Home Blog Page 3

সুরভিত অতীত || ফারজানা শারমিন

সুরভিত অতীত
ফারজানা শারমিন
অনেকদিন পরে ঝরছে মেঘ হৃদয়ের আকাশে
ঝরছে অশ্রু এ নয়ন তরে
অনেক সাধের স্বপ্ন খুঁজে চলেছে চোখের পান্থশালায়,
সে কোন আলোর মায়া ভরিয়ে গেল হৃদয়ে
সেই ভাঙ্গা স্বপ্ন নিয়ে বুকে,
হেঁটে চলেছি আমি
জানি না কোথায় কিসের সন্ধানে,
জ্বলে কিসের দহনে
সব পুড়েছে কিছুই আর নেই বাকি,
সুরভিত অতীত জানে ওই মিলন বিন্দুর মাঝে রয়েছে
কতো স্বপ্ন কত কাহিনী,
কত রাতের চন্দনময় সুবাস আছে লুকায়ে।

আসবে মরণ || শফিক নোমানী

আসবে মরণ
শফিক নোমানী
জানিনা যে আমি কখন
আসবে আমার মরণ,
সেদিন আমার আপনজন
       সবে হবে পর।
  মা- বাবা আত্নীয়- স্বজন  করবে আহাজারি,
সম্পদ নিয়ে সন্তানাদি  করবে খারাখারি।
 কবরেতে রেখে
আসবে সবাই চলে
তিনদিন পরে তারা সবাই
যাবে মোরে ভুলে।
কবরে যাবার আগে 
ভেবে দেখ মন
কাদের জন্য করছ তুমি
রঙ্গিন আয়োজন।

প্রেমাতাল পর্ব – ২১ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধ চোখ খুলে রাখতে পারছেন। ঘুমের জন্য না। চোখদুটো প্রচন্ড জ্বলছে তাই। গতকাল তিতিরের সাথে কথা হওয়ার পর সারারাত আর ঘুমাতে পারেনি। ফোন না দিয়েই বা কোথায় যাবে? মন তো আর সবসময় এত বাধা মানতে চায়না। নিঃশ্বাসটা আটকে যায় মাঝে মাঝে। স্নিগ্ধ, পিউ আর মায়ের দায়িত্ব ওর উপর না থাকলে আল্লাহ কে বলতো নিঃশ্বাসটা যেন সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দেয়। এখন তাও পারেনা। কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে সাময়িকভাবে সবকিছু থেকে একটু দূরে থাকা যায়। কিন্তু দুদিন ধরে অফিসে কাজের চাপ কম। তাই এখন ব্যস্থতাও নেই তিতিরের স্মৃতির হাত থেকে রেহাইও নেই।
লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে। পিয়ন এসে লাঞ্চের জন্য ডেকে গেছে অনেকক্ষণ আগে। মুগ্ধ উঠলো। ফোন ওয়ালেট পকেটে ঢুকালো। প্রায় সাথেই সাথেই ফোনটা বেজে উঠলো। তিতির! তিতির ফোন করেছে! কিন্তু এটা প্রায় অসম্ভব।গত ৭ মাসে তিতির একটাবারও ফোন করেনি ওকে। ফোন রিসিভ করলো। না তিতির নয় একাটা পুরুষ কন্ঠ ভেসে এল ওপাশ থেকে,
-“হ্যালো।”
-“হ্যালো।”
-“মুগ্ধ বলছেন?”
-“ইয়েস। আপনি কে? এটা তো তিতিরের নাম্বার।”
-“দেখুন ভাইয়া, আমি ওনার নাম জানিনা। উনি রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে। তাই ওনার ব্যাগ ঘেটে ফোনটা বের করতে বাধ্য হয়েছি। ফোন লক করা আর ইমারজেন্সি কল লিস্টে কেবল আপনার নাম্বারটাই পেলাম তাই আপনাকে কল করলাম।”
তিতির রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে এই সেনটেন্সটাই যথেষ্ট ছিল মুগ্ধর ভেঙে পড়ার জন্য। কিন্তু মুগ্ধ ভেঙে পড়েনি। কঠিন সময়ে স্টেবল থাকার ক্ষমতা আল্লাহ ওকে দিয়েছে। স্বাভাবিক স্বরে
-“ওহ ওকে ওকে! কোথায় আছেন?”
-“বনানী, চেয়ারম্যান বাড়ি।”
-“ভাই, আমার ১০-১৫ মিনিট লাগবে। আপনি কি ততক্ষণ একটু থাকবেন ওর পাশে?”
-“শিওর। আপনি আসুন।”
অফিস থেকে বের হতে হতেই মুগ্ধ চিন্তা করছিল, তিতির এখানে কি করছে? ওর বাসা, ইউনিভার্সিটি সবই তো ধানমন্ডিতে। তবে কি মুগ্ধর কাছেই এসেছিল?
১৫ মিনিট লাগলো মুগ্ধর অফিস থেকে আসতে। দূর থেকেই দেখতে পেল তিতিরকে। দেখামাত্রই এক দৌড়ে চলে গেল ওর কাছে। একটা মেয়ের কোলে ওর মাথাটা রাখা। আশেপাশে কয়েকটা ছেলে আর একজন বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে আছে। নার্ভাস লাগছে, তিতিরকে কখনো এভাবে দেখেনি ও। ওদের কাছে গিয়ে বলল,
-“স্কিউজমি, আমিই মুগ্ধ।”
একটা ছেলে বলল,
-“আমি শ্রাবন। আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। এইযে ওনার ফোন।”
মুগ্ধ ফোনটা নিয়ে তিতিরের পাশে বসতেই ছেলেটি বলল,
-“ভাইয়া উনি পুরোপুরি সেন্সলেস হননি। অন্য কোনো প্রব্লেম হয়েছে তাকাতে পারছিলনা আর কথাও বলতে পারছিলনা। ওনার চোখেমুখে পানি দেয়া হয়েছে। পানি খাওয়ানোও হয়েছে। কিছু বলার চেষ্টা করেছিল। আমরা বুঝতে পারিনি। তারপর আর চোখ খোলেনি।”
-“ওকে আমি ওকে আশেপাশে কোনো হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ।”
-“ইটস ওকে ব্রাদার! চোখের সামনে এরকম দেখে এটুকু না করে পারা যায়না। আপনার গার্লফ্রেন্ড?”
-“হ্যা।”
মুগ্ধ একটা সিএনজি ডেকে তিতিরকে নিয়ে উঠলো। শ্রাবন ছেলেটা বলল,
-“ভাইয়া আমরা ওনার খবর পাবো কিভাবে?”
মুগ্ধ ওয়ালেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিয়ে বলল,
-“থ্যাংকস এগেইন।”
-“ইটস ওকে! টেক কেয়ার অফ হার।”
সিএনজি ছাড়তেই মুগ্ধ তিতিরকে নিজের বুকের সাথে হেলান দিয়ে শোয়ালো। তিতিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কি বিদ্ধস্ত হয়েছে চেহারা। মুখটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচটা কিছুটা কালো হয়েছে। ওর ফ্যামিলির মানুষগুলোর কি এগুলো চোখে পড়েনা? তিতির একটু তাকানোর চেষ্টা করলো। দুইতিন সেকেন্ড তাকিয়েই ওর চোখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল আবার। মুগ্ধ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল কাছের একটা ক্লিনিকে।
ডাঃ তিতিরকে দেখে বলল,
-“ওনার প্রেশার লো হয়ে এরকম হয়েছে। আর উনি বোধহয় রাতে ঘুমায়না একদমই, খাওয়াদাওয়াও ঠিকমত করেনা। শরীর খুব দুর্বল। তবে চিন্তা করবেন না, ওনার জ্ঞান আছে। কে হন আপনি ওনার?”
-“বয়ফ্রেন্ড।”
-“ঝগড়া হয়েছিল নাকি?”
-“না।”
-“তাহলে ওনার ডিপ্রেশন টা কিসের?”
-“একচুয়েলি ওর ফ্যামিলি আমাদের সম্পর্কটা মানেনি। তাই নিয়েই বোধহয় ও আপসেট।”
-“বোধহয় মানে? আপনি ঠিকমতো জানেনও না? ফ্যামিলি বয়ফ্রেন্ড সবাই মিলে কেয়ারলেস হলে তো এমন হবেই।”
-“ডক্টর, আমাদের ৭/৮ মাস ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল, রাস্তার লোকজন ওর মোবাইলের ইমারজেন্সি কল লিস্টে আমার নাম্বার পেয়ে আমাকে ফোন করে তখন আমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসি। যোগাযোগ না রাখলে কি করে কেয়ার করবো বলুন?”
ডাঃ কতক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। সে কি ভাবছে বোঝা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর বলল,
-“আমি ওনাকে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দিচ্ছি, দুএক ঘন্টা ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে। আর কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ভিটামিন। রেগুলার খেতে বলবেন।”
ইনজেকশন দেয়ার সময় ও একটু ব্যাথা পেয়ে কুঁকড়ে গেল। একবার তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। কোনো কথা বলতে পারল না। তিতিরের এমন নিথর দেহ আর নিস্তেজ মুখটা সহ্য করতে পারছিল না মুগ্ধ। বলল,
-“ডক্টর আমি ওকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি।”
-“ওনার তো ঘুম দরকার।”
-“হুম বাসায় গিয়ে ঘুমাবে।”
-“আচ্ছা নিয়ে যান।”
পিউ দরজা খুলেই অবাক। বলল,
-“ভাবী! ভাইয়া, ভাবীকে কোথায় পেলি? কি হয়েছে ওর?”
মুগ্ধ তিতিরের ঘুমন্ত মাথাটা নিজের বুকে ঠেকিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ওর হাতগুলো ঝুলছিল। এই দৃশ্যটা পিউ নিতে পারছিল না। মুগ্ধ ভেতরে ঢুকতেই পিউ আবার জিজ্ঞেস করলো,
-“বলনা ভাবীর কি হয়েছে? অজ্ঞান হয়ে গেছে?”
-“প্রেশার লো হয়ে রাস্তায় পড়ে গেছিল।”
-“তারপর? তুই পেলি কিভাবে?”
মুগ্ধ পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে বলল পিউকে। তারপর বলল,
-“ওকে ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। তাই ঘুমাচ্ছে।”
মুগ্ধ তিতিরকে নিজের রুমে নিয়ে গেল। শুইয়ে দিল বিছানায়। পিউ গেল পিছন পিছন। মুগ্ধ পিউকে জিজ্ঞেস করলো,
-“মা বাসায় নেই?”
-“না।”
-“কোথায় গেছে?”
-“ইকরাপুদের বাসায় গেছে। চলে আসবে।”
-“স্নিগ্ধ?”
-“কলেজে।”
-“কলেজ ছুটি হয়েছে ২ টায়। এখন সাড়ে ৩ টা বাজে। এখনো কলেজে কি?”
-“ভাইয়া, ওদের কলেজে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছে তো তাই।”
-“ও। তুই কোথাও যাচ্ছিস নাকি?”
-“হ্যা ভাইয়া, ক্লাস আছে।”
-“যা তাহলে।”
-“ভাবীকে কি একটু পরেই বাসায় দিয়ে আসবি?”
