এনেছে মুগ্ধ। উফ শাড়িটা এত সুন্দর কেন? মুগ্ধর পছন্দ আছে বলতে হবে। সাথে লাল ব্লাউজ, পেটিকোটও আছে। ফ্রেশ হয়ে শাড়িটা পড়ার অনেক চেষ্টা করলো তিতির কিন্তু পারলো না। কোনোভাবে পেঁচিয়ে বেড়িয়ে এল। বাইরে এসে দেখলো মুগ্ধ সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। ইশ! কাল রাতে ঘুমাতে পারেনি বলেই হয়তো এখন ওর অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে। তিতির ওর কাছে গিয়ে ভেজা চুলগুলো মুগ্ধর চোখের উপর ধরলো। কয়েক ফোঁটা পানি পড়তেই মুগ্ধ লাফিয়ে উঠে হেসে দিল। তারপর তিতিরের দিকে তাকাতেই চোখে যেন নেশা ধরলো। লাল শাড়িতে কিযে অপূর্ব লাগছে তিতিরকে! কাল নীল শাড়িতে বউ বউ লাগছিল আর আজ লাল শাড়ি, ভেজা চুল সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে নতুন বউ বিয়ের পরদিন সকালে গোসল করে বেড়িয়েছে! কি বলবে! কিভাবে এক্সপ্রেশ করবে তিতিরকে দেখে ওর ভেতরে কি হচ্ছে। বাকরুদ্ধ হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মুগ্ধ।
মুগ্ধ এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যে তিতির লজ্জায় কোনো কথাই বলতে পারছিল না। মুগ্ধ আচমকা তিতিরকে কোলে তুলে নিল তারপর টয়লেটের পাশের দেয়ালের পর্দা সরিয়ে দরজা ঠেলে বারান্দায় চলে গেল। বারান্দাটা দেখে আরও একবার মুগ্ধ হলো তিতির। সামনে বিশাল লেক। লেকটা কি কৃত্রিম না প্রাকৃতিক কে জানে! মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে পরে। এখন আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
বারান্দাটা বেশ বড়। বারান্দায় কোনো ছাদ দেই। আর ঘরের সাথে লাগোয়া দেয়কলটি ছাড়া বাকি তিন দিকের দেয়ালগুলো ছোট ছোট হাটুসমান। প্রত্যেকটা কর্নারে ফুলের টব। একপাশে একটা সাদা রঙের সোফা। একটা ইরানি লাইটও জ্বলছিল বারান্দার এক কোনায়। মুগ্ধ তিতিরকে কোল থেকে নামিয়ে লাইটটা বন্ধ করে দিল। কারন লাইট টা চোখে লাগছিল। যদিও আকাশে মেঘ ছিল, পূর্নিমাও ছিল। মেঘের বিচরণ যেন খেলছিল ওদের সাথে। সরে গেলেই জোছনায় ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ। আর মেঘে চাঁদ ঢেকে যেতেই আবছা অন্ধকারে লুকোচুরি খেলছিল। তিতির লেকের দিকে তাকিয়ে ছিল। মুগ্ধ লাইট অফ করে তিতিরকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই তিতির বলল,
-“একটা গান শোনাবে?”
মুগ্ধও আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল গান শোনাবে তাই বিনাবাক্যে শুরু করে দিল,
“মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথির
চৈতি চাঁদেরও দুল..
খোঁপায় তারার ফুল
মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল
কন্ঠে তোমার পড়াবো বালিকা
হংস সাড়ির দোলানো মালিকা
বিজরী জরির ফিতায় বাধিব
মেঘরঙ এলোচুল…
দেব খোঁপায় তারার ফুল।
মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল
জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে
মাখাব তোমার গায়ে..
রামধনু হতে লাল রঙ ছানি
আলতা পড়াব পায়ে..
আমার গানের সাত সুর দিয়া
তোমার বাসর রচিবও প্রিয়া
তোমারি হেরিয়া গাহিবে আমার
কবিতার বুলবুল
দেব খোঁপায় তারার ফুল
মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল।”
গানটা শেষ হতেই তিতির বলল,
-“এটা শুধু একটা গান ছিলনা। তার চেয়েও যেন অনেক বেশি কিছু ছিল।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“হুম চলো বসি।”
একথা বলেই মুগ্ধ সোফায় গিয়ে বসলো। তিতিরও যাচ্ছিল পেছন পেছন। হাঁটা শুরু করতেই পায়ে বেঝে তিতিরের শাড়ির কুচি খুলে গেল। তিতির কুচিগুলো কুড়িয়ে নিল। মুগ্ধ উঠে এসে হেসে বলল,
-“এসো আমি পড়িয়ে দেই।”
-“না আমি পারব।”
এই বলেই তিতির ঘরে যাচ্ছিল। মুগ্ধ তিতিরের কোমর আঁকড়ে ধরে আটকালো। তারপর বলল,
-“পারলে প্রথমবারই পারতে। একবার পড়িয়ে দেইনা। কি হয়েছে? আমার অনেক ইচ্ছে ছিল আমি আমার বউকে শাড়ি পড়িয়ে দেব তাইতো শিখেছিলাম।”
-“কিন্তু তখন যে বললে..”
-“ওটা তো তোমাকে রাগানোর জন্য বলেছি।”
তিতির দাঁড়ালো। মুগ্ধ দেখলো তিতির শাড়ি উলটো পড়েছে। শাড়িটা ঠিক করে পড়িয়ে তিতিরের সামনে হাটু গেরে বসে যখন কুচি দিচ্ছিল তখন তিতির বলল,
-“ব্লাউজটা একদম ঠিক মাপের হয়েছে। তোমাকে তো আমি কখনো বলিনি তাহলে মাপ জানলে কোত্থেকে?”
-“তোমার মাপ আমি জানবো না তো জানবে কে? তোমার পা থেকে মাথা অবধি কত শতবার চোখ দিয়ে মুখস্থ করেছি জানো?”
তিতির লজ্জা পেল। মাঝে মাঝে মুগ্ধ যে কিসব বলে, মুখে কিছু আটকায় না। এরপর মুগ্ধ বলল,
-“অবশ্য মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে কিভাবে শাড়ি পড়লে জানো?”
-“কিভাবে?”
-“আগের যুগে ওভাবে পড়তো। এখন যা দিনকাল পড়েছে তাতে অবশ্য ওভাবে শাড়ি পড়া যাবে না আমাদের সমাজে। তবে হাজবেন্ডের জন্য প্রত্যেক মেয়েরই পড়া উচিৎ। পাহাড়ীরা তো এখনো পড়ে।”
-“কিভাবে বলবে তো?”
-“চোখের বালি সিনেমা টা দেখেছো? ইন্ডিয়ান বাংলা সিনেমা।”
-“কোনটা ওইযে প্রসেনজিৎ, ঐশরিয়া আর রাইমা সেনের টা?”
-“চোখের বালি একটাই হয়েছে।”
-“দেখিনি, তবে ট্রেইলর দেখেছি।”
-“ওখানে ঐশরিয়া কিভাবে শাড়ি পড়েছে দেখেছো?”
-“ব্লাউজ ছাড়া? পেঁচিয়ে?”
-“হ্যা, মারাত্মক লাগে… উফ।”
-“ছিঃ”
-“ছিঃ কেন? সবার সামনে পড়ার কথা তো বলছি না।”
তিতিরের এত লজ্জা লাগছিল! মুগ্ধ কিভাবে যে বলে এই কথাগুলো কে জানে! শেষমেশ তিতির বলল,
-“প্লিজ তুমি থামবে?”
-“তুমি কেন এত লজ্জা পাচ্ছো? তোমার জন্য তো ব্লাউজ এনেছিই।”
তিতির আর কথাই বলল না। ওর সাথে এ নিয়ে আরো কথা বললে আরো লজ্জা দেবে। কুচি দেয়া শেষ হতেই মুগ্ধ তিতিরের হাতে দিয়ে বলল,
-“নাও এবার গুঁজে নাও।”
তিতির শাড়ি উলটো গুঁজছিল মুগ্ধ ধরে ফেলল,
-“শাড়ি গুঁজতেও জানোনা? কি শেখালো তোমার শ্বাশুড়ি মা তোমাকে?”
তিতির কিছু বলল না, হাসছিল। মুগ্ধ কুচিগুলো ঠিক করে ধরে গুঁজে দিল। এই কাজ করতে গিয়ে তিতিরের নাভিতে চোখ চলে গেল, তারপর ঠোঁটও অটোমেটিক্যালি চলে গেল। নাভির ডানপাশে চুমু দিল মুগ্ধ। তিতির শিউরে উঠলো। দুহাত দিয়ে ওর চুল খামচে ধরে সরিয়ে দিতে চাইলো। মুগ্ধ সরলো না। আশেপাশে আরো কয়েকটা চুমু দিল। মুগ্ধর ঠোঁটের প্রতিটা স্পর্শে তিতির কেঁপে কেঁপে উঠছিল, আর সরে সরে যাচ্ছিল। তিতিরের পিছনেই ছিল ঘরের দেয়াল। কাঁপতে কাঁপতে আর সরতে সরতে ও দেয়াল পর্যন্ত চলে গেল। পেছনে হাত দিয়ে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে ব্যালেন্স রাখছিল। মুগ্ধ উঠে দাঁড়ালো। তিতিরকে দেয়ালে ঠেকিয়ে দুহাতে ওর মুখটা তুলে ধরলো। তারপর নিচু হয়ে তিতিরের চোখে চোখে রাখলো। একজনের নিশ্বাস আরেকজনের নিশ্বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে লুটিয়ে পড়ছিল। তিতির তাকিয়েই ছিল। মুগ্ধ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
-“আজ নিশ্চয়ই তোমার কোনো আপত্তি নেই?”
মুগ্ধর কন্ঠটা ভারী শোনালো। তিতির বলল,
-“কিন্তু একটা কথা বলার ছিল যে!”
তিতিরেরও গলা কাঁপছিল। মুগ্ধ বলল,
-“বলো।”
তিতির মুগ্ধর চোখে চোখ রেখেই বলল
-“আই লাভ ইউ।”
মুগ্ধ হাসলো। তিতিরও মাথা নিচু করে সামান্য হাসলো। মুগ্ধ একটা হাত তিতিরের কোমরে রাখলো। আরেকটা হাতে ওর কানের নিচ দিয়ে চুলের ভেতর দিয়ে ওর মুখটা তুলে ধরলো। তিতির তাকালো। মুগ্ধ এগিয়ে যেতেই তিতির চোখ বন্ধ করে ফেললো। তারপর মুগ্ধ তিতিরের ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। তিতিরের দেয়ালে রাখা হাত দুটো একসময় মুগ্ধর কোমর পার করে পিঠে উঠে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুগ্ধ টের পেল তিতিরের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কিন্তু কেন? মেয়েরা অতি সুখে চোখের জল ফেলে বটে কিন্তু তাই বলে এরকম সময়ে! কই ওর এক্স গার্লফ্রেন্ডদের বেলায় তো এমনটা হয়নি! ধুর এসব কথা ভাবার সময় নেই। তিতিরকে এখন ও স্বর্গে নিয়ে যাবে।
তিতিরের কাঠের ফ্লোরে রাখা পায়ের গোড়ালি দুটোও উঁচু হয়ে উড়ে যেতে চাইছিল। ওড়াবার জন্য মুগ্ধ তো আছেই।
To be continued..