-“ঘুম থেকে উঠলে দিয়ে আসব।”
-“ইশ! আমার ফিরতে ফিরতে রাত হবে। ওর সাথে একটু কথাও বলতে পারলাম না।”
-“কথা বলে আর কি হবে? যে সারাজীবন দূরে থাকবে সে দূরেই থাক।”
পিউ কি বলবে! শান্তনা দেয়ার কোনো ভাষা ওর নেই। তিতিরের অবস্থা দেখে ওর নিজেরই বুকটা ফেটে যাচ্ছে। পরীর মত মেয়েটা কেমন হয়েছে দেখতে! তার উপর বড় ভাই। চুপ করেই থাকলো। মুগ্ধ বলল,
-“ক্লাসে যা। দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। আমি আছি, আজ আর অফিসে যাবনা।”
-“আচ্ছা। ভাইয়া তুই কি লাঞ্চ করেছিলি? নাহলে ভাত দেই তোকে?”
-“করেছি।”
-“আচ্ছা, যাচ্ছি। দরজাটা লাগিয়ে দে।”
পিউ চলে গেল। মুগ্ধ আবার এসে বসলো তিতিরের পাশে। তাকিয়ে রইলো তিতিরের দিকে। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। ঘুমের জন্য যাকে আদর করে ঘুমকুমারী ডাকতো আজ সে নাকি প্রয়োজনীয় ঘুমটুকুও ঘুমায় না। মুগ্ধর ইচ্ছে করছে তিতিরকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখতে। আচ্ছা এমন কোনো মন্ত্র যদি থাকতো বুকে জাপ্টে ধরে মন্ত্রটা পড়লেই প্রিয়জনের সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।তাহলে ও আজ সারাদিন সেই মন্ত্রটা পড়তো।
কত সুন্দর করে কেটে গিয়েছিল ওদের ৪টা বছর। যেন স্বপ্ন! হঠাৎ করেই প্রপোজ করেছিল.. আর তিতির ইন্সট্যান্ট রিপ্লাই দিয়েছিল জড়িয়ে ধরে। তারপর থেকেই শুরু হয়েছিল এই স্বপ্নটা। সকালে যখন মুগ্ধ অফিসে যেত তিতির তখনো ঘুমে। যেদিন ওদের সম্পর্কটা হয়েছিল তার পরের দিন সকালের ঘটনা,
তিতির ঘুমিয়ে আছে। ফোনটা বেজেই চলেছে। চোখ না খুলেই ফোন হাতরে কোনোরকমে কানের কাছে ধরে হ্যালো বলল। সেই হ্যালো টা মুগ্ধর বুকে একটা ফুলের টোকা দিয়েছিল। মুগ্ধ বলল,
-“আমার ঘুমকুমারী এখনো ঘুমাচ্ছে?”
-“হুম আমার স্কুল কলেজ সব সকালে ছিল। ঘুমাতে পারিনি। প্লিজ ঘুমাতে দাওনা।”
আবার সেই ঘুম মাখানো কণ্ঠস্বর। সবগুলো শব্দ যেন একটার সাথে আরেকটা ধাক্কা খেয়ে লুটিয়ে পড়ছে। বেশ লাগছে শুনতে। বান্দরবানে যখন ওকে রেমাক্রিতে সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাবে বলে ঘুম থেকে ওঠাচ্ছিল তখনও এভাবেই কথা বলেছিল তিতির। কিন্তু এখন একটু অন্যরকম লাগছে কেন? বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেছে বলে বেশি আহ্লাদ করছে নাকি? তারপর আচমকাই মুগ্ধর খেয়াল হলো তিতির ওকে তুমি করে বলেছে। এটাই ডিফারেন্স। বাহ! ওর মুখে আপনি তুমি সবই কেন এত ভাল লাগে! মুগ্ধ বলল,
-“এত সিডাক্টিভলি কথা বললে কিন্তু তোমার ঘরে চলে আসব।”
-“আচ্ছা আসো।”
মুগ্ধর হাসি পেল। ও কি ঘুমের ঘোরে থেকেই কথা বলছে এখনো! তা নাহলে তো এধরণের রিপ্লাই না দিয়ে উলটো লজ্জা পেত। মুগ্ধ বলল,
-“আসলে কিন্তু….”
মুগ্ধ কিছু বলার আগেই তিতির বলল,
-“আদর দিতে হবে কপালে বান্দরবানের মত করে। কিন্তু আমি উঠবো না।”
-“ওরে দুষ্টুটা! তুমি জেগে ছিলে?”
-“হ্যা তো। আমি তোমার কোলে চড়ার জন্য ঘুমের ভান করেছিলাম।”
-“ফাজিল মেয়ে, যাও তোমাকে আর কোলেই নিব না।”
তিতির নগদ কান্না করে দিল।
-“অ্যাআআআআ… আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে সারাজীবন কোলে নিবা। আমার ফ্রেন্ডরা ঠিকই বলেছিল। ছেলেরা বয়ফ্রেন্ড হওয়ার পর বদলে যায়।”
কান্না শুনে মুগ্ধ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বলল,
-“আরে না পাগলী। নিব নিব।”
-“না নিবানা। আমি বুঝে গেছি। প্রমাণ তো পেয়েই গেছি। কাল সন্ধ্যায় কোলে চড়ার লোভেই তো আমি তোমাকে রাস্তার মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে কোলে নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে হেঁটে আমাদের নিউ বর্ন রিলেশনশিপ সেলিব্রেট করবে। কিন্তু তুমি করোনি। ফোন নাম্বার নিয়ে ভেগে গেছো। এখন আমার কি হবে! অ্যাআআআআআ।”
মুগ্ধ হাসতে হাসতে কুটিকুটি হলো। তিতির বলল,
-“আমি কাঁদছি আর তুমি হাসছো! তুমি পচা।”
-“সরি বাবা। তুমি কান্না করোনা প্লিজ। সত্যি আমার এমনটাই ইচ্ছে করছিল। আই সয়ার, যদি এটা তোমার বাসার সামনে না হয়ে অন্য যেকোনো যায়গা হতো আমি এটাই করতাম। দেখোনি বান্দরবানে আমি তোমাকে কারনে অকারনে কতবার কোলে নিয়েছি? কোলে নিতে তো আমার ভাল লাগে। কিন্তু কাল আমার ভয় করছিল যদি তোমার বাসার কেউ দেখে ফেলে!”
তিতির কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
-“না না না। এসব কথায় আমি ভুলবো ন।”
-“আচ্ছা যাও। আমাদের বিয়ের পর যখন তোমাকে বাসায় নিয়ে আসব। তখন গাড়ি থেকে নামিয়ে আর এক পা হাঁটাবো না তোমাকে। যত উপরেই হোক না কেন তোমাকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে যাব।”
-“প্রমিস?”
-“প্রমিস!”
-“যদি আমি মোটা হয়ে যাই তবু নিবে?”
-“হ্যা নিব। আমার তিতিরপাখিকে নিবনা কাকে নিব বলো?”
-“কেন তোমার বেবিদের নিবে না? কালকেই না বললে বেবিদের তুমিই কোলে কোলে রাখবে। আমাকে নিতে হবে না। দুইজনকে নাকি একসাথেই কোলে নিতে পারবে?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“হ্যা.. ওদেরকেও নিব। কিন্তু ২ টার পরের গুলোকে তোমার নিতে হবে সেটা কিন্তু ভুলে যেওনা।”
-“আচ্ছা, কিন্তু ওদের যখন নিবে তখন কি আবার আমাকে কোলে নেয়া বন্ধ করে দিবে?”
-“না তো। আমার তিতিরপাখিকে তো আমি সারাজীবন কোলে নিব। কিন্তু বেবিরা যখন ছোট থাকবে হাটতে পারবে না যতদিন ততদিন তো কোলেই রাখতে হবে তাই না? তো তখন হয়তো তোমাকে একটু কম নিতে পারবো।”
-“তাহলে তখন আমিই ওদের কোলে নিব। আর তুমি আমাকে কোলে নিও?”
মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে তুমি খুশি থাকবে তো?”
-“হ্যা.. খুউউউব।”
-“আচ্ছা, এখন বলোতো আমার ঘুমকুমারীর ঘুমটা কেন এত তাড়াতাড়ি ভাঙালাম?”
-“কেন?”
-“অফিসে যাওয়ার আগে মুখটা না দেখে যাই কি করে বলোতো?”
-“কিন্তু আমি তো এখন বের হতে পারবো না। কি বলে বের হব?”
-“বের হতে হবে না। তুমি শুধু বারান্দায় আসো। আমি তোমার বাসার সামনেই আছি। পুরোপুরি সামনে না, একটু লেফট সাইডে।”
তিতির লাফ দিয়ে উঠে পড়লো। দৌড়ে গেল বারান্দায়। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে অপজিটের ফুটপাতে। ফুল ফরমাল, গ্রে কালারের শার্ট ব্ল্যাক প্যান্টের সাথে ইন করা, ব্ল্যাক টাই, সানগ্লাস, কানে ফোন। এই প্রথম ওকে ফরমাল দেখছে। উফফফ এত মারাত্নক লাগছে মুগ্ধকে। ওকে দেখেই সানগ্লাসটা খুলে হাসলো।
মুগ্ধও তিতিরকে দেখছিল মুগ্ধ চোখে। হোয়াইট স্লিভলেস টি-শার্ট পড়ে আছে। চুলগুলো মারাত্মকভাবে এলোমেলো। চোখে ঘুম। কানে ফোন। মুগ্ধকে দেখেই হাসলো।
মুগ্ধ বলল,
-“ম্যাম আপনি এলোচুলে আমার সামনে দয়া করে আসবেন না। আমার প্রব্লেম হয়।”
-“কি প্রব্লেম?”
-“ওহ.. ভুলেই গিয়েছিলাম তোমাকে তো আবার সব ডিরেক্টলি বলতে হয়। আচ্ছা পরে বলবো। আজ বেশি সময় নেই।”
-“আচ্ছা।”
-“থাক এখনি শোনো, এলোচুলে তোমাকে অনেক আবেদনময়ী লাগে।”
-“আবেদনময়ী মানে যেন কি? আমি বাংলায় একটু উইক আছি।”
-“হায়রে! তোমাকে সেক্সি লাগে। যতই চাইলাম সেক্সি ওয়ার্ডটা স্কিপ করতে তুমি বলিয়েই ছাড়লে।”
কি লজ্জাটাই যে তিতির পেয়েছিল! আর কোনো কথা বলতে পারেনি। তারপর দুপুর ১২ টায় ফোন করে বলল,
-“এই আপনি কি সকালে আমার বাসার সামনে এসেছিলেন? নাকি আমি স্বপ্নে দেখেছি? কল লিস্টে দেখলাম ২০ মিনিটের মত কথা বলেছি কিন্তু কিছুই মনে করতে পারছি না।”
-“স্বপ্ন না, গিয়েছিলাম।অফিসে আসার আগে বউয়ের মুখটা একবার দেখে না আসলে হয়? আজ তো ক্লাসও আছে, ফিরতে ফিরতে রাত!”
-“ও। আমি কি খুব উল্টোপাল্টা কিছু বলেছি? আসলে ঘুমের ঘোরে আমি অনেক হাবিজাবি বকি।”
মুগ্ধ হাসলো। তারপর বলল,
-“না উল্টোপাল্টা কিছু বলোনি। যা বলেছো ভালই বলেছ। মনে না থাকলে আমি রাতে ফিরে তোমাকে বলব।”
-“আচ্ছা। অফিসে থাকতে ফোন করা যাবেনা?”
-“হুম যাবে। বাট অনেকক্ষণ কথা বলা যাবে না। আমি তোমাকে লাঞ্চ টাইমে ফোন করবো। এখন রাখি?”
-“আচ্ছা।”
রাতে বাসায় ফিরে সব বলতেই তিতির খুব লজ্জা পাচ্ছিল আর অস্বীকার করেছিল যে ও এসব বলেনি। মুগ্ধ তাতেও মজা পেয়েছিল। তিতিরের সব খুঁটিনাটি বিষয়কে ঘিরেই ছিল মুগ্ধর আনন্দ।
To be continued…

প্রেমাতাল পর্ব – ২০ || মৌরি মরিয়ম

তিতির মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরার পর মুগ্ধও তিতিরকে ধরলো কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর ছেড়ে দিয়ে বলল,
-“এইযে তিতিরপাখি! এবার ফোন নাম্বারটা বলো।”
-“01*********”
-“আচ্ছা এবার বাসায় গিয়ে ভেজা কাপড় ছাড়ো। আমি বাসায় গিয়ে কল দিচ্ছি।”
-“আচ্ছা, কিন্তু একবার শুনেই নাম্বারটা মনে রাখতে পারবেন?”
মুগ্ধ নাম্বারটা বলল। তিতির দেখলো মুগ্ধ ঠিক নাম্বারই বলেছে। একবার শুনেই কি করে মনে রাখতে পারলো! ভালই হয়েছে তিতির এই টাইপের জিনিসগুলো মনে রাখতে পারেনা। এখন থেকে এগুলো মনে রাখার দায়িত্ব মুগ্ধকেই দিয়ে দিবে।
তিতির এক পা দুপা করে পিছিয়ে উলটো ঘুরে বাসায় ঢুকে গেল। সিঁড়িতে উঠতেই ওর খেয়াল হলো ও নিজের বাসার সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরেছিল! ভয়ে শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো। কেউ দেখে ফেলেনি তো? নিজের ফ্যামিলির কেউ না হোক আশেপাশের ফ্ল্যাটের কেউ দেখলেও বিপদ আছে কপালে।
তিতির বাসায় ঢুকে যেতেই মুগ্ধ নিজের বাসার দিকে রওনা হল। শত শত বৃষ্টির ফোটা রাস্তায় জমে যাওয়া বৃষ্টির পানিতে টুপ করে পড়েই ছোট একটা সার্কেল হচ্ছে তারপর সেই সার্কেল বড় হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই সাধারণ দৃশ্যও আজ মুগ্ধর কাছে অসাধারণ লাগছে। মনে মনে তিতিরকে বলছিল, ‘আমি জানতাম তুমি আমাকে ভালবাসো। তবু কেন আমার এতটা ভাল লাগছে তিতির?’
বাসায় গিয়ে কোনরকমে ভেজা কাপড় পালটে ফোনটা পলিথিন থেকে বের করলো। বৃষ্টি নামায় ও চা ওয়ালার কাছ থেকে একটা পলিথিন নিয়ে ফোনটা পেঁচিয়ে রেখেছিল। তবু ফোনটা ভিজে গেছে খানিকটা। ভালমতো মুছে নাম্বারটা টাইপ করতেই দেখলো সাজেশন এসেছে! তিতিরের নাম্বার আগে ইউজড হয়েছে ওর ফোনে! কিভাবে! সাজেশনে ঢুকতেই দেখলো সকালে এই নাম্বার থেকেই কল এসেছিল যাকে ও অনেক ঝেড়ে দিয়েছিল। তার মানে ও ওর বাবার ফোন ঘেটে নাম্বারটা বের করেছিল কিন্তু সিওর ছিলনা। ঝাড়ি খেয়ে কেটে দিয়েছিল। মুগ্ধ নাম্বারটা ডায়াল করল। প্রায় সাথে সাথেই ওপাশ থেকে হার্টবিট বাড়ানো সেই কণ্ঠস্বর,
-“হ্যালো।”
-“হ্যালো। চেঞ্জ করেছো?”
তিতির ফোনটা হাতে নিয়েই বসেছিল। অধীর আগ্রহে বসে থাকার পর মুগ্ধর এইটুকু কথা যেন একগুচ্ছ সাদা কামিনী ফুলের মত বুকের মাঝে এসে লুটিয়ে পড়লো। তিতির মনে মনেই সেগুলোকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে চাইলো,
-“হুম। আপনি?”
-“করেছি। মাথা মুছেছো ভাল করে?”
-“হুম।”
-“ঘোড়ার ডিম মুছেছো! তুমি তো মাথাই মুছতে পারোনা। টপটপ করে পানি পড়তে থাকে চুল থেকে।”
-“হ্যা তা ঠিক, এর চেয়ে ভাল মুছতে পারিনা।”
-“হ্যা সেজন্যই তো চিন্তায় পড়ে গেছি।”
-“কিসের চিন্তা?”
-“আমার বাচ্চাকাচ্চাদের তো সারাবছর ঠান্ডা লেগে থাকবে।”
-“মানে?”
-“মানে মা নিজেই যেখানে চুল মুছতে পারেনা সেখানে বাচ্চাদের চুল কি করে মুছবে?”
তিতির লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইলো। মুগ্ধও তা বুঝতে পারলো। এরপর বলল,
-“অনেস্টলি স্পিকিং তিতির, আমার যে তিনটা গার্লফ্রেন্ড ছিল তাদের কারো সাথেই আমি বাচ্চাকাচ্চা পর্যন্ত কথা বলিনি। কারও প্রতি এতটা মুগ্ধতা আমার ছিলই না। তোমার সাথে বললাম, ভবিষ্যতেও বলবো। তোমাকে আমার বাচ্চাদের মা হতেই হবে। চুল মুছতে না পারলেও প্রব্লেম নেই। আমি শিখিয়ে দেব। আর ছুটির দিনগুলোতে আমিই মুছে দেব। সকালে আর রাতে ওদেরকে আমিই খাইয়ে দেব। তুমি শুধু কষ্ট করে দুপুরে খাওয়াবে। বাইরে বেরোলে বাচ্চারা সব আমার কোলে থাকবে। একসাথে দুজন পর্যন্ত কোলে নিতে পারবো। অভ্যাস আছে, ছোট ভাইবোন দুটোকেই একসাথে কোলে নিতে হয়েছে। কিন্তু দুটোর পরের বাচ্চাগুলো অবশ্য তোমাকেই নিতে হবে।”
-“আপনি প্লিজ থামবেন? এগুলো কোনো কথা হলো?”
মুখে এসব বললেও তিতির মনে মনে উড়ছিল। মুগ্ধ বলল,
-“থামবো কেন? কেবল তো শুরু।”
-“আপাতত অন্য কথা বলুন। আমার খুব লজ্জা করছে।”
-“এটাই তো মুশকিল। আমি তোমাকে কোনো কথাই আর লজ্জা দেয়া ছাড়া বলতে পারবো বলে মনে হয়না।”
-“ইশ! ওনার ওসব কথা শুনতে আমি যেন বসে আছি। আচ্ছা বলুন তো আপনার আমার জন্য এই ফিলিং টা কবে হয়েছে?”
-“স্পেসিফিক করে বলতে পারবো না। একটু একটু করে হয়েছে। তবে তোমার ঘুমন্ত মুখটার উপরই প্রথম ক্রাশ খেয়েছিলাম। তারপর সেকেন্ড ক্রাশটা থানচি গেস্ট হাউজে গোসলের পর যখন তোমার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছিল তখন। কিন্তু এসব শুধুই ক্রাশ! ভালবাসা হয়েছে একসাথে পথ চলতে চলতে যখন দেখেছি তুমি ঠিক আমার মনেরই মতন, তখন। আর শুরুতে একদম এরকম ভাবিনি। আমি সাধারণত বাচ্চা মেয়েদের দিকে নজর দিই না।”
তিতির অবাক হয়ে বলল,
-“আমি বাচ্চা?”
-“অবশ্যই তুমি বাচ্চা। ৮ বছরের ছোট তুমি। আমার তোমার বয়সের কোনো মেয়ের সাথে প্রেমের কথা চিন্তা করতেও খারাপ লাগতো। বড়জোর আমার চেয়ে ২/৩ বছর ছোট যারা তাদের সাথে প্রেমটা প্রেফার করতাম। কিন্তু এখন বুঝলাম বাচ্চাদের সাথেই প্রেমে সবচেয়ে মজা।”
-“কিরকম?”
-“সেটা ঠিক বলে বোঝানো সম্ভব না।”
-“ও। কিন্তু আমি তো আর এরকম বাচ্চা থাকবো না, বড় হবো একসময়… তখন?”
-“হুম অবশ্যই তুমি বড় হবে। আমিও কিন্তু এই বয়সেই থেমে থাকবো না। তুমি আজীবনই আমার থেকে ৮ বছর কম ম্যাচিওর থাকবে। তাই অলওয়েজ তুমি আমার কাছে বাচ্চাই থাকবে। বুঝেছো তিতিরপাখি?”
তিতির হাসলো কোনো কথা বলল না। মুগ্ধও উত্তরের অপেক্ষায় রইলো না। বলল,
-“এবার তুমি বলোতো তোমার এসব ফিলিং আসলো কবে, কিভাবে?”
-“আমিও জানিনা। আমারও একটু একটু করেই হয়েছে। কিন্তু আপনি যেরকম ক্রাশের কথা বললেন ওরকম বলতে গেলে বলতে হবে আমি প্রথম আপনার পায়ের উপর ক্রাশ খেয়েছিলাম।”
-“হুম খেয়াল করেছি তো। কি লোভাতুর চোখে তাকিয়ে ছিলে আমার পায়ের দিকে!”
-“ইশ! ছিঃ কখনোই লোভাতুর চোখে তাকাইনি। নরমালি তাকিয়েছি। আপনি যেরকম আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন ওরকমই।”
-“হুম আমি যেন বুঝিনা!”
-“বোঝেনই না।”
-“ভাল কথা মনে পড়েছে শোনো.. তুমি রেমাক্রি গেস্ট হাউজের বারান্দায় স্যাভলন লাগাতে দিয়েছিলে না আমাকে?”
-“হ্যা।”
-“ওভাবে ভেজা চুল সরিয়ে অত সুন্দর ঘাড় কোনো পুরুষের সামনে ধরলে কি হয় জানো?”
-“কি হয়?”
-“সেই পুরুষের চরিত্র নষ্ট হয়।”
-“মানে?”
-“তখন যদি ঘাড়ে একটা চুমু দিতাম কি হত? আমি চরিত্রহীনই তো প্রমানিত হতাম।”
তিতির লজ্জায় আর কোনো কথাই বলতে পারলো না। কিন্তু মনে মনে বলল,’দিলেও খুশিই হতাম যেমনটা রাতে হয়েছিলাম।’
মুগ্ধ বলল,
-“আরে বাবা বার বার সাইলেন্ট মুডে চলে গেলে তো হবেনা। এটলিস্ট ভাইব্রেশনে আসো।”
-“শুনছি।”
-“নেক্সট টাইম ভুলেও একাজ করোনা। তাহলে কিন্তু আর ছাড়বো না।”
-“নেক্সট টাইম আপনিও খালি গায়ে আর হাফ কিংবা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে আমার সামনে আসবেন না।”
-“কেন? আসলে কি তুমিও চরিত্রহীনা হবে? তাহলে আমি বার বার ওভাবে তোমার সামনে আসতে চাই।”
-“না। কিন্তু মার লাগাতে পারি।”
-“মারকে কিভাবে আদরে পরিণত করতে হয় সেটা আমি ভাল করেই জানি সুন্দরী।”
-“উফফ অন্য কথা বলুন। খেয়েছেন দুপুরে?”
-“না টেনশনে কি খাওয়া হজম হতো?”
-“যান গিয়ে খেয়ে নেন। পরে কথা বলছি।”
-“তুমি খেয়েছো?”
-“হুম। খেতে ইচ্ছে করছিলনা। জোড় করে খেয়েছি। আমার বাসায় না খেয়ে থাকা অসম্ভব। আর আমি ফিরেছি বলে বাবা দুপুরে বাসায় খেয়েছে আমাকে সাথে করে।”
-“ভাল করেছো। আমার মাও এরকম। কিন্তু অনেকদিন মায়ের সাথে বসে খাওয়া হয়না।”
-“যেতে পারেন না?”
-“যাই তো। প্রতি মাসে একবার যাই। তাছাড়া ছোট ভাইবোন দের পরীক্ষা হয়ে গেলেই বাবা ছাড়া ফুল ফ্যামিলি ঢাকায় চলে আসবে। তখন শুধু শান্তি আর শান্তি।”
-“ওদের কি পরিক্ষা? কিসে পড়ে?”
-“স্নিগ্ধর জেএসসি পরীক্ষা আর পিউ এর এইচএসসি পরীক্ষা।”
-“বাহ নামগুলো সুন্দর তো। আগে বলেননি কেন?”
-“আগে তো তুমি জিজ্ঞেস করোনি। আর এখন তো ওদের কথা অনেক বলতে হবে। বার বার ছোট ভাই ছোট বোন বলতে কেমন লাগে না? তাই নাম বলে দিলাম।”
-“ভাল করেছেন। এখন খেয়ে আসুন না প্লিজ। আমি তো আছিই.. কথাও হবে।”
-“পরে খাব।”
-“না এক্ষুনি খেতে হবে নাহলে আর একটা কথাও বলবো না।”
-“উফ কি ব্ল্যাকমেইল রে বাবা।”
-“যান না প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”
-“ওকে। ১০ মিনিটে খেয়ে আসছি।”
-“হুম আপনি যান। আমি অপেক্ষা করছি।”
এরপর মুগ্ধ খেতে গেল। তিতির ফোন হাতে বসে ছিল। ড্রেসিং টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই ওদের কাজের মেয়েজে ডাকলো,