প্রেমাতাল পর্ব – ২৯ || মৌরি মরিয়ম

একসময় নীরবতা ভেঙে মুগ্ধ বলল
-“ভাবছো আমি খুব খারাপ?”
-“না।”
-“তাহলে? কথা বলছো না, দূরে বসে আছো! এসবের কারন কি?”
-“কই?”
মুগ্ধ তিতিরের কাছে এগিয়ে ওর হাতটা ধরতেই তিতির আচমকা সরে গেল। মুগ্ধ বলল,
-“ভয় কেন পাচ্ছো?”
তিতির ভাবলো সত্যিই তো, ও কেন ভয় পাচ্ছে! বলল,
-“কই নাতো! ভয় পাচ্ছি না।”
মুগ্ধ তিতিরের হাতটা ধরে বলল,
-“শোনো তিতির, তোমার চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি তোমার আমাকে ভয় করছে। তুমি আমাকে এরকম ভাবোনি হয়তো তাই এক্সেপ্টও করতে পারছো না। কিন্তু তোমার ভয় পাওয়ার কোনো কারন দেখি না। ও অনেক বড় একটা অন্যায় করেছিল। রাগটা আমার সেদিনই উঠেছিল কিন্তু তোমার সেফটির কথা ভেবে পালিয়ে গিয়েছিলাম।”
তিতিরের মনে পড়লো মুগ্ধর মা বলেছিল মুগ্ধর অনেক রাগ, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। মুগ্ধ বলল,
-“দেখো, আমি অল্পতে রাগি না কিন্তু কেউ বেঈমানি করলে প্রচন্ড রেগে যাই।”
তিতির ভয়ে ভয়ে বলল,
-“বেঈমানকে তার বেঈমানির শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ আছেন।”
-“হ্যা অবশ্যই আছেন। আমি তো শাস্তি দেইনি। আমি শুধু প্রটেস্ট করেছি। আমার প্রটেস্ট করার ধরনটা এমন। আমার বাবা ছোটবেলা থেকে আমকে এভাবে প্রটেস্ট করতে শিখিয়েছেন। তার কারন, মার কেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। আমাদের সোসাইটিতে সবাই ক্রাইম করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর আমরা কাপুরুষের মত হাত গুটিয়ে বসে থাকি! আমরা যত হাত গুটিয়ে বসে থাকবো ক্রাইম ততই বাড়তে থাকবে।”
তিতির চুপ করে বসে রইল। এতক্ষণে একবারও তাকায়নি মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধ বলল,
-“কি হলো? কিছু বলো।”
-“তোমাকে তখন আমার অচেনা লাগছিল। তোমার ফেসটাও বদলে গিয়েছিল।”
মুগ্ধ তিতিরকে বুকে টেনে নিল। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-“কান পেতে শুনে দেখো তো, এই হৃদস্পন্দন অচেনা কিনা?”
তিতির শুনলো ওর চেনা সেই শব্দ, ঢিপঢিপ ঢিপঢিপ ঢিপঢিপ! পেল সেই চেনা ঘ্রাণ। মুগ্ধ একটু সময় দিল তিতিরকে। তারপর বলল,
-“তিতির প্রত্যেকটা মানুষের মাঝেই ভাল খারাপ দুটো দিক থাকে। ভালটা খুব সহজেই মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু খারাপটা একসাথে থাকতে থাকতে সামনে আসে।”
তিতিরের মনে হলো মুগ্ধ তো ঠিকই বলছে। অন্যায় দেখলে যারা চুপ করে থাকতে পারে না তারাই তো প্রকৃত মানুষ। বলল,
-“আমি হঠাৎ তোমকে এভাবে দেখছি বলে হজম করতে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু প্রটেস্ট করা কোনো খারাপ কাজ না। সো এটাকে তোমার খারাপ দিক বলা যাচ্ছে না।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আমি অনেক স্ল্যাং ইউজ করেছি তিতির। তুমি তো জানতে না তোমার মুগ্ধ এত স্ল্যাং ইউজ করে।”
তিতির কিছু বলল না। মুগ্ধ বলল,
-“শুধু মেরেই প্রটেস্ট করা যেত, স্ল্যাং টা এক্সট্রা ছিল যার কোনো দরকার ছিল না। বাট এধরনের সিচুয়েশনে এমনই হয়, আই কান্ট কন্ট্রোল মি। এটা আমার খারাপ দিক। এজন্যই বললাম আজ আমার খারাপ দিকটা তোমার সামনে এসেছে। একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে তোমার সবটা জানা দরকার। সব জেনেশুনে তারপর ডিসিশন নাও।”
তিতির মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে বলল,
-“কিসের ডিসিশন?”
-“আমার সাথে সারাজীবন থাকার ডিসিশন।”
তিতির মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“একদম বাজে কথা বলবে না। আমি ডিসিশন অনেক আগেই নিয়ে ফেলেছি। এখন তুমি যেমনই হও না কেন আমি তোমার সাথেই থাকব।”
-“যদি আমার আরো আরো খারাপ দিকগুলো তোমার সামনে আসে তবুও থাকবে?”
-“তবুও থাকব।”
-“যদি জানতে পারো আমার আরেকটা গার্লফ্রেন্ড আছে তবুও?”
তিতির মুগ্ধকে ছেড়ে দিয়ে ওকে মারতে শুরু করে দিল। মুগ্ধ হাসতে হাসতে ওর দুই হাত একসাথে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এল। তারপর মুখটা ধরে গালে একটা চুমু দিল। তিতির মুগ্ধর বুকে মাথা রাখলো।
নীলাচলের সামনের টিকেট কাউন্টারে জীপ থামতেই মুগ্ধ আর ড্রাইভার নামলো টিকেট কাটতে। তিতিরও নেমে দাঁড়ালো। চিকন রাস্তা দুই ধারে খাদ! অনেক নিচে দূরে বান্দরবান সিটি দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে সাঙ্গু নদী আর অজস্র উঁচ নিচু পাহাড়। মুগ্ধ পাশে এসে দাঁড়ালো। বলল,
-“চলো।”
-“এত তাড়াতাড়ি চলে এলাম?”
-“মাত্র ৬ কিমি তো!”
-“ওহ।”
মুগ্ধ জীপের দরজা খুলতেই তিতির বলল,
-“আবার জীপে উঠব কেন?”
-“এটা তো কাউন্টার। আরেকটু যেতে হবে। হেটে যাবে নাকি?”
-“ওহ।”
জীপ সাঁই করে একবার নিচুতে গিয়ে আবার উঁচুতে উঠে নীলাচলে নামিয়ে দিল। মুগ্ধ জীপটাকে পার্কিং এ দিয়ে ড্রাইভারের নাম্বার নিয়ে বলল,
-“আমরা হাইয়েস্ট ২ ঘন্টা থাকব। তুমি যেখানে ইচ্ছা অপেক্ষা করতে পারো। এসে তোমাকে ফোন দিলে তুমি চলে এসো।”
চওড়া সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল তিতির। ওর মনে হলো ওরা কোনো পার্কে বেড়াতে এসেছে। মানুষের অভাব নেই। মুগ্ধ ওর হাত ধরে বাম পাশের একদম কিনারে নিয়ে গেল। এখানটায় ইটসিমেন্ট দিয়েই গাছের গুড়ির ডিজাইন করে তা দিয়ে বারান্দার মত বানিয়েছে। এখানে এসে সামনে তাকাতেই তিতিরের মন ভাল হয়ে গেল। মুগ্ধ ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
-“কি এখন ভাল লাগছে তো?”
-“হুম। তুমি বুঝতে পেরেছিলে প্রথমে আমার ভাল লাগেনি?”
-“হ্যা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তোমার এক্সপ্রেশন দেখেই বুঝেছি।”
তিতির হাসলো।এরপর মুগ্ধ ওকে হাত ধরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছিল। তিতির দেখলো এখানে একটা গোল দোতলা বিল্ডিং আছে। কাছাকাছি যেতেই বুঝলো এটা একটা রেস্টুরেন্ট। মুগ্ধ রেস্টুরেন্টের দোতলায় চলে গেল। দোতলায় স্টাফদের রেস্টরুম বোধহয়। মুগ্ধ একটা ওয়েটারকে ডেকে বলল ছাদে যেতে চায়। ওয়েটার বলল,
-“পারমিশন নাই।”
মুগ্ধ ওয়েটারের হাতে ১০০ টাকা গুঁজে দিতেই ওয়েটার হেসে হেসে বলল,
-“ভাই আসলে তো এভাবে কাউকে উপরে যেতে দেইনা। বেশিক্ষণ থাকবেন না।”
-“হ্যা হ্যা আমি একটু তোমার আপুকে উপর থেকে পাহাড় দেখিয়েই চলে আসব।”
উপড়ে উঠতে উঠতে তিতির বলল,
-“পুলিশের ছেলে হয়ে তুমি ঘুষ দিচ্ছ?”
-“এটা ঘুষ না। আমাকে ও কিছু দিচ্ছে আমি ওকে কিছু দিচ্ছি, শোধবোধ। তাছাড়া আমাকে অত অনেস্ট ভাবার কোনো কারন দেখি না। আমার প্রয়োজনের জিনিসটা আমি যেভাবে হোক আদায় করে নিই। এটা আমার আরেকটা খারাপ দিক।”
একথা বলেই হাসলো মুগ্ধ। উপরে উঠেই তিতির বুঝলো কেন মুগ্ধ ঘুষ দিয়ে হলেও এখানে নিয়ে এসেছে ওকে। মুগ্ধ একেবারে কিনারে নিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“আশেপাশে তাকিও না। দূরে থাকাও। যতদূরে চোখ যায়।”
তিতির তাই করলো। তারপর মুগ্ধর বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বলল,
-“খুব মনে পড়ছে নীলগিরির কথা। কিভাবে পাহাড় দেখিয়েছিলে আমাকে। আমি তো দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
-“হুম।”
-“আচ্ছা তুমি কি সবাইকে ওভাবে পাহাড় দেখাও?”
-“নাহ, তোমার মধ্যে মুগ্ধতা বেশি তাই তোমাকে দেখিয়েছি।”
এখান থেকে সব পাহড়গুলোকে নীল দেখাচ্ছে। এজন্যই বোধয় এটার নাম নীলাচল। ডান পাশে তাকাতেই দেখতে পেল কয়েকটা ঘর। সবগুলোর চাল নীল। তিতির জিজ্ঞেস করল,
-“ওটা কি?”
-“নীলাচল এস্কেপ রিসোর্ট।”
-“ওখানে কি টুরিস্টরা থাকতে পারে?”
-“হ্যা। গুজব আছে আর্মিরা ছাড়া কেউ থাকতে পারেনা কিন্তু আসলে পারে। আমি তো এক রাত থেকেছি উইদাউট এনি রেফারেন্স।”
-“সত্যি?”
-“হ্যা।”
তিতির ঘুরে দাঁড়াল। মুগ্ধর গলার পিছনে দুহাত বেঁধে বলল,
-“আমি থাকব।”
-“মানে?”
-“তুমি কাল ছুটি নিতে পারবে?”
-“কেন?”
-“তাহলে আজ রাতে ফিরব না। এখানেই থাকব।”
-“পাগল হলে নাকি?”
-“প্লিজ প্লিজ না করোনা।”
-“বান্দরবান টু ঢাকার টিকেট আমি গতকালই চিটাগাং থেকে কেটে রেখেছিলাম।”
-“তো? এখন ফেরত দেয়া যাবে না? আর ফেরতই কেন? আমরা তো যাবই বাট আজকের বদলে কাল বা পরশু। দুদিন পাহাড়ে থাকব। শুধু তুমি আর আমি।”
মুগ্ধ হেসে তিতিরের কোমর জড়িয়ে বলল,
-“আমার পাগলীটার মাথা দেখছি পুরো খারাপ হয়ে গেছে।”
-“এই বলোনা টিকেট চেঞ্জ করা যাবে?”
-“তা যাবে, পরিচিত। অপরিচিত হলেও যেত.. কিন্তু।”
তিতির মুগ্ধর মুখ চেপে ধরে বলল,
-“এত কিন্তু কিন্তু করোনা প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”
মুগ্ধ ওর মুখ চেপে ধরা তিতিরের হাতে চুমু দিয়ে বলল,
-“যদিও আগে বুকিং না দিলে পাওয়া যায় না। তবু চলো দেখছি কি করা যায়।”
ভাগ্য ওদের সাথে ছিলনা। নীলাচলে একটা রুমও পাওয়া গেল না। ইভেন এখন বুকিং দিলে তিন মাস পরে পাওয়া যাবে। একথা শুনে তিতিরের মন খারাপ হয়ে গেল। মুগ্ধ বলল,
-“প্রমিস তোমাকে এখানে আবার আনবো। এই নীল চালওয়ালা এস্কেপ রিসোর্টেই রাখবো। নিলগিরি হিল রিসোর্টেও রাখবো। কিন্তু মন খারাপ করোনা বাবা।”
-“তাহলে অন্যকোথাও থাকি? আজ আমার ঢাকা যেতে ইচ্ছে করছে না। ঢাকা গেলেই তো আর তোমাকে এত কাছ থেকে দেখতে পাব না।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আমরা অনেক কাছাকাছি থাকি তিতির। আর হতে পারে দূর থেকে তবু তো এই মুখটা প্রতিদিনই অফিসে যাওয়ার সময় দেখিয়ে যাই। কাছ থেকেও তো দুএকদিন পর পর দেখা হয়।”
তিতির রাগে গটগট করে বলল,
-“তুমি থাকতে চাচ্ছো না? ওকে চলো।”
বলেই হাটা শুরু করলো। মুগ্ধ দৌড় দিয়ে ওকে ধরে ফেলল। বলল,
-“এই পাগলী! আমি কি বলেছি থাকতে চাচ্ছি না? তোমার কথার প্রেক্ষিতে ওই কথা বললাম।”
তিতির মাথাটা এক দিকে হেলিয়ে বলল,
-“তাহলে বল থাকবে।”
-“আচ্ছা আচ্ছা থাকব। মিলনছড়ি হিল রিসোর্টের কথা মনে আছে বলেছিলাম?”
-“হ্যা, পাখির নামে নাম সব কটেজের।”
-“হুম। ওখানে থাকবে?”
তিতির লাফিয়ে উঠে বলল,
-“উফফফ… ওয়াও!!! চলো চলো।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আন্দাজে গিয়ে কি করবো? খালি থাকলে ফোনেই পাব। চলো নিচে চায়ের দোকান আছে। চা খাই আর খুঁজি কোথায় থাকা যায়।”
-“খুঁজতে হবে? যদি পাওয়া না যায়? আচ্ছা এত বড় বান্দরবানে আমাদের থাকার যায়গা হবে না?”
-“শোনো, সিটিতে তো হোটেলের অভাব নেই। কিন্তু ওখানে থেকে লাভ নেই। কোনো রিসোর্টে থাকলে থাকাটা সার্থক হতো।”
-“তাহলে?”
-“রিসোর্ট না পেলে থাকব না। চলে যাব।”
তিতির মন খারাপ করে রইল। মুগ্ধ জিজ্ঞেস করলো,
-“আচ্ছা তুমি যে আজ রাতে থাকতে চাচ্ছো তোমার ভয় করছে না?”
-“কিসের ভয়? তুমি আছো না? তুমি থাকতে ভয় কিসের?”
-“আরে ভয়টা তো আমাকে নিয়েই।”
-“তোমাকে নিয়ে কি ভয়?”
-“তোমাকে একা পেয়ে যদি ভুল কিছু করে ফেলি।”
-“আমি জানি আমার মুগ্ধ কোন ভুল করতে পারেনা। এর আগেও আমরা অনেক রাত দুজনে একসাথে থেকেছি।”
-“হ্যা, তখন তো তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলেনা।”
-“তাতে কি?”
-“তাতে কি জানোনা? মুগ্ধর তো তোমার উপর অনেক লোভ জন্মেছে যা আগে ছিলনা।”
তিতির মুগ্ধর পিঠে ঘুষি দিতে দিতে বলল,
-“তুমি শুধু শুধু আমাকে কনফিউজড করবে না।”
মুগ্ধ হাসতে লাগলো। তিতির মারপিট থামিয়ে মুগ্ধর হাত জড়িয়ে হাটতে হাটতে বলল,
-“তোমার উপর আমার বিশ্বাস আছে।”
চায়ের দোকানগুলো পাহাড়ের পাশেই। টেবিল আর বেঞ্চ পাতা। অনেক রকম পাহাড়ী জিনিস পাওয়া যায় এখানে। বেঞ্চে বসতেই তিতির খেয়াল করলো ফ্লোরটা কাঠের। দেয়ালগুলো বাশের। ওরা যেখানে বসে ছিল তার দেয়ালগুলো বারান্দার মত অর্ধেক। দূরের সব দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে যা উপর থেকে দেখেছিল কিন্তু এখান থেকে আবার অন্যরকম লাগছে। অত দূরে লাগছে না। মনে হচ্ছে কাছেই। মুগ্ধ দোকানী মেয়েটাকে বলল,
-“দিদি দুটো চা দিয়েন।”
তারপর তিতিরকে জিজ্ঞেস করলো,
-“ম্যাম, বলেন কয়দিনের ছুটি নেব?”
-“দু’দিন।”
-“বুঝে বলো। কারন তারপর আবার বায়না ধরলে রাখতে পারব না। দু’দিন ছুটি নিলে মরতে মরতে হলেও তিন দিনের দিন অফিসে এটেন্ড থাকতে হবে।”
-“হ্যা হ্যা দুদিনই। কাল আর পরশু। কারন, কাল রাতে আমরা রওনা দিব। পরশু সকালে পৌঁছে সারাদিন রেস্ট নিবে। পরের দিন অফিস যাবে।”
-“শুধু আজ রাত আর কালকের দিনটা থাকবে তো?”
-“হ্যা।”
-“আচ্ছা। তাহলে আমি শুধু কালই ছুটি নেব। রেস্ট লাগে না। এতদিন তো রেস্ট করলামই।”
-“তবু জার্নি করে ফিরে একটু রেস্ট নিবে না?”
-“আরে না। একটা ছুটি মানে অনেক কিছু। এভাবে রেস্ট নিয়ে নষ্ট করার মানে হয়না। আমি ট্যুরে গেলে ভোরবেলা ফিরেই অফিস যাই, অভ্যাস আছে।”
তিতির আর কিছু বলল না। মুগ্ধ ফোন করে একদিন ছুটি নিয়ে নিল। তারপর মিলনছড়ি হিল রিসোর্টে ফোন দিয়ে জানতে পারলো কোন কটেজ খালি নেই। তিতির বলল,
-“এখন কি হবে?”
-“দেখছি।”
কিছুক্ষণ নাম্বার ঘেটে তারপর বলল,
-“তিতির, আমি এখন ফোন করছি আমার সবচেয়ে প্রিয় রিসোর্টের কেয়ার টেকারের কাছে। অমায়িক লোক, অনেকটা মংখাইয়ের মত। দোয়া করো যাতে ওখানে একটা ব্যবস্থা হয়।”
-“ওকে।”
তিতির খুব এক্সাইটেড ছিল। ফোন করল,
-“হ্যালো।”
-“হ্যালো, বংশী দা.. মুগ্ধ বলছি।”
-“আরে সাহাব। আপ? আপ কাহাসে?”
-“বান্দরবান থেকেই। কোনো কটেজ খালি আছে? বউ নিয়ে এসেছি।”
-“আপ সাদি ভি কার লিয়া? সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ!”
-“হ্যা দাদা। এবার একটা কটেজ দাওনা গো।”
-“লেকেন দুখ কি বাত ইয়ে হে সাহাব, কোয়ি ভি কামরা খালি নেহিহে।”
-“আহা। গেল সব।”
-“কা গায়া সাহাব?”
-“খুব ইচ্ছে ছিল তোমাদের “হলিডে ইন” এই থাকব। আমার বউটা ওইরকম যায়গা খুব পছন্দ করত।”
-“আফসোস কি বাত হে। আগার আপ হামকো কুছ দিন পেহলে বাতা দে তো হাম আপকো অর বিবিজিকো লিয়ে ও লেকওয়ালা কামরা রাখ দেতা।”
-“হুট করে এসেছি। কোনো প্ল্যানিং ছিলনা দাদা। আচ্ছা, কি আর করা। রাখছি তাহলে।”
-“আচ্ছা সাহাব, কেয়া আপ হামকো কুচ সামে দে সাকতা? হাম ম্যানেজার সাহাব কো পুছকে বাতা তা হু কেয়া তাম্বু খাটানা যাবে কি নেহি!”
-“দাদা আমি তো তাঁবু আনিনি।”
-“হামারে পাস তো হেয়।”
-“ওহ, আচ্ছা দেখ তাহলে।”
-“ঠিক হেয় সাহাব। ম্যানেজারবাবু বান্দরবান গায়া হেয়। কুছ দের বাদ আয়েগা।”
-“আচ্ছা আচ্ছা।”
আরো কয়েকটা রিসোর্টের ফোন নাম্বার ছিল মুগ্ধর কাছে। একে একে সব গুলোতে ফোন করলো মুগ্ধ। কোনোটাতেই কোনো কটেজ খালি নেই। তিতিরের মনটা পার্মানেন্টলি খারাপ হয়ে গেল। আর মুগ্ধ শেষপর্যন্ত বংশীর আশায় রইলো।
বিকেলটা নীলাচলে কাটিয়ে ওরা বান্দরবানে ফিরে এল। সন্ধ্যা হতে হতে মুগ্ধ তিতিরকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেল যার নাম মেঘদূত। এটা যে রেস্টুরেন্ট সেটা বুঝতেই কতক্ষণ সময় লেগে যায়। বান্দরবান ক্যান্টনমেন্টের শুরুতেই রাস্তার ডান পাশে একটা বড় একতলা বিল্ডিং। বিল্ডিং এর একপাশে বিশাল কিচেন আর কাউন্টার। অন্যপাশে রেস্টুরেন্ট, এসি জোন। সামনে বাগান। বাগানে কম করে হলেও ১০/১২ টা টেবিল। মাঝখানে পানির ফোয়ারা। মুগ্ধ তিতিরকে জিজ্ঞেস করলো,
-“কোথায় বসবে? ভেতরে না বাগানে?”
-“অবশ্যই বাগানে।”
বাগানের কোনো টেবিলই খালি ছিল না। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একটা টেবিল খালি হলো। মুগ্ধ বলল,
-“এখনে গিয়ে অর্ডার করতে হয়। তুমি বসো আমি অর্ডার করে আসি।”
-“আচ্ছা।”
মুগ্ধ অর্ডার করে ফিরে এসে বলল,
-“মুখটা প্যাঁচার মত করে রেখোনা তো। তোমাকে পেঁচিমুখী রুপে মানায় না।”
তিতির ক্ষেপলো না, মারলো না কিছুই করলো না। চুপ করে বসে রইল। মুগ্ধ বলল,
-“আরে বাবা। আমি তো চেষ্টা করলাম। এত মন খারাপ করার কি আছে? কদিন পর নাহয় আগে থেকে বুকিং দিয়ে আসব।”
তিতিরের মন তাতে ভাল হল না। ও বলল,
-“আমি কোন কিছু একবার ঠিক করলে তারপর যদি না করতে পারি খুব অস্থির লাগে, আর কিছুই ভাল লাগে না তখন।”
-“দেখছি তো বাবা। একটু ধৈর্য ধর। বংশী ম্যানেজারের সাথে কথা বলেই জানাবে। থাকার ব্যবস্থা হলে তো জানাবেই নাহলেও জানাবে। কারন ও জানে আমি অপেক্ষা করছি।
খাবার চলে এল। মুগ্ধ গপাগপ খাচ্ছে। তিতির এখনো মুখেই দেয়নি। মুগ্ধ ওকে খাইয়ে দিতে চাইল। বলল,
-“একবার খেয়ে দেখো খাবাবগুলো। ঢাকায় কোথাও নেই এত টেস্টি কাবাব। আর এই কাবাব টার নাম “অস্কার পুলে”। সাথে বসনিয়া রুটি। আমার জানামতে বসনিয়া রুটি পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের আর কোথাও অস্কার পুলে পাওয়া যায়না। একবার মুখে দিয়ে দেখ জাস্ট, অমৃত।”
-“আমার খেতে ইচ্ছে করছে না তুমি খাও।”
মুগ্ধ রেখে দিল। বলল,
-“যাও আমিও খাবনা। খিদে নিয়ে সারারাত বসে থাকব।”
এমন সময় মুগ্ধর ফোন বেজে উঠলো। বংশী কল করেছে। তিতির ওর হাত আটকে ধরে বলল,
-“প্লিজ ফোন ধরোনা। যদি বলে ব্যবস্থা হয়নি আমি হার্ট অ্যাটাক করবো।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আরে দুটোই তো হতে পারে। ফোন না ধরলে জানবো কি করে?”
-“জানিনা আমি।”
ফোন কেটে গেল ততক্ষণে। এবার মুগ্ধ নিজেই কল করলো।
To be continued…

প্রেমাতাল পর্ব – ২৮ || মৌরি মরিয়ম

তিতির শুয়ে আছে কিন্তু ঘুম আসছে না। পিউ ওর পাশে শুয়ে বিভিন্নরকম গল্প জুড়ে দিয়েছে। প্রত্যেকটা কথা এত আগ্রহ নিয়ে বলছে যে তিতির হাসি হাসি মুখ করে শুনছে, নিজের অজান্তেই পিউয়ের কথায় তাল মেলাচ্ছে। কিন্তু একটা শব্দও তিতিরের কান পর্যন্ত যাচ্ছে না। ওর মাথায় একটা ব্যাপারই ঘুরছে! মুগ্ধ অপেক্ষা করছে ওর জন্য। তখন ডিনার টাইম হয়ে গিয়েছিল আর সবাই জেগেও ছিল তাই মুগ্ধ তিতিরকে নিয়ে তখনই রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছিল। তারপর খেয়েদেয়ে যাওয়ার সময় সুযোগ বুঝে বলেছিল,
-“শাড়িটা চেঞ্জ করোনা। রাতে পিউ ঘুমিয়ে পড়লে আমার ঘরে পারলে একবার এসো। ভেবো না, খেয়ে ফেলব না। শুধু দেখব, দু’চোখ ভরে দেখবো, প্রাণভরে দেখবো। তখন তোমাকে দেখতেই পারিনি। এসো কিন্তু, অপেক্ষা করবো।”
পিউ ঘুমাচ্ছে না, যাবে কি করে ও? এমন সময় মুগ্ধর ফোন এল। তিতির ধরলো না। পিউ বলল,
-“আরে ধরো, কথা বলো। আমি নাহয় একটু পরেই বলি। আমার সামনে অস্বস্তি লাগলে বারান্দায় গিয়েও কথা বলতে পারো।”
তিতির বারান্দায় চলে গেল। ফোন ধরে হ্যালো বলতেই মুগ্ধ দু’লাইন গাইল,
“আর কত রাত একা থাকবো?
চোখ মেলে দেখবো না তোমাকে,
স্বপ্নের রঙে ছবি আঁকব….
-“আমি কি করবো বলো? পিউ তো ঘুমাচ্ছে না। ওর সামনে দিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?”
-“না না পাগল? ছোট বোন না আমার?”
-“সেটাই।”
-“কতক্ষণ আর, ঘুমিয়ে পড়বে একসময়। তারপর এসো। আমি জেগে আছি, নো প্রব্লেম।”
-“আচ্ছা।”
-“শোন?”
-“কি?”
-“এই সারপ্রাইজিং প্ল্যান টা কি মায়ের ছিল?”
-“হুম, নাহলে গয়নাগাটি কোথায় পেতাম? আর আমি তো শাড়িও পড়তে পারিনা। মা পড়িয়ে দিয়েছে।”
-“ওহ। ওগুলো কি মা তোমাকে একেবারে দিয়ে দিয়েছে?”
-“হুম। কিন্তু আমি বলেছি এগুলো এখন মায়ের কাছেই থাকবে। আমি বউ হয়ে এলে দিতে। এখন এগুলো আমি যত্ন করে রাখতে পারব না। তাছাড়া বাসায় যাওয়ার পর আম্মু জিজ্ঞেস করলে বলবোই বা কি?”
-“ওহ, তাও ঠিক।”
-“সেজন্যই নেইনি। মাকে বুঝিয়ে বলেছি, মা বুঝেছে।
-“দেখেছো আমার মা কত রোমান্টিক?”
-“হুম। সত্যি অনেক অনেক রোমান্টিক।”
-“আচ্ছা তিতির, তুমি এখন যাও পিউ কে ঘুম পাড়াও।”
তিতির হেসে ফোন রেখে দিল। তিতির ঘরে ঢুকতেই গল্প কন্টিনিউ করলো পিউ।
তিতির চোখ মেলে দেখলো পিউ নেই পাশে। আলো দেখে কান্না পেল ওর। সকাল হয়ে গেছে! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল ৮ টা বাজে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়ালই তো নেই। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো মুগ্ধর ৩ টা মিসড কল আর ২ টা মেসেজ জমে আছে। ফার্স্ট মেসেজটা ওপেন করলো,
“Amar ghumkumari ki amake opekkhay rekhe ghumiye porlo?”
রাত ২ টার দিকে এসেছে এই মেসেজ।
সেকেন্ড মেসেজ,
“Accha ghumao tahole, bt amr ghumer 12 ta beje gese, tmr neel shari pora bou mukhta chokhe vashche.. Good night.. ok?”
এই মেসেজটা এসেছে ভোর সাড়ে ৪ টায়। তিতির এবার আর কান্না আটকে রাখতে পারলো না। পিউ রুমে ঢুকে দেখলো তিতির কাঁদছে। বলল,
-“ভাবী কি হয়েছে তোমার? কাঁদছ কেন?”
তিতির কান্না থামাতে চাইছে কিন্তু পারছে না, কিছুতেই কান্না থামছে না। পিউ বলল,
-“আরে বলোনা কি হয়েছে? প্লিজ বলো। আমার খুব খারাপ লাগছে।”
তিতির কি বলবে ভেবে পেলনা। সত্যিটা তো আর বলতে পারবে না। তিতিরের হাতে মোবাইল দেখে পিউ জিজ্ঞেস করলো,
-“কোনো খারাপ খবর পেলে নাকি?”
তিতিরের মাথায় কিছু আসলো। ও বানিয়ে বলল,
-“তোমার ভাইয়া অনেকগুলো কল করেছিল, অনেক রাতে। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম ধরতে পারিনি। মাত্র দেখলাম। ও সারারাত জেগে ছিল।”
পিউ তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“আহারে! ভাবী, ফোন ধরতে পারোনি বলে কাঁদছ! তুমি ভাইয়াকে এত্ত ভালবাসো? “
তিতির বলল,
-“না, ও সারারাত জেগে আমাকে কল করেছে, নিশ্চই মিস করছিল। অথচ আমি এমন মরা ঘুম দিয়েছি যে কিছু টেরই পাইনি। ও আমাকে যেমনভাবে ভালবাসে আমি কোনদিনও বোধহয় সেভাবে বাসতে পারব না। আমি খুব খারাপ।”
পিউ তিতিরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“এই পাগলী! কান্না করে না। ভাইয়া রাতে ঘুমায়নি তো কি হয়েছে? এখন তো ঘুমাচ্ছে। ও তো এতক্ষণ ঘুমায় না, ভোরবেলাই উঠে যায়। কাল রাতে ঘুমায়নি বলেই হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে।”
কোন কথায় কাজ হলোনা তিতির কাঁদতেই থাকলো। মা পিউকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকলো,
-“পিউ এই পিউ? এতক্ষণ লাগে আসতে? কি করছিস তুই?”
ঘরে ঢুকতেই মা তাজ্জব বনে গেলেন। কাছে এসে পিউকে সরিয়ে তিতিরের কাধে হাত রেখে বললেন,
-“কি হয়েছে আমার লক্ষী আম্মুটার? কাঁদছে কেন?”
তিতির কিছু বলল না। পিউ সবটা বলতেই মা হেসে তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
-“বাহ! আমার ছেলে দেখছি খুব ভাগ্যবান। এটুকুর জন্য বউ এমনভাবে কাঁদছে! বউটা যদিও একদম ছেলেমানুষ, একদম আনাড়ি! কিন্তু বুকে প্রেম আছে গদগদ! আজ বুঝলাম ছেলে আমার কি করে তোমার জন্য এত পাগল হলো!”
তিতির এ কথায় লজ্জা পেয়ে গেল। মা তিতিরের চোখদুটো মুছে বলল,
-“সত্যি এই দুদিন আমি তোমাকে যতটুকু দেখেছি তাতে আমি বুঝে গেছি, আমার ছেলে তোমার সাথে ভাল থাকবে। এই চুজি, মুডি ছেলেটাকে নিয়ে আমি খুব চিন্তায় ছিলাম। আজ আমি নিশ্চিন্ত! ওকে সারাজীবন এমনভাবেই ভালবেসো মা। কখনো ওকে একলা ছেড়ো না। তোমার আর কিচ্ছু করতে হবে না, আর কোনো দায়িত্ব নেই। বাকী সবকিছু আমার ছেলেই সামলে নেবে।”
তিতির কিছু বলল না। কিন্তু কান্না থামলো। পিউ বলল,
-“ভাবী তোমাদের বাস যেন কয়টায়?”
-“তোমার ভাইয়া তো বলেছিল ১১ টায়।”
মা বলল,
-“যাবেই যখন আরো আগে রওনা দিলে ভাল হতো। রাত হয়ে যাবে না যেতে যেতে?”
পিউ বলল,
-“ভাইয়া বুঝবে ওসব! এসব ব্যাপারে আমাদের চেয়ে ভাইয়ার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি, ১১ টার বাসে যখন যাচ্ছে নিশ্চই ভাল বুঝেই যাচ্ছে।”
তিতির কিছু বলল না। মা বলল,
-“আচ্ছা মা, এখন ওঠো। শাড়ি পালটে নাও। ফ্রেশ হয়ে নাও।”
-“আমি একেবারে গোসল করে ফেলব। সারাদিন তো জার্নি করতে হবে।”
-“ও হ্যা। ঠিকাছে করো।”
মা ঘর বের হবার সময় পিউকে বলল,
-“মুগ্ধকে এখনি ডাকিস না। সারারাত যখন ঘুমায়নি আরেকটু ঘুমাক।”
তিতির গোসল করে ড্রইং রুমে আসতেই মা বলল,
-“তিতির নাস্তা করে নাও। আমরা সবাই অনেকক্ষণ আগেই নাস্তা করে ফেলেছি।”
-“ও উঠুক, একসাথেই খাব।”
-“ওর তো উঠতে দেরী হতে পারে। তুমি খেয়ে নাও না।”
-“দেরী হলেও সমস্যা নেই। আমার খিদে পায়নি।”
-“পাগলী।”
সাড়ে নটার দিকে তিতির পিউয়ের ঘরে বসে শেষ গোছগাছ টা সেড়ে নিচ্ছিল। পেছন থেকে মুগ্ধ বলল,
-“এইযে সুন্দরী! এভাবে ছলনা করলে আমার সাথে? এটা কি ঠিক হলো?”
তিতির এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে দৌড়ে গিয়ে মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরলো। মুগ্ধও ওকে জড়িয়ে ধরতেই কেঁদে ফেলল।”
-“আরে আরে! কি হলো এটা? কাঁদছ কেন?”
-“সরি, আমাকে মাফ করে দাও।”
-“মাফ এর কথা আসছে কোত্থেকে?”
-“তোমাকে আমি সারারাত অপেক্ষা করিয়েছি। তারপর ভোম্বলের মত ঘুমিয়েছি। আমি খুব খারাপ। আমি অমানুষ। আমি জঘন্য।”
-“এই পাগলী, থামো। নাহলে চড় মেরে দাত ফেলে দেব। কতবড় সাহস! আমার বউকে যা তা বলা!”
তিতির থামছেই না। মুগ্ধ তিতিরের মুখটা তুলে ভেজা চোখে চুমু দিয়ে বলল,
-“আজ রাতে তো বাসে একসাথেই থাকবো, পুষিয়ে দিও।”
তিতির কিছু বলল না। মুগ্ধ বলল,
-“অনেক হয়েছে। এবার থামো আর ব্রেকফাস্ট করতে চলো। আধাঘণ্টার মধ্যে বের হতে হবে নাহলে বাস মিস করবো।”
ওরা যখন বের হচ্ছিল মুগ্ধর মা তিতিরকে জড়িয়ে ধরলেন, কপালে চুমু দিলেন। পিউকেও জড়িয়ে ধরে বিদায় নিল তিতির। এদের ছেড়ে যেতে কেন জানি কষ্ট হচ্ছে, এরা যেন পর কেউনা। শুধু ২/৩ দিন না শতজনমের চেনা।
প্ল্যানমাফিক ওরা ১১ টার বাসে বান্দরবান রওনা হল। যদিও ১ ঘন্টা লাগার কথা কিন্তু প্রায় ১ টা বেজে গেল পৌঁছতে। বাস থেকে নেমে মুগ্ধ বলল,
-“বান্দরবানে এখন আমাদের কাজ হলো খালি খাওয়া।”
-“মানে? আসলেই এখানে কি প্ল্যান তার কিছুই বলোনি আমাকে।”
-“বলবো কি করে? এসব ডিসকাশন বাসায় বসে করলে প্রব্লেম না?”
-“হুম। এখন বলোনা আমরা কোথায় কোথায় যাব? এই নিলগিরি যাব?”
-“নাহ। নিলগিরি অনেক দূর রে বাবা। আমরা এখন আমার প্রিয় এক রেস্টুরেন্টে ভাত খাব। তারপর নীলাচল যাব। নীলাচল থেকে ফিরে আবার যাব আরেকটা প্রিয় রেস্টুরেন্টে কাবাব খেতে। তারপর ১০ টার বাসে ঢাকা।”
-“নীলাচল কি নিলগিরির মতই না?”
-“না নীলাচল ১৬০০ ফিট উঁচু। তবে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন অংশে কম না, অস্থির অস্থির।”
-“ওহ, ওয়াও।”
-“চলো চলো আগে খেয়ে নিই। তারপর নীলাচল যাই।”
-“আমার অত খিদে পায়নি। এসেও খেতে পারি।”
-“না, তখন স্পেশাল আইটেম গুলো শেষ হয়ে যাবে আর নীলাচলেও বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।”
-“আচ্ছা, তাহলে চলো।”
মুগ্ধ একটা রিক্সা ডাকলো,
-“এই মামা, রাজার মাঠ যাবা?”
-“১৫ টাকা।”
-“হ্যা চলো।”
রিক্সায় উঠেই মুগ্ধ ফিসফিস করে তিতিরের কানে কানে বলল,
-“মজার ব্যাপার কি জানো? এখানকার রিক্সায় শহরের মধ্যে তুমি যেখানেই যাওনা কেন ভাড়া ১৫ টাকা।”
-“সেটা কি করে সম্ভব?”
-“সম্ভব কারন, শহরটাই এমন ছোট। শহরের বাইরে আবার ভাড়া বেশি।”
-“ওহ।”
রিক্সা থামলো একটা রেস্টুরেন্টের সামনে নাম “চড়ুইভাতি”। অপজিটে একটা মাঠ। তিতির বলল,
-“এটাই রাজার মাঠ?”
-“হুম।”
ভেতরে ঢুকতেই ম্যানেজার হাত বাড়িয়ে বলল,
-“আরে মুগ্ধ ভাই যে!”
মুগ্ধ হ্যান্ডশেক করে বলল,
-“কেমন আছেন রফিক ভাই”
-“ভাল। অনেকদিন পর এলেন।”
-“ওইতো ভাই আসলেই দৌড়ের উপর ভেতরে চলে যাই। শহরে তো থাকা হয়না।”
এরপর লোকটা তিতিরকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“ভাবী নাকি?”
-“হ্যা।”
-“বাহ! বসেন বসেন কি খাবেন বলেন?”
মুগ্ধ এক নিঃশ্বাসে বলল,
-“বাঁশ কুরুইল, বেম্বো চিকেন, রুপচাঁদা ফ্রাই। আর ভর্তা যা আছে।”
তিতির বলল,
-“এতকিছু কে খাবে?”
-“তুমি না খেতে পারলেও আমি পারবো। সো ডোন্ট ওরি।”
খাওয়া শুরু করতেই তিতির অবাক। রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে মনেই হচ্ছে না। একদম বাসার রান্নার মত। এত মজার রুপচাঁদা ফ্রাই তো মাও করতে পারেনা বাসায়। আর পাহাড়ী আইটেম দুটোর তো কোনো তুলনাই হয়না। লাস্ট মোমেন্টে মুগ্ধ বলল,
-“কি বুঝলে?”
-“অসাধারণ!”
-“আর দুটো রুপচাঁদা নেই কি বলো? ভাত খাওয়ার যায়গা তো আর নেই পেটে। শুধু মাছ খাই?”
-“আমিই তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম যে আরো দুটো মাছ নাও।”
আরো দুটো মাছ নেয়া হলো খাওয়াও হলো। আর সবশেষে কফি। কফিতে চুমুক দিয়ে তিতির বলল,
-“কফিটাও জোস!”
-“হুম।”
রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে আবার বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রিক্সা নিল ওরা। রিক্সায় উঠেই তিতির বলল,
-“তোমার সাথে থাকলে আমি পুরা মটুস হয়ে যাব। দেখো ৩ দিনে কি ফুলে গেছি।”
-“ফুলে যাওনি। তবে একটু ভরা ভরা লাগছে। বেশ লাগছে, অত টিংটিঙে থাকার চেয়ে এই ভাল।”
এতক্ষণে রিক্সা চলে এসেছে। ভাড়া মিটিয়ে দুজনে হাটছে। মুগ্ধ বলল,
-“নীলাচলের জন্য একটা কিছু নিতে হবে।”
তিতির কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আর বলা হলো না তার আগেই মুগ্ধ দৌড় দিল। তিতির কিছুই বুঝলো না মুগ্ধ দৌড় কেন দিল! কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলো মুগ্ধ একজনকে ধরে মারতে শুরু করেছে। মারতে মারতে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। এখন লাথি মারছে। উফ কি ভয়ঙ্কর! কি অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে মুগ্ধ! লজ্জায় তিতির কান চেপে ধরলো। একি সত্যিই মুগ্ধ নাকি অন্য কেউ? মুগ্ধ এতটা হিংস্র কি করে হলো! আর ওর মুখের ভাষা এতটা নিচে নামলো কি করে। তিতির দৌড়ে চলে গেল ওদের কাছে। গিয়ে দেখলো মুগ্ধ যে ছেলেটাকে মারছে সে হাসু। তিতির বিস্ময়ে হাত চেপে ধরেছে মুখে। আশপাশ থেকে অনেক লোক এসে ভীর হয়ে গেছে কিন্তু কেউ এসে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। তিতির কি আগাবে? এগিয়ে থামাবে ওকে? বুঝতে পারছে না কিছুই। সিএনজি মহাজন এসে বলল,
-“ভাই কি হইসে আমাগো একটু কন। এমনে মারতাসেন ক্যান?”
মুগ্ধ হাসুর কলার ধরে দাঁড় করিয়ে বলল,
-“বল কি করিসিলি? বল? তুই না বললেও আমি বলবো। সব প্রমাণও কিন্তু আছে, ডিসাইড কর কি করবি। তাড়াতাড়ি, হাতে সময় নাই।”
হাসু মুগ্ধর পা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“ভাইজান আমারে মাফ কইরা দেন। খোদার কসম আর জীবনে এমুন কাম করুম না।”
মুগ্ধ ওকে সজোরে লাথি মেরে ফেলে দিল রাস্তায়। তারপর বলল,
-“তোরে মাফ চাইতে কেউ বলে নাই। সেদিন কি করসিলি সেইটা বল সবার সামনে।”
মহাজন হাসুকে রাস্তা থেকে তুলে জিজ্ঞেস করলো,
-“কিরে ভাইজান রে চিনোস? কি করসিলি? এমনে মারতাসে ক্যান?
মুগ্ধ ওকে আবার মারতে যাচ্ছিল তার আগেই ও গড়গড় করে সব বলে দিল। কিভাবে ডাকাতদের হেল্প করেছিল সব। শেষে আবার মুগ্ধর পা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“বিঃশ্বাস করেন ভাইজান আমার এইসব কাজ করিনা। কিন্তু সেদিন না করলে ওরা আমারে মাইরা ফালাইতো। ভয় দেখাইয়া আর টাকার লোভ দেখাইয়া রাজী হইতে বাধ্য করসে।”
মুগ্ধ আবার লাথি মেরে বলল,
-“ঘরে মা নাই? বোন নাই? বউ নাই? তাদের জন্য চিন্তা হয় না? অন্য মেয়েরাও কারো না কারো মা, বোন, বউ। শালা অমানুষের বাচ্চা।”
মহাজন বলল,
-“ভাইজান এবার আপনেরে আমি চিনছি। ৪/৫ মাস আগে অরেই আমি পাডাইসিলাম আপনের লগে। মাফ কইরা দিয়েন ভাই। অয় যে এমুন আমি আগে জানতাম না।”
তারপর হাসুর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আইজ থেকা তুই আর আমার সিএনজি চালাইতে পারবি না। ডাকাইতগো লগেই কাম কর যাইয়া। যা দেনা-পাওনা আছে সাজের বেলা আইসা নিয়া যাইস।”
মুগ্ধ আর কোন কথা না বলে তিতিরের হাত ধরে বেড়িয়ে এল ভীর কাটিয়ে।
জীপে বসে আছে তিতির-মুগ্ধ। জীপ চলছে উঁচু নিচু পাহাড়ী রাস্তায়। গন্তব্য নীলাচল। অনেকখানি রাস্তা চলে এসেছে। দুজনের একজনও একটি কথাও বলেনি। তিতিরের বিস্ময় এখনো কাটেনি। আজ মুগ্ধর অজানা এক রূপ ঝুলি থেকেই যেন বেরিয়ে এল তিতিরের সামনে। খুব ভয় পেয়েছিল তিতির। রেগে গেলে কি মুগ্ধ ওর সাথেও এত বাজে ভাষায় কথা বলবে? এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তিতিরের। সত্যি সারাজীবন একসাথে থাকলেও মানুষ চেনা যায়না। ওর তো মাত্র ৪ মাস!
To be continued…