-“চম্পা, এই চম্পা…”
চম্পা এসে বলল,
-“জ্বী আফা..”
-“ভেতরে আয়।”
-“গেট লাগাইন্যা দি।”
-“ওহ দাঁড়া খুলছি।”
তিতির দরজা খুলে দিতেই চম্পা ঘরে এল। তিতির ওর ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে সব লিপস্টিক গুলো তুলে চম্পার হাতে দিয়ে হেসে বলল,
-“এগুলো এখন থেকে তোর।”
চম্পা অবাক,
-“আফা আমনের মাতার গন্ডগোল হইসে নাকি? এত দামি জিনিসগুলা আমারে দিয়া দিতাসেন যে!”
-“ওড়নার আঁচলটা মেলে ধর তো।”
চম্পা হতভম্ব হয়ে তিতিরের কথামত আঁচল মেলে ধরল। তিতির এবার মেকাপ বক্স আর নেইপলিশ গুলো তুলে ওর আঁচলে দিয়ে বলল,
-“এগুলোও তোর।”
-“আফা সব দিয়া দিতাসেন ক্যা?”
-“এগুলো তুই আমাকে রেগুলার ইউজ করতে দেখেছিস কখনো? চাচী, ফুপি আর আপুদের কাছ থেকে গিফট পেতে পেতে এত জমে গেছে।”
-“হ কিন্তু মাঝেমইধ্যে তো এগুলান লাগান দেহি।”
-“হুম। আগে মাঝেমধ্যে লাগতো। কিন্তু এখন থেকে আর মাঝেমধ্যেও লাগবে না। তাই তোকে দিয়ে দিলাম। এখন তুই যা।”
চম্পার বিস্ময় কাটছিল না। বিস্ময় নিয়েই চম্পা ঘর থেকে বের হলো, তিতির আবার দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর তিতির আবার বিছানায় শুয়ে মুগ্ধর ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই কল এল। তিতির মহানন্দে ফোন ধরলো,
-“হ্যালো।”
-“হুম, খেয়েছি। এবার খুশি?”
তিতির হেসে বলল,
-“হুম খুশি।”
মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা একটা ইম্পরট্যান্ট কথা জানার ছিল।”
-“কি বলুন?”
-“নিজের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে ওভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরার সাহস তুমি পেলে কোথায় বলোতো? আমার কিন্তু খুব ভয় করছিল।”
-“আমি নিজেও জানিনা। বাসায় আসার পর ভয় লেগেছে কিন্তু তখন আমার হুশ ছিলনা। সারাদিন কত খোঁজার পর পেয়েছি জানেন?”
-“হুম জানি।”
-“কি করে জানেন?”
-“তুমি বিকাল ৩ টার দিকে আমার বাসায় এসে দারোয়ানের কাছে আমার খোঁজ করেছিলে।”
-“হ্যা, কিন্তু সে বলেছে মুগ্ধ নামের কেউ ওই বাড়িতে থাকেই না। আসল ঘটনা কি? আপনি কি আসলেই ওই বাসাতে থাকেন?”
-“হ্যা।”
-“তাহলে উনি মিথ্যে বলল কেন?”
-“মিথ্যে বলেনি। আসলে আমার ফরমাল নেম হলো মেহবুব চৌধুরী। নিক নেম মুগ্ধ। তো স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, অফিস সব যায়গাতে সবাই আমাকে মেহবুবই ডাকে। বাসায় যে ফ্রেন্ডদের সাথে থাকি ওদের মধ্যে দুজন ভার্সিটি ফ্রেন্ড আর একজন স্কুলফ্রেন্ড। ওরাও মেহবুব ডাকে, ভাড়াটিয়ার লিস্টেও মেহবুব চৌধুরী। তো দারোয়ান কিভাবে জানবে বলো?”
-“ও, তাহলে সে আপনাকে বলল কিভাবে আমি খুঁজতে গিয়েছিলাম? আমি তো মুগ্ধকেই খুঁজেছি।”
-“আমি বের হবার সময় ওকে বললাম আমার খোঁজে একটা মেয়ে আসতে পারে। যে মুগ্ধকে খুঁজবে। আমার ডাক নাম মুগ্ধ। যদি কেউ আসে আমার নাম্বারটা যেন দিয়ে দেয়। তখন ও বলল অলরেডি একজন এসেছিল, ও বলেছে এই নামে কেউ থাকেনা, এইতো।”
-“ওহ।”
-“জানি আরো খুঁজেছিলে। তোমার বাবার মোবাইল ঘেঁটে আমাকে কল করেছিলে কিন্তু আমার ঝাড়ি খেয়ে আর কথা বলোনি। কথা বললে কিন্তু সকালেই পেতাম। তুমি আমার কণ্ঠস্বর না চিনলেও তোমারটা আমি চিনতাম।”
-“তার মানে আমি ঠিক নাম্বারই বের করেছিলাম? ওই কর্কশ কণ্ঠী লোকটা আপনি ছিলেন?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“তখন তোমাকে খুঁজছিলাম তো পাচ্ছিলাম না তাই মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে ছিল। তার উপর তুমি ফোন দিয়ে কথা বলছিলে না। তাই ঝেড়ে দিয়েছি। আই এম সরি ফর দ্যাট মাই তিতিরপাখি।”
আহ কি মিষ্টি কি মিষ্টি! তিতির বলল,
-“আমি যখন বুড়ী হয়ে যাব তখনও আপনি আমাকে এভাবেই তিতিরপাখি ডাকবেন?”
-“হুম সারাজীবন।”
-“দেখা যাবে।”
-“মানে?”
-“সবাইকে তো বলতে শুনি বয়ফ্রেন্ডরা প্রেম হওয়ার সময় অনেক কিছু বলে পরে সেগুলো ভুলে যায়।”
মুগ্ধ হেসে দিল। তিতির বলল,
-“হাসছেন কেন?”
-“এমনি।”
-“হাসলে হবে না উত্তর দিন।”
-“যখন বলা বন্ধ করে দেব তখন নাহয় শাস্তি দিও।”
-“ওকে! শুনুন না আমি আপনাকে আরো খুঁজেছি। সাফি ভাইয়াকে সারাদিন কল করেছি। উনি ধরেনি, কিন্তু নিশ্চই দেখেছে কারন কল করতে করতেই ওনার ফোন অনেকবার বিজি পেয়েছি।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“ও তুমিও কল করছিলে? এবার বুঝেছি। আসলে আমিও ওকে কল করছিলাম। তাই তুমি যখন কল করেছো তখন আমি বিজি পেয়েছি আর আমি যখন কল করেছি তখন তুমি বিজি পেয়েছো। দেখেছো আমাদের দুজনের কি অবস্থা হয়েছিল? সেটা কি শুধু শুধুই? তুমি আমার বাচ্চাদের মা হবে বলেই তো।”
-“ধ্যাত! বলুন না সত্যি আপনিও কল করছিলেন?”
-“হুম। কারো সাথে কথা বললে ওয়েটিং দেখাতো। ওর ওয়েটিং সার্ভিস চালু করা আছে।”
-“ওহ!”
কিচ্ছুক্ষণ থেমে তিতির বলল,
-“কিন্তু এখন আরেকটা কথা বলার ছিল।”
-“বলো.. তোমার সব কথা শোনার জন্যই বসে আছি।”
-“আমি যে সেই কখন থেকে আপনি আপনি করে যাচ্ছি সেদিকে তো কারো খেয়াল নেই। একবারও তো বলল না তুমি করে বলতে।”
মুগ্ধ মজা করে বলল,
-“কে বলোতো? কার এতবড় সাহস?
-“আপনি! বুঝেও আবার ঢঙ করছে।”
মুগ্ধ হা হা করে হাসলো। তারপর বলল,
-“সিরিয়াসলি সবসময় তুমিতেই যে রোমান্টিকতা আসে তা কিন্তু না। তোমার মুখে ওই আপনিটাই আমার বেশ লাগে। তোমার ওই আপনি, শুনছেন, শুনুন এগুলো কত যে রোমান্টিক আর কত যে মিষ্টি লাগে তা তুমি বুঝবে না।”
-“তাহলে কি আমি আজীবন আপনাকে আপনি করেই বলবো?”
-“তোমার ইচ্ছে।”
-“অবশ্য হুট করে আপনি থেকে তুমি বলাটাও মুশকিল।”
-“তোমার যখন যা ইচ্ছে তুমি ডাকতে পারো। কিন্তু শুধু তুমি করে বললে, কোলে উঠলে আর জড়িয়ে ধরলেই তো হবে না। বৃষ্টিতে ভিজে যে কথাটা বলেছিলাম তার উত্তর চাই।”
-“এতকিছুর পর আবার উত্তরের কিছু বাকী থাকে নাকি?”
-“থাকে কারন, আমি উত্তরটা তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।”
তিতির লাজুক স্বরে বলল,
-“আমি বলতে পারবো না।”
-“সিরিয়াসলি, এই প্রথম শুনলাম কোন মেয়ে ঢাকা শহরের খোলা রাস্তায় নিজের বাড়ির সামনে একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে লজ্জা পায়না কিন্তু ঘরের মধ্যে ফোনে “আই লাভ ইউ” জাস্ট তিনটা শব্দ বলতে লজ্জা পায়।”
-“হুম কারন, সবাই তিতির না।”
মুগ্ধ হেসে হেসে বলল,
-“দ্যাটস হোয়াই মুগ্ধ মার্ডারড বাই তিতির।”
তিতিরিও হেসে দিল। মুগ্ধ বলল,
-“আচ্ছা ফোর্স করবোনা। কিন্তু অপেক্ষা করবো।”
এভাবেই শুরু হয়েছিল এই দুই প্রেমাতালের একসাথে পথচলা। পাঁচ বছর কেটে গেলেও তিতিরের মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। সব স্পষ্ট কানে বাজে আজও। রাস্তায় ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল তিতির।
আজ ওরা দুজন দুজনের থেকে আলাদা। কোন যোগাযোগ নেই, দুজনের ফোন নাম্বার দুজনের কাছে থাকলেও কথা হয়না। দেখা হয়না প্রায় ৭ মাস হতে চললো। খুব কষ্টে সামলে নিয়েছে তিতির। মেনে নিয়েছে মানুষের জীবনের সব চাওয়া পূরণ হয়না। প্রতি রাতে কাঁদে সকালে উঠে সেই কান্নার সৎকার করে প্লাস্টিক একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয় সারাদিন। এই রুটিনে বেশ মানিয়ে গেছে তিতির। মানিয়ে গেছে মুগ্ধও কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ মুগ্ধ ফোন করে, মাসে হয়তো একবার। যখন মুগ্ধ আর কোনভাবেই নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে পারেনা তখনই ফোন করে কিন্তু ওর ওই একটা ফোনকল তিতিরের সব ওলট পালট করে দেয়। পাগলের মত হয়ে যায়। না পারে মুগ্ধর কাছে যেতে না পারে ওকে ছাড়া থাকতে আর না পারে মরে যেতে। যেন হাজার হাজার বিষলতা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে ওকে। আর সেই বিষলতা গুলো থেকে গুটি গুটি পায়ে বের হয়ে আসা হাজার হাজার বিষপোকা তাদের সূঁচালো ঠোঁট দিয়ে খুবলে খুবলে রক্তাক্ত করে ফেলে ওর ভেতরটা। কাল রাতে মুগ্ধ ফোন করার পর তিতিরের আবার সেই অবস্থাই হয়েছে। আরো বেশি পাগল পাগল লাগছে গানটা শুনে.. “ভাল আছি ভাল থেকো।”
হঠাৎ তিতিরের মাথাটা ঘুরে উঠলো। সামনের সবকিছু অন্ধকার আর আবছা হয়ে আসলো। তরতর করে ঘামতে লাগলো। বড্ড রোদ উঠেছে নাকি? কত হবে তাপমাত্রা? কাল যেন কত ছিল? ৪০ ডিগ্রি ছিলনা? নাকি ৪২? মনে করতে পারছিলনা তিতির। পা ভেঙে আসছিল। গায়ের সব শক্তিগুলো কোথায় গেল? দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না কেন? ও প্রানপণে আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল কোন রাস্তায় আছে? কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফুটপাতে লুটিয়ে পড়লো।
to be continued….