প্রেমাতাল পর্ব – ২৭ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধর পরিবারের সবাই যেমন ছিল ওর বাবা ছিল তার পুরোপুরি উলটো। উনি খুব সিরিয়াস টাইপের মানুষ। কিন্তু মুগ্ধ বেশ সাবলীল ছিল ওর বাবার সাথে। তিতির ভাবতেও পারেনি এতবড় একটা ইন্টারভিউ ওকে দিতে হবে ওনার কাছে। সকালবেলা ১০/১১ টার দিকে উনি এসেছিল। তিতির-মুগ্ধ তখন বাগানে ছিল। বাবা ওদের দেখতে পায়নি। কিন্তু ওরা দেখতে পেয়েছিল। ওনার ইউনিফর্ম দেখে তিতির মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করেছিল,
-“তোমার বাবা পুলিশ?”
মুগ্ধ হেসে বলেছিল,
-“হ্যা।”
-“কই কখনো বলোনি তো!”
-“তুমিওতো কখনো জিজ্ঞেস করোনি।”
-“তা বলে তুমি বলবে না?”
-“বাদ দাও, শোনো মায়ের মত ওনাকেও পা ধরে সালাম করতে যেও না যেন। অতিভক্তি চোরের লক্ষণ ভাববে। এমনি মুখে সালাম দিও।”
তিতির পরে বুঝেছিল মজাটা। ওর বাবা এত এত কোশ্চেন করেছিল যে তিতিরের মনে হচ্ছিল ও কোন আসামী। প্রশ্নপর্ব শেষ হতেই উনি বলেছিল,
-“মুগ্ধ এমন সময় হুট করে তোমাকে নিয়ে আসলো যখন আমি খুবই ব্যস্ত। শুধু তোমার সাথে দেখা করার জন্যই আমি বাসায় এসেছি। আবার লাঞ্চের পরই চলে যাব ৩ দিনের জন্য। তবে এই তাড়াহুড়ো করে আসাটা সার্থক। তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে।”
লাঞ্চ করেই বাবা চলে যায়। যাওয়ার সময় মুগ্ধকে সাথে করে নিয়ে যায়। তিতিরের বিকালটা মা আর পিউএর সাথে সুন্দরভাবে কেটে যায়। ওরা এত আপন করে নিয়েছে যে তিতিরের মনেই হচ্ছে না ও প্রথমবার এসেছে।
সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত হয়ে গেল। মুগ্ধর আসার খবর নেই। তিতির মুগ্ধকে ফোন করল কিন্তু মুগ্ধ ধরলো না। কিছুক্ষণ পর মুগ্ধ কলব্যাক করলো,
-“আমার তিতিরপাখি টা কি করছে?”
-“তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
-“আমাকে বাবা একটা কাজে পাঠিয়েছিল। কাজ শেষ, আমি ফিরছি ৪০-৪৫ মিনিটের মধ্যেই।”
-“তাড়াতড়ি আসো না। তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।”
-“সারপ্রাইজ? আমি যদি খুব তাড়াতাড়ি চালাই তাহলেও তো ৩০ মিনিট লাগবে। তার আগে তো পারবো না বাবা।”
-“এই না না। আস্তে চালাও, কোনো সারপ্রাইজ নেই।”
মুগ্ধ হাসলো। তিতির বলল,
-“আচ্ছা, বাইকটা তুমি ঢাকা নিয়ে যাওনা কেন? তাহলে এতদূর থেকে অফিসে যেতে কষ্ট হতো না। দেড়ঘন্টা আগেও রওনা দিতে হতো না।”
-“এটাতো বাবার বাইক! মাকে পেছনে নিয়ে ডেটে যায়।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ আরো বলল,
-“আমাদের এদিকটা শহর থেকে কতদূরে দেখেছো? বের হওয়ার সময় রিক্সা,সিএনজি যে কোনটাই পাওয়া মুশকিল তখন এই বাইকটাই কাজে দেয়। পিউ, স্নিগ্ধ সবাই চালাতে পারে।”
-“সিরিয়াসলি?”
-“হুম।”
-“বাহ!”
-“তাহলে তুমিও একটা বাইক কিনে নাও।”
-“নাহ, আমি একটা গাড়ি কিনবো।”
-“ও।”
-“মনে মনে কি ভাবছো গাড়ি কেনার এত টাকা কোথায় পাবো?”
-“না না তা কেন ভাববো?”
-“ভাববে না কেন? আমার বাবার তো অনেক টাকা নেই, আমারও নেই। গাড়ি কেনার টাকা কোথায় পাব ভাবা উচিৎ তোমার!”
-“কোথায় পাবে?”
-“নতুন অফিস আমার কাজে খুবই সন্তুষ্ট! এক বছরের মাথায় একটা প্রমোশন হতে পারে। হয়ে গেলে আমি ইচ্ছে করলে কার লোন অথবা হোম লোন নিতে পারবো। তখন আমি কার লোন নিব।”
-“ওহ।”
-“শোনো তিতির, এরকম হয়ে থাকলে কিন্তু তোমার সংসার ভেসে যাবে।”
-“মানে? বুঝিনি।”
-“মানে এইযে তোমার হাসবেন্ড কি করছে, কেন করছে, কিভাবে করছে তুমি তার খবর রাখবে না? আমি বললাম গাড়ি কিনবো তুমি জিজ্ঞেসও করলে না কিভাবে কিনবো! একটু কৌতূহল থাকা ভাল। তা নাহলে তোমার হাসবেন্ড দুনিয়ার আকাম করে বেড়ালেও তুমি টের পাবে না। হাসবেন্ডের এধরণের সকল কার্যকলাপ সম্পর্কে জানার অধিকার ওয়াইফের আছে। “
তিতির হেসে বলল,
-“তোমার ব্যাপারে আমার অনেক কৌতূহল। কিন্তু তোমার কাজের ব্যাপারে কোন কৌতূহল নেই। আমি জানি তুমি যাই করবে ঠিকই করবে, তুমি কোনো অন্যায় করতেই পার না।”
-“বিঃশ্বাস ভাল, অন্ধবিশ্বাস ভাল না।”
-“তেমনি ভালবাসা ভাল, অন্ধভালবাসা ভাল না। তুমি আমাকে অন্ধভাবে ভালবাসো, আমি তোমাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করি.. যাও কাটাকাটি।”
মুগ্ধ হেসে ফেলল। তিতির বলল,
-“এসব কথা বলে আর সময় নষ্ট করোনা প্লিজ, আসো।”
-“এত তাড়া কিসের? চুমু দিবে?”
-“এই আমি রাখি।”
তিতির ফোন রেখে দিল। তিতির মনে মনে বলল, ‘আমি তো নিজে থেকে দিতে পারব না। কিন্তু তুমি যদি চাও আজ আর বাধা দেবনা আমি।’
মুগ্ধ ফিরলো প্রায় ৩৫ মিনিট পর। রাত প্রায় ১০ টা বাজে। বাড়িতে ঢুকেই দেখলো ড্রইংরুমে পিউ টিভি দেখছে। মুগ্ধ জিজ্ঞেস করলো,
-“সবাই কোথায় রে?”
-“সবাই নাকি ভাবী?”
-“মারবো এক চড়। বাসায় ঢুকে সবসময়ই তো আমি সবার খোঁজ নেই। এটা কি নতুন নাকি?”
-“আচ্ছা সরি, স্নিগ্ধ পড়তে বসেছে। মা আর ভাবী রান্নাঘরে। ভাবী যেন কি বানাচ্ছে।”
-“ও।”
মুগ্ধ নিজের ঘরে চলে গেল ফ্রেশ হতে। তিতির টের পেয়েছে মুগ্ধ এসেছে। ও এখন মাছের কাবাব বানাচ্ছে যেটা মুগ্ধ খুব পছন্দ করেছিল। তাই এখনো ওর সামনে যেতে পারেনি। বুকটা ঢিপঢিপ করছে যেন প্রেম হওয়ার পর ওদের প্রথম দেখা হতে যাচ্ছে। মুগ্ধ এসেছে শুনে মা ওর জন্য চা বানাচ্ছিল। শেষ হতেই বলল,
-“এই নাও, চা টা মুগ্ধকে গিয়ে দাও।”
-“এত রাতে চা?”
-“ও খায়। বাসায় ফিরেই চা খায়। তাতে নাকি ও এনার্জি পায়।”
-“ওহ, আচ্ছা।”
-” আর তোমাকে দেখে কি বলল আমাকে বলতে হবে কিন্তু। লজ্জা পেলে চলবে না।”
একথা শুনেই তিতির লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। মা ওকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“আচ্ছা লজ্জা পেও। লজ্জাতেই তোমাকে মানায়, তাছাড়া এই যুগে লাজুক বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবে কে জানে পরে কেমন হয়ে যাবে।”
তিতির কিছু বলল না। মুচকি হাসলো। মানুষটা কত সরল নাহলে ভবিষ্যতের চিন্তার কথা এভাবে কেউ মুখের উপর বলে! মা আবার বলল,
-“যাও যাও, নাহলে চা এখানেই ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
তিতির চা নিয়ে মুগ্ধর ঘরে ঢুকলো। মুগ্ধ পিছন ফিরে হাতমুখ মুছছিল। দরজা খোলার শব্দ পেতেই ও পিছনে তাকিয়ে ওর চোখ আটকে গেল তিতিরকে দেখে। গাঢ় নীল পাড়ের নীল রঙের তাতের শাড়ি পড়ে আছে তিতির। শাড়ি পড়া এই প্রথম দেখছে। হাতে চায়ের কাপ। কানে গলায় গয়না পড়েছে, ওগুলো চেনে মুগ্ধ ওর মা ওর বউয়ের জন্য বানিয়ে রেখেছে আর হাতে দুটো চুরিও দেখা যাচ্ছে, ওগুলো ওর মায়ের। আর কোনো সাজগোজ নেই। চুলগুলো খোলা। তিতির জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুগ্ধর দিকে তাকাচ্ছে না। লজ্জা লাগছে। মুগ্ধর তো চোখে পলকই পড়ছে না, কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তিতিরকে একদম অন্যরকম লাগছে। কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিল খেয়াল নেই। তারপর খেয়াল হতেই হাতের টাওয়াল টা ফেলে দিয়ে মুগ্ধ তিতিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তিতির চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“তোমার চা।”
মুগ্ধ কাপটা ধরে টেবিলে রাখলো। তারপর তিতিরের আরো কাছে এসে তিতিরের মুখটা দুহাতে ধরে চোখে চোখ রেখে নিচু গলায় বলল,
-“একটা কথা রাখবে?”
মুগ্ধর গলা হালকা কাঁপছিল। তিতিরেরও একই অবস্থা। চোখ সরালো না। বলল,
-“হুম রাখবো, বলো।”
-“বিয়ের দিন থেকে প্রতিদিন তুমি শাড়ি পড়বে? আজীবন?”
-“হুম, তুমি বললে পড়বো।”
-“বউ হলে তোমাকে মারাত্মক লাগবে।”
তিতির এবার মাথা নিচু করে হাসলো। মুগ্ধ তিতিরের চোখের উপর এসে পড়া চুলগুলোকে সরিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-“এতবড় একটা সারপ্রাইজ পাব সত্যিই ভাবিনি।”

ঈদের চাঁদ || শফিক নোমানী

ঈদের চাঁদ
শফিক নোমানী
রমজানেরই রোজার শেষে 
ঈদের চাঁদ ওঠল হেসে,
বছর ঘুরে আসল আবার ঈদ।
মিষ্টি চাঁদের হাসি দেখে,
খুশির জোয়ার সবার মাঝে,
ঈদের খুশি বপন করো,
গরীব-দুঃখীর মাঝে।
হৃদয়কে করে আলো,সবারে বাসো ভালো,
যেন দূরীভূত হয় তব মনের কালো।
ঈদের খুশি দাও ছড়ায়ে,
বিশ্ব সমাজে।

প্রেমাতাল পর্ব – ২৬ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধ হিসাব মেলাতে পারছিল না। কাল রাতে তিতির ঘুমের ঘোরে বলেছে মুগ্ধ কেন ওকে আদর করেনা! এখন আবার আদর করতে যেতেই এরকম করলো যেন ও চাচ্ছেই না। অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে প্রেমে এই এক ঝামেলা বটে! তারা কখন যে কি চায় বোঝা বড় দায়। কিন্তু তিতির আজ যেভাবে চলে গেল তাতে ও কিছুটা অপমানিত বোধ করছে। ওর নিজের উপর যে পরিমাণ কন্ট্রোল আছে তাতে ও তিতিরকে বছরের পর বছর একফোঁটা না ছুঁয়েও থাকতে পারবে।
লাঞ্চ টাইমে আবার দেখা হলো তিতিরের সাথে। কিছুই বলল না মুগ্ধ। চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল। উঠে বেসিনে হাত ধুচ্ছে এমন সময় মা বলল,
-“মুগ্ধ তিতিরকে নিয়ে একটু বেড়িয়ে আয় না।”
-“কোথায়?”
-“ওম্মা! এদিকে যা যা ঘোরার মত যায়গা আছে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়। পতেঙ্গাও তো যেতে পারিস।”
-“পতেঙ্গা যাওয়ার সময় কোথায়? এখন তো ৩ টা বেজেই গেছে।”
তিতির চিন্তায় পড়ে গেল। মুগ্ধ এভাবে বলছে কেন? রাগ করেছে নাকি? কিন্তু রাগ কেন করবে? বুকে কিস করতে না চাইলে কি ওভাবে বের হয়ে যেত ঘর থেকে? আচ্ছা মুগ্ধ কি সত্যিই করতো? নাকি ওকে লজ্জা দেয়ার জন্য বলেছিল? মুগ্ধ তো মজা করে কত কিছুই বলে! তারপরও, বললেও এভাবে প্রিপারেশন নিয়ে ধরে তো না কখনোও। ইশ কেন যে মুগ্ধর বুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ওভাবে কিস করতে গিয়েছিল! খুব ভুল হয়েছে। কিন্তু ও কিইবা করবে? মুগ্ধকে যে ওর কতরকমভাবে আদর করতে ইচ্ছে করে তা তো ও কোনোদিনও উচ্চারনও করতে পারবে না।
মা বলল,
-“তাহলে আশেপাশে ঘুরিয়ে আন। বেচারি বাসায় বসে বোর হচ্ছে না?”
মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তুমি বাসায় বোর হচ্ছো?”
তিতির বলল,
-“না, পিউ আর আন্টির সাথে ছিলাম সারাদিন, একটুও বোর হইনি।”
-“ওকে।”
মুগ্ধ নিজের ঘরে চলে গেল। মনে হলো এই বাচ্চা মেয়েটার সাথে রাগ করে কি হবে? ও তো রাগটা বুঝেই না। সে যাই হোক, ওর আসলে কি হয়েছিল? ও কি রাগ করেছিল? নাকি লজ্জা পেয়েছিল? লজ্জা তো সবসময়ই পায় কিন্তু এভাবে রিফিউজড কখনো, কিছুতে করেনা।
মুগ্ধ ঘরে ঢোকার পর মা তিতিরকে জিজ্ঞেস করলো,
-“ওর আবার কি হলো? রাগ করেছে কেন? ঝগড়া হয়েছে তোমাদের?”
-“না তো!”
-“ঝগড়া না হলেও কোন কারনে রেগে আছে।”
-“কি করে বুঝলেন আন্টি?”
-“আরে, আমার ছেলের সব বিহেভিয়ার আমার মুখস্থ। খুব বুঝতে পারছি তোমর উপরেই কোন কারনে রাগ করেছে। আর তুমি জানোই না?”
-“ও আমার সাথে কখনোই রাগ করেনি, তাই বুঝতে পারছি না।”
পিউ বলল,
-“ভাবী, ভাইয়া আসলেই রাগ করেছে। তুমি দেখো গিয়ে কি হয়েছে!”
ওদের কথার মাঝেই মুগ্ধ শার্ট পড়তে পড়তে নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
-“মা, বাবা কি বাইকটা নিয়ে বেড়িয়েছে?”
-“না, তোর বাবা তো ঢাকা গেছে কাল, অফিসের গাড়িতে গেছে। বাইক গ্যারেজেই আছে। তুই চিন্তা করিস না, তোর বাবা কালই চলে আসবে। তিতিরের সাথে দেখা হবে।”
-“ওহ। আচ্ছা বাইকের চাবিটা দাও।”
-“ও তোরা বেরোবি? আমি এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।”
-“তোরা না, আমি একা বের হব। শহরে যাব, কাজ আছে।”
-“তুই তিতিরকে একা রেখে বের হবি?”
-“একা কোথায়? তোমরা আছ তো।”
-“একটা থাপ্পড় মারবো, ওকে নিয়ে যা।”
মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তুমি আসলেই যাবে? গেলে রেডি হয়ে আসো। আর আমি কিন্তু আজকে ঘোরাতে পারবো না। আমি কাজে যাচ্ছি।”
তিতিরের তবু যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কি বলবে! ওকে বলতে হলো না। মা বলল,
-“যাবে না কেন? ছোট মানুষ বাসায় বসে থাকবে নাকি সারাক্ষণ? তোর কাজ তুই করবি ও তোর সাথে থাকবে। বাইকে করে যাবে আসবে এতেই তো ঘোরা হবে।”
তারপর তিতিরের দিকে ফিরে বলল,
-“মা যাও রেডি হয়ে নাও।”
তিতির বলল,
-“পিউ তুমিও চলো।”
পিউ বলল,
-“না না আমি যাব না। আমার কাজ আছে। তোমরা যাও।”
তিতির পিউএর রুমে গেল। ৫ মিনিটের মধ্যেই মুখটা ধুয়ে, ড্রেস চেঞ্জ করে চুলগুলো একটা ঝুটি করে বেড়িয়ে এল। মা চাবি এনে মুগ্ধর হাতে দিতে দিতে তিতিরের দিকে চেয়ে বলল,
-“ওমা এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল?”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল,
-“তোমার কি মনে হয় মা তোমার ছেলে অর্ডিনারি কাউকে বিয়ে করতে চলেছে? তিতির ঠিক তেমন যেমনটা তোমার ছেলের জন্য দরকার।”
একথা বলেই মুগ্ধ বের হল। মা তিতিরের কাছে এসে বলল,
-“অতটাও রাগ করেনি। যাও যাও। দাঁড়িয়ে আছে তোমার জন্য।”
তিতির লজ্জা পেয়ে বেড়িয়ে গেল। বাইকে উঠে বসে মুগ্ধর কাধে হা রেখে পিছনে ফিরতেই পিউ, মা হাত তুলে টা টা দিল। তিতিরও টাটা দিল। ওরা যখন টিলার উপর থেকে যখন নামছিল স্নিগ্ধ স্কুল থেকে ফিরছিল। ওদের বাইকে দেখতে পেয়েই দু’অাঙুল মুখে দিয়ে একটা সিটি বাজালো। মুগ্ধ থামলো না। যেতে যেতেই জোরে জোরে বলল,
-“কানের নিচে একটা দিব ফিরে এসে।”
স্নিগ্ধ চিৎকার করে বলল,
-“ভাবী বাঁচাবে।”
ততক্ষণে মুগ্ধ অনেকদূর চলে গেছে। তাই আর উওর দিল না। তিতির বলল,
-“ও অনেক দুষ্টু না?”
-“হুম, মারাত্মক।”
মুগ্ধ তিতিরকে জিজ্ঞেস করল,
-“পতেঙ্গা রোডে বাইকরাইডে যাবে?”
তিতির মুগ্ধকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠের উপর মাথা রেখে বলল,
-“তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখেই যাব।”
-“যদি জাহান্নামে নিয়ে যাই?”
-“যাব।”
মুগ্ধ তিতিরকে পতেঙ্গা রোডে নিয়ে স্পিড বাড়িয়ে দিল। উন্মত্ত বাতাস যেন ওদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দুইপাশে গাছ, মাঝখানে পিচঢালা রাস্তা। সমুদ্রের ঠেউএর শব্দ! আহ, আনন্দ রাখার যায়গা পাচ্ছে না তিতির। অথচ আসার আগে বলছিল ঘোরাতে পারবে না।
এরপর সন্ধ্যা নেমে এলে মুগ্ধ ওকে নিয়ে নাভাল রোডে চলে গেল কাঁকড়া খেতে। তিতির বলল,
-“তোমার না কাজ আছে? এখানে এলে যে?”
-“হ্যা, ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা করার কাজ। ওদের বলে দিয়েছি, ওরা এখানেই আসবে।”
-“ও।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল গরম গরম মশলা দিয়ে লাল করে ভাজা কাঁকড়া। মুখে দিয়েই তিতির বলল,
-“এত মজার কাঁকড়া আমি কোনদিনও খাইনি।”
-“হুম জানি তো। কুয়াকাটার লেবুবনের কাঁকড়া আরো মজা।”
-“আমি যাব।”
-“হুম, অবশ্যই নিয়ে যাব কোনো একদিন। ওখানে কাঁকড়া ছাড়াও আরো অনেক কিছু আছে।”
-“কি আছে?”
-“ওখান থেকে সূর্যাস্ত, সূর্যদোয় দুটোই ভাল দেখা যায়। একটা জাতীয় উদ্যান আছে যেখানে অসংখ্য গাছ আর বিভিন্নরকম পাখি দেখা যায়, পাশেই সমুদ্র। যায়গাটা খুবই শান্তির। লাল কাঁকড়ার দ্বীপও আছে একটা। লেবুবনের ওইদিকটাও অনেক সুন্দর। একপাশে সমুদ্র আরেকপাশে বালুতে জন্মানো গাছ। অসাধারণ।”
-“আর বোলোনা, আমার এখনি যেতে ইচ্ছে করছে।”
-“আচ্ছা যাও আর বলব না।”
তিতির হঠাৎ মুগ্ধর একটা হাত ধরে বলল,
-“তোমার বাসার সবাই এত ভাল কেন?”
-“সবার সাথে এমন ভাল না। তোমাকে পছন্দ হয়েছে তাই তোমার সাথে এত ভাল।”
-“সত্যি?”
-“হুম সত্যি। আচ্ছা তুমি বাসায় কয়দিনের কথা বলে এসেছো?”
-“৫ দিন।”
-“কিন্তু আমার ছুটি তো তিনদিন। একদিন আজ চলেও গেল।”
-“হুম জানি তো। তবু আমি এক্সট্রা টাইম নিয়ে এসেছি। আগে চলে গেলে তো আর প্রব্লেম নেই।”
-“ও। আচ্ছা তোমার এক্সট্রা টাইমের কথা শুনে একটা আইডিয়া এল মাথায়।”
-“কি?”
-“তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে চলো যাওয়ার সময় একটা দিন বান্দরবানে ঘুরে আসি। আমাদের বাসা থেকে ১ ঘন্টাও লাগে না যেতে। ধরো সকালে বের হলাম সারাদিন ঘুরে রাত্রের বাসে ঢাকা চলে গেলাম। বান্দরবান সিটিতেই ঘুরাঘুরি করবো। আমার কিছু পছন্দের যায়গা আছে, তোমাকে সেসব যায়গায় নিয়ে যাব।”
-“ইটস আ গ্রেট আইডিয়া। কিন্তু তোমার তো ছুটি নেই।”
-“আমি তো আর ছুটি নিয়ে আসিনি। আজ সরকারি ছুটি ছিল। কাল-পরশু শুক্রবার-শনিবার। অফিসে বলিওনি বাড়ি আসব। তুমি যদি বান্দরবান যাও তো তখন ছুটি নিয়ে নেব।”
-“আমি যাব প্লিজ।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আচ্ছা ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ পর মুগ্ধর ফ্রেন্ডরা এল। মুগ্ধ তিতিরকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। অনেক আড্ডা হলো তারপর ফিরে এল বাসায়। রাতে সবার সাথে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। অবশেষে ১ টার দিকে যে যার মত ঘুমাতে গেল। বিছানায় শুয়েই আছে শুধু ঘুম আসছে না। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো মুগ্ধর। ওপাশ থেকে তিতিরের গলা,
-“হ্যালো..”
-“হুম বলো।”
-“কি করছো?”
-“শুয়ে আছি।”
-“শুয়ে শুয়ে কি করছো?”
-“করার মানুষ তো এখানে নেই। পিউএর ঘরে।”
তিতির মুচকি হেসে বলল,
-“জানো,ঘুম আসছে না আমার!”
-“জীবনেও বিশ্বাস করিনা। বাসের মধ্যেই যেভাবে ঘুমিয়েছো আর এখানে বিছানায়ও তোমার ঘুম আসছে না?”
-“তখন তো তুমি পাশে ছিলে।”
-“তো?”
-“তুমি পশে থাকলে এত শান্তি লাগে। তোমার ছোঁয়া পেলে আবেশে ঘুম চলে আসে।”
-“হুম সেজন্যই তো দুপুরবেলা ওরকম করলে!”
-“ইশ, সরি।”
-“আচ্ছা এত কাছে থেকেও ফোনে কথা বলার কোনো মানে হয়না। চলো ছাদে যাই। বের হও রুম থেকে। বাই দ্যা ওয়ে পিউ কি জেগে?”
-“নাহ ও ঘুমিয়ে পড়েছে।”
-“আচ্ছা দেন বের হও। ছাদে যাই।”
তিতির বেরিয়ে এল। মুগ্ধ ওর হাত ধরে ছাদে চলে গেল। মুগ্ধ আকাশের চাঁদ টার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“দেখেছো আমাদের একসাথের সব মুহূর্তগুলোতে চাঁদ আমাদের সাথে।”
-“হুম! আমরা লাকি।”
মুগ্ধ সিঁড়িরুমের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তিতিরকে বুকে টেনে নিল। তারপর বলল,
-“এবার বলোতো দুপুরে ওরকম করলে কেন?”
-“সরি, আমার আসলে খুব লজ্জা লাগছিল, তুমি যা বলছিলে! ছিঃ আর ভয় করছিল যদি কেউ চলে আসে।”
-“এখন ভয় করছে না?”
-“নাহ! এখন তো রাত।”
-“তার মানে কি রাতে তোমার সাথে যা করতে চাইব তাইই করতে দিবে?”
-“ইশ! কক্ষনো না।”
একথা বলেই তিতির সরে যেতে চাইলো। মুগ্ধ বলল,
-“খুব শক্ত করে ধরেছি, আমি নিজে না ছাড়লে ছাড়াতে পারবে না।”
তিতির মুগ্ধর বুকে কামড় দিল। মুগ্ধ ব্যাথা পেলেও ছাড়লো না। বলল,
-“তোমার যত অত্যাচার আর যত ভালবাসা সব আমার বুকের উপর কেন? আমি কি কখনো তোমার…”
কথা শেষ করতে দিলনা তিতির। একটা হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। মুগ্ধ ওর সেই হাতে চুমু খেল।
তিতির বলল,
-“প্লিজ, একটু সামলে কথা বলো। তোমার কিছু কিছু কথায় আমার খুব বেশি লজ্জা লাগে।”
মুগ্ধ ওর হাতটা সরিয়ে দুহাতে তিতিরের মুখটা ধরে বলল,
-“তোমার লজ্জামাখা মুখটা দেখতেও তো আমার খুব বেশি ভাল লাগে।”
তিতির একথায়ও চোখ নামিয়ে নিল। চাঁদের আলো পড়ে কি মায়াবী দেখাচ্ছে তিতিরকে! মুগ্ধ চোখ ফেরাতে পারছিল না। নিচু হয়ে তিতিরের ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিতেই তিতির আবার হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলো। বলল,
-“না, প্লিজ!”
মুগ্ধ তিতিরকে ছেড়ে দিল। কিন্তু তিতির চলে গেল না। দাঁড়িয়ে রইলো। মুগ্ধ পকেটে হাত গুজে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। তিতিরের মনে হলো মুগ্ধ আবার রাগ করেছে। কিন্তু মুগ্ধ তখন রাগ করেনি, নিজেকে সামলে নিচ্ছিল। তিতির মুগ্ধর কাছে এসে বলল,
-“রাগ করো না প্লিজ। আমার কেমন জানি লাগে। কখনো করিনি তো।”
বলতে বলতেই তিতির কান্না করে দিল। মুগ্ধ অবাক। তিতির আর দাঁড়ালো না, হাঁটা শুরু করলো নিচে যাওয়ার জন্য। মুগ্ধ দৌড়ে ওকে ধরে ফেলল,
-“এই পাগলী কি হচ্ছেটা কি? আমি রাগ করেছি কে বলল? তুমি যতদিন না চাইবে আমি কিছুই করবো না। কান্না থামাও।”
-“আমি তোমার এক্স গার্লফ্রেন্ডদের মত স্মার্ট নই।”
-“শোনো কাল রাতে তুমিই কান্না করতে করতে বলেছিলে আমি আমার এক্সদের কিস করেছি কিন্তু তোমাকে করিনি। তার মানে আমি ওদের তোমার থেকে বেশি ভালবেসেছিলাম। কেমন লাগে এসব কথা শুনতে?”
-“ইশ, জীবনেও আমি এসব বলিনি।”
-“বলেছ বাবা। আরো অনেক কিছু বলেছো”
-“কি বলেছি?”
মুগ্ধ সবটা বলল। তিতির সব অস্বীকার করে মুগ্ধর হাত ছেড়ে নিচে চলে যেতে নিল। মুগ্ধ আবার ওর হাত ধরে থামিয়ে গান শুরু করে দিল। মান্না দে’র সেই বিখ্যাত গানটা,
“সুন্দরী গো দোহাই দোহাই মান করোনা
আজ নিশীথে থাকো কাছে
না বোলোনা।
অনেক শিখা পুড়ে তবে
এমন প্রদীপ জ্বলে
অনেক কথার মরন হলে হৃদয় কথা বলে
না না চন্দ্র হারে কাজল ধোয়া জল ফেলোনা।
একেই তো এই জীবন ভরে
কাদের বোঝাই জনে
আজ পৃথিবীর ভালবাসার
সময় গেছে কমে
না না একটু ফাগুন আগুন দিয়ে না জ্বেলোনা।
সুন্দরী গো দোহাই দোহাই মান করোনা
আজ নিশীথে থাকো কাছে
না বোলোনা।”
To be continued….