প্রেমাতাল পর্ব – ১৯ || মৌরি মরিয়ম

মুগ্ধ তিতিরকে না পেয়ে নিজের বাসায় ফিরে এল। ভাল লাগছে না কিছু! সারারাত বাসের ঝাঁকুনি আর তিতিরকে নির্ভয়ে অপলক দেখার লোভ! এই দুটো কারনে ঘুমাতে পারেনি ও। ভেবেছিল বাসায় এসে ঘুমাবে। কিন্তু কিসের ঘুম কিসের খাওয়া। তিতিরকে কিভাবে পাবে সেই চিন্তায় ও অস্থির! যদিও বাসা চেনে কিন্তু কয় তলায় থাকে তা তো জানেনা। আর জানলেও বাসায় গেলে তিতিরের প্রব্লেম হতে পারে। কি করবে কি করবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো সাফিকে কল করলে নিশ্চই তিতিরের নাম্বার পাওয়া যাবে। অবশ্যই পাওয়া যাবে সব গ্রুপ মেম্বারের ডিটেইল ওর কাছে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সাথে সাথে কল করলো সাফিকে। সাফি ফোন ধরছে না। উফ এত বিরক্তিকর কেন ছেলেটা। সাফিকে অনেকবার ট্রাই করার পর দোলাকে ফোন করলো। দোলা তো আরো এক ধাপ এগিয়ে, ফোনই বন্ধ। নিজের গালে নিজে দুইটা চড় মারতে মন চাইছে। ও নিজেকে বুদ্ধিমান বলেই জানতো। কখনো এমন কিছু করেনি যার জন্য পরে আফসোস করতে হয়েছে। সবসময় প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য রেডি থাকে। সব ব্যাপারে আগাম কনসার্ন থাকে। আর এখন তিতিরের ফোন নাম্বারটা আনতেই ভুলে গেল! এতটা বোকামি ও কিভাবে করলো! হ্যা চলে আসার সময় প্রচন্ড মন খারাপ হয়েছিল তাই তেমন কিছুই বলতে পারেনি। কিন্তু ফোন নাম্বারটা তো আগে নিয়ে রাখা উচিৎ ছিল। ওর জন্য নিলগিরি থেকে পেনহোল্ডার, রেমাক্রি বাজার থেকে ডুমুর আর পাকা পেঁপে কিনেছিল তাও দেয়া হয়নি। এত গাধা মুগ্ধ কবে হলো!
এবার সাফির মাকে কল করলো মুগ্ধ,
-“হ্যালো চাচী?”
-“হ্যা হ্যা মুগ্ধ বল বাবু।”
-“এই চাচী শোনোনা, সাফি কি ঘুমাচ্ছে? ওকে এতবার কল দিলাম ধরছেই না।”
-“মানে? ও তো তোর সাথেই ট্রিপে গেল। এখনো তো আসেইনি। তুই ওকে বাসায় খুঁজছিস! আমি তো কিছুই বুঝতে পারচ্ছিনা।”
মুগ্ধ বুঝতেই পারছে চাচী এখন চিন্তায় পড়ে যাবে তাই চাচীকে নিশ্চিন্ত করার জন্য বলল,
-“ওহ হো। আচ্ছা আচ্ছা আসলে আমি তো ওকে বান্দরবানে হারিয়ে ফেলেছিলাম বুঝলে? আমি এসে পড়েছি তাই ভেবেছি সাফিও বুঝি এসে পড়েছে। তুমি চিন্তা করোনা তো। ও এসে পড়বে।”
-“তুই যে বললি ফোন ধরছে না।”
-“তো কি হয়েছে? ফোনে তো কত প্রব্লেমই হতে পারে।”
-“ওহ, তাও ঠিক।”
-“আচ্ছা চাচী রাখি, তুমি অত চিন্তা করোনা।”
ফোন রেখেই মুগ্ধ আবার কল দিল সাফিকে। এবার ওর ফোন বিজি পাওয়া গেল। যাক পাওয়া যাবে তাহলে। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করলো। কিন্তু বার বার ফোন বিজি আসছেন আজব তো ছেলেটার কি ওয়েটিং সার্ভিসও একটিভ করা নেই? না মনে পড়েছে। ওয়েটিং সার্ভিস তো চালুই আছে। কতই তো ওকে ওয়েটিং এ পেয়েছে। তাহলে? উফ আর কিছু ভাল লাগছিল না মুগ্ধর।
মুগ্ধ সাফির ফোন বিজি পাবেনা কেন? এদিকে তিতিরও তো সাফিকে অনবরত ফোন করছিল মুগ্ধর নাম্বারের জন্য। সাফি তো ফোনই ধরছে না। হঠাৎ তিতিরের মনে পড়লো বাবাকে না মুগ্ধর ফোন দিয়ে ফোন করেছিল? ইয়েস! এত সহজে নাম্বারটা পাবে ভাবেনি ও। দৌড়ে বাবার ঘরে চলে গেল। বাবা রেডি হচ্ছিল বাইরে যাওয়ার জন্য। তিতির বলল,
-“বাবা একটু ফোনটা নেই? জরুরী কল করার ছিল। আমার ফোনে না ব্যালেন্স নেই।”
-“হ্যা হ্যা, নিয়ে নে।”
তিতির ফোন নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। তারপর ভাবতে লাগলো কবে কখন ফোন করেছিল। হ্যা মনে পড়েছে সকালে ফোন করেছিল। গতকাল সকালে ছিল রাস্তায়, গত পরশু সকালে ছিল নাফাখুম। তার মানে পরশুর আগের দিন কল করেছিল। কললিস্ট চেক করতে গিয়ে মহাবিপদে পড়লো তিতির। কারন অনেক আননোন নাম্বার ছিল। এটা কোনো কথা! বাবা এত কথা কার সাথে বলে? যাই হোক বাবাকে ফোন ফেরত দিতে হবে তাই ফটাফট সেদিন সকাল থেকে ১২ টা পর্যন্ত যত কল এসেছে সব তুলে নিল একটা ডায়েরীতে। তারপর এক দৌড়ে গিয়ে ফোনটা বাবাকে ফেরত দিয়ে আরেক দৌড়ে ফিরে আসলো ঘরে। সব মিলিয়ে ৮ টা নাম্বার পাওয়া গেছে তার মধ্যে ৩ টা এয়ারটেল! হায় খোদা এগুলো কেন তুললো ও। ওর এয়ারটেলে নেটওয়ার্ক ছিলনা বলেই তো মুগ্ধর নাম্বার থেকে কল করেছিল। ওগুলো বাদ দিলে থাকে ৫ টা নাম্বার। প্রথমটাতে কল দিল,
-“হ্যালো..”
ওপাশ থেকে কর্কশ মহিলা কন্ঠে,
-“হ্যালো কেডা? কেডা আপনে?”
তিতির ফট করে লাইনটা কেটে দিল। এটাও বাদ। পরের নাম্বারটাতে কল দিল। ওপাশ থেকে বলল,
-“হ্যালো তিতির আফা?”
তিতির অবাক,
-“আপনি কে ভাই?”
-“আফা আমি শরীফ।”
শরীফ ওদের দারোয়ান। কি বলবে! বলল,
-“ও আচ্ছা। শরীফ ভাই, আমি না একজনকে ফোন করতে গিয়ে ভুলে আপনাকে কল দিয়ে ফেলেছি। আচ্ছা রাখি।”
-“আচ্ছা আফা।”
দুটো গেল। ৩য় নাম্বারটা টাইপ করতেই দেখলো এটা দেখলো এটা অলরেডি ওর ফোনবুকে আছে। ভাইয়ার এক্সট্রা ফোনের নাম্বার, নতুন নিয়েছে। তিনটা গেল। ৪র্থ নাম্বারটাতে কল করতেই একটা কর্কশ আর রাগী লোকের ভয়েস পাওয়া গেল। ঝাড়ি দিয়ে বলল,
-“হ্যালো কে?”
উফ এই মানুষগুলোর কি আর কোনো কাজ নেই? অলওয়েজ রামগরুড়ের ছানার মত মুখ করে বসে থাকে আর কাউকে পেলেই ঝাড়ি মারে। বাবার সাথে এদের এমন কি কাজ! যাই হোক, কি বলবে ও? যদি বাবার কেউ হয় তাই ‘মুগ্ধ বলছেন?’ একথা তো জিজ্ঞেস করা যায়না। আর জিজ্ঞেস করবেই বা কেন? ওর মুগ্ধ কখনো এভাবে কথা বলে না। মুগ্ধর ভয়েসটাও এমন কর্কশ না, কি মিষ্টি ভয়েস! খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। অযথা এই ব্যাটার সাথে কথা বলবে কেন ও? এমন সময় ওপাশ থেকে আবার বলল,
-“অই মিয়াঁ কে আপনে? কথা কন না ক্যান? কথা কন, নাইলে ফোন রাখেন। আজাইরা ফোন দিয়া ফোনটারে বিজি কইরা রাখসে! যত্তসব। ফোন রাখেন।”
তিতির ফট করে লাইনটা কেটে দিল। উফ এই গুন্ডা টাইপ ব্যাটার সাথে বাবার কি সম্পর্ক কে জানে! পরের নাম্বারটায় ডায়াল করলো অথচ জানলোই না যে এটাই ছিল মুগ্ধ। ও তিতিরকে খোঁজার জন্য সাফিকে কল করছিল তাই মাঝখানে অন্য কলে ডিস্টার্ব ফিল করায় ওরকম বিহেভ করেছে।
৫ম নাম্বারটা বন্ধ পেয়ে তিতির আবার সাফিকে কল করলো কিন্তু সাফির নাম্বার এখন বিজি। অদ্ভুত তো! এতক্ষণ ওর কল ধরেনি আর এখন অন্য কারো সাথে কথা বলছে? নিশ্চই দোলা আপুর সাথে কথা বলছে কিন্তু ওর কলগুলো দেখে একবার কি কল ব্যাক করা যেত না? কিন্তু তখন সাফির ফোন বিজি ছিল কারন, মুগ্ধ তখন পাগলের মত ফোন করে যাচ্ছিল সাফিকে। কিন্তু তিতির তা জানতেও পারলো না। ওদিকে মুগ্ধও জানলো না তিতির কতটা ব্যাকুল হয়ে আছে ওর জন্য।
সারাটা দিন এরকমই চলতে থাকলো। অবশেষে লাঞ্চের পর দুজনেই সাফিকে কল করে সাফির নাম্বার বন্ধ পেল। কারন, ওদের দুজনের কলের তাড়নায় সাফির ফোন চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। আর সাফি সকাল থেকেই দোলার বাসায় মরার মত ঘুমাচ্ছিল। তাই ও কারোরই কল ধরতে পারেনি।
মুগ্ধ কললিস্ট ঘেটে তিতিরের বাবার নাম্বার পেয়ে গেছিল। কিন্তু ওর বাবকে কল দিলে ওর যদি কোনো প্রব্লেম হয়? তাই দিলনা। মুগ্ধ ভাবলো সাফি বোধহয় ঘুমাচ্ছে তা নাহলে ফোন ধরতো। তাছড়া মুগ্ধ তো জানেই ট্যুর থেকে এসে সাফি সারাদিন ঘুমায়। আর হয়তো কথা বলার জন্য না চাচী ফোন করছিল বলে ওর ফোন বিজি ছিল। হ্যা তাই হবে কারন, চাচীকে ফোন দেয়ার আগে প্রত্যেকবার ফোন বেজে বেজে কেটে গেছে। চাচীকে ফোন দেয়ার পর থেকেই বিজি। চাচীও না এত টেনশন করতে পারে। সাফি বাসায় যায়নি আগে জানলে ও কখনোই চাচীকে কল দিত না। কোথায় গেল? দোলার বাসায় নয়তো! হতেও পারে। অপেক্ষা করতে লাগলো সাফি উঠে নিশ্চই কল করবে। তখন তিতিরের নাম্বারও পাওয়া যাবে। শুধু শুধু ওর বাবাকে কল দিয়ে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। ও জানে সবুরের ফল মিষ্টি হয়।
তিতির অপেক্ষা করতে করতে একসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিল। এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর তিতিরের বাইরে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ভার্সিটি কোচিং। আজ ক্লাস নেই তবু বিকাল ৩ টার দিকে ক্লাসের কথা বলে বের হলো তিতির। একটা বাসা পরেই মুগ্ধর বাসা। বাসার সামনে যেতেই দারোয়ান জিজ্ঞেস করলো,
-“আপা কাউকে খুজতেছেন?”
-“হ্যা, ভাই আসলে আমি একজনকে হারিয়ে ফেলেছি। আমার কাছে ফোন নাম্বার নেই কিন্তু উনি এই বাসাতেই থকে।”
-“ও। নাম কি?”
-“ওনার নাম মুগ্ধ।”
-“এটা আবার কেমন নাম! যাই হোক, আপা এই বাসায় এই নামে তো লেউ থাকে না।”
-“একটু ভাল করে সিওর হয়ে বলেন না।”
লোকটা বলল,
-“আসলে আমার কাছে সব ভাড়াটিয়া এবং তাদের সব মেম্বারদের নামের লিস্ট আছে। আমি এ বাসায় ৫ বছর ধরে আছি। সত্যি বলছি আপা, এই নামে এখানে কেউ নাই।”
তিতির মন খারাপ করে চলে আসলো। মুগ্ধ ওকে মিথ্যে বলল! কিন্তু কেন মিথ্যে বলবে? প্রচন্ড মন খারাপ হলো। হেটে নিজের বাসা পর্যন্ত আসতে যেন পা ভেঙে আসছিল। বাসায় ঢুকলো না তিতির। ছাদে চলে গেল। কিছুই ভাল লাগছে না ওর।
বিকাল ৫ টার দিকে বাসা থেকে বের হলো মুগ্ধ। তিতিরের বাসার সামনে যাবে। কি করবে জানেনা কিন্তু যাবে। আর অপেক্ষা করতে পারছে না। গেট দিয়ে বের হয়ে আবার ফেরত আসলো দারোয়ানকে ডেকে বলল,
-“লিটন ভাই শোনো।”
-“জ্বী ভাই বলেন।”
-“আমাকে খুঁজতে একটা মেয়ে আসতে পারে। তুমি তাকে নাম জিজ্ঞেস করবে। যদি নাম বলে তিতির তাকে আমার ফোন নাম্বার টা দিয়ে দেবে।”
-“আচ্ছা।”
মুগ্ধ একথা বলে বের হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আবার ফিরে আসলো। বলল,
-“লিটন ভাই…।”
-“বলেন ভাই।”
-“নাম জিজ্ঞেস করা লাগবে না। আসলে একজনই আসবে নাম্বারটা দিয়ে দিও।”
লিটন হেসে বলল,
-“আচ্ছা ভাই।”
মুগ্ধ বলল,
-“আরেকটা ইম্পরট্যান্ট কথা। ও কিন্তু মেহবুবকে খুঁজবে না, মুগ্ধকে খুঁজবে। আমার ফ্যামিলি নেম মুগ্ধ বুঝলা? এখানে ভার্সিটির ফ্রেন্ডদের সাথে থাকি তো তাই এখানে সবাই ফরমাল নামটাই ডাকে।”
-“হায় হায় ভাই আগে বলবেন না?”
-“কেন আসছিল? আর তুমি বলে দিসো মুগ্ধ এখানে থাকে না?”
-“হ্যা ভাই ৩ টার দিকে আসছিল। খুব সুন্দরী একটা মেয়ে অল্পবয়সী। কিন্তু ভাই আপনের নাম যে মুগ্ধ তা তো আমি জানতাম না। সবাই তো দেখি আপনেরে মেহবুব বইলাই ডাকে।”
-“শিট! আমি যে কেন তোমাকে সকালে বললাম না। উফফফ!”
-“সরি ভাই।”
-“না না। ঠিক আছে। তুমি কেন সরি হবা? আমি তো তোমাকে আগে বলি নাই।”
মুগ্ধ সোজা চলে গেল তিতিরের বাসার সামনে। রাস্তার অপজিটে দাঁড়িয়ে বাসার সব বারান্দা আর জানালাগুলোতে চোখ বুলাতে লাগলো। এমনই একটা যায়গা একটা চায়ের দোকানও নেই, ধুর! শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই অস্বস্তিকর। হঠাৎ দেখলো একটা চা ওয়ালা আসছে, যারা ফেরি করে চা বিক্রি করে। থামালো মুগ্ধ,
-“ওই মামা চা দাও তো।”
লোকটা রাস্তায় বসলো। বলল,
-“মামা কি চা দিমু?”
-“যা আছে সব দাও।”
চা ওয়ালা বোকা হয়ে গেল। বলল,
-“মানে?”
-“লেবু চা দাও।”
লোকটা একটা ওয়ান টাইম কাপে চা দিল। মানে এখন টাকা নিয়ে চলে যাবে। মুগ্ধ বলল,
-“মামা তুমি আমার সাথে এখানে বসে থাকবা এক ঘন্টা। কত টাকা নিবা?”
-“আমি এইখানে বইসা থাকমু কেন?”
-“আমি চা খাব তাই। আর ঘন্টায় কত টাকা নিবা বলো আমি দিব।”
-“এক ঘন্টা ৫০ টাকা।”
-“আমি তোমাকে এক ঘন্টায় ১০০ টাকা দিব। তুমি খুশি মনে বসে থাক আর আমাকে চা খাওয়াও।”
চা ওয়ালা এই অফার পেয়ে খুশি হলো।
এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। চা ওয়ালাকে আরো এক ঘন্টার জন্য কন্ট্যাক করা হয়েছে। মুগ্ধ এই এক ঘন্টায় কয় কাপ চা খেয়েছে তা ও নিজেই জানেনা। তাও ভাল এই রাস্তাগুলো অনেক বড় বড় আর ভিড়ও থাকে না তাই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও তেমন কারো নজরে আসেনি। কোনো বারান্দা বা জানালায়ও তিতিরকে দেখতে পায়নি।
তিতির ছাদ থেকে নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। ওর আর কিছুই ভাল লাগছে না। সাফিকে আবার কল দিল, নাম্বার বন্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুম করে বৃষ্টি নামলো। কি যে দিন আসলো। পাহাড়ে পুরো শীত আসলেও ঢাকায় অল্প অল্প পড়তে শুরু করেছে। এই দিনে বৃষ্টি! অবশ্য ভালই লাগছে। তিতির বৃষ্টি দেখতে বারান্দায় গেল। বারান্দায় গিয়ে রাস্তার দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল অ্যাশ কালারের শার্ট পড়া ছেলেটার দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ওদের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে, দৃষ্টি বারবার এদিক ওদিক করছে। এই ভরা সন্ধ্যার অন্ধকারেও মানুষ্টিকে চিনতে কষ্ট হলোনা তিতিরের। বুকের ভেতর থেকে একটা কান্না উঠে আসতে চাইলো। এক অদ্ভুত আনন্দ অনুভূত হলো। কিন্তু মুগ্ধ যে ওদের বারান্দার দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। তিতির কয়েকবার হাত নাড়লো মুগ্ধ দেখতে পেলনা। তিতির ভেতরে আসলো। কি ছুঁড়ে মারবে কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে কয়েকটা লিপস্টিক নিয়ে একটা রুমালে বাঁধলো। এই লিপস্টিক গুলোর আর দরকার নেই। এগুলোই নষ্ট হোক। তারপর তা নিয়ে বারান্দা থেকে ছুঁড়ে মারলো মুগ্ধর গায়ে। মুগ্ধর গায়ে না লাগলেও মুগ্ধর সামনে এসেই পড়লো। তা দেখতে পেয়ে উপড়ে তাকাতেই তিতিরকে দেখতে পেল। মুগ্ধ ইশারা করলো তিতিরকে নিচে নামতে। তিতির ইশারায় বোঝালো আসছে। কিন্তু বাসায় কি বলে বের হবে এই ভর সন্ধ্যায়? তাও বৃষ্টির মধ্যে! আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ড্রইং রুমে কেউ নেই। কিছু না বলেই যাক তাহলে পরে যা হওয়ার হবে। তিতির চোরের মত দরজা খুলে বেড়িয়ে এল। এক দৌড়ে নিচে, সেসময় দারোয়ানও ছিলনা গেটে, বাহ! দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল। হেটে হেটে নয়। এক দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো মুগ্ধর সামনে। ততক্ষণে তিতিরও ভিজে সপসপে। আর এক সেকেন্ডের অপেক্ষাও না করে মুগ্ধ বলল,
-“আই লাভ ইউ তিতির।”
মুগ্ধর চুল, চোখের পাতা, ঠোঁট বেয়ে বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। তিতির রিপ্লাই দিতে গিয়েও পারলো না। কথাটা যেন গলায় আটকে গেল। কেন এমন হলো! খুশিতে ও কথাই বলতে পারছে না। এক পা এগিয়ে মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরলো তিতির। মুগ্ধ উত্তর পেয়ে গেল।
To be continued….

পিচ্চি বউ পর্ব – ১৩ (শেষ) || জিসান আহম্মেদ রাজ

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবাই,আমার বুকের মাঝে ব্যাথা করছে বাবাই। কথা গুলো বলছে আর কাঁদছে।
.
এদিকে রাইসার কান্না দেখে, সবাই কাঁদছে। কথার কাছে মনে হচ্ছে, তাঁর কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর রাজ কেমন জানি করতে লাগলো। ডাক্তার এসে দেখতেই রাজ কেমন যেন নড়াচাড়া বন্ধ করে দিল।
.
রুম থেকে বের হয়ে ডাক্তার চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, সরি!আমাদের আর কিছু করার নেই! আপনারা আল্লাহ্কে ডাকেন, আল্লাহ্ যদি তাকে স্বয়ং সুস্থ করে দেন!
” কথাটা শুনেই কথা হসপিটালে ফ্লরে পড়ে গেল।সবাই কথাকে নিয়ে বেডে শুইয়ে দিল। এদিকে সবাই কান্না করছে। রাইসা গিয়ে রাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে! আর বাবাই বাবাই করে ডাকছে। রাইসার কান্না দেখে সবাই কাঁদছে।
রাজের স্যালাইন নেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে!
.
হঠাৎ,ডাক্তার এসে রাজের মুখ থেকে, অক্সিজেন মাক্স খুলে দিল। স্যালাইনটাও খুলে দিয়ে বলবো, রাজ আর কোনদিন ফিরবে না। যা ভেবেছিলাম তাই হলো।
.
কথা ভাবতে পারছে না রাজ মারা গেছে!
.
সবাই কান্না করছে, কথা নিঃস্তব্ধ হয়ে গেছে, রাইসা কাঁদছে আর বলছে” বাবাই কথা বলো বাবাই! কথা বলবে না আমার সাথে? বাবাই তুমি আর আমাকে পাপ্পি দিবে না? আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে বাবাই। আল্লাহ্কে পিচ্চি বলে আমার চোখের পানি দেখে না। ও আল্লাহ্ তুমি তো বলেছে, ছোট বাচ্চারা নিষ্পাপ হয় তাঁদের কোন পাপ থাকে না তাঁদের কথা অগ্রাহ্য করতে পারো না। ওহ আল্লাহ্ দেখো আমি কাঁদছি, তুমি আমার বাবাই কে বলো আমার সাথে কথা বলতে, তুমি কথা বলতে বললে বাবাই আর চুপ করে থাকতে পারবে না। দেখতো বাবাই আমার সাথে অভিমান করেছে, আমাকে কুলে নেই না আদর করে না। আমার কষ্ট হয় না বুঝি। বাবাই ও বাবাই কথা বলো।
.
মা মা দেখ বাবাই কথা বলছে না। বাবাইকে বলো কথা বলতে। এদিকে সবাই রাজের জানাযা করে কবরে নিয়ে যাচ্ছে। কথা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রাজের চলে যাওয়ার দিকে!
.
কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছে, আজ একটি ভুলের জন্য কথা সারাজীবনের জন্য হারিয়ে গেল কথার জীবন থেকে।
.
মম বাবাইকে কোথায় নিয়ে যায়। বলো না মা, বাবাইকে সবাই কোথায় নিয়ো যায়। বাবা কি রাগ করেছে তাই নিয়ে যাচ্ছে। বাবা আবার কখন আসবে মা? বলো না মা আমার বাবাইকে সবাই কোথায় নিয়ে যায়।
.
রাইসার কথা শুনে কথার কষ্টে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রাইসাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে কথা। রাইসাকে কি বলবে, সে উওর যে কথার কাছে নেই। এদিকে রাজকে কবরে নামালে কথা আর থাকতে পারে না, দৌঁড়ে চলে যায় কবরের কাছে গিয়ে বলতে লাগে” আমি আমার স্বামীকে কোথাও যেতে দিবো না, তোমরা কেউ আমার স্বামীকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না”!
.
এদিকে কথার চিল্লানী শুনে রাজের বাবা কথাকে গিয়ে বলে, কি হয়েছে মা তুই কাঁদছিস কেন?
.
বাবা রাজকে কবর দিয়ে দিচ্ছে, রাজকে প্লিজ কবর দিতে দিয়েন না, ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। বাবা সত্যি ওকে ছাড়া মরে যাবো। ( কথা)
.
মা’রে তুই দুঃস্বপ্ন দেখেছিস। রাজ বেঁচে আছে। ডাক্তার আল্লাহকে ডাকতে বললো। আমি জানি তুই রাজকে অনেক ভালবাসিস। এতো কষ্ট দেওয়ার পরও তুই ওকেই ভালোবেসে গিয়েছিস।
.
বাবা রাজ কোথায়?
.
রাজের বেডে!
.
কথা দৌড়ে রাজের বেডে গিয়ে দেখি, রাইসা রাজের বুকে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো। শরীরে স্যালাইন যাচ্ছে। কথা রাজের কপালে চুমু দিয়ে রাজের পা ধরে কাঁদতে লাগল। প্লিজ তুমি আমাকে ছেড়ে দিয়ো না, কীভাবো বাঁচবো তোমায় ছাড়া। তুমি যে আমার জীবন। তুমি যে আমার ভালবাসা।
.
প্লিজ ম্যাডাম এভাবে কাঁদবেন না! পেশেন্ট এর সমস্যা হবে পারলে আল্লাহ্কে ডাকেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, রাত ১ টা বাজে। কথা দু’রাকাত নফল নামায শেষ করে, মোনাজাতে দুটি হাত উত্তোলন করে বলতে লাগল” হে পরম করুণাময় আল্লাহ্ তায়ালা, রহিম রহমান। এই শেষ রাতে পৃথিবীর সকল মানুষ যখন ঘুমন্ত এমন সময় তোমার পবিএ দরবারে দু’টি হাত তুলে ধরেছি! ছোটকালেই মা -বাবাকে হারিয়েছি, বাবার স্নেহ কি জিনিস কখনো তা পায়নি। পায়নি মায়ের ভালবাসা। একমাএ অবলম্বন স্বামী। আজ আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা চায় তোমার দরবারে। হে আল্লাহ্ ফকির এক দরজার ভিক্ষা না পেলে অন্য দরজার যায়। আর তুমি ছাড়া তো আমার কোন দরজা নাই, এই ভিক্ষারিণীকে তুমি খালি হাতে ফিরাইওনা। আমি কিছু চায়নি কোনদিন তোমার দরবারে। কোনদিন বলেনি বা অভিযোগ করেনি মা-বাবাকে কেন কেড়ে নিলে। আল্লাহ্ তোমার কাছে আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা চায়। আল্লাহ্ আমার জীবনের বদৌলতে হলেও আমার স্বামীকে বাঁচিয়ে দাও। আমার মেয়েকে তুমি বাবা হারা করো না। আল্লাহ্ সন্তান কাঁদলে নাকি মা সহ্য করতে পারে না! ওহ্ আল্লাহ্ তুমি তো দুনিয়ার মায়ের চেয়ে তোমার বান্দা -বান্দীকে লক্ষ কোটিগুণ বেশি ভালোবাসো। আল্লাহ্ এই নিশিরাতে তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো না? আমার স্বামীকে সুস্থ করে দাও হে আল্লাহ্। আমার বেঁচে থাকার অবলম্বনকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না। নিশ্চয়ই তোমার গোনাহ্গার বান্দীর দোয়া কবুল করেছে। এই কথা বলে মোনাজাত শেষ করে জায়নামাযেই ঘুমিয়ে গেল।
.
ভূরের আলো পড়তেই,কথার ঘুম ভেঙে যায়। কথা দৌড়ে যায় রাজের বেডে। কথা গিয়ে দেখে রাজের অক্সিজেন মাক্স খোলা, ডাক্তার এসে বললো রাজ আর ফিরবে না। কথাটা বলেই ডাক্তার চলে গেল।
.
কথা চিল্লায়ে কাঁদছে! না আমার রাজ আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না। রাজের পা দুটি জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো, তুমি আমাকে ছেড়ে যেয়ো না আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। তোমার বুকই যে আমার শেষ ঠিকানা। প্লিজ কথা বলো, চুপ করে থেকো না। কথা রাজের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে!
.
কথা কাঁদতে কাঁদতে রাজের কপালে গিয়ে ভালবাসার স্পর্শ এঁকে দিল। এদিকে কে যেন, কথাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কথা চেয়েই দেখে রাজ কথাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।
.
এদিকে রাজ বলছে, আমি কি আমার পিচ্চি বউটাকে রেখে মরতে পারি? আমি যে আমার পিচ্চি পরীটাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি। আমার পিচ্চিটাকে কী জড়িয়ে ধরতে পারি?
যাহ্ দুষ্ট কথাটা বলে, রাজের বুকে মুখ লুকালো। এই কি করছো শার্ট তো ভেজে গেল। ভিজুক কেন কষ্ট দিলে আমায়। ( কথা)
.
তুমি ও তো আমাকে কম কষ্ট দাওনি, পাঁচবছর তোমাকে ছাড়া কাটিয়েছি। তাই আমিও ডাক্তারকে সব কিছু বলে ডাক্তারের সাথে প্ল্যান করে এসব করেছি। তবে একসিডেন্ট সত্যি সত্যি হয়েছিল। আচ্ছা সত্যিই যদি আমি হারিয়ে যেতাম?
.
কথা আমার মুখে হাত দিয়ে ফেলল। কি বলছো, তাহলে আমার কি হবে। এখনো তো বাসর রাত বাকী! আর এখন আর আমি কিন্তু পিচ্চি না। .
আমি হেসে দিয়ে কথাগুলো জড়িয়ে ধরলাম। হঠাৎ রাইসা এসে বললো ” বাবাই মাকেই আদর করবে, আমায় করবে না?
.
রাইসাকে কুলে নিয়ে দুজনেই হেসে দিলাম!
.
সমাপ্ত।

মিছে স্বপ্নের জাল বুনি || ফারজানা শারমিন

মিছে স্বপ্নের জাল বুনি
ফারজানা শারমিন
তোমার পথ হতে কতোটা দূরত্বে আমি
তারপরও তুমি ছুঁয়ে থাকো আমার প্রতিটি প্রহর,
আমি স্বপ্নে বিভোর,
তোমার নামেই প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
যেন ছুঁয়ে থাকো চোখ বুজে প্রতিটি বিশ্বাসে,
কি নির্বোধ আমি !
ভেবেছিলাম তুমি বুঝি আমারই রবে আজীবন,
অথচ এই মিথ্যে স্বপ্নের জাল বুনে যাই সারাক্ষণ
এতটুকু ভাবিনি মিছে খুঁজি তোমাকে পথ চেয়ে রই
আমি তো তোমার কেউ নই কিচ্ছু নই,
আমি হয়তো তোমার যোগ্য নই ।
এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে খুঁজেছি কতোবার,
দুঃখ গুলো জমে থাকুক আমার বুকে,
তোমার জন্য সুখের সময় থাকুক পদ্মরাগে ।
কি নির্বোধ আমি !
মিছে স্বপ্নের জাল বুনি,
সমস্ত স্মৃতি গুলো পরম মমতায় আগলে রাখি ।