প্রেমাতাল পর্ব – ২৫ || মৌরি মরিয়ম

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙলো মুগ্ধর। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পায়নি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তিতির ওর বুকের মধ্যে ঘুমাচ্ছে। তিতিরের দিকে চোখ পড়তেই ওর রাতের পাগলামির কথা মনে পড়ে গেল। একা একাই হেসে ফেলল মুগ্ধ। আস্তে আস্তে আকাশটা সাদা হতে লাগলো। বাসে সামনে কয়েকজনের ঘুম ভেঙেছে। ওদের এভাবে কেউ দেখুক আর উল্টোপাল্টা কথা বলুক তা মুগ্ধ চায়না তাই তিতিরকে ঠেলে উঠালো। তিতির বিরক্ত হয়ে বলল,
-“কেন? উফফফফো! আমি উঠতে পারব না।”
-“এভাবে জড়াজড়ি করে ঘুমালে লোকে কি বলবে বলোতো?”
তিতির ঘুমের ঘোরেই বলল,
-“লোক নেই।”
-“আছে সারা বাস ভরতি লোক। উঠো না বাবা। বাসায় গিয়ে আবার ঘুমিও।”
তিতির উঠে গিয়ে নিজের সিটে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর তিতিরকে আবার ডাকলো মুগ্ধ,
-“তিতিরপাখি, ওঠো.. তোমার শ্বশুরবাড়ি চলে এসেছি।”
তিতির ঘুমের ঘোরে মাথা উঁচু করে বলল,
-“কোথায়?”
-“ওইযে দেখো চিটাগাং গেট চলে এসেছি। আর কিছুক্ষণ পরই নামব। ততক্ষণে তুমি তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, চোখেমুখে পানি লাগিয়ে ঘুম কাটাও।”
-“ধুর, লাগবেনা। চলোতো তাড়াতাড়ি বাসায় যাই।”
মুগ্ধ হেসে ফেলল। সারারাত ঘুমিয়েও ঘুম কাটেনা। কি অদ্ভুত!
বাস থেকে নেমে মুগ্ধ যখন সিএনজি ঠিক করছে, তিতির তখন বোতলের পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে নিল। সিএনজিতে উঠেই তিতির বলল,
-“এই আমার নার্ভাস লাগছে।”
-“কেন?”
-“প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি! নার্ভাস লাগবে না?”
মুগ্ধ তিতিরের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
-“যদি গিয়ে দেখো বাসায় কেউ নেই।”
-“মানে?”
-“মানে যদি গিয়ে দেখো, বাসায় কেউ নেই শুধু তুমি আর আমি?”
-“অপেক্ষা করবো। কেউ নেই তো কি হয়েছে? চলে আসবে।”
-“আর যদি না আসে?”
তিতির বিরক্ত হয়ে বলল,
-“রহস্য করবে না তো, অসহ্য। এমনিতেই নার্ভাস লাগছে তার উপর উনি আসছে ওনার রহস্যের ঝুলি নিয়ে।”
মুগ্ধ কিছু বলল না। একা একা হাসতে লাগলো। মুগ্ধর হাসি দেখে তিতিরের গা জ্বলে যাচ্ছিল।
সিএনজি কয়েকবার ডানে বায়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বামে মোড় নিয়ে যেখানে থামলো যায়গাটা শহরের বাইরে। তার ডানপাশে ছিল একটা চা বাগান। বামপাশে একটা রাস্তা উপরের দিকে উঠে গেছে। তিতির বলল,
-“যায়গাটা অসাধারণ।”
তিতির নিজের ব্যাগটা উঠাতে যাচ্ছিল। মুগ্ধ বলল,
-“আমাকে দাও।”
-“আমি পারব।”
-“যখন নিজের ব্যাগ টেনেছ তখন তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলে না। আমিও কিছু বলিনি। কিন্তু এখন তো আমি তোমাকে ব্যাগ টানতে দেব না। থার্ড, ফোরথ বাচ্চাদের টানার জন্য শক্তি সঞ্চয় কিরে রাখো।”
তিতির আর কিছু বলল না। এই পাগলের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মুগ্ধ তেমন কিছুই আনেনি। ছোট্ট একটা ব্যাগ কাধে। তিতিরের ব্যাগটাও সেটার উপরে নিয়ে নিল। ওই রাস্তায় উঠতেই তিতির বলল,
-“এত উঁচু কেন রাস্তাটা? আর সিএনজিটা ছাড়লে কেন? কতদূর হাটতে হবে? হটছিই বা কেন? এদিক দিয়েই কি তোমার বাসায় যেতে হয়?”
-“এতগুলো প্রশ্ন?”
-“থাক বলতে হবে না।”
একথা বলেই তিতির আবার হাটা ধরলো। মুগ্ধ তিতিরের একটা হাত ধরে বলল,
-“আরে রাগ করছো কেন?”
তিতির থামছিল না। মুগ্ধ হঠাৎ তিতিরকে কোলে তুলে নিল। তিতিরের রাগ উধাও। তারপর হাটতে হাটতে মুগ্ধ বলল,
-“রাস্তাটা এত উঁচু কারন আমরা একটা টিলার উপর উঠছি।”
-“টিলা মানে জানি কি? টিলা, ঢিবি এগুলো আমি বুঝিনা।”
-“ঢিবি বলে সামান্য উঁচু যায়গাকে। টিলা বলে ছোট পাহড়কে। মাঝারি গুলো মেইনলি পাহাড়। আর নিলগিরি টাইপ উঁচুগুলোকে বলে পর্বত। তোমার দেখি বাংলা ভোকাবোলারিতে ব্যাপক সমস্যা! আমার বাচ্চাগুলোকে কি শিখাবে?”
তিতির একটা চিমটি দিল মুগ্ধকে। তারপর বলল,
-“তোমার বাচ্চাদের তুমি শিখাবে। আমার অত দায় পড়েনি।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“কতকিছুর দায় যে পড়বে এখন কি বুঝবে সুন্দরী?”
তিতির বলল,
-“মানে?”
-“মানে কিছু না, আগে তোমার আগের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে নিই। সিএনজি ছেড়ে দিয়েছি কারন এখানকার সিএনজি বান্দরবানের মত তেলে চলে না। গ্যাসে চলে, যদিও প্রব্লেম হয়না তবু এটুকুর জন্য আমি রিস্ক নিতে চাইনা। বেশি হাটতে হবে না, আর সামান্য একটু। আর হ্যা, এদিক দিয়েই আমার বাসায় যেতে হবে। এই টিলার উপরেই আমার বাসা।”
-“সিরিয়াসলি? এত সুন্দর যায়গায় তোমার বাসা?”
-“তো? প্রকৃতিপ্রেম কি এমনি এমনি হয়েছে?”
-“ওয়াও। যায়গাটা অনেক সুন্দর।”
-“সুন্দরের দেখেছো কি? আগে উপরে উঠি?”
উপরে উঠে মুগ্ধ যেখানে তিতিরকে কোল থেকে নামালো তার সামনেই একটা গেট। গেটটা লাগানো। মুগ্ধ কাধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে বলল,
-“পাঁচ মিনিট ওয়েট করো।”
তারপর গেট বেয়ে তড়তড় করে উপরে উঠে ওপাশে চলে গেল। ভেতর থেকে লাগানো গেটটা খুলে বলল,
-“আসুন বেগাম। শ্বশুরবাড়িতে আপনাকে সুস্বাগতম!”
তিতির হেসে ব্যাগগুলো উঠাতে যাচ্ছিল। মুগ্ধ বলল,
-“অপরাধ মার্জনা করবেন বেগাম! ওগুলো আনার জন্য এই বান্দা এখনো জীবিত রয়েছে, আপনি আপনার স্বর্ণপদযুগল রেখে এই বাড়িটিকে ধন্য করুন।”
তিতির হাসিমুখে ভেতরে ঢুকলো। ও খুব এক্সাইটেড। মুগ্ধ বেড়িয়ে ব্যাগগুলো নিয়ে আসলো। তারপর বলল,
-“চলো।”
গেটের ভেতর লম্বা একটা রাস্তা। দুইপাশে অসংখ্য গাছ, সব চেনেও না তিতির। রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে ছোট্ট একটা দোতলা বাসা। বিল্ডিং এর কাছাকাছি দুটো গাছের মাঝে একটা হ্যামক ঝোলানো। অপজিটের একটা গাছের ডালে দড়িতে কাঠ বেধে একটা দোলনা বানানো হয়েছে। ছাদে একটা কবুতরের বাসাও দেখা যাচ্ছে। গেটের দুপাশের লাইট, বাউন্ডারি, হ্যামক, দোলনা, কবুতরের বাসা সব মিলিয়ে তিতির বুঝলো এসবই কোন সৌখিন মানুষের কাজ! কে হতে পারে? মা, বাবা, স্নিগ্ধ, পিউ নাকি মুগ্ধ? যেই হোক সবকিছু এত ভাল লাগলো যে ওর এখানেই স্থায়ী হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। মুগ্ধকে বলতে হবে তবে এখন না পরে। তিতির হাটতে হাটতে বলল,
-“এটা তোমাদের নিজেদের বাসা?”
-“হ্যা, দাদা বানিয়েছিল। সামনে যে চা বাগান টা দেখেছো ওখানে দাদা চাকরি করতো। তখনই এই টিলাটা কিনে বাসা বানায়। প্রথমে এটা কাঠের ঘর ছিল। আস্তে আস্তে বিল্ডিং হয়েছে বাট আই মিস দ্যাট উডেন হাউজ।”
-“কিন্তু তুমি যে বলেছিলে তোমাদের বাড়ি চিটাগাং এ না। বাবা চাকরীর জন্য থাকে?”
-“হ্যা, আমাদের বাড়ি তো কুমিল্লা। দাদা এখানে চাকরী করতো, বাসা বানিয়েছে। আস্তে আস্তে সবাই চলে এসেছে তা বলে তো আমরা চিটাগাং এর হয়ে গেলাম না। তাই না?”
-“ও। দাদা এখন কোথায় থাকে?”
-“দাদা-দাদী কেউই বেঁচে নেই এখন।”
-“সরি।”
-“হুম এসো। আর শোনো মাকে পা ধরে সালাম করতে আপত্তি নেই তো? মানে জানি কারো পা ধরে সালাম করতে নেই কিন্তু মা খুব খুশি হবে।”
-“না না আপত্তি কিসের? আমি করবো।”
মুগ্ধ বেল বাজালো। তিতিরের প্রচন্ড নার্ভাস লাগছিল। একটা ১৩/১৪ বছরের ছেলে বেড়িয়ে এল। বলল,
-“কাকে চাই?”
মুগ্ধ বলল,
-“মেহতাব চৌধুরী আছেন?”
-“না, উনি একটা অপারেশনে গেছেন। কোন মেসেজ থাকলে আমাকে দিয়ে যেতে পারেন।”
তিতির বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে। মুগ্ধ বলল,
-“ওহ। আমরা কি একটু ভেতরে আসতে পারি? আসলে আমরা খুবই টায়ার্ড।”
-“আপনার পরিচয়?”
-“আমি মেহবুব চৌধুরী। মেহতাব চৌধুরীর একমাত্র বড় ছেলে।”
-“ওহ! আর ওই সুন্দরী কিশোরীটি কে? ওনার পরিচয় তো দিলেন না?”
-“আপনি মেহদিন চৌধুরীকে চেনেন? মেহতাব চৌধুরীর একমাত্র ছোট ছেলে।”
-“জ্বী চিনি।”
-“ওই কিশোরীটি তার বড় ভাবী।”
ছেলেটা দুই কদম সামনে এসে চোখদুটো বড় বড় করে বলল,
-“ভাইয়া তুমি বিয়ে করে ফেলেছো? আম্মু যে বলল গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে আসছো? একা একা কেন বিয়ে করলে? আমরা কি বাধা দিতাম?”
এতক্ষণে মুগ্ধর মা আর পিউ চলে এল। মা তিতিরের কাছে এসে ওর মুখটা ধরে বলল,
-“মাশাল্লাহ! চোখদুটো যেন ধন্য হয়ে গেল। কি মিষ্টি দেখতে তুমি মা।”
তিতির লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। তারপর পা ছুঁয়ে সালাম করলো। মা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“কী লক্ষী মেয়ে গো।”
স্নিগ্ধ বলল,
-“মিষ্টি আর লক্ষী হলে কি হবে? দেখে তো মনে হচ্ছে আমার চেয়েও ছোট।”
মুগ্ধ সব দেখছিল আর মিটিমিটি হাসছিল। পিউ স্নিগ্ধকে একটা ধমক দিয়ে তিতিরের কাছে এসে বলল,
-“আপু ভেতরে এসো তো। পাগলদের পাগলামি চলতেই থাকবে। তোমরা যে এতটা পথ জার্নি করে এসেছো সে খেয়াল কারোর নেই।”
মা বলল,
-“ওহো তাই তো। তোমাকে দেখে সব ভুলে গেছি। ভেতরে এসো মা, ভেতরে এসো।”
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে তিতির একবার মুগ্ধর দিকে তাকালো। মুগ্ধ ওকে চোখ মেরে দিল। এর অর্থ কি ছিল কে জানে! ভেতরে ঢুকে পিউ তিতিরকে ওর ঘরে নিয়ে গেল। বলল,
-“শোনো এখনি তো ভাইয়ার ঘরে থাকার পারমিশন পাবে না। তাই আমার ঘরেই থাকতে হবে। আর আমি কিন্তু আপু টাপু বলতে পারবো না। এখন থেকেই ভাবী বলবো আপত্তি নেই তো?”
-“নাহ। তোমার যা ইচ্ছে তুমি বলো।”
-“আচ্ছা, আর অনেক গল্প হবে আগে ফ্রেশ হয়ে নাও।”
তিতির ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখলো মা বসে আছে। ওর এখন আর একটুও নার্ভাস লাগছে না, শুধু লজ্জা লাগছে। মা বলল,
-“চলো চলো নাস্তা করবে। সবাই তোমার জন্য বসে আছে।”
সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে অপেক্ষা করছিল। তিতির রুমে ঢুকতেই মুগ্ধ ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তিতির জানে কেন! তিতিরের চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এই দৃশ্য অনেক দিন পর দেখছে মুগ্ধ। পাগল একটা।
মুগ্ধ সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালো। কারন তিতিরকে ও ভাগে পেলনা। সকালে স্নিগ্ধ কতক্ষণ পাগলামি করে স্কুলে চলে গেল। তারপর সারাটাক্ষণ মা আর পিউ মিলে ওর সাথে গল্প করলো, ম্যাক্সিমাম মুগ্ধর ব্যাপারে। মুগ্ধ কি পছন্দ করে কি অপছন্দ করে এসবই। খুব ভাল লাগছিল তিতিরের। পিউ ঘুরে ঘুরে পুরো বাসাটা ওকে দেখালো। তারপর মা যখন রান্না করতে চলে গেলে পিউ ফিসফিস করে বলল,
-“এবার ভাইয়ার কাছে একটু যাও। নাহলে বোধহয় পাগল হয়ে যাবে। বেচারার চেহারা দেখে আমি তো অবাক। কখনো কোনো মেয়ের জন্য আমি ওর এমন ফিলিং দেখিনি জানো?”
তিতির লজ্জা পেয়ে হাসলো। পিউ বলল,
-“আরে আমার কাছে লজ্জা কি? যাও না। ভাইয়া সেই সকাল থেকেই একা একা তোমার দুক্ষে নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে। যদি তোমাকে একটু না ছাড়ি তাহলে হয়তো তোমাকে আর আমাদের কাছে আনবেই না।”
-“ও না আনলেও আমি আসব। এত আদর বুঝি আমি নেব না?”
পিউ তিতিরকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বলল,
-“ভাবী তুমি অনেক ভাল। তোমাকে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।”
তিতির পিউএর গাল ধরে বলল,
-“আর তুমিও এত্ত কিউট যে খালি আদর করতে ইচ্ছে করে।”
-“আচ্ছা আচ্ছা, এবার ভাইয়ার কাছে একটু যাও। আমার ভাইয়াটাও কিন্তু অনেক কিউট।”
তিতির মুগ্ধর ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। মুগ্ধ খালি গায়ে ঘুমাচ্ছে। তিতির ওর পাশে বসলো। খুব ইচ্ছে করছিল ওর বুকে হাত রাখতে। কিছু না ভেবেই তিতির মুগ্ধর বুকে হাত রাখলো। এই প্রথম বোধহয় ওর যা ইচ্ছে হলো তাই করলো। মুগ্ধর ঘুম ভেঙে গেল কিন্তু তিতিরের স্পর্শ বুঝতে পেরে ঘুমের ভান করে রইলো। তিতিরের খুব ইচ্ছে করছে মুগ্ধর বুকে একটা চুমু দিতে। কিন্তু মুগ্ধ যদি জেগে যায়? ওর যা পাতলা ঘুম! জেগে গেলে যাবে। তিতির মুগ্ধর বুকে একটা চুমু দিয়ে উঠতে নিয়ে আর উঠতে পারলো না। মুগ্ধ ওকে জড়িয়ে ধরেছে। তিতির বলল,
-“ছাড়ো। কেউ এসে পড়বে।”
-“আসুক! তো কি হয়েছে? মুগ্ধ কাউকে ভয় পায় নাকি?”
-“তুমি ভয় না পেলেও আমি পাই, ছাড়ো।”
-“আরে এত ছটফট করছো কেন? শোনো না।”
-“কি?”
-“তুমি এটা কেন করলে?”
-“কোনটা?”
-“এইযে আমার বুকে হাত রাখলে, চুমু দিলে।”
তিতিরের মাথাটা মুগ্ধর বুকের উপর ছিল। তিতির মুগ্ধর বুকে জোড়ে একটা কামড় দিয়ে বলল,
-“ঘুমের ভান করে ছিলে? ছিঃ তুমি একটা খুব খারাপ।”
-“ভাল হয়েছে, আমি খারাপই। আর তাই এখন তুমি যেটা করেছো সেটা আমিও করবো।”
-“কোনটা? কি করবে?”
-“তুমি কি করেছো সেটা তুমিই চিন্তা করো। ঠিক সেটাই করবো। আমি নিজের মুখে বললে তো আবার রাগ করবে।”
তিতির লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল। কি করবে এখন? মুগ্ধর হাতে কামড় দিল। মুগ্ধ এটার জন্য রেডি ছিল না। তাই হাত আলগা হতেই তিতির উঠে দৌড় দিয়ে ঘর থেকে বের হতে নিল। কিন্তু তার আগেই মুগ্ধ দৌড়ে ধরে ফেলল ওকে। তিতির বলল,
-“ছেড়ে দাও। মাফ চাই এরকম আর করবো না।”
মুগ্ধ পেছন থেকে তিতিরকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে একটা চুমু দিতেই ও লাফিয়ে উঠলো। নিজেকে প্রাণপনে ছাড়াতে চাইলো মুগ্ধর হাত থেকে। মুগ্ধ ওর হাত আলগা করে দিল তিতির কি করে দেখার জন্য। তিতির নিজেকে কোনরকমে ছাড়িয়ে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। ব্যাপারটা কি হলো? মুগ্ধ বুঝতে পারলো না। অবাক হয়ে চেয়ে রইল তিতিরের চলে যাওয়া পথের দিকে। তিতিরের গায়ের ধাক্কায় দরজাটা এখনো নড়ছে।
To be continued…