প্রেমাতাল পর্ব – ১৮ || মৌরি মরিয়ম

জলপ্রপাতের পানিতে ভাসতে ভাসতে আর স্রোতের ধাক্কা খেতে খেতে তিতিরের সারা শরীর যেন অসাড় হয়ে পড়ছিল। তিতির পানি থেকে ওঠার কথা মুগ্ধকে বলতে গিয়ে দেখলো কোনো কথাই বলতে পারছেনা। কথা বলার জন্য যে মিনিমাম শক্তিটুকু দরকার তা ওর ওই মুহূর্তে ছিলনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুগ্ধ বলল,
-“এইযে তিতিরপাখি, চলো এবার ওঠা যাক। এর বেশি থাকলে পরে তোমার কষ্ট হবে।”
তিতির কিছু বলতে পারলো না। মুগ্ধ ওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই উপরে উঠলো। সাথে সাথে দোলা এসে ওদের বেল্ট আর দড়ি খুলে দিল। তিতির নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়েছে। মুগ্ধর ব্যাগে আরো দুই বোতল পানি ছিল। একটা বের করে তিতিরকে খাওয়ালো। তিতির অর্ধেকটা পানি খেয়ে আবার শুয়ে পড়লো। মুগ্ধ বাকি পানিটুকু খেয়ে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিল। হঠাৎ তিতিরের দিকে তাকাতেই দেখলো তিতির উঠে বসেছে। জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর হাসছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তাকিয়ে আছে জলপ্রপাতের সেই স্রোতধারা গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ পর তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আপনি জানেন না আপনি আমাকে আজ কি দিয়েছেন! এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। যতক্ষণ আমি ওখানে ছিলাম আমার মনে হচ্ছিল আমি অন্য কোনো এক জগতে আছি। যদিও আমার একফোঁটা শক্তি ছিলনা কিন্তু আমার খুব ভাল লাগছিল। খুব খুব খুব!”
মুগ্ধ হাসলো শুধু কিছু বললনা। দোলা বলল,
-“এত ভাল লাগছে তাহলে কাঁদছ কেন?” তিতির হাসতে হাসতে বলল,
-“আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না আপু। আমার এই কান্নাটা অবশ্যই খুশির কান্না! আমার জীবনে এত সুখের মুহূর্ত আগে কখনো আসেনি। কিন্তু কেন জানিনা কান্নাটা আমি থামাতে পারছিনা।”
মুগ্ধ বলল,
-“আমি তো দেখছি তুমি হাসিটাও থামাতে পারছ না!”
তিতির আবার হাসলো। মুগ্ধ ব্যাগ থেকে টাওয়াল বের করে দিল। বলল,
-“নাও মাথাটা ভাল করে মুছে নাও।”
তিতির টাওয়াল নিল। মুগ্ধ ব্যাগ নিয়ে উঠে কোথায় চলে গেল। একটু পর ভেজা থ্রি-কোয়ার্টার পালটে শুকনো একটা পড়ে ফিরে এল। তিতির এখনো সেই যায়গায় একা একা বসে আছে। আর গ্রুপেরই একটা ছেলে ওর দিকে তিতিরের দিকে তাকিয়ে আছে। নজরটা যে কোনদিকে তা বুঝতে মুগ্ধর অসুবিধা হলো না। ট্রিপে এসে ছেলেটাকে কিছু বলাও তো যাবে না। তিতিরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,
-“তিতির ব্যাগ তো আনোনি না?”
-“না।”
-“এক্সট্রা কাপড় যখন আনোনি ভেজাটা উচিৎ হয়নি।”
তিতির বলল,
-“প্রব্লেম নেই।”
-“প্রব্লেম আছে। দোলা ছোট একটা ব্যাগ এনেছে, ওকে জিজ্ঞেস করো তো ওর কাছে এক্সট্রা কাপড় আছে কিনা।”
তিতির উঠে গিয়ে দোলার সাথে কথা বলে ফিরে এল। বলল,
-“আপু ব্যাগে কাপড়চোপড় আনেনি। শুকনো খাবার এনেছে।”
-“ও।”
তারপর মুগ্ধ নিজের ব্যাগ থেকে একটা টি-শার্ট বের করে তিতিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“নাও এটা পড়ো।”
তিতির অবাক চোখে,
-“এটা আপনার?”
-“হ্যা।”
এবার তিতির হো হো করে হেসে উঠলো,
-“ওর মধ্যে দুটো আমি ঢুকতে পারবো।”
-“সেটা আমি জানি। লাগলে তিনটা তুমি ঢোকো গিয়ে। যাও, আর একটা কথাও না বলে চেঞ্জ করে এসো। ওই ঝোপের আড়ালে গিয়ে চেঞ্জ করো।”
-“থ্যাংকস বাট সত্যি কোনো দরকার নেই। আমার ঠাণ্ডা লাগবে বলে বলছেন তো? আমার এটুকুতেই ঠান্ডা লাগেনা, কোনো প্রব্লেম হবেনা। এটা আপনিই পড়ুন।”
-“তিতির বাম পাশের চেক শার্ট পড়া ছেলেটা তোমার ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি দেখেছি, দেখে খুব রাগ লেগেছে। মন চাইছিল চোখদুটো গেলে দিই। ট্রিপে কোনো ঝামেলা করতে চাচ্ছিনা। তাই বলছি চেঞ্জ করো।”
তিতিরের চোখগুলো রসগোল্লা হয়ে গেল। নিজের কানকে বিঃশ্বাস করতে পারছিল না। মুগ্ধ বলল,
-“একদম ডিরেক্টলি না বললে কিছুই বোঝোনা কেন? আজব!”
তিতির আর একটা কথাও না বলে টি-শার্ট টা নিয়ে ঝোপের মধ্যে চলে গেল। তারপর টি-শার্ট টা বুকে জড়িয়ে ধরলো, স্মেল নিল। ইশ, মুগ্ধ কত খেয়াল রাখে ওর যতটা ও নিজেও রাখতে পারেনা। উড়তে ইচ্ছে করছে, উড়তে! মুগ্ধর স্মেলটাও এত মারাত্মক কেন?
মুগ্ধর টি-শার্ট টা তিতিরের হাটু সমান লম্বা হয়েছে, আর এত ঢোলা যে আরো দুএকজন ঢুকতে পারবে। তাতে কিছু যায় আসেনা। মুগ্ধর টি-শার্ট পড়া মানে অনেক কিছু যা কেউ বুঝবে না। আরেকবার টি-শার্ট টা নাকের কাছে এনে স্মেল নিয়ে বেড়িয়ে এল ঝোপের বাইরে। ওকে দেখে দোলা হেসে দিল। আরো অনেকেই হাসলো বোধহয় কিন্তু ও একটুও অস্বস্তিবোধ করছিল না। খুব পার্ট নিয়ে ছিল।
এবার ফেরার পালা। প্রায় ৪-৫ ঘন্টা নাফাখুমে কাটিয়ে ওরা ফেরার পথে হাটা ধরলো। পথে তিতিরকে ৯ বার জোকে ধরলো, মুগ্ধ একইভাবে জোক ছাড়িয়ে দিল। সবারই কেমন যেন কথাবার্তা ফুরিয়ে গেছিল, জলপ্রপাতের ঘোর কারোরই কাটেনি। সেই কোমড় সমান পানির যায়গায় এসে মুগ্ধ বিনাবাক্যে তিতিরকে কোলে নিয়ে হাটা শুরু করলো। কোলে নিতেই তিতির ওর গলা জড়িয়ে ধরলো। একটা অদৃশ্য অধিকারবোধ দুজনের মধ্যেই কাজ করছিল। মুগ্ধর টি-শার্ট তিতিরকে দেয়ার কারনে মুগ্ধ ছিল খালি গায়ে। এটাও একটা দেখার মত দৃশ্য ছিল। তিতিরের কেমন যেন লাগছিল! মুগ্ধ ছিল খালি গায়ে আর লজ্জা লাগছিল ওর। হাতগুলো মুগ্ধর খালি গায়ে লাগছিল। আর যখনি সে হাতের কুনুই ওর বুকের লোমগুলোর সাথে লাগছিল তখন সুড়সুড়ি লাগছিল তিতিরের। যেদিন এসেছিল সেদিন মুগ্ধর মুখে খুব ছোট ছোট দাঁড়ি ছিল। এখন সেগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। তিতির সেদিকে তাকিয়ে ছিল। মুগ্ধকে এখন আরো বড় বড় লাগছে। তিতির মুগ্ধর গলার পিছনে দুহাত বেধে রেখেছিল। হঠাৎ একটা হাত দিয়ে মুগ্ধর গলা জড়িয়ে আরেকটা হাত নামিয়ে মুগ্ধর দাড়িতে রাখলো। মুগ্ধ চমকে তাকালো তিতিরের দিকে। তিতির লজ্জা পেয়ে ওর দাড়ি ছেড়ে দিয়ে আবার গলার পিছনে হাত বাধলো।
রেমাক্রি ফিরতে ফিরতে বিকাল ৫ টা বাজল। সবাই ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে নিল। তারপর যে যার মত রেস্ট নিচ্ছিল। তিতির বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল। খুব ক্লান্ত লাগছিল। পা গুলো যেন ভেঙে আসছিল। জানালা গুলো নিচু হওয়ার কারনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নদী, পাহাড় সবই দেখতে পাচ্ছিল তিতির। হঠাৎ বারান্দায় মুগ্ধকে দেখা গেল। মুগ্ধ ওকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করল,
-“কি ব্যাপার? ঘুমকুমারী না ঘুনিয়ে তাকিয়ে আছে যে!”
-“আমার এত ক্লান্ত লাগছে যে ঘুমাতেও পারছিনা।”
-“আরে ঘুরতে আসলে ওরকম একটুআধটু হয়। রাতে একবারে ঘুমিও। এখন চলো তো।”
-“কোথায়?”
-“রেমাক্রি বাজারে যাব। চলো মজা হবে।”
-“কি মজা?”
-“বাজারে কতরকম ফল, সবজি ওঠে। সব তুমি চিনবেও না।”
-“না প্লিজ আমি যাব না, আপনি যান। আমি এখন আরো হাটলে মরেই যাব।”
-“এহ! তুমি হাটলা কখন? কোলে কোলেই তো গেলে আসলে। আর জলপ্রপাতের পানিতে? সেখানেও তো কোলেই ছিলে।”
তিতির অবাক হয়ে বলল,
-“মানুষের উপকার করে আবার খোঁটা দিচ্ছেন? কি খারাপ আপনি।”
-“সেটাতো অবশ্যই।”
-“আপনি যান। আমি যাবনা।”
-“কোলে করে নিলে যাবে?”
তিতির মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে হেসে দিল। মুগ্ধও হেসে দিল। তারপর বলল,
-“আচ্ছা তুমি রেস্ট নাও। আমি যাই।”
তিতির কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল তা ওর মনে নেই। ঘুম ভাঙলো দোলার ডাকে। উঠতেই দোলা বলল,
-“আহা ঘুমিয়ে ছিলে, ওদিকে তোমার আশিক তো তোমাকে ছাড়া মরেই যাচ্ছিল। মনের দুঃখে শেষে রান্নাই করতে চলে গেল।”
তিতির লজ্জা পেয়ে হাসলো। দোলা বলল,
-“আরে এত লজ্জার কি আছে? আমিই তো।”
-“নাহ আসলে তেমন কিছু না।”
-“ইশ আর লজ্জা পেয়ে মিথ্যে বলতে হবেনা। আমরা এতক্ষণ তোমাদের এডভেঞ্চারের গল্প শুনছিলাম।”
-“কোন গল্প?”
-“ডাকাতের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচার গল্প।”
-“ওহ।”
-“তাইতো বলি দুজনের মধ্যে এত ভাব হলো কখন?”
তিতির কি বলবে লজ্জায় তো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। দোলা বলল,
-“তুমি খুব লাকি বুঝলে? তোমার আগে কোনো মেয়েকে ভাইয়া এতটা প্রায়োরিটি দেয়নি। ওদের একটা কাজিন আছে ‘ইকরা’। ভাইয়াকে পাগলের মত লাভ করে আর ভাইয়া পাত্তাই দেয়না।”
হঠাৎ তিতিরের মনে পড়লো সেইযে মেসেজ দেয় ‘পেরা’ সেই ইকরা নয়তো? কিন্তু সে তো ভার্সিটির, কাজিন তো না। নাকি কাজিনই বাট একই ভার্সিটিতে পড়ে। দোলা বলল,
-“এই বলোনা, কিভাবে প্রোপোজ করল?”
তিতির বলল,
-“প্রোপোজ! তুমি ভুল ভাবছো.. সত্যি প্রোপোজ করেনি। আমাদের মধ্যে তেমন কিছুই হয়নি।”
দোলা অবাক হয়ে বলল,
-“ভাইয়াও তাই বলল। কিন্তু বিশ্বাস করিনি। আই মিন তোমাদের মধ্যে রিলেশনশিপ চলছে সে ব্যাপারে আমি সিওর ছিলাম তা নাহলে কোলে নেয়া। একই দড়িতে পানিতে নামা। দুজনের কথাবার্তা, দুজনের দুজনের দিকে তাকানো! এসব কিভাবে সম্ভব!”
তিতির এবার বলল,
-“আসলে আমি ওনাকে পছন্দ করি। উনিও হয়তো করে কিন্তু কিছু বলেনি তো কখোনো। তাই সিওর না।”
-“ওয়াও, দ্যাটস গ্রেট। তুমি তাহলে ওকে বলে দাও তোমার ফিলিংসের কথা।”
-“না না আমি বলতে পারবো না।”
-“কেন?”
-“উনি যদি পছন্দ না করে আর রিজেক্ট করে তাহলে মানতে পারবো না। তার চেয়ে অপেক্ষা করি।”
-“সেকী! রিজেক্ট কেন করবে?”
-“হতেও তো পারে ওনার আমাকে পছন্দ না। আফটারঅল মাত্র ৩/৪ দিন ধরে চিনি আমরা একে অপরকে।”
-“আরে আমরা তো চিনি ভাইয়াকে। ও ভাল না বাসলে এরকম করতোই না।”
-“তবু আমি অপেক্ষা করবো আপু।”
-“কতদিন অপেক্ষা করবে? এর মধ্যে যদি অন্য কেউ ঢুকে পড়ে? আর ভাইয়া তার হয়ে যায়?”
-“উনি আমার হলে কখনোই অন্য কেউ ঢুকে পড়তে পারবে না। আর ঢুকলেও উনি তার হবে না। হলে বুঝতে হবে আমি ভুল ভেবেছি। উনি আসলে আমাকে ফিল করেনি।”
-“হায় আল্লাহ! কোন দুনিয়ায় আছি।”
তিতির দোলার হাত ধরে বলল,
-“প্লিজ আপু আমাকে ছুঁয়ে বলো যে তুমি ওনাকে আমার ফিলিংসের কথা কিছু বলবে না। আমি চাই উনি নিজ থেকে আমাকে বুঝুক আর প্রোপোজ করুক।”
দোলা তিতিরের হাত ধরে হেসে বলল,
-“আচ্ছা বলবোনা। দোয়া করি খুব তাড়াতাড়ি আমার বড় জা হয়ে যাও।”
তিতির লজ্জা পেয়ে গেল। দোলা হাসতে হাসতে বাইরে বেড়িয়ে গেল।
রাতে সবাই খেতে বসেছে। তিতির বারান্দায় দড়িয়ে ভাবছিল মুগ্ধরই কথা। এমন সময় পিছন থেকে মুগ্ধ বলল,
-“এইযে সুন্দরী, আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
-“মোটেই খোঁজেননি। আমি এখানেই ছিলাম।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“আচ্ছা আচ্ছা, তোমার ক্লান্তি গেছে?”
তিতির হেসে বলল,
-“হুম, ঘুমিয়েছি না?”
-“পা ব্যাথা?”
-“পা ব্যাথা আছে। এত হাঁটিনিতো কখনো।”
-“ওহ। হুম ডিনার করে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিও। ব্যাথা কমে যাবে।”
-“আচ্ছা।”
-“তোমার জন্য বাঁশ রেঁধেছি। চলো খাবে।”
-“কি?”
মুগ্ধ হেসে বলল,
-“বান্দরবানে বলেছিলাম না বাঁশ কুরুইল খাওয়াবো সুযোগ পেলে? ওটাই রান্না করেছি। ওটা আনতেই বাজারে গিয়েছিলাম।”
বাঁশ কুরুইল টা সত্যি অসাধারণ ছিল। নরম নরম আর খুব টেস্টি। চিকেন দিয়ে ঝাল ঝাল করে রান্না করেছে মুগ্ধ। তিতিরের মনে হলো এত সুস্বাদু খাবার ও আর খায়নি। খেতে খেতে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিল,’আমি আপনার কাছ থেকে সব রান্না শিখবো। তারপর আর আপনাকে রাঁধতে দেবনা। আমি আপনাকে রেঁধে খাওয়াবো।’
খুব ভোরে ওরা রওনা দিয়েছিল যাতে রাতে থানচিতে থাকতে না হয়। কারন, থানচি যায়গাটা কারোরই তেমন পছন্দ হয়নি। সন্ধ্যার মধ্যেই ওরা বান্দরবান পৌঁছলো। তারপর রাতের বাসে ঢাকা। ঢাকার বাসেও তিতির মুগ্ধ পাশাপাশি বসলো। তিতিরের মন খারাপ লাগছিল। পথ তো শেষ হয়ে যাচ্ছে, মুগ্ধ এখনো কিছু বলল ন। মুগ্ধ আর ও টুকটাক কত গল্প করছে। ম্যক্সিমাম ট্রাভেলিং রিলেটেড। ১০ দিনের ট্যুর ৫ দিনে শেষ হয়ে গেল পারমিশন না পাওয়ার কারনে। ৪০% টাকা ফেরত পেল। এই টাকা দিয়ে তো অন্য কোথাও ঘুরে আসা যায়! তিতিরের ইচ্ছে করছে মুগ্ধর সাথে অন্য কোথাও চলে যেতে কিন্তু ও কখনোই তা বলতে পারবে না। এত চিন্তার মধ্যেও ও বেশ কয়েকবার ঘুমালো। উঠলো, গল্প করলো। কিন্তু মুগ্ধ কিছুই বলল না।
আস্তে আস্তে একসময় সকাল হল। বাস চলে এল ঢাকায়। মুগ্ধ আর তিতিরের গন্তব্য একই যায়গা, ধানমন্ডি ১১ নম্বর রোড। দুজনে একটা সিএনজি নিল। তিতিরের বাসার সামনে এসে মুগ্ধ সিএনজি ছেড়ে দিল। একটা বাসা পরেই ওর বাসা। হেটেই চলে যেতে পারবে।
দুজনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিতিরের বাসার সামনে রাস্তার অপজিটে। দুজনেরই মন খারাপ। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারলো না। ভেবে পেলনা কি বলবে। একসময় মুগ্ধ ম্লান হেসে বলল,
-“ওকে বাসায় যাও তাহলে।”
-“হ্যা যাচ্ছি।”
-“ভাল থেকো। নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। সাবধানে থেকো।”
-“আপনিও ভাল থাকবেন।”
তিতির আর দাঁড়ালো না, চলে গেল। গেটের সামনে গিয়ে তিতির একবার পিছন ফিরে তাকালো। মুগ্ধ পকেটে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে ফিরে তাকাতে দেখেই হাসলো। তিতিরও একবার হাসলো। তারপর গেটের ভেতর ঢুকে গেল।
তিতির ভেতরে যাওয়ার পর মুগ্ধ উলটো ঘুরে নিজের বাসার দিকে হাটতে লাগলো। বাসার গেটের ভেতর ঢুকতেই মনে পড়লো তিতিরের ফোন নাম্বারটাই তো আনা হয়নি! কোনরকমে গেটটা খুলে দৌড় দিল। এক দৌড়ে চলে এল তিতিরের বাসার সামনে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
অন্যদিকে এক সিঁড়ি উঠে দোতলার অর্ধেকে যেতেই তিতিরের খেয়াল হল মুগ্ধর ফোন নাম্বার নেয়া হয়নি। এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমতেই বাবার সাথে ধাক্কা লাগলো। বাবা ওকে দেখে খুশিতে বলে উঠলো,
-“ওরে বাবা! আমার আম্মা দেখি ১০ দিনের যায়গায় ৫ দিনে এসে গেছে। কিন্তু আম্মা দৌড়াচ্ছে কেন?”
-“বাবা সিএনজিতে আমার পার্স ফেলে এসেছি।”
এছাড়া আর বিশ্বাসযোগ্য কোন কথা খুঁজে পেলনা তিতির। বাবা বলল,
-“বাইরে তো কোন সিএনজি নেই।”
-“ওহ! বাবা আমি আরেকটু খুঁজে দেখি?”
-“নেই তো মা। বাদ দে। কি এমন ছিল পার্সে?”
-“টাকা।”
-“ওহ। তাতে কি হয়েছে? টাকা গেছে যাক। আমার মেয়ে তো সেফলি ফিরে এসেছে।”
-“বাবা ওতে পাঁচ হাজার টাকা ছিল। ট্যুরের টাকা বেচে যাওয়ার ফেরত পেয়েছি। আমি ভেবেছিলাম ওটা দিয়ে কিছু করবো। বাবা আমি যাই?”
-“আরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা? চল আমি তোকে এক্ষুনি দিয়ে দিচ্ছি। এর জন্য নাকি আমার আম্মা এত সকালে বাইরে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে।”
তিতির মন খারাপ করে বাবার সাথে সিঁড়িতে উঠলো,
-“এত সকালে তুমি কোথায় গিয়েছিলে বাবা?”
-“নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এত সকালে আর কোথায় যাব? চল চল। উপড়ে চল। আজ আমি নিজে বাজারে গিয়ে বাজারের সবচেয়ে বড় ইলিশ মাছটা নিয়ে আসব আমার আম্মার জন্য।”
কিন্তু তিতিরের অস্থির লাগছিল। একেকটা সিঁড়ি যেন একেকটা উঁচু পাহাড়ের চেয়েও বেশি উঁচু মনে হচ্ছিল।
To be continued….

পিচ্চি বউ পর্ব – ১২ || জিসান আহম্মেদ রাজ

আমি দরজাটা লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে, বালিশে মুখটা লাগিয়ে কাঁদতে লাগলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, রাজ একটা ডাইরি দিয়ে গেছে। টেবিলের উপর থেকে ডাইরিটা তুলে বুকে জড়িয়ে নিলাম।
.
ডাইরিটা খুলতেই চমকে গেলাম,
.
“আমার এই হৃদয়ে লিখিলাম তোমারি নাম”
ডাইরির পরের পাতা উল্টাতেই,
.
ওগো হৃদয়রাঙিনী,
জানিনা কিভাবে শুরু করবো, আমি যে অনেক বড় অপরাধী! তোমার অবুঝ ভালবাসাকে অবহেলা করেছি। জানো যেদিন তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি, সেদিন বুঝেছি তুমি কতটা জুড়ে আমার জীবনে ছিল।
জানো, প্রতিদিন তোমার জন্য কেঁদেছি। মাঝরাতে উঠে আল্লাহর কাছে চাইতাম যেন, তোমাকে আমার করে দাও।
প্রতিরাতে তোমার ছবিটা বুকে নিয়ে ঘুমাতাম।
তোমার ছবি বুকে নিয়ে কাঁদতাম। জানো, মানুষ মারা গেলে নাকি তারা হয়ে যায়। তাই প্রতি সন্ধায় আকাশের তারাদের সাথে কথা বলতাম। বলতাম, যেন আমার হৃদয়রাঙিনীকে তারা যেন কষ্ট না দেয়। রাতের আকাশের সব চেয়ে উজ্জল তারাকে তুমি মনে করে, কাঁদতাম আর বলতাম, অভিমান ভেঙে এসো না, জড়িয়ে নাও না তোমাতে আমি যে আর পারছি না তোমার বিরহে। এসব বলে কাঁদতাম। কিন্তু তুমি এতটাই আমার প্রতি অভিমান করেছিলে, যার জন্য আমার সাথে কথা বলো না, শুধু করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। সত্যি কি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না? জানো খুব ইচ্ছা করে তোমাকে এই মরুরবুকে জড়িয়ে নিয়ে, শান্ত করতে আমারি প্রাণ।
.
জানো আজ একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখে তোমার কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। বাচ্চাটা দেখতে ঠিক তোমার মতই। আমি এতটাই হতভাগী নিজের বাচ্চাকে নিজের হাতে নষ্ট করেছি। জানো এখনো সেই রাতের কথাগুলো ভুলতে পারি না। তোমাকে দেওয়া প্রতিটা চড়ের আঘাত আমার কলিজাতে লেগেছে!
.
জানো পরের দিন যখন বাচ্চাটাকে ব্ল্যাড দিলাম, সেদিন মনে হয়েছে, আমার খুব কাছের কাউকে রক্ত দিচ্ছি।
.
বাচ্চাটার জন্মদিনে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে নিতেই, তোমার শরীরের গন্ধ পেলাম। কিন্তু যখনি সিড়িতে তোমার মতোই কাউকে দেখলাম, তখন সত্যি ভেবে নিয়েছিলাম, আল্লাহ্ আমার ডাক শুনেছে। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন শুনেছিলাম, তুমি কথা নও, আমাকে চিনো না, তখন আমার কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছিলো। যখন রফিক সাহেব এসে হাত ধরল, আমার কাছে তখন মনে হয়েছিল, কেউ যেন কলিজাটা ধুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে!
.
জানো তুমি নেও যেনেই নিজের অজান্তে পাগলামী করেছি। আর বাসায় এসে কেঁদে বুক ভাসিয়েছি! পরের দিন ঠিক করলাম, তোমার জন্য লেখা ডাইরিটা তানিয়া আপুকে দিয়ে তোমার কাছেই চলে আসবো,।
.
আমি যে আর পারছিনা, মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই! তোমাকে ছাড়া যে এখন আমার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, কষ্টটা আরো বেশি হয় যখন তোমারি মতো তানিয়া নামক মেয়েটা তাঁর স্বামীর হাত ধরে আমারি সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। জানো তখন বড্ড বেশি তোমার কথা মনে পড়ে। কি করবো, আমি তোমাকে ছাড়া আর যে বাঁচতে পারছি না। তোমাকে নিয়ে লেখা শেষ অবলম্বনটা তোমাকে মনে করে তানিয়া আপুকেই দিয়ে গেলাম। জানো খুব কষ্ট হচ্ছে লেখাগুলো লিখতে।
.
ডাইরিটা পড়তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো। আজকে কথার একটা মিথ্যার জন্যই রাজ মৃত্যুর কিনারায়। খুব কষ্ট হচ্ছে কথার, রাজের মুখটা বার বার কথার সামনে ভেসে ওঠছে। কথার কানে বার বার বাজছে, রাজের শেষ কথাগুলো।
.
হঠাৎ, বাহিরে কিছু ভাঙার শব্দ পেল!
.
কথা রুমের বাহিরে এসে দেখে,
রাইসা কাঁদছে, খাবারের প্লেট ফেলে দিয়েছে।
.
মা রাগ করে না, খেয়ে নাও!
.
আমাকে মা বলবে না, আমাকে বাবাই এর কাছে নিয়ে যাও! আর তুমি আমার বাবাইকে কষ্ট দিয়েছো, আমার সাথে কথা বলবে না।
.
প্লিজ রাইসা মা আমার, তোমার বাবার কিছুই হবে না, প্লিজ কান্না করো না! খেয়ে নাও। ( কান্না চেপে
.
আমাকে বাবাই এর কাছে নিয়ে যাও!
বাবাইকে না দেখে খাবো না।
.
হঠাৎ, সবুজ কে আসতে দেখেই কথা ভাইয়া বলে কেদে দিয়ে বলল” ভাইয়া রাজ বাঁচবেনা, রাজকে ছাড়া আমিও যে বাঁচবো না।
.
সবুজ কথাকে বুকে নিয়ে বলল, কান্না করিস না বোন, আল্লাহ তায়ালায় সব ঠিক করে দিবেন।
.
তোর কান্না যে দেখতে পারি না। মা – বাবাকে তো ছোটবেলায় হারিয়েছি। তানিয়াটাকেও প্রথম দেখাতেই হারিয়ে ফেলেছি। তুকে খুন করার জন্য, সাথী নামের মেয়েটা কন্টাক্ট করেছিল। তোকে খুন করতে এসে তোর গলার লকেট দেখেই চিনে ফেলি তুই আমার ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন কথা । কিন্তু সেসময়, তানিয়াকে গাড়ির নিচে পিস্ট হতে দেখি। তোর চেহেরা তানিয়ার মতোই ছিল, তাই যখন দেখলাম, তানিয়া রাস্তায় পাশে পড়ে আছে, দৌঁড়ে বুকে টেনে নেই! সন্ত্রাসী ছিল, মানুষের রক্ত দেখলে হাসি পাইতো, কিন্তু যখন নিজের বোনটার রক্ত আমার শার্ট ভেজে যাচ্ছিল, তখন বুঝেছি, আপন মানুষদের রক্ত শুধু তাঁদের শরীর থেকে ঝড়ে না, অাপন মানুষটির কলিজা থেকেও ঝড়ে। তোকে আর তানিয়াকে পেয়ে, অন্ধকার রাস্তা থেকে সরে আসি।
.
তারপর রাজের বাবার প্ল্যান অনুযায়ী, তানিয়াকে কথা বানিয়ে রাজের বাড়িতে পাঠাই, আর রিচি পায় তাঁর মাকে।
.
রিচির বাবার রফিক ভাইয়ার সাথে সব প্ল্যান করি। কিন্তু এ জন্য যে রাজ আজকে মৃত্যুর মুখামুখি হবে, তা জানলে কখনো, এতটা মিথ্যার আশ্রয় নিতাম না!
.
হঠাৎ রাইসা দৌড়ে এসে, কথাকে জড়িয়ে ধরে বলল” মম চলো না বাবাই এর কাছে, আমার সাথে বাবাই কথা বলবে, তোমাদের সবার সাথে রাগ করে থাকলেও আমার সাথে বাবাই রাগ করে থাকতে পারবে না। বাবাই জানে আমার সাথে, অভিমান করলে, তাকে কান ধরে উঠবস করতে হবে!
.
কথাকে কিছু বলতে দেওয়ার আগেই রাইসা কথাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গাড়ি চালাতে বলল! কথা রাইসাকে নিয়ে হসপিটালে আসতেই, রাজের বাবার সাথে দেখা হয়।
.
মা’রে কেমন আছিস!
.
বাবা আমি সত্যি অনেক বড় অপরাধী হয়ে গেলাম। নিজের স্বামীকে কোন স্ত্রী এতটা কষ্ট দিতো না। বাবা সত্যি রাজকে ছাড়া বাঁচবো না।
অন্যদিকে রাইসা তার বাবার রুমে গিয়েই বলতে লাগল” ও বাবাই, বাবাই কেমন আছো তুমি?
কথা বলবে না আমার সাথে বাবাই? জানো বাবাই তোমাকে মম কষ্ট দিয়েছে বলে, মমের সাথে আড়ি দিয়েছি! ঠিক করেছি না বাবাই। বাবাই তুমি আমাকে বুকে নিবে না, আমাকে জড়িয়ে ধরে আম্মু ডাকবে না!
.
হঠাৎ একটা নার্স এসে বললো” মামনী এখানে কথা বলা যাবে না!
.
আপনি চুপ করেন তো, দেখছেন না? আমি আমার বাবাই এর সাথে কথা বলছি! কথা বলবেন না, বাবাই রাগ করবে ।
ও বাবাই তুমি জানো? মা তোমার জন্য কতো কান্না করে। তুমাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি, মায়ের সাথে একটি ছবিতে। বাবাই স্কুলের সব মেয়েরা তাঁর বাবাই এর সাথে ঘুরে বেড়ায়। তাঁদের বাবাই, চকলেট আইসক্রিম কিনে দেয়, আমি এসব কিচ্ছু চাই না। তুমি কথা বলো বাবাই তাহলেই হবে। কথা বলছো না কেন? দেখছো না, তোমার রাইসা কাঁদছে। প্লিজ বাবা কথা বলো, আর চুপ করে থেকো না। আমাকে বুকে নাও, তোমার বুকে যেতে খুব খুব ইচ্ছে করছে। ও বাবাই এত্তো অভিমান কিসের তোমার। মা কাঁদছে বাবাই, বাবা মা তোমার জন্য রাতে কান্না করে। আমাকে বুকে নিয়ে তোমার নাম বলে ঘুমের ঘরেও কান্না করে। তুমি দেখো, দাদুভাই কাঁদছে। কথা বলবে না আমার সাথে? আমি কিচ্ছু খাইনি! তুমি খাইয়ে দিবে আমায়? তুমি খাইয়ে না দিলে আমি কিন্তু খাবো না । ও বাবা কথা বলছো না কেন? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবাই,আমার বুকের মাঝে ব্যাথা করছে বাবাই। কথা গুলো বলছে আর কাঁদছে।
.
এদিকে রাইসার কান্না দেখে, সবাই কাঁদছে। কথার কাছে মনে হচ্ছে, তাঁর কলিজাটা ফেঁটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর রাজ কেমন জানি করতে লাগলো। ডাক্তার এসে দেখতেই রাজ কেমন যেন নড়াচাড়া বন্ধ করে দিল।
.
রুম থেকে বের হয়ে ডাক্তার চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, সরি!
” কথাটা শুনেই কথা হসপিটালে ফ্লরে পড়ে গেল।
চলবে…..

আমার জন্ম ভূমি || শফিক নোমানী

আমার জন্ম ভূমি
শফিক নোমানী
বাংলা আমার জন্ম ভূমি
বাংলা আমার প্রাণ,
বাংলা আমার স্বপ্ন আশা বাংলা খোদার দান।
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা মায়ের অবদান,
কৃষকের কন্ঠে শুনি আমি বাংলা মায়ের গান ।
বাংলা আমার বেঁচে থাকা বাংলা আমার সুখের আশা, বাংলা আমার দুঃখ।
বাংলা আমার কাব্য ছড়া, বাংলা আমার দেশ।
বাংলা আমার ভালবাসা
বাংলা আমার রত্ন আশা, ভালবাসার রেশ।