প্রেমাতাল পর্ব – ২৪ || মৌরি মরিয়ম

বাসের লাইট জ্বলে উঠতেই দুজন দুজনকে ছেড়ে যে যার সিটে চলে গেল। বাস কুমিল্লার একটা হোটেলে ২০ মিনিটের ব্রেক দিল। মুগ্ধ বলল,
-“চলো ডিনার করে আসি।”
-“আমি তো ডিনার করেই এসেছি। আমি ৮ টার মধ্যে ডিনার করি।”
-“ডায়েটকন্ট্রোল না?”
-“ডায়েটকন্ট্রোল বলে কথা না। আসলে সবারই রাত ৭/৮ টার মধ্যে ডিনার কম্পলিট করা উচিৎ। নাহলে ক্যালরিটা বার্ন হওয়ারর সু্যোগ পায়না। তুমি খাওনি?”
-“হা হা হা… ৭/৮ টায় আমি নাস্তা করি, ১২ টায় ডিনার। ঘুমানোর আগে না খেলে রাতে ক্ষুধায় আমার ঘুম আসে না।”
তিতির বলল,
-“এটা কিন্তু ভাল অভ্যাস না।”
-“কেন? এত যে খাই আমার কি কোনো ভুরি আছে?”
-“তা নেই।”
-“নেই আর হবেও না কারন, আমি যেমন অনেক খাই তেমন এক্সারসাইজও করি। না খেলে গায়ে শক্তি হবে কি করে? স্লিম মেদবিহীন থাকার জন্য কম খাওয়াটাকে আমি কখনোই প্রেফার করি না। তাহলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়না, দুর্বল হয়ে যায়।”
-“কিন্তু, আমি নিয়মের বাইরে একটু খেলেই মোটা হয়ে যাব। এপাশ ওপাশ সমান হয়ে ব্যাঙের মত দেখাবে।”
-“কেন এক্সারসাইজ করবে।”
-“এক্সারসাইজটা হয়ে ওঠে না। সকালটা তো ক্লাস করেই কেটে যায়। ক্লাস না থাকলে ঘুম।”
-“তোমার ক্লাস তো থাকে ৯ টায়। তার আগে এক্সারসাইজ করবে।”
-“কিভাবে? ৯ টায় হলেও তো সাড়ে ৮ টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়।”
-“আধা ঘন্টায় রেডি হও আর ব্রেকফাস্ট করা হয়ে যায়?”
-“হ্যা।”
-“এক্ষেত্রে তুমি অনেক ফাস্ট। সো ঢাকা ফিরে আসার পর ইচ্ছেমত খাবে। খালি সুগারটা এভয়েড করার ট্রাই করবে। আর ঘুম থেকে উঠবে সাড়ে ৭ টায়। এক্সারসাইজ করবে সাড়ে আটটা পর্যন্ত। তারপর আধা ঘন্টায় রেডি হয়ে খেয়েদেয়ে ক্লাসে চলে যাবে।”
-“সুগার এমনিতেই এভয়েড করি, পছন্দ না। কিন্তু সাড়ে ৭ টায় ওঠা সম্ভব না। এমনিতেই আমার ঘুম বেশি তার উপর এখন রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে ঘুমাতে লেট হয়ে যায়।”
-“তাহলে রাতে বেশিক্ষণ কথা বলব না।”
-“কেন? তোমার কি মনে হয় আমি ডায়েটকন্ট্রোল করে দুর্বল হয়ে গেছি? বান্দরবানে দেখোনি অন্যসব মেয়েদের থেকে আমি কতটা স্ট্রং ছিলাম?”
-“হ্যা হয়তো আছো বাট ডায়েটকন্ট্রোল না করলে আরো স্ট্রং থাকবে। তাছাড়া আমার বাচ্চাগুলোও তো পুষ্টি পাবে না।”
তিতির লজ্জা পেয়ে খামচি দিল মুগ্ধকে। মুগ্ধ বলল,
-“উফ মারছো কেন? যেটা সত্যি সেটাই তো বললাম রে বাবা।”
-“উফ তুমি চুপ না করলে আমি আরো মারব।”
-“না সত্যিই কিন্তু তোমার ডায়েটকন্ট্রোল করা উচিৎ না।”
-“ডায়েটকন্ট্রোল না করলে মোটা হয়ে যাব।”
-“আরেকটু মোটা তো হওয়াই উচিৎ।”
-“কি বলো তুমি? এই ফিগার বানানোর জন্য সব মেয়েরা হা হুতাশ করে মরে। আর তুমি কিনা মোটা হতে বলছো?”
-“তোমার ফিগার ঠিক আছে তবে গায়ে আরেকটু মাংস হলে ভাল হতো। আরো এট্রাক্টিভ লাগত তখন। অন্যদের কথা জানিনা তবে আমার চোখে লাগত। তাছাড়া এখন জড়িয়ে ধরলে গায়ের মধ্যে হাড্ডি ঢুকে যায়। তুমিই বলো আমাকে জড়িয়ে ধরে মজা পাওনা? সেটা তো এই কারনেই যে আমার গায়ের হাড্ডির খোঁচা তোমাকে খেতে হয়না।”
তিতির মুগ্ধর হাতে ইচ্ছেমত খাঁমচাতে লাগলো। মুগ্ধ হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল।তিতিরের হাত ধরে বলল,
-“পরে আরো মেরো। কিন্তু এখন না গেলে তো ব্রেক টাইমটুকু বাসে বসেই কেটে যাবে। চলো তো।”
-“যেতে হবে না দাঁড়াও।”
এই বলে তিতির ব্যাগ থেকে একটা বক্স বের করলো। তারপর সেটা মুগ্ধর হাতে দিয়ে বলল,
-“খাও, আমি নিজের হাতে রেঁধেছি তোমার জন্য।”
-“ওয়াও, হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ!”
মুগ্ধ বক্সটা খুলতেই দেখলো বিরিয়ানি রান্না করে এনেছে তিতির, সাথে কাবাব। মুগ্ধ ঘ্রাণ শুঁকে বলল,
-“সিরিয়াসলি তুমি রান্না করেছো? এত সুন্দর ঘ্রাণ!”
-“হুম আমি রান্না করেছি। বিরিয়ানি কিন্তু এই প্রথম রান্না করলাম। ঘ্রাণ ভাল হলেও খেতে ভাল নাও হতে পারে। তাড়াহুড়োয় টেস্টও করতে পারিনি।”
মুগ্ধ বক্সটা নিয়ে নিজের সিটে বসলো। তারপর তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তিতির, বিরিয়ানি আমার অনেক পছন্দ।”
-“জানি তো, সেজন্যই তো বিরিয়ানি রেঁধে আনলাম।”
মুগ্ধ হেসে বক্স্ব রাখা চামচটা দিয়ে খাওয়া শুরু করলো। তিতির আগ্রহে চেয়ে রইলো মুগ্ধ কি বলে সেটা জানার জন্য। কিন্তু মুগ্ধ কিছুই বলছে না শুধু খেয়েই চলেছে। অর্ধেকটা যখন শেষ হলো তখন মুগ্ধ বলল,
-“আহহা! দ্যাত আমি একাই খেয়ে চলেছি। তোমাকে দিচ্ছি না। কি খারাপ আমি। নাও হা করো।”
তিতির হা করলো। মুগ্ধ ওকে খাইয়ে দিল। তিতির খেয়ে বুঝলো বেশ ভালই হয়েছে রান্নাটা। কিন্তু মুগ্ধ কিছু বলছে না কেন? তিতির বলল,
-“খাবাবগুলো খাচ্ছো না যে?”
মুগ্ধ একটা কাবাব তুলে মুখে দিল। তারপর বলল,
-“মাছের কাবাব?”
-“হুম।”
-“বাহ! অস্থির জিনিস তো।”
আরেকটা খেল। তারপর বিরিয়ানি রেখে এক এক করে সবগুলো কাবাব খেল। বলল,
-“এই তিতিরপাখি তুমি একটা নাও।”
-“নাহ তুমি খাও।”
মুগ্ধ জোড় করে একটা খাইয়ে দিল। তারপর বিরিয়ানিটা শেষ হতেই মুগ্ধ বলল,
-“চলো, বাইরে যাই।”
-“কেন?”
-“চা খাব, ওয়াশরুমে যাব।”
তিতির উঠলো। হোটেলে ঢুকে ওয়াশরুমে গেল। ফিরে এসে মুগ্ধকে কোথাও পেলনা। ফোনটাও তো ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় মুগ্ধর কাছে দিয়ে গিয়েছিল। হোটেল থেকে বেড়িয়ে একই কোম্পানির এতগুলো বাস দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছিল কারন ও বুঝতে পারছিল না কোনটা ওদের বাস! এখন কি হবে? আচ্ছা ও কি ওয়াশরুম থেকে এখনো বের হয়নি? তা তো হবার কথা না। তাহলে কি কাউন্টারে গেল কিছু কিনতে? উলটো ঘুরে দৌড় দিতেই মুগ্ধর সাথে ধাক্কা লাগলো। মুগ্ধর হাতে থাকা ওয়ান টাইম কাপের দুই কাপ চা উলটে পড়লো মুগ্ধর শার্টের বুক আর পেটের কাছটাতে। তিতির ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে বলল,
-“সরি সরি। আমি খেয়ালই করিনি। পুড়ে গেল বুঝি বুকটা?”
-“পুরে তো সেদিনই গেছে যেদিন ঝাপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরেছিলে কিন্তু দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিলে?”
তিতির খানিকটা হাপাচ্ছিল। বলল,
-“আমি তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এদিক ওদিক খুঁজছিলাম। টেনশনেই দৌড় দিয়ে ফেলেছি।”
-“কেন তোমাকে না বলেছিলাম আমি চা নিব? আমি তো তোমাকে দেখেছিলাম বের হতে। আমি ভেবেছি তুমি সামনে থাকবে।”
-“ওহ খেয়াল করিনি বোধহয়।”
-“আচ্ছা আসো আমার সাথে। চা নিয়ে আসি।”
চা নিয়ে আসতে আসতে বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। বাসে উঠেই চা খেল ওরা। চা খাওয়া শেষ হতেই মুগ্ধ উপর থেকে ওর ব্যাগ টা নামালো। ব্যাগ থেকে একটা শার্ট বের করে পড়নের শার্টটা খুলে ফেলল। তিতির হা করে তাকিয়ে রইলো। মুগ্ধ শার্টটা পড়তে পড়তে বলল,
-“মেয়েদের অনেক সুবিধা বুঝলে? ওরা অনেক ব্যাপারে এক্সট্রা প্রিভিলেজ পায়।”
তিতির বলল,
-“কখনোই না। মেয়েদের কোনো ব্যাপারেই সুবিধা নেই।”
-“আছে আছে। যেমন ধরো আমি চেঞ্জ করছি আর তুমি যে লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছিলে সেই ঘটনাটা যদি উলটো হতো যেমন তুমি চেঞ্জ করছো আর আমি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তাহলে আমি হয়ে যেতাম চরিত্রহীন, লুচ্চা ব্লা ব্লা ব্লা। বাট তোমার কিন্তু কোনোই দোষ হচ্ছে না।”
তিতির অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
-“সরি। কিন্তু আমার সামনে চেঞ্জ করোনা কক্ষনো। আমার চোখ চলে যায়।”
মুগ্ধ ব্যাগটা আবার উপরে উঠিয়ে রেখে বসলো। তারপর তিতিরের কাছে এসে বলল,
-“সাবধানে থেকো। মাঝেমধ্যে চোখ কিন্তু আমারও চলে যায়। বাধা দিলেও শোনেনা।”
তিতির অবাক হয়ে তাকালো মুগ্ধর দিকে। ওর দুষ্টুমি মাখা হাসি দেখে তিতির খুব লজ্জা পেল। তারপর আর তাকালোই না ওর দিকে। কিছুক্ষণ পর মুগ্ধ তিতিরের কোমড় জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে আনলো। বুকের মধ্যে নিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
-“আমার বউটা যে এত ভাল রান্না করতে পারে আমি তো আগে বুঝিনি।”
তিতির মুখ তুলে চাইল মুগ্ধর দিকে। তারপর বলল,
-“তাই সত্যিই ভাল হয়েছে?”
-“হুম।”
-“আচ্ছা, সারাজীবন যদি আমি তোমাকে মজার মজার রান্না করে খাওয়াই তুমি কি সারাজীবনই আমাকে এভাবে আদর করবে?”
-“হুম, আরো কত কত আদর করবো!”
তিতির চোখ নামিয়ে মুগ্ধর বুকে মুখ গুঁজে চুপ করে রইলো। মুগ্ধ বাসের সিটের মাথাটা এলিয়ে চোখ বন্ধ করলো কিছুক্ষণের জন্য। ঘুমিয়ে পড়েছিল। তিতিরের দিকে তাকাতেই বুঝলো ও ঘুমন্ত। রাত তখন অনেক। বাসের ম্যক্সিমাম লোকজনই ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তিতির যেভাবে বাকা হয়ে আছে পরে তো কোমড়,ঘাড় ব্যাথা করবে। তাই মুগ্ধ ডাকলো,
-“তিতির এই তিতির?”
তিতির মাথা উঠিয়ে সেই ঘুমে জড়ানো মাদকময় কন্ঠে বলল,
-“কি হয়েছে ডাকছো কেন?”
-“এভাবে শুয়ে থাকলে তোমার গা ব্যাথা হয়ে যাবে। একটু এদিকে এসে শোও।”
-“পারব না আমি। দুইটা মেয়েকে তো লিপকিস করেছোই, এখন আর আমার গা ব্যাথার কথা চিন্তা করে কি হবে? মনে যে কত ব্যাথা হয়েছে! সেটা দূর করতে পারবে?”
-“কেন বাবা? ওরা তো আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল তখন। এইযে তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড হয়েছো আমি তোমাকে কত আদর করিনা বলো? করতেই হয় রে বাবা। এটা নিয়ে কষ্ট পেওনা প্লিজ।”
-“তার মানে কি তুমি আমাকে যেভাবে আদর করো ওদেরও সেভাবে আদর করেছো?”
-“না, এতটা না। বাট করেছি তো।”
তিতির কান্না করে দিল,
-“অ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা.. তুমি এত এমন, আমি আগে বুঝিনি।”
-“কেমন?”
-“অন্নেক পচা। একদম ভালবাসো না আমাকে।”
মুগ্ধ তিতিরের চোখ মুছে দিয়ে বলল,
-“কেন বাবা? এরকম কেন বলছো? আমি তো তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি। তুমি বোঝোনা?”
-“হ্যা বুঝি। খুব ভাল করে বুঝি যে আমাকে ওদের মত অত ভালবাসো না। আমিও তো তোমার গার্লফ্রেন্ড! কখনো আমাকে লিপকিস করেছো?”
-“আমি তো করতে চেয়েছিই। তুমিই পারমিশন দাওনি!”
-“অদ্ভুত তো! আমি লজ্জা পেয়ে না না বলি। তুমি পারমিশনের অপেক্ষা করো কেন? পারমিশন চাইলে কি আমি কখনো বলতে পাড়বো যে, হ্যা আসো আমাকে কিস্সি করো?”
মুগ্ধ খুব ভালভাবে বুঝতে পারছে তিতির এখনো ঘুমের ঘোরে থেকেই এসব বলছে! হয়তো ঘুম থেকে উঠে সবটা ভুলেও যাবে। কিন্তু ওর খারাপ লাগছে। ঘুমের ঘোরে তিতিরের বলা উল্টাপাল্টা কথা শুনে সবসময় ওর হাসি পায়। এখনো পাচ্ছে কিন্তু তারপরেও মনের কোন কোনায় কষ্টও হচ্ছে। কেন যে তিতিরকে সব বলতে গেল! ও তো একটা মেয়ে তার উপর বাচ্চা মানুষ! ওর খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। মুগ্ধকে চুপ থাকতে দেখে তিতির আবার বলল,
-“দেখেছো এখনো কিস্সি করছো না। তুমি তোমার এক্সদেরকেই বেশি ভালবেসেছিলে।”
মুগ্ধ বলল,
-“করবো। এখন তো জানলাম তোমার ইচ্ছে আছে। এখন করবো। তবে আজকে এই বাসের মধ্যে না।”
কান্নার ভাব করে তিতির বলল,
-“কেন?”
-“ছিঃ বাসে কেউ কিস করে? কত মানুষ আছে না?”
-“ওহ তাই তো।”
-“বাসায় গিয়ে। ওকে?”
-“জানি বাসায় গিয়ে তুমি ভুলে যাবে।”
একটু বিরক্ত হয়ে একথা বলে আবার কান্নার ভাব করলো। তারপর মুগ্ধকে অবাক করে দিয়ে তিতির নিজের সিটে দুই পা উঠিয়ে পা ভাজ করে গুটিসুটি মেরে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো মুগ্ধর কোলে মাথা রেখে। মুগ্ধ জাস্ট হা করে চেয়ে রইলো। এটুকু যায়গার মধ্যে এভাবে কি করে ঘুমানো সম্ভব সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না।
তিতির যেভাবে শুয়েছে বাস একটু ব্রেক করলেই পড়ে যাবে। মুগ্ধ দুহাত দিয়ে ওকে নিজের কোলের মধ্যে ধরে রাখলো। সত্যি ঘুমকুমারী নামটা সার্থক! নিজের মনেই হাসলো মুগ্ধ। তিতির একটু আগে যখন ঘুমের ঘোরেই বলেছিল, ‘কি হয়েছে ডাকছো কেন?’ ইশ তখন ওর ভয়েসটা কি মারাত্মক শোনাচ্ছিল! বুকের মধ্যে লাগছিল একদম। মুগ্ধ তিতিরের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিল। তারপর চেয়ে রইলো ওর মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরেই বাসটা একটা স্পীড ব্রেকার পার হলো। আর বাসটা সামান্য নড়ে উঠলো। তিতির পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মুগ্ধ ধরে ফেলল। তিতির নড়ে উঠে পাশ ফিরলো। কি অদ্ভুত মেয়ে! এটুকু যায়গার মধ্যে আবার পাশ ফিরছে। হেসে ফেললো মুগ্ধ। কিন্তু তিতির শুধু পাশ ফিরলই না মুগ্ধর কোমড়ও জড়িয়ে ধরলো। এখানেই শেষ নয়, ও মুগ্ধর পেটের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিল। পেটের মধ্যে গরম নিঃশ্বাস পড়ায় প্রথমে ওর সুড়সুড়ি লাগছিল পরে আস্তে আস্তে সয়ে গেল। বাসের সবাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল। কিন্তু মুগ্ধ এমনিতেই যেখানে বাসে ঘুমাতে পারে না, এই অবস্থায় তো অসম্ভব! এই মুহূর্তটা ও কিছুতেই মিস করতে চায় না।
তিতির ঘুম যখন কিছুটা ভাঙলো, ও বুঝতে পারছিল না ও কোথায়! কিন্তু ঘ্রাণটা খুব চেনা, মুগ্ধ! কিন্তু মুগ্ধ এত রাতে কিভাবে এল? লুকিয়ে লুকিয়ে? কিন্তু সেটা কিভাবে? চম্পা কি দরজা খুলে দিয়েছে? বাবা-মা, ভাইয়া কেউ দেখে ফেলেনি তো! এসব প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এমন সময় বাসটা একটু নড়ে উঠতেই তিতির মনে পড়লো ওরা বাসে করে চিটাগাং যাচ্ছে, ওর হবু শ্বশুরবাড়ীতে। এমা! ও এভাবে মুগ্ধর পেটের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিল ও? ইশ জেগে উঠলে মুগ্ধ খুব ক্ষ্যাপাবে আর লজ্জা দেবে। তিতির উঠলো না ঘুমের ভান করে পরে রইলো। মুগ্ধর পেটের লোমগুলো শার্টের উপর দিয়েই তিতিরের চোখেমুখে লাগছিল! উফ কি আরাম! মুগ্ধ যদি কয়েকটা বাটন খুলে দিত তাহলে ও এখানে প্রান ভরে চুমু খেত। খুব ইচ্ছে করছে। ওকে কি বলবে? ইশ কখনো বলতে পারবে না ও।
নাহ আর কতক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকবে? মুগ্ধর নিশ্চই কষ্ট হচ্ছে। কোল থেকে মাথাটা উঠাতেই ও বলল,
-“মাম, আপনার ঘুম ভাঙলো?”
-“ইশ তোমার কত কষ্ট হলো!”
উঠে যেতে নিল তিতির। মুগ্ধ ওকে উঠতে দিলনা। নিজেই কোল থেকে উঠিয়ে বুকের মধ্যে নিয়ে জড়িয়ে ধরলো তারপর বলল,
-“কষ্ট হয়নি। থাকো এখানে ভাল লাগছে।”
-“তুমি এতক্ষণ একা একা বোর হওনি?”
-“নাহ! একা কোথায় আমার ঘুমকুমারী তো ছিল আমার কাছে। খুব কাছে!”
-“একটা গান শোনাবে?”
-“এখানে?”
-“তাতে কি হয়েছে? এই যেরকম নিচু ভয়েসে কথা বলছি সেরকম ভয়েসেই গাও।”
-“গলা না খুলে গান গাইলে কি সুন্দর হয়?”
-“সুন্দর হওয়া লাগবে না। আমি জানি তুমি ভাল গাও। একদিন খারাপ হলেও ক্ষতি নেই।”
মুগ্ধ গাইতে শুরু করলো,
“তুমি ভরেছ এ মন…..
এক নিঝুম অরন্যে।
বসন্তে পাহাড়চূড়ায় আর বৃষ্টি দিয়ে।
মরুভূমির ঝড়ে আর ঘুমন্ত সাগরে।
তুমি ভরে দাও এ মন ফিরে এসে!
তুমি ভরেছ এ মন…..
এক নিঝুম অরন্যে।
আমায় ভালবাসতে দাও
এ জীবন দিয়ে।
যেন হারাই তোমার মিষ্টি হাসিতে
যেন থাকো সারাক্ষণ এই বাহুডোরে
ফিরে এসো এ জীবনে নতুন করে।
তুমি ভরেছ এ মন…..
এক নিঝুম অরন্যে।”…

প্রেমাতাল পর্ব – ২৩ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধ কলাবাগান বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে। ১০:৩০ এ বাস ছাড়বে। সামনেই সাফি আর দোলা বসে আছে। ওরা এসেছে হেল্প করার জন্য। কারন তিতিরকে পৌঁছে দিতে আসবে ওর বাবা এবং ভাইয়া। তিতির বাসায় বলেছে এবারও টিওবি থেকেই যাচ্ছে খাগড়াছড়ি ট্রিপে। যেহেতু তিতিরের বাবা, ভাইয়া সাফি-দোলাদের চেনে তাই ওদেরকে নিয়ে এসেছে মুগ্ধ। ১০:২৫ বাজে, এখনো তিতির আসছে না দেখে মুগ্ধ দোলাকে দিয়ে ফোন করালো। তিতির জানালো ও প্রায় এসে গেছে।
মুগ্ধ আগে থেকেই বাসে উঠে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিতির এসে পড়লো ওর বাবার সাথে। বাবা তিতিরকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বাস না ছাড়া পর্যন্ত। অগত্যা দোলা সাফিকেও বাসে উঠতে হলো। বাস ছেড়ে দেয়ার পরও তিতিরের বাবা দাঁড়িয়ে ছিল। তিতির জানালা দিয়ে মুখ বের করে বলল,
-“বাবা, তুমি রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে যাও।”
-“হ্যা যাচ্ছি।”
তারপর হাত নেড়ে টা টা বলল তিতির। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সাটায় উঠলো। বাস ততক্ষণে অনেক দূরে চলে এসেছে। বাস যেদিকে যাচ্ছে রিক্সা যাচ্ছে তার উলটো দিকে তাই বাবাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না তবে রিক্সাটা দেখা যাচ্ছে। তবু তিতির তাকিয়েই আছে। মুগ্ধ বলল,
-“বাস তো ছেড়ে দিয়েছে, এবার মুখটা ভেতরে আনো। হুট করে আরেকটা বাস চলে আসতে পারে।”
তিতির শুনলো না। মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে আসলো। তিতিরের চোখভর্তি পানি। মুগ্ধ অবাক,
-“সেকি! কাঁদছ কেন?”
এতক্ষণ চোখে জমে থাকা পানিটা একফোঁটা পড়লো গাল বেয়ে। বলল,
-“আমি কখনো বাবাকে মিথ্যে বলে কোথাও যাইনি। খুব ভালবাসি বাবাকে। সব থেকে বেশি। আর আজ সেই আমি বাবাকে মিথ্যে বলে এতদূর যাচ্ছি। আমার খুব খারাপ লাগছে।”
মুগ্ধ কি বলবে বুঝতে পারলো না। নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে। তিতিরের চোখ মুছে দিয়ে হাত ধরে বলল,
-“চলো আমরা নেমে যাই। যাওয়া লাগবে না। আমি তোমাকে দিয়ে আসছি।”
-“না আমি যাব।”
-“আরে পাগলী! আমি রাগ করে বলছি না। সত্যি বলছি এরকম খারাপ লাগা নিয়ে গেলে কি তোমারও ভাল লাগবে বলো?”
-“আমি জানি তুমি রাগ করে বলোনি। কিন্তু আমি যাব।”
-“কেন জেদ করছো?”
তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“কারন, আমার লাইফে বাবা যতটা ইম্পরট্যান্ট তুমিও ঠিক সমান ইম্পরট্যান্ট!”
মুগ্ধ কিছু বললনা শুধু মনে মনে ভাবলো, হুমায়ুন আহমেদ স্যার বলে গেছেন “কিশোরী মন বড়ই রহস্যময়।”
বাস শাহবাগ পৌঁছতেই দোলা আর সাফি বিদায় নিয়ে নেমে গেল। যাত্রাবাড়ী থেকে প্যাসেঞ্জার উঠানোর পর বাসের লাইট অফ করে দিল। আবছা আলোয় মুগ্ধ দেখলো তিতির সিটে হেলান দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে চুপ! মুগ্ধ ওকে ঘাঁটালো না। থাকুক কিছুক্ষণ নিজের মত। বাস যখন কাঁচপুর ব্রিজে উঠলো তিতির তখন বাসের জানালা দিয়ে মুখ বের করে রাখলো। মুগ্ধ আবার ওকে টেনে ভেতরে নিয়ে এসে বলল,
-“এটা করো না। রিস্কি খুব।”
তিতির হেসে বলল,
-“সবসময় তো করছি না। এখন একটু নদীর গন্ধ নিলাম। আবার যখন নদী পড়নে তখন একটু নেব। নিতে দেবে না?”
তিতিরের মুখে হাসি দেখে মুগ্ধ একটু স্বস্তি পেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুগ্ধর ফোন এল। পিউ ফোন করেছে,
-“হ্যালো, ভাইয়া?”
-“হুম বল।”
-“তোরা রওনা হয়েছিস?”
-“হ্যা, মাত্রই কাঁচপুর ব্রিজ পার হলাম।”
-“ওহ! তিতির আপু তোর পাশেই না?”
-“না পিছনে।”
-“পিছনে মানে? তোরা পাশাপাশি সিট পাসনি?”
-“যেমন প্রশ্ন ছিল তেমনই উত্তর ছিল।”
-“উফফ! বাদ দে। আপুকে দে না একটু কথা বলি?”
-“কাল সকালেই তো জলজ্যান্ত পেয়ে যাবি। এখন আবার কথা বলে কি করবি?”
-“দে না। শুধু আমি না, আম্মুও কথা বলবে।”
মুগ্ধ ফোনটা কানের কাছ থেকে সরিয়ে বলল,
-“একটু কথা বলবে? পিউ খুব চাইছে।”
তিতির বলল,
-“দাও, আবার জিজ্ঞেস করা লাগে?”
তিতির ফোনে ধরে বলল,
-“হ্যালো..”
পিউ ওপাশ থেকে বলল,
-“ওমা কি মিষ্টি ভয়েস গো তোমার! আমার ভাইটার আবার ডায়াবেটিস না হয়ে যায়।”
তিতির হাসলো। পিউ বলল,
-“হাসিটাও সুন্দর। উফ কখন যে তোমাকে দেখবো আমার আর তর সইছে না।”
তিতির বলল,
-“তোমাদের সবাইকে দেখার জন্যও আমার মনটা অস্থির হয়ে আছে। তোমার ভাইয়া তো সবসময় তোমাদের গল্প করে।”
-“তাই?”
-“হুম।”
-“এই শোনো আপু… মা তোমার সাথে কথা বলবে, নাও।”
তারপর হুট করেই পিউ ফোনটা মায়ের হাতে দিয়ে দিল। মা ওপাশ থেকে হ্যালো বলতেই তিতির সালাম দিল। তারপর জিজ্ঞেস করলো,
-“কেমন আছেন আন্টি?”
মা বলল,
-“এইতো আম্মু ভাল আছি। কিন্তু বড্ড অস্থির লাগছে। তোমরা সেফলি আসবে তারপর আমি শান্তি পাব।”
আহা কী অবলীলায় কথা বলছে! যেন হাজার বছরের চেনা। খুব ভাল লাগছিল তিতিরের। কথা শেষ হতেই মুগ্ধ বলল,
-“আমার মা তোমাকে দেখার আগেই মানে শুধু ছবি দেখেই পটে গেছে। শুধু তোমার সাথে কথা বলেই ফোন রেখে দিল। আমার সাথে কথাই বলতে চাইলো না।”
তিতির হেসে বলল,
-“জেলাস?”
-“নাহ! মা যত তোমাকে পছন্দ করবে আমার তো ততই ভাল লাগবে তাই না?”
তিতির আচমকা মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরলো। মুগ্ধও ধরলো। পুরো বাস অন্ধকার। তিতির মুগ্ধর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
-“আমি খুউউউব হ্যাপি।”
মুগ্ধও তিতিরের মত ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
-“কেন?”
-“তোমাকে পেয়ে।”
মুগ্ধ তিতিরের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-“আমিও খুব হ্যাপি! লাকি অলসো.. তোমাকে পেয়ে।”
তারপর তিতির আর কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ পর মুগ্ধ আবিস্কার করলো তিতির ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজের মনেই হাসলো মুগ্ধ। প্রায় এক ঘন্টা পর একটা স্পিড ব্রেকার পার হওয়ার সময় বাসটা নড়ে উঠতেই তিতিরের ঘুমটা ভাঙলো। ঘুম ভাঙতেই হেসে দিল তিতির। তারপর মুগ্ধকে ছেড়ে দুই পা উঠিয়ে গুটিসুটি হয়ে নিজের সিটে মাথা রেখে মুগ্ধর দিকে ফিরে বসলো। তারপর মুগ্ধর হাত ধরে বলল,
-“একটা কথা বলবে?”
ইশ! তিতিরের ঘুমু ঘুমু ভেজা ভেজা ভয়েসটা কাছ থেকে কি যে সুন্দর লাগছে। ভয়েস যদি খাওয়া যেত মুগ্ধ এক্ষুনি খেয়ে ফেলতো। তিতির আবার হাতে নাড়া দিয়ে বলল,
-“বলোনা, বলবে?”
মুগ্ধ বলল,
-“হুম, বলো কি?”
-“ইকরা কিসে পড়ে?”
-“ভার্সিটিতে।”
-“আমার সমান?”
-“না তোমার চেয়ে অনেক বড়। ও আমাদের ভার্সিটিতেই পড়ে। এখন বোধহয় সেকেন্ড ইয়ার।”
-“ও। আচ্ছা ও কক্সবাজারে কি করেছিল? যার জন্য তোমার কাছে মাফ চাইছিল?”
-“অনেক খারাপ একটা কাজ করেছিল।”
-“সেটা তো তোমাদের মেসেজ দেখে আমি বুঝেছি। কিন্তু কি করেছে বলোনা? তুমি তো বলেছ বলবে।”
-“আমি তো বলতেই পারি কিন্তু তুমি তো সহ্য করতে পারবে না। আর লজ্জাও পাবে।”
-“সহ্য করতে না পারার কি হলো? পারব, বলোতো।”
-“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুমের মধ্যেই ও আমাকে কিস করেছে।”
-“কোথায়?”
-“ঠোঁটে।”
-“মানে?”
-“বোঝোনি?”
-“তুমি করতে দিলে কেন?”
-“আমি তো ঘুমিয়ে ছিলাম রে বাবা। যখন টের পেয়েছি তখন তো উঠে চড় মেরেছি একটা।”
-“কিন্তু ততক্ষণে তো ও যা করার করেই ফেলেছে।”
-“নাহ, এর পরেও করেছে।”
-“কি করেছে?”
তিতিরের চোখেমুখে আতঙ্ক। মুগ্ধ বলল,
-“ও শার্ট পড়া ছিল। হঠাৎ শার্টের বাটনগুলো সব খুলে ফেলেছিল।”
-“কিহ?”
আবছা আলোয় মুগ্ধর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তিতিরের মুখটা লাল হয়ে গেছে। চোখে পানিও এসে গেছে, পড়ার অপেক্ষা শুধু। মুগ্ধ বলল,
-“কাঁদলে কিন্তু একটা থাপ্পড় মারবো। আমি কি তাকিয়েছিলাম নাকি ওর দিকে? আমি তো ওকে চড় মেরে ঘর থেকে বের করেই দিয়েছিলাম।”
-“কক্সবাজারে এটা কি করে সম্ভব? আর কেউ ছিলনা?”
-“সবাই মহেশখালী গিয়েছিল। আমার পা কেটে যাওয়ার আমি যাইনি। আর ও যে যায়নি কিকরে বলবো বলো? আমি তো ঘুমিয়েই ছিলাম।”
তিতির আর কিছু বলল না। মন খারাপ করে বসে রইলো। মুগ্ধ বলল,
-“তোমার কি মনে হয় তোমার মুগ্ধ বিলিয়ে দেয়া অর্ডিনারি জিনিস হাত পেতে নেয়?”
-“না।”
-“তাহলে মন খারাপ করছো কেন?”
-“জানিনা।”
মুগ্ধ তিতিরের কোমড় জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে আনলো। তারপর বলল,
-“তোমার মুগ্ধর তো শুধু তার তিতিরপাখির উপর লোভ! অনেক লোভ জানো?”
তিতির মিটিমিটি হাসলো। কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর বলল,
-“তোমাকে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। অনেক দিন আগে থেকেই ভেবেছি কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি।”
-“কি বলো?”
-“বান্ধরবানে একটা কথা বলেছিলে মনে আছে?”
-“বান্দরবানে তো কত কথাই বলেছি। কোনটার কথা বলছ এখন?”
-“ওইযে.. ইউ নেভার কিসড ইউর এক্স বিকজ অফ হার লিপস্টিক।”
মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। বলল,
-“হ্যা বলেছি তো। আর এটা ট্রু!”
-“তারমানে কি যেহেতু তোমার টোটাল ৩ জনের সাথে সম্পর্ক ছিল। তাই ওকে ছাড়া তুমি বাকি দুইজনের সাথে কিস করেছো?”
মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“হ্যা করেছি। এটা তো একটা নরমাল ব্যাপার। তোমাকেও তো কতবার করতে চেয়েছি তুমি তো পারমিশন দাওনি।”
-“ওরা কি চাইতেই পারমিশন দিয়ে দিল?”
-“হ্যা। পারমিশন লাগেনি ওরাও উদ্যোগী ছিল।”
-“আমার অবাক লাগে তুমি কি টাইপের মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলে!”
-“সবাই তো আর তোমার মত লাজুকলতা না।”
-“তোমার ওরকমই পছন্দ না? আমার টাইপ মেয়ে তেমন পছন্দ না?”
এবার মুগ্ধ একটু সিরিয়াস হয়ে বলল,
-“তিতির, তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা যে প্ল্যান করে হয়নি তা তো তুমি জানোই। সম্পর্কটা না করে বাঁচতাম না, তাই করেছি। ৫ দিনে বুঝে গিয়েছিলাম তোমাকে ছাড়া ভাল থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব। তোমার সাথে ওদের তুলনা করা চলে না। আর তুমি যেমন তেমনভাবেই আমি তোমাকে ভালবেসেছি, তেমবভাবেই ভালবাসতে চাই বাকীটা জীবন। আমার কি ধরনের মেয়ে পছন্দ অপছন্দ তা তুমি ভাবতেও যেও না। শুধু জেনে রেখো তোমাকে আমার পছন্দ!”
আহ! তিতিরের আবার উড়তে মন চাইছে। কিছু বলল না, মনে মনে উড়তে লাগলো। মুগ্ধ বলল,
-“এই অনেক সিরিয়াস সিরিয়াস কথা হয়েছে। এবার একটু তাকাও না আমার দিকে।”
তিতির তাকালো। মুগ্ধ তিতিরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তিতির মুগ্ধর গালে হাত রেখে বলল,
-“তোমার দাড়িটা এখন একদম পারফেক্ট সাইজ। বেশি বড়ও না, আবার বেশি ছোটও না। কেন যে ক্লিনসেভ করো!”
-“অফিসের জন্য।”
-“ধুর! অফিসকে বলবা এটা ফরমাল হওয়ার নতুন স্টাইল।”
-“তাই অনেক সুন্দর লাগছে?”
-“অন্নেক!”
-“তাহলে একটা চুমু দাও।”
তিতিরের জন্য ভালই হলো। এতক্ষণ দাড়ির দিকে তাকিয়ে তিতিরের একটা চুমু দিতেই ইচ্ছে করছিল। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারেনি। মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে কিন্তু ওইযে লজ্জা! লজ্জায় পারেনা।
মুগ্ধ গাল বাড়িয়ে আছে। যদিও অন্ধকার আর এত রাতে সবাই ঘুমাচ্ছে তবু তিতির আশেপাশে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। তারপর মুগ্ধর বাড়িয়ে রাখা গালটাতে একটা চুমু দিল। তিতির যখন সরে যাচ্ছিল তখন মুগ্ধ তিতিরের মুখটা ধরে ইচ্ছেমত ওর গালে গাল ঘষে দিল। তিতির ব্যাথায় উঁহ করে উঠলো। মুগ্ধ তাড়াতাড়ি ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
-“আস্তে। কি সব সাউন্ড করছো! কেউ শুনলে কি ভাববে জানো? বোকা মেয়ে কোথাকার!”
তিতির মুগ্ধর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে ঠোঁট উলটে বলল,
-“দাড়ি না যেন তাঁরকাটা।”
একথা শুনে মুগ্ধ হেসে গড়িয়ে পড়লো। তারপর বলল,
-“তোমার না দাড়ি ভাল লাগে?”
তিতির মুগ্ধর আরো কাছে এসে বলল,
-“ভাল লাগে তো। এখনো লাগে। দাড়ি দিয়ে আরো যত খোঁচাই দাও না কেন তবু ভাল লাগবে। আই জাস্ট লাভ ইট।”
-“তাই? তাহলে আরেকবার দিই?”
-“দাও।”
মুগ্ধ এবার তিতিরের গালে নয় ঘাড়ে দাড়ি ঘষে দিল। তিতির ছিটকে সরে গেল। ওপাশে মুগ্ধর একটা হাত না থাকলে তিতির জানালার উপর পড়ে ব্যাথা পেত। তিতির ঘাড়ের সেখানে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো। ওর হার্টবিট ভয়ানকভাবে বেড়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলছে। মুগ্ধ জিজ্ঞেস করলো,
-“ব্যাথা পেয়েছ?”
তিতির আবার সেই ভেজা স্বরে বলল,
-“না।”
কিন্তু মুখ তুলে তাকালো না তিতির। একইভাবে বসে রইলো। মুগ্ধ ওকে বুকে টেনে নিল। তারপর তিতিরের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
-“পাগলী! শান্ত হও। এখনি এত অস্থির হলে ভবিষ্যতে কি করবে?”
তিতির কিছু বলল না। মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা, তোমার কি খুব ভাল লেগেছিল?”
তিতির চুপ। মুগ্ধ বলল,
-“জাস্ট সে ইয়েস অর নো।”
তিতির এবারেও চুপ করে রইলো। মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা যাও সহজ করে দিচ্ছি। ভাল না লাগলে তুমি আমার বুক থেকে উঠে তোমার সিটে গিয়ে বসো। আর যদি ভাল লাগে তাহলে এভাবেই থাকো আমার বুকে।”
তিতির আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো ন। দুই হাত দিয়ে আরো শক্ত করে মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরলো। মুগ্ধ হেসে বলল,
-“জানতাম তো!”
To be continued….

প্রেমাতাল পর্ব – ২২ || মৌরি মরিয়ম

ওদের সম্পর্ক তখন ৪ মাস চলছিল। তিতির পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায়নি। প্রাইভেটেই ভর্তি হয়েছে। ওদিকে মুগ্ধর মাস্টার্স কম্পলিট হয়ে গেছে। তখনই মুগ্ধ আগের চাকরিটা ছেড়ে এখনকার চাকরিটায় জয়েন করেছিল। আগের অফিস ধানমন্ডিতেই ছিল। এখনকারটা বনানী। ধানমন্ডি থেকে বনানী অফিস করাটা ডিফিকাল্ট লাগলেও মুগ্ধ বাসা চেঞ্জ করেনি কারন এখানে তিতির আছে। এখান থেকে চলে গেলে যখন তখন তিতিরের সাথে দেখা করাটা এতটাও ইজি হবে না।
তখনকারই একটা দিন মুগ্ধ কেবল অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েছে। এমন সময় তিতিরের ফোন,
-“হ্যালো।”
-“হ্যা তিতিরপাখি বলো।”
-“বাসায় ফিরেছো?”
-“হ্যা, একটু আগেই। তুমি কোথায়?”
-“ভার্সিটিতে।”
-“এখনো? সন্ধ্যা হয়ে গেল তো। আবার বৃষ্টিও তো নামলো।”
-“হ্যা, একটা ফ্রেন্ডের বার্থডে ছিল। সবাই মিলে একটু সেলিব্রেট করছিলাম।”
-“ও।”
-“এই শোনোনা, তুমি কি অনেক টায়ার্ড?”
-“না তো। কেন তুমি জানোনা তোমার বাচ্চাদের বাবা একটুতেই টায়ার্ড হয়না?”
-“উফ আবার শুরু হয়ে গেছে!”
-“রেগে যাচ্ছো কেন? বাচ্চাদের বাবা অন্য কাউকে বানানোর ইচ্ছে আছে নাকি?”
তিতির হেসে বলল,
-“কামড় দিব কিন্তু।”
-“দাওনা প্লিজ। তোমার কামড়ে অন্তত তোমার ঠোঁটের ছোঁয়াটা পাওয়া যায়। চুমু তো আর দাওনা।”
-“এই রাখলাম। কি বলতে ফোন করেছি তা শোনার নাম নেই যত হাংকিপাংকি কথা বলে চলেছে।”
-“আচ্ছা সরি সরি। বলোনা কি বলবে।”
-“বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে।”
-“ভেজো। তবে বাসায় এসে। রাস্তা দিয়ে একা একা ভিজতে ভিজতে এসোনা।”
-“উঁহু। তোমার সাথে ভিজতে ইচ্ছে করছে।”
-“ও। তুমি তাহলে ভার্সিটিতেই থাকো। আমি আসছি।”
মুগ্ধ একটা রিক্সা ডেকে উঠে পড়লো। মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে এখন। ১০ মিনিটে রিক্সা তিতিরের ভার্সিটির সামনে গিয়ে থামতেই তিতির দৌড়ে এল। মুগ্ধ সরে বসলো। তিতির রিক্সায় উঠতেই মুগ্ধ রিক্সাওয়ালাকে বলল,
-“মামা চালাও। ১১ নাম্বার রোডে খালি যাইয়ো না। আর যেদিকে তোমার মন চায় যাও।”
রিক্সা চলতে শুরু করলো। সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত নেমে এসেছে। ভিজে দুজনে চুপচুপে হয়ে গেছে। মুগ্ধ তিতিরের কোমড় জড়িয়ে ধরলো। তিতির লাফিয়ে উঠলো। পড়েই যাচ্ছিল, মুগ্ধ ধরে ফেলল,
-“এত লাফালাফির কি আছে?”
-“সুড়সুড়ি লাগে। ধুরো ছাড়ো না।”
-“সিরিয়াসলি? ছাড়লে খুশি হবে? সত্যি তো?”
তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“না, কিন্তু ওভাবেও জড়িয়ে ধরোনা প্লিজ। নরমালি ধরে রাখো।”
মুগ্ধ ওর কথামত আলগাভাবে ধরলো। তারপর তিতিরের কানের কাছে মুখ এনে বলল,
-“আই লাভ ইউ।”
-“হুম, জানি।”
-“আমি আজও উত্তরটা পেলাম না।”
-“সময় হলেই পাবে।”
মুগ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আল্লাহ সেই দিনটা আমি জীবিত থাকতেই দেখিও।”
তিতির মুগ্ধর হাতটা নিয়ে একটা কামড় দিল। মুগ্ধ ফিসফিস করে বলল,
-“একদিন তো একটা চুমু দিলেও পারো। সবসময় কামড়ই দিতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।”
তিতির সেকথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,
-“তোমাকে না আমি একদিন নিষেধ করেছি থ্রি-কোয়ার্টার পড়ে আমার সামনে আসবেনা।”
-“পড়ে দেখেছি। কিছুই হয়না তাই আবার পড়েছি। আর তুমিই বলো বৃষ্টিতে ভিজে একটা ফুল প্যান্ট নষ্ট করা কি ঠিক?”
-“তোমার সাথে কথা বলাটাই বৃথা।”
মুগ্ধ আর এই অহেতুক বিষয়ে কথা বাড়ালো না। বলল,
-“তোমাকে কি এখন কিছুতেই বিয়ে দেবে না?”
-“না। স্টাডি শেষ হওয়ার আগে তো অসম্ভব।”
-“মা আজও বিয়ে কর বিয়ে কর বলছিল। আমার এক কাজিন আমাকে অনেক পছন্দ করে। ও এমনভাবে মায়ের মাথা খেয়েছে যে মা ওকেই বিয়ে করতে বলছে।”
তিতির আতঙ্কিত স্বরে বলল,
-“মানে?”
মুগ্ধ দেখল তিতিরের চোখে পানি এসে পড়েছে। সেকেন্ডের মধ্যে মুখটা লাল হয়ে গেল। মুগ্ধ ওকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“এই পাগলী! কাঁদছ কেন? বললেই কি আমি বিয়ে করছি নাকি? আমার উপর বিশ্বাস নেই?”
তিতির একটা কথাও বলল না। মুগ্ধ বলল,
-“আমি এমনিতেই ওকে পছন্দ করিনা। ইভেন হেট করি। তুমি না থাকলেও আমি আর যাই হোক ওকে বিয়ে করতাম না।”
-“ওর নাম কি?”
-“ইকরা।”
-“কেমন কাজিন তোমার?”
-“ফুপাতো বোন।”
-“ওর নাম্বার কি তোমার মোবাইলে ‘প্যারা’ লিখে সেভ করা?”
-“হ্যা। তুমি কি করে জানলে?”
-“সরি আমি তোমার পারমিশন ছাড়া তোমার মোবাইল ধরেছিলাম আর মেসেজ পড়েছিলাম।”
-“আরে ধুর পাগলী। কিসের সরি? যা আমার তা তোমারও। আমার কোনো জিনিস ধরার জন্য তোমার পারমিশন নিতে হবে না। তাছাড়া, আমার জীবনে সিক্রেট বলে কিছু নেই যা তোমার কাছে লুকাতে হবে।”
তিতির চুপ করে রইল। মুগ্ধ বলল,
-“যাই হোক, বাদ দাও ওর কথা। আসল কথা বলি। মা যখন ওকে বিয়ে করার কথা বলছিল তখন আমি মাকে তোমার কথা বলে দিয়েছি।”
তিতির অবাক হয়ে তাকালো মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধ তিতিরের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলো,
-“বলার পর মা বলল, ‘তাহলে তো হলোই। চল বিয়ের প্রপোজাল নিয়ে যাই।’ আমি বললাম, ‘মা তিতির খুব বাবু একটা মেয়ে। ওর ফ্যামিলি এখনই ওকে বিয়ে দেবে না।’ তারপর মা কতক্ষণ আফসোস করলো এতদিন পর মেয়ে একটা পছন্দ করেছি তাও এত ছোট! আরো কত কি! তারপর বুচ্ছো পিউকে ফেসবুকে তোমার ছবি পাঠিয়ে বলেছি মাকে দেখাতে। তোমার ছবি দেখে মা পুরো পাল্টি খেল।”
তিতির মন খারাপ করে বলল,
-“পছন্দ করেনি না? তুমি যে কেন ছবি পাঠাতে গেলে? ছবিতে আমাকে আরো ছোট ছোট লাগে। কোন ছবিটা পাঠিয়েছো?”
যেই ছবিই পাঠাই না কেন মা ছবি দেখে বলেছে, ‘মুগ্ধ তুই এতদিনে একটা কাজের কাজ করেছিস বাপ। ছোট হয়েছে তো কি হয়েছে? ওর বিয়ের বয়স হতে হতে হয়তো তোর ৩০/৩২ বছর হয়ে যাবে তাতে কি! পুরুষ মানুষের বয়সে কি আসে যায়?”
কথা শেষ হতেই মুগ্ধ হো হো করে হেসে দিল। তিতিরের আতঙ্ক কমেছে, ও তাকিয়ে আছে। মুগ্ধ বলল,
-“আমার মা বুচ্ছো পুরা একটা সিনেমার ক্যারেকটার। তার ব্যাবহারে তোমার মনে হবে যে সে তোমারই বয়সী। একদম বাচ্চাদের মত করে। মা আরো কি বলেছে জানো? বলেছে, ‘আগে তোর পছন্দ করা একটা মেয়েকেও আমার ভাল লাগেনি। এই মেয়েটা একদম হিরার টুকরা। কোথায় পেলি?’ হা হা হা মা পারেও।”
-“সত্যি আন্টি আমাকে পছন্দ করেছে?”
-“কি বললে?”
-“কি বলেছি?”
-“আমার মা তোমার আন্টি হয়? এক থাপ্পড় মারবো, মা বলো।”
তিতির মুগ্ধর আরো কাছে এসে ওর একটা হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
-“এই বলোনা, মা আমাকে পছন্দ করেছে?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“হুম, খুব।”
তিতির হাসলো। মুগ্ধ বলল,
-“এত পছন্দ করেছে যে তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। সামনাসামনি দেখতে চায়।”
-“মা যেন কবে ঢাকায় আসবে?”
-“সামনের মাসেই তো পিউ এর পরীক্ষা। পরীক্ষা হয়ে গেলে পিউকে নিয়ে সবাই আসবে। আমাকে আর পিউকে নতুন বাসায় তুলে দিয়ে মা-বাবা স্নিগ্ধকে নিয়ে চলে যাবে। স্নিগ্ধর পরীক্ষা পর্যন্ত বাবা-মা ওখানেই থাকবে। পরীক্ষা শেষ হতেই মা স্নিগ্ধকে নিয়ে পার্মানেন্টলি চলে আসবে। বাবা ট্রান্সফার পেলে আসবে নাহলে ওখানেই থাকবে।”
-“ও। তখন তুমি ধানমন্ডি ছেড়ে চলে যাবে না?”
-“তো কি? যখন বলবে তখনই বান্দা হাজির হয়ে যাবে।”
তিতির হেসে বলল,
-“আমি জানি।”
-“তিতির জানো মা বলছিল তোমাকে চিটাগাং নিয়ে যেতে। যদি সম্ভব হতো সত্যি তোমাকে নিয়ে যেতাম। ইশ! নাভাল রোডের কাঁকড়া ফ্রাই! পতেঙ্গা রোডের বাইকরাইড সবকিছু যেন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে!”
-“সম্ভব না কেন?”
-“মানে? সম্ভব না কেন তুমি জানো না?”
-“কেন?”
-“বাসায় কি বলে যাবে তুমি?”
-“বলবো ট্যুরে যাচ্ছি।”
-“সিরিয়াসলি?”
-“হ্যা! কিন্তু এভাবে বিয়ের আগেই তোমাদের বাসায় চলে গেলে কেউ আমাকে খারাপ ভাববে না তো?”
-“কে খারাপ ভাববে? আমার মা? বললাম না আমার মা কেমন? একটু বোকাসোকা। কিন্তু পাগল একটা। তোমাকে ভাল লাগলে তোমার জন্য জান দিয়ে দেবে।”
-“আর বাবা?”
-“বাবার সময় কোথায় কিছু ভাবার? আর আমি বাবার সাথেও ফ্রি। নো প্রব্লেম তিতিরপাখি। তাছাড়া তুমি তো আর আমার সাথে থাকবে না। পিউ এর সাথে থাকবে। কিন্তু তুমি কি সত্যি যেতে পারবে?”
-“পারবো।”
-“তাহলে পরশুই চলো। আমিতো এমনিতেই পরশু যাব বলেছিলাম না তোমাকে?”
-“ও হ্যা। আচ্ছা, আমি আজ রাতেই তোমাকে কনফার্ম করছি।”
-“ওকে। ওই মামা রিক্সা এইখানেই থামাও।”
তিতির বলল,
-“এটা তো ১০ নাম্বার।”
মুগ্ধ ভাড়া দিতে দিতে বলল,
-“এত পাক্নামি করো কেন? নামো রিক্সা থেকে।”
তিতির নামলো। মুগ্ধ তিতিরের হাত ধরে ১০ নাম্বার রোডে ঢুকলো। তিতির পানিতে হাটবে বলে স্যান্ডেল খুলে ফেলল। তারপর স্যান্ডেলের ফিতাটা আঙুলের সাথে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
-“দেখেছো বৃষ্টি আরো বেড়েছে। আজ বাসায় ফিরতেই ইচ্ছে করছে না।”
-“রাস্তাঘাটে মানুষজন এত কম কেন জানো? বৃষ্টির জন্য! আর তুমি কিনা বৃষ্টির জন্য বাসায় যেতে চাচ্ছো না?”
তিতির মুগ্ধর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,
-“হুম আমার তো বৃষ্টি আর মুগ্ধকে একসাথে খুব ভাল লাগে।”
-“রিয়েলি? আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের নাম কিন্তু বৃষ্টি ছিল।”
তিতির অবাক চোখে তাকালো মুগ্ধর দিকে। বলল,
-“তোমাকে বলেছিনা তুমি তোমার এক্স হিস্ট্রি আমাকে শোনাতে আসবে না?”
-“আমি কোথায় বললাম? তুমিই তো বললে!”
তিতিরের এক হাতে স্যান্ডেল আরেক হাতে ব্যাগ থাকায় মারতে পারলো না। কিন্তু ঠিকই তেড়ে এসে কামড়ে দিল মুগ্ধর হাতে। মুগ্ধ তাড়াতাড়ি তিতিরকে কোলে নিয়ে হাঁটা ধরলো। কয়েক পা হেঁটেই মুগ্ধ বলল,
-“আমি তোমাকে কোলে নিব বলেই রিক্সা ছেড়ে দিয়েছি। বুঝেছ তিতিরপাখি?”
তিতির কিছু না বলে শুধু হাসলো। কিছুদূর যেতেই একটা পুলিশের গাড়ি দেখা গেল। ভেতর থেকে একটা পুলিশ ডাক দিল,
-“এইযে হিরো? এটা কি সিনেমা করার যায়গা? দিস ইজ পাবলিক প্লেস!”
তিতির আস্তে আস্তে বলল,
-“এই আমাকে নামিয়ে দাও।”
মুগ্ধ বলল,
-“চুপ করে খালি দেখে যাও। প্রয়োজনে আমার কথায় তাল মেলাবে।”
মুগ্ধ গাড়িটার কাছে গিয়ে বলল,
-“সরি স্যার। ও বৃষ্টিতে পা পিছলে পড়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে, হাটতে পারছে না। তাই কোলে করে নিয়ে যাচ্ছি। সামনেই আমাদের বাসা।”
পুলিশ বলল,
-“ও, আচ্ছা যান তাহলে।”
-“থ্যাংকস।”
মুগ্ধ তিতিরকে কোলে নিয়েই আবার ব্যাক করলো। গাড়িটা স্পীডে চালিয়ে চলে যেতেই ওরা দুজনে হেসে দিল। তিতির বলল,
-“ইউ আর জিনিয়াস!”
-“তো কি? ওদের ভয়ে আমি তোমাকে কোল থেকে নামাবো নাকি? ধুর ওদের পাত্তা দেয় কে?”
-“বাহ রে! এখন পার্ট নেয়া হচ্ছে? খুব তো স্যার স্যার করছিলে!”
-“স্যার স্যার করিনি। স্যার বলে সম্বোধন করেছি। ওটা ভদ্রলোকেরা করে।”
১০ নাম্বার রোড শেষ হতেই মুগ্ধ তিতিরকে নামিয়ে বলল,
-“কিন্তু এবার নামাতেই হবে। বাকিটা আমাদের আলাদা যাওয়া উচিৎ।”
তিতির কোল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
-“ধরা পড়লে খবর আছে। অনেক বেশি সাহস দেখাই আমরা। আসলে আমাদের ধানমন্ডির মধ্যেই দেখা করা উচিৎ না।”
-“হুম, বাসায় যাও এখন তাহলে। এত বেশি বৃষ্টিতে ভিজলে আবার ঠান্ডা লাগবে।”
তিতির মুগ্ধকে বিদায় জানিয়ে হাটতে শুরু করলো। মুগ্ধ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তিতির ৭/৮ পা গিয়েই দৌড়ে ফিরে আসলো। মুগ্ধ বলল,
-“কি?”
তিতির মুখে কিছু বলল না, আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো লোকজন নেই। স্যান্ডেল আর ব্যাগ হাত থেকে ফেলে দিল। তারপর আচমকা মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরলো। মুগ্ধ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরে সামলে নিল। তারপর নিজেও জড়িয়ে ধরলো। কিছুক্ষণ পর তিতির ওকে ছেড়ে নিচু হয়ে ব্যাগ আর স্যান্ডেল তুলে হাঁটা শুরু করলো। একবারও আর মুগ্ধর দিকে তাকালো না। মুগ্ধ পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছিল তিতির ব্যাগটা কাধের উপর ফেলে পেনসিল হিলের চিকন ফিতাগুলো আঙুলে ঝুলিয়ে হেলেদুলে হাঁটতে লাগলো। যেন ওর মত সুখী মানুষ এই পৃথিবীতে আর একজনও নেই।
To be continued